গৃহশ্রমিকদের শ্রমআইনে অন্তর্ভুক্ত করা হয়নি এখনো। তাই শ্রমিক হিসেবে আইনি সুরক্ষার আওতায় নেই তারা। সরকার গৃহশ্রমিকদের জন্য ‘গৃহকর্মী সুরক্ষা ও কল্যাণ নীতি ২০১৫’ প্রণয়ন করেছেন। ছুটি, বিনোদন, পারিশ্রমিক, কর্মঘণ্টা, চিকিৎসা ও পড়াশোনার কথা উল্লেখ থাকলেও, তার কোনোটিই আদায় হয় না। নীতির বাস্তবায়ন নেই, নেই গৃহশ্রমিকদের সঠিক পরিসংখ্যান। এই অবস্থায় গৃহশ্রমিকের অধিকার আদায়ে শ্রমআইন ও ঝুঁকিপূর্ণ শিশুশ্রমের অন্তর্ভুক্ত করাসহ গৃহশ্রমের জন্য পৃথক আইন করা উচিত।
গৃহশ্রমিকদের অধিকার সুরক্ষায় তাদের আইনি কাঠামোর মধ্যে আনা খুবই গুরুত্বপূর্ণ। তাদের জন্য যেমন আইন নেই। তেমন যে আইনগুলো সহায়ক হিসেবে কাজ করে সেগুলোর মধ্যে দ্বন্দ্ব বিদ্যমান। যেমন-শিশু আইনে বলা হচ্ছে ১৮ বছরের আগে কোনো শিশুকে কাজে লাগানো যাবে না। আবার শ্রম আইনে বলা হচ্ছে ১৪ বছরের নিচে কেউ শ্রমে নিযুক্ত হতে পারবে না। আবার গৃহকর্মী সুরক্ষা নীতিমালায় বলা হচ্ছে ১২ বছরের পর পড়াশোনা অধিকার আদায়সহ শিশুকে হালকা কাজে নিযুক্ত করা যাবে। একই সঙ্গে ১৩৮ আইএলও কনভেনশন মতে—১৩ থেকে ১৫ বছরের শিশুদের হালকা কাজে লাগানো যাবে। আবার শ্রম আইনই বলছে গৃহশ্রমিক শ্রমআইনের আওতায় আসবে না। এমন দ্বিধাদ্বন্দ্বের মধ্যে গৃহশ্রমিক অধিকার আদায়ে আলাদা আইনের প্রয়োজনীয়তা জরুরি।
গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশের সংবিধানের ২০ অনুচ্ছেদ অনুযায়ী কর্মক্ষম প্রতিটি নাগরিকের জন্য কর্মের অধিকার হচ্ছে তার অধিকার, কর্তব্য ও মর্যাদার বিষয় এবং শ্রমিকের প্রাপ্য পরিশোধের মূলনীতি হলো, ‘শ্রমিকের সামর্থ্য অনুযায়ী কর্মসম্পাদন এবং সম্পাদিত কাজ অনুযায়ী শ্রমের মূল্য পরিশোধ।’ অনুচ্ছেদ ২৭ অনুযায়ী সব নাগরিক আইনের দৃষ্টিতে সমান এবং আইনের আশ্রয়লাভে সমঅধিকারী। অনুচ্ছেদ ৩৪-এ সব প্রকার জবরদস্তি শ্রম নিষিদ্ধ করা হয়েছে। সর্বজনীন মানবাধিকার ঘোষণার অনুচ্ছেদ ১ অনুযায়ী প্রতিটি নাগরিক জন্মগতভাবে স্বাধীন এবং মর্যাদা ও অধিকারের ক্ষেত্রে ধর্ম, গোত্র, গাত্রবর্ণ, জেন্ডার, ভাষা, রাজনৈতিক বা ভিন্ন মত, জাতীয় অথবা সামাজিক উৎস, সম্পদ, জন্ম বা অন্যান্য স্ট্যাটাস-নিরক্ষেপভাবে সমান।
অনুচ্ছেদ ১২ অনুযায়ী কোনো ব্যক্তির পরিবার, গৃহ ও পত্র যোগাযোগ—সব ক্ষেত্রে স্বেচ্ছাচারিতামূলক হস্তক্ষেপ বা বিঘ্ন সৃষ্টি করা এবং তার সম্মান ও মর্যাদায় আঘাত করা যাবে না। অনুচ্ছেদ ২৩, ২৪ ও ২৫-এ সব শ্রমিকের সমান কাজের জন্য সমান মজুরি নীতির ভিত্তিতে ন্যায়সংগত মজুরির বিনিময়ে স্বাধীনভাবে কর্মনির্বাচন, নির্ধারিত কর্মঘণ্টা, সাময়িক ছুটিসহ বিশ্রাম ও বিনোদন, স্বাস্থ্যসম্মতভাবে বসবাস, পরিবারসহ মানবিক মর্যাদার সঙ্গে জীবনযাপন এবং সামাজিক নিরাপত্তার অধিকার সংরক্ষণের কথা বলা হয়েছে।
দেশের শহর ও গ্রামাঞ্চল সর্বত্র গৃহকর্মীদের কর্মক্ষেত্রের বিস্তৃতি। এ ব্যাপক পরিসরে বিভিন্ন শ্রেণীভুক্ত নিয়োগকারীর গৃহে কর্মরত গৃহকর্মীর জন্য শোভন কাজ এবং মর্যাদাপূর্ণ জীবনযাপন নিশ্চিতকরণের লক্ষ্যে নিম্নবর্ণিত বিষয়াদি প্রতিপালন করতে হবে:
ক. মজুরি নির্ধারণ: উভয়পক্ষের আলাপ-আলোচনার ভিত্তিতে মজুরি নির্ধারিত হবে। পূর্ণকালীন গৃহকর্মীর মজুরি যাতে গৃহকর্মীর পরিবারসহ সামাজিক মর্যাদার সঙ্গে জীবনযাপনের উপযোগী হয়, নিয়োগকারী তা নিশ্চিত করবেন। গৃহকর্মীর ভরণপোষণ, পোশাক-পরিচ্ছদ দেওয়া হলে তা মজুরির অতিরিক্ত বলে গণ্য হবে।
(খ) খণ্ডকালীন গৃহকর্মীর মজুরি: খণ্ডকালীন গৃহকর্মীর মজুরি কাজ বা কাজের ধরণ কিংবা কাজের সময়ের ভিত্তিতে নির্ধারণ করা হবে। খণ্ডকালীন গৃহকর্মীর ভরণ-পোষণ ও পোশাক-পরিচ্ছদ দেওয়া হলে তা মজুরির অতিরিক্ত বলে গণ্য হবে।
(গ) মজুরি পরিশোধ: নিয়োগকারী গৃহকর্মীকে প্রতি মাসের মজুরি পরবর্তী মাসের ৭ তারিখের মধ্যে পরিশোধ করবেন।
(ঘ) গৃহকর্মীর বয়স: গৃহকর্মী নিয়োগে বাংলাদেশ শ্রম আইন, ২০০৬-এর বিধান অনুসরণ করতে হবে। ১৪ বছর পূর্ণ করেছে, তবে ১৮ বছরের কম এরূপ বয়সে গৃহকর্মে নিয়োজিত কিশোর বা কিশোরী কিংবা হালকা কাজের ক্ষেত্রে ১২ বছর বয়োপ্রাপ্ত শিশুনিয়োগ করতে হলে আইনানুগ অভিভাবকের সঙ্গে এবং প্রাপ্তবয়স্ক হলে নিয়োগলাভে ইচ্ছুক ব্যক্তির সঙ্গে বিস্তারিত আলোচনা করে নিয়োগপ্রদান যুক্তিযুক্ত।
তবে মৌখিক চুক্তি বা সমঝোতা বা ঐকমত্যহলে তা গৃহকর্মী ও নিয়োগকারীর কাছে গ্রহণযোগ্য কোনো তৃতীয় পক্ষের উপস্থিতিতে আলোচনা সম্পন্ন করা বাঞ্ছনীয়। বিস্তারিত আলোচনাকালে কিংবা চুক্তি বা সমঝোতা বা ঐকমত্যে নিম্নবর্ণিত বিষয়গুলো স্পষ্টভাবে উল্লেখ থাকবে:
(ক) নিয়োগের ধরন
(খ) নিয়োগের তারিখ
(গ) মজুরি
(ঘ) বিশ্রামের সময় ও ছুটি
(ঙ) কাজের ধরণ
(চ) গৃহকর্মীর থাকা-খাওয়া
(ছ) গৃহকর্মীর পোশাক-পরিচ্ছদ ও শারীরিক পরিচ্ছন্নতা এবং
(জ) গৃহকর্মীর বাধ্যবাধকতা।
নিয়োগপত্র বা চুক্তি কিংবা সমঝোতা বা ঐকমত্যে উল্লিখিত শর্তগুলো উভয়পক্ষ মেনে চলতে বাধ্য থাকবে, তবে লক্ষ্য রাখতে হবে যে ওই শর্তাবলি যাতে দেশের প্রচলিত আইন ও নীতির পরিপন্থি না হয়। ১২ বছর বয়োপ্রাপ্ত কোনো শিশুকে হালকা কাজে নিয়োগের ক্ষেত্রে তার স্বাস্থ্য ও উন্নতির জন্য বিপজ্জনক নয় অথবা শিক্ষা গ্রহণকে বিঘ্নিত করবে না, তা বিবেচনায় নিতে হবে। প্রত্যেক গৃহকর্মীর কর্মঘণ্টা এমনভাবে বিন্যস্ত করতে হবে, যাতে তিনি পর্যাপ্ত ঘুম, বিশ্রাম, চিত্তবিনোদন ও প্রয়োজনীয় ছুটির সুযোগ পান। গৃহকর্মীর ঘুম ও বিশ্রামের জন্য নিরাপদ ও স্বাস্থ্যসম্মত স্থান নিশ্চিত করতে হবে।
গৃহকর্তা বা গৃহকর্ত্রীর অনুমতি নিয়ে গৃহকর্মী সবেতনে ছুটিভোগ করতে পারবেন। সন্তানসম্ভবা গৃহকর্মীকে তার প্রসূতিকালীন ছুটি হিসেবে মোট ১৬ সপ্তাহ সবেতনে মাতৃত্ব ছুটি দিতে হবে। এছাড়া প্রয়োজনীয় সময় পর্যন্ত ভারী কাজ থেকে বিরত রাখা এবং মাতৃস্বাস্থ্যের পরিচর্যায় সরকারি হাসপাতালের সঙ্গে যোগাযোগ করতে গৃহকর্তা সহায়তা করবেন।
কোনো ক্রমেই গৃহকর্মীর প্রতি কোনো ধরনের অশালীন আচরণ বা দৈহিক আঘাত অথবা মানসিক নির্যাতন করা যাবে না। নিয়োগকারী, তার পরিবারের সদস্য বা অতিথিদের দ্বারা কোনো গৃহকর্মী কোনো প্রকার শারীরিক ও মানসিক নির্যাতন যেমন: অশ্লীল আচরণ, যৌননিগ্রহ কিংবা শারীরিক আঘাত অথবা ভীতি প্রদর্শনের শিকার হলে দেশের প্রচলিত আইনানুযায়ী প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণ করতে হবে। গৃহকর্মী তার কর্মরত পরিবারের সদস্য বিশেষ করে শিশু, অসুস্থ ও বৃদ্ধ বা অন্য কোনো সদস্যের প্রতি কোনো প্রকার শারীরিক ও মানসিক নির্যাতন বা পীড়াদায়ক আচরণ করতে পারবেন না। এ ধরনের কোনো ঘটনা ঘটলে নিয়োগকারী তার নিয়োগ বাতিল করতে পারবেন এবং তার বিরুদ্ধে দেশের প্রচলিত আইনানুযায়ী ব্যবস্থা গ্রহণ করতে পারবেন।
তবে এই ‘গৃহকর্মী সুরক্ষা ও কল্যাণ নীতি’ কিন্তু অসম্পূর্ণ ও অস্পষ্ট। কারণ এই নীতিতে ভুক্তভোগীর জন্য ক্ষতিপূরণের পরিমাণ, অর্থপ্রদান পদ্ধতি, ছুটির সংখ্যা এবং ছুটি না পেলে সে বিষয়ে আপিল প্রক্রিয়ার মতো নির্দিষ্ট তথ্য নেই। কাজেই যত তাড়াতাড়ি সম্ভব এই বিষয়গুলি আমলে নিয়ে গৃহকর্মীদের জন্য একটি পূর্ণাঙ্গ আইন প্রণয়ন করা এখন সময়ের দাবি।
লেখক: অ্যাডভোকেট, বাংলাদেশ সুপ্রিম কোর্ট
আরও পড়ুন:



