গৃহকর্মী নির্যাতন ও হত্যা: আইনের শূন্যতা ও বিচারপ্রাপ্তির সংকট

বাংলাদেশে গৃহকর্মীরা এক শ্রেণির অদৃশ্য শ্রমিক, যারা প্রতিদিন আমাদের ঘর পরিষ্কার রাখে, সন্তান পালনেও সহায়তা করে। কিন্তু আইনি ও সামাজিকভাবে প্রায় অদৃশ্যই থেকে যায়। তাদের শ্রমের কোনো লিখিত স্বীকৃতি নেই, অধিকাংশ ক্ষেত্রেই নেই চুক্তিপত্র, নেই শ্রম অধিকার বা সামাজিক সুরক্ষা। এর চেয়েও ভয়াবহ বাস্তবতা হলো: নির্যাতনের শিকার হয়ে অনেক গৃহকর্মী মারা যাচ্ছেন, অথচ বিচারপ্রাপ্তির হার অত্যন্ত কম।

বাংলাদেশে গৃহকর্মী হত্যা: একটি ভয়াবহ চিত্র

গত এক দশকে অসংখ্য গৃহকর্মী নারী নির্যাতনের শিকার হয়ে মারা গেছে। অধিকাংশই কম বয়সের, কেউ কেউ মাত্র ১০-১২ বছরের। অধিকাংশ সময়ই এগুলো ‘আত্মহত্যা’ বলে চালিয়ে দেওয়া হয় অথবা ‘বাথরুমে পড়ে গিয়ে মৃত্যু’–এই ধরনের গল্প প্রচার করা হয়। ময়নাতদন্তের প্রতিবেদনে প্রায়ই বেরিয়ে আসে, শরীরে নির্যাতনের স্পষ্ট চিহ্ন ছিল।

আলফা হত্যা মামলা (ঢাকা, ২০২১)

১৪ বছর বয়সী আলফা নামের একটি মেয়ে ধানমন্ডির এক বাসায় গৃহকর্মী হিসেবে কাজ করত। একদিন জানানো হয়, সে বাথরুমে পড়ে মারা গেছে। কিন্তু ময়নাতদন্তে দেখা যায়, তার শরীরে মারাত্মক আঘাতের চিহ্ন এবং পুরোনো ক্ষত ছিল। এই মামলায় গৃহকর্ত্রীকে গ্রেপ্তার করা হলেও চার্জশিট দায়ের হতে দুই বছর সময় লেগে যায়।

শিশু জোসনা হত্যা (চট্টগ্রাম, ২০১৯)

১২ বছরের জোসনাকে কাজের জন্য নিয়ে যাওয়া হয় চট্টগ্রামের একটি বাড়িতে। কয়েক মাস পর তার মরদেহ পরিবারের হাতে তুলে দেওয়া হয় অজানা অসুস্থতার অজুহাতে। পরে ময়নাতদন্তে প্রকাশ পায়, তার শরীরে ১৭টি আঘাতের চিহ্ন ছিল। মামলার বিচার এখনো ঝুলে আছে।

প্রযোজ্য আইনসমূহ

গৃহকর্মীর ওপর নির্যাতন বা হত্যাকাণ্ড সংঘটিত হলে প্রযোজ্য হয় ফৌজদারি আইন, শিশু আইন ও দণ্ডবিধির বিভিন্ন ধারা। নিচে তা সংক্ষেপে উল্লেখ করা হলো:

বাংলাদেশ দণ্ডবিধি, ১৮৬০

ধারা ৩০২–ইচ্ছাকৃত হত্যা: মৃত্যুদণ্ড বা যাবজ্জীবন কারাদণ্ড।

ধারা ৩০৪–অনিচ্ছাকৃত বা গাফিলতিজনিত হত্যার জন্য ১০ বছরের কারাদণ্ড।

ধারা ৩২৬/৩২৫/৩২৩–গুরুতর শারীরিক আঘাত ও নির্যাতনের জন্য বিভিন্ন মেয়াদের কারাদণ্ড।

ধারা ৩৪ ও ১০৯–সম্মিলিত অপরাধ ও প্ররোচনার ক্ষেত্রেও প্রযোজ্য।

ফাইল ছবিশিশু আইন, ২০১৩

১৮ বছরের নিচে কোনো ব্যক্তির ওপর নির্যাতন বা হত্যার ক্ষেত্রে শিশু আইন অনুসারে বিশেষ আদালতে বিচার হওয়া উচিত। এখানে শিশুর সর্বোত্তম স্বার্থের নীতিমালা প্রযোজ্য।

আইনের শূন্যতা ও দুর্বলতা

বাংলাদেশে গৃহকর্মীরা আজও শ্রম আইন, ২০০৬-এর আওতায় পুরোপুরি অন্তর্ভুক্ত নন। ২০১৫ সালের একটি খসড়া গৃহকর্মী সুরক্ষা ও কল্যাণ নীতি প্রণয়ন হলেও তা আইনে রূপ পায়নি। ফলে, এদের ক্ষেত্রে:

১. সুনির্দিষ্ট সুরক্ষা নেই।

২. নিয়োগপত্র বাধ্যতামূলক নয়।

৩. আঘাতপ্রাপ্ত বা মৃত গৃহকর্মীর পরিবারের জন্য ক্ষতিপূরণ ব্যবস্থাও অপ্রতুল।

৪. বিচারপ্রক্রিয়া অত্যন্ত ধীর ও প্রভাবশালীদের জন্য অনুকূল।

বিচারপ্রাপ্তির সংকট ও আইনি প্রক্রিয়া

গৃহকর্মীর ওপর নির্যাতন বা হত্যাকাণ্ডের ক্ষেত্রে আইনি প্রক্রিয়া শুরু হয় এফআইআর দায়েরের মাধ্যমে। তবে এই পর্যায়েই দেখা যায় প্রধান বাধাসমূহ:

১. পরিবার মামলা করতে ভয় পায়।

. থানায় মামলা নিতে গড়িমসি।

৩. তদন্তে গাফিলতি।

৪. আদালতে সাক্ষীদের অনুপস্থিতি।

৫. প্রভাবশালীদের চাপের কারণে চার্জশিটে দুর্বলতা থাকে।

একটি আলোচিত রায়

২০১৮ সালে টঙ্গীতে একটি গৃহকর্মী হত্যার মামলায় আদালত গৃহকর্ত্রীকে মৃত্যুদণ্ড দেন। এই মামলায় ময়নাতদন্ত, প্রতিবেশীর সাক্ষ্য ও নিহতের ডায়েরির তথ্য ছিল শক্তিশালী প্রমাণ।

আইনজীবীদের মতামত

নারী ও শিশু নির্যাতন দমন ট্রাইব্যুনালের সিনিয়র আইনজীবী অ্যাডভোকেট রেহানা পারভীন বলেন, ‘গৃহকর্মী নির্যাতন মামলার অধিকাংশই সাক্ষ্য-প্রমাণের অভাবে টেকে না। পরিবারগুলো গরিব, তারা মামলা চালাতে পারে না, আবার পুলিশও অনেক সময় নিরপেক্ষভাবে তদন্ত করে না। আলাদা আইন না থাকায় বিচার আরও কঠিন।’

ব্যারিস্টার শাহরিয়ার কবির বলেন, ‘আমার মতে, গৃহকর্মীদের জন্য আলাদা সুরক্ষা আইন প্রয়োজন। যেখানে তাদের চাকরির চুক্তিপত্র, আঘাতের ক্ষতিপূরণ এবং নির্যাতনের শাস্তির বিষয়টি স্পষ্ট থাকবে।’

কীভাবে মামলা করতে হবে: ধাপে ধাপে নির্দেশিকা

গৃহকর্মী নির্যাতনের ঘটনায় মামলা করতে চাইলে ভুক্তভোগী বা তার পরিবার নিচের ধাপগুলো অনুসরণ করতে পারেন:

১. থানায় অভিযোগ (FIR) দায়ের

  • নির্যাতন বা মৃত্যুর পর দ্রুততম সময়ে নিকটস্থ থানায় গিয়ে প্রাথমিক তথ্য বিবরণী (FIR) দায়ের করতে হবে।
  • FIR-এ নির্যাতনের বিবরণ, সন্দেহভাজন ব্যক্তির নাম, স্থান ও সময় উল্লেখ করতে হবে।

২. মেডিকেল রিপোর্ট ও ময়নাতদন্ত

  • নির্যাতিত ব্যক্তি জীবিত থাকলে সরকারি হাসপাতালে মেডিকেল চেকআপ ও রিপোর্ট সংগ্রহ করা জরুরি।
  • যদি মৃত্যু ঘটে, তাহলে পোস্টমর্টেম রিপোর্ট অপরিহার্য প্রমাণ হিসেবে ব্যবহৃত হয়।

৩. সাক্ষী সংগ্রহ ও জবানবন্দি

  • প্রতিবেশী, আত্মীয় বা সহকর্মীদের কাছ থেকে লিখিত সাক্ষ্য নেওয়া যেতে পারে। ভিডিও বা অডিও রেকর্ডিং থাকলে তা গুরুত্বপূর্ণ।

৪. নারী ও শিশু নির্যাতন দমন ট্রাইব্যুনালে অভিযোগ

  • যদি নির্যাতনের ধরন নারী বা শিশুর প্রতি যৌন বা শারীরিক সহিংসতা হয়, তবে মামলা নারী ও শিশু নির্যাতন দমন ট্রাইব্যুনালে যেতে পারে।

৫. আইনগত সহায়তা

  • যারা মামলা চালাতে অর্থনৈতিকভাবে অক্ষম, তারা জাতীয় আইনগত সহায়তা প্রদান সংস্থা (NLASO) অথবা স্থানীয় মানবাধিকার সংস্থা ও এনজিও থেকে বিনামূল্যে সহায়তা পেতে পারেন।

প্রতীকী ছবিপ্রস্তাব ও করণীয়

১. স্বতন্ত্র ‘গৃহকর্মী সুরক্ষা আইন’ প্রণয়ন যেখানে নির্যাতন, শোষণ, বেতন, বিশ্রাম, নিরাপত্তা ও চুক্তিপত্রের বিষয় সুনির্দিষ্টভাবে থাকবে।

২. গৃহকর্মীদের বাধ্যতামূলক রেজিস্ট্রেশন ও কাজের লিখিত চুক্তিপত্র প্রণয়ন করতে হবে, যাতে নির্যাতনের প্রমাণ সহজ হয়।

৩. আলাদা ট্রাইব্যুনাল বা ফাস্ট-ট্র্যাক আদালত গঠন করা যেতে পারে নারী ও শিশু গৃহকর্মী নির্যাতনের বিচারের জন্য।

৪. আইনজীবী সমিতি ও এনজিও-দের সহায়তায় একটি “লিগ্যাল এইড হেল্পডেস্ক” গড়ে তোলা দরকার গৃহকর্মীদের জন্য।

৫. মিডিয়া ও শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে সচেতনতামূলক কার্যক্রম বাড়াতে হবে।

গৃহকর্মী নির্যাতন বা হত্যা কোনো বিচ্ছিন্ন ঘটনা নয়–এটি একটি কাঠামোগত ব্যর্থতা ও মানবিক সংকট। বিচারপ্রক্রিয়ার দীর্ঘসূত্রতা, আইনের ফাঁকফোকর এবং প্রভাবশালী অপরাধীদের প্রভাব–সব মিলিয়ে গৃহকর্মীরা বিচার থেকে বঞ্চিত হন। শুধু আইনি সংস্কার নয়, চাই রাষ্ট্রের সদিচ্ছা ও জনসচেতনতা। আমাদের উচিত এই নীরব শ্রমিকদের প্রতি দায়বদ্ধতা প্রতিষ্ঠা করা।

লেখক: এলএলবি, শিক্ষানবিশ আইনজীবী