সব ঠিকঠাক থাকলে আগামী ২০ জানুয়ারি যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট হিসেবে দ্বিতীয় মেয়াদে ক্ষমতায় বসবেন ডোনাল্ড ট্রাম্প। তাঁর দ্বিতীয় মেয়াদেও প্রথম মেয়াদের অনেক নীতির পুনরাবৃত্তি ঘটার নানা লক্ষণ এরই মধ্যে স্পষ্ট হয়েছে। বিশেষ করে অভিবাসন, সীমান্ত ও শুল্কের ক্ষেত্রে আগের অবস্থানে থাকবেন ট্রাম্প। তবে বিভিন্ন নীতিতে পরিবর্তন দ্বিতীয় মেয়াদ আগেরবারের চেয়ে অনেক বেশি ভিন্ন হতে পারে বলে মনে করেন বিশ্লেষকেরা। ট্রাম্প এরই মধ্যে ক্রিপ্টোকারেন্সি, টিকটক, স্বাস্থ্যসেবা বিভাগ, শিক্ষা বিভাগ নিয়ে যেসব মন্তব্য করেছেন বা এসব বিষয় দেখার জন্য যাদের মনোনয়ন দিয়েছেন, তাতে করে নতুন মেয়াদ যে আগেরবারের চেয়ে অনেকটা ভিন্ন গতিমুখ পেতে যাচ্ছে, তা স্পষ্ট।
ক্রিপ্টোকারেন্সি
প্রথম মেয়াদে ক্রিপ্টোকারেন্সির প্রকাশ্য সমালোচক ছিলেন ট্রাম্প। বিটকয়েনের মতো ডিজিটাল মুদ্রা নিয়ে সরব ছিলেন। ক্রিপ্টোকারেন্সিকে মুদ্রা বলতে নারাজ ছিলেন। একে রীতিমতো ‘স্ক্যাম’ বলে মন্তব্য করেছিলেন। তবে দ্বিতীয় মেয়াদে ফিরে আসার জন্য, ট্রাম্প তাঁর অবস্থান বদলেছেন। ২০২৪ সালের নির্বাচনী প্রচারে যুক্তরাষ্ট্রকে ‘বিশ্বের ক্রিপ্টো রাজধানী’ হিসেবে প্রতিষ্ঠা করার প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন। এমনকি ন্যাশনাল ক্রিপ্টোকারেন্সি রিজার্ভ প্রতিষ্ঠার পরিকল্পনার কথাও জানিয়েছেন এই রিপাবলিকান নেতা।
টিকটক
প্রথম মেয়াদে ট্রাম্প টিকটককে জাতীয় নিরাপত্তার জন্য হুমকি আখ্যা দিয়ে এটি যুক্তরাষ্ট্রে নিষিদ্ধ করার পদক্ষেপ নিয়েছিলেন। তবে দ্বিতীয় মেয়াদে অবস্থান পুরোপুরি পাল্টে গেছে তাঁর। উল্টো টিকটকের সুরক্ষার প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন। টিকটক যুক্তরাষ্ট্রে অবাধে কার্যক্রম চালাতে পারবে বলে আশার বাণী শুনিয়েছেন তিনি।
ভ্যাকসিন
প্রথম মেয়াদে ট্রাম্প তাঁর প্রশাসনের অধীনে করোনাভাইরাস প্রতিরোধী ভ্যাকসিন তৈরি প্রকল্পে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখেন। তবে সময়ের সঙ্গে সঙ্গে তাঁর সমর্থকদের মধ্যে ভ্যাকসিন নিয়ে সংশয় বৃদ্ধি পাওয়ায় তিনি এই প্রকল্প থেকে সরে আসেন। শুধু তাই নয়, করোনা টিকা বা করোনা মহামারি রোধে মানুষের চলাচলে নিয়ন্ত্রণ আরোপের বিপক্ষে অবস্থান নেন। এ বিষয়ে সিডিসি ও ট্রাম্প প্রশাসন বলা যায় মুখোমুখি অবস্থানে এসে দাঁড়িয়েছিল। দ্বিতীয় মেয়াদে স্বাস্থ্য ও জনসেবা বিভাগের সচিব পদে রবার্ট এফ কেনেডি জুনিয়রকে নিয়োগের ঘোষণা দিয়েছেন। কেনেডি জুনিয়র ভ্যাকসিনের বিষয়ে প্রচুর ভুল তথ্য প্রচার করে আসছেন।
শিক্ষা
শিক্ষা খাতে ফেডরালে সরকারের ভূমিকা সংকোচনের পক্ষে ছিলেন ট্রাম্প। প্রথম মেয়াদে প্রশাসনকে তিনি শিক্ষা বিভাগ ও শ্রম বিভাগকে একত্রিত করার প্রস্তাব দিয়েছিলেন। তবে দ্বিতীয় মেয়াদে শিক্ষা বিভাগের কার্যক্রমকে রাজ্য সরকারগুলোর হাতে ছেড়ে দেওয়ার প্রস্তাব দিয়েছেন। গত ৫ নভেম্বর অনুষ্ঠিত প্রেসিডেন্ট নির্বাচনে জয়ের কয়েক দিনের মধ্যে এ বিষয়ে একটি ঘোষণাও দেন তিনি।
যুদ্ধের কৌশল
প্রথম মেয়াদে মধ্যপ্রাচ্য ও আফগানিস্তান থেকে মার্কিন সেনা প্রত্যাহারের কৌশল নিয়েছিলেন ট্রাম্প। দ্বিতীয় মেয়াদে এ ক্ষেত্রে কিছুটা একই ধরনের অবস্থানে থাকবেন বলে ধারণা করা হচ্ছে। বিদেশে সেনা পাঠানোর পরিবর্তে মিত্র দেশগুলোকে সমর্থন দিতে পারেন। তবে ‘সন্ত্রাসবাদের বিরুদ্ধে’ মার্কিন যুদ্ধ, চীনের সামরিক উত্থান ও রাশিয়ার বিরুদ্ধে কৌশলগত চাপ বাড়াতে পারেন ট্রাম্প। এ ছাড়া সাইবার যুদ্ধ ও তথ্যপ্রযুক্তিগত ক্ষেত্রে মার্কিন সামরিক শক্তির আধিপত্য বাড়ানোর জন্য নতুন কৌশল ব্যবহার করতে পারেন তিনি।
রাশিয়া‑ইউক্রেন যুদ্ধ
দ্বিতীয় মেয়াদে রাশিয়া‑ইউক্রেন যুদ্ধকে গুরুত্ব দেবেন ট্রাম্প। ইউক্রেন যুদ্ধের অবসানে একটি বড় পদক্ষেপ নিতে পারে নতুন প্রশাসন। রাশিয়া‑ইউক্রেন যুদ্ধের অবসান বিশ্ব জ্বালানি বাজারকে স্থিতিশীল করতে পারে। এ বিষয়ে যদি ট্রাম্প সফলভাবে একটি চুক্তির মধ্যস্থতা করেন, তবে এটি যুক্তরাষ্ট্র-রাশিয়া সম্পর্ককে নতুন মাত্রা দেবে। এমনকি দুই দেশ এক হয়ে সন্ত্রাস দমনে সহযোগিতার পথ খুলতে পারে। যদিও সামরিক জোট ন্যাটোর পক্ষ থেকে এর বিরোধিতা হতে পারে।
বাণিজ্য যুদ্ধ
ট্রাম্পের প্রথম মেয়াদে মার্কিন বাণিজ্য যুদ্ধ বিশ্ব অর্থনীতিকে অস্থিতিশীল করে তুলেছিল। বিশেষ করে চীন ও ইউরোপের বিভিন্ন দেশের সঙ্গে বাণিজ্য সম্পর্কের ক্ষেত্রে উচ্চাভিলাষী পদক্ষেপ গ্রহণ করা হয়েছিল। চীনের বিরুদ্ধে ২ হাজার কোটি ডলারের শুল্ক আরোপ ও ইউরোপের সঙ্গে বিভিন্ন বাণিজ্য চুক্তি পরিবর্তন করেন ট্রাম্প। দ্বিতীয় মেয়াদে চীনের বিরুদ্ধে আরও কঠোর পদক্ষেপ নিতে পারেন তিনি। চীনের অর্থনৈতিক উত্থানকে মোকাবিলা করতে এবং বিশ্বব্যাপী সরবরাহ শৃঙ্খলে প্রভাব কমাতে শুল্ক, বাণিজ্য বাধা ও প্রযুক্তির বিধিনিষেধ অব্যাহত রাখার ইঙ্গিত দিয়েছেন রিপাবলিকানরা। অর্থাৎ, নতুন ট্রাম্প প্রশাসন ফের চীনের বিরুদ্ধে বাণিজ্য যুদ্ধে জড়াতে পারে।
অ্যাফোর্ডেবল কেয়ার অ্যাক্ট
ওবামা প্রশাসনের অন্যতম জনপ্রিয় নীতি ছিল অ্যাফোর্ডেবল কেয়ার অ্যাক্ট (এসিএ), যা ওবামাকেয়ার হিসেবে পরিচিত। এ আইনের মাধ্যমে মার্কিন নাগরিকদের চিকিৎসা ব্যয়কে নাগালের মধ্যে নিয়ে আসা হয়েছিল। কিন্তু নানা কারণে প্রথম মেয়াদে ট্রাম্প এসিএ’র বিরোধী ছিলেন। এই আইনকে ‘বিপর্যয়’ বলে মন্তব্য করে তা বাতিলের জন্য নানা চেষ্টা করেছিলেন। ট্রাম্পের প্রথম মেয়াদে ওবামাকেয়ার বাতিলের জন্য রিপাবলিকান পার্টির আইনপ্রণেতারা কংগ্রেসে একাধিকবার চেষ্টা করেছিলেন। এসব প্রচেষ্টায় ট্রাম্পের সমর্থন ছিল। আইনটি বাতিলের জন্য ট্রাম্প প্রশাসন সুপ্রিম কোর্টেরও দ্বারস্থ হয়েছিল। কিন্তু আদালত তাদের আবেদন বাতিল করে দেয়।
গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, ২০২৪ সালের নির্বাচনী প্রচারে ট্রাম্পকে ওবামাকেয়ারের বিরোধিতা করতে দেখা যায়নি। বরং ক্ষমতায় এলে এসিএ বাতিলের কোনো উদ্যোগকে সরাসরি সমর্থন করবেন না বলে এবারের প্রচারণায় ঘোষণা দিয়েছেন তিনি। গত সেপ্টেম্বরে ডেমোক্রেটিক পার্টির প্রেসিডেন্ট প্রার্থী কমলা হ্যারিসের সঙ্গে বিতর্কে ট্রাম্প বলেছিলেন, এসিএ’র বদলে অন্য নতুন স্বাস্থ্য কর্মসূচি শুরু করার ‘পরিকল্পনা’ রয়েছে তাঁর।
তথ্যসূত্র: টাইম ম্যাগাজিন, বিবিসি, সিএনএন, ওয়াশিংটন পোস্ট


যুদ্ধ কি আদৌ শেষ করতে পারবেন ট্রাম্প
ডোনাল্ড ট্রাম্প: আমেরিকা কি একজন ‘স্ট্রংম্যান’ আমদানি করল?
