ঠাকুরগাঁওয়ে অতিরিক্ত বৃষ্টির কারণে শত শত বিঘা জমির পাকা ও আঁধা পাকা ধান পানির নিচে তলিয়ে গেছে। অতিরিক্ত পানির কারণে ধান সংগ্রহ করতে না পারায় দুশ্চিন্তায় পড়েছেন ঠাকুরগাঁওয়ের বোরো ধান চাষিরা। ক্ষতিগ্রস্ত চাষিদের তালিকার পাশাপাশি ডুবে যাওয়া ধান দ্রুত কাটার পরামর্শ দিচ্ছে কৃষি বিভাগ।
ঠাকুরগাঁওয়ের ইতিহাসে অতিরিক্ত বৃষ্টিতে এবারই প্রথম। এতে পানির নিচে তলিয়ে গেছে বোরো ধান। বৈশাখ মাসের প্রথম থেকেই প্রায় প্রতিদিনই বৃষ্টি হচ্ছে ঠাকুরগাঁওয়ে। তার পরেও গত তিন দিন থেকে শুরু হয়েছে অতিরিক্ত বৃষ্টিপাত। আর অতিরিক্ত বৃষ্টিপাতের কারণে ধান উৎপাদনের জেলা হিসেবে পরিচিত উত্তরের জেলা ঠাকুরগাঁওয়ে শত শত বিঘা জমির ধান পানির নিচে তলিয়ে গেছে। ডুবে যাওয়া ধান বুক বরাবর পানিতে অনেক কষ্টে সংগ্রহ করছেন চাষিরা। যে জমিতে আরও বেশি পানি সেখানকার ধান কেটে ভাসমান হাঁড়ি, পাতিল সংগ্রহ করছেন অনেকে।
স্থানীয় কৃষি বিভাগ বলছে, নদীর আশপাশে, বিল ও নিচু এলাকার ধান পানির নিচে চলে গেছে। ডুবে যাওয়া ধান দ্রুত না কাটলে নষ্ট হয়ে যাবে, এ কারণেই সকলকে দ্রুত পাঁকা ধান কাটার পরামর্শ দিয়েছে তারা।
এদিকে ধান উৎপাদনে ঋণের বোঝা মাথায় নিয়ে লোকশানের আশঙ্কায় দুশ্চিন্তায় দিন পার করছেন স্থানীয় কৃষকেরা। অতিরিক্ত পানি আবার পানির নীচে জোঁকের অত্যাচার তারপরও থেমে নেই কৃষকদের ডুবে যাওয়া ধান সংগ্রহের অভিযান। জোকের হাত থেকে বাঁচার জন্য হাত থেকে পা পর্যন্ত মোটা কাপড় পরছে তারা। আর যারা খালি পায়ে পানিতে নেমে ধান কাটছে তাদের জোকের আক্রমণের মুখে পড়তে হচ্ছে।
আজ সোমবার সকালে সদর উপজেলার ভেলাজান, রহিমানপুরের বিল নড়লই, রায়পুরের বেংরোল এলাকা ঘুরে দেখা যায় বেশিরভাগ নিচু জমি ধান পানিতে ডুবে গেছে।
কৃষি বিভাগের তথ্যমতে, জেলার সাত উপজেলায় ৬২ হাজার হেক্টর জমিতে বোরো ধানের আবাদ হয়েছে। এখন পর্যন্ত প্রায় ১৫ হাজার হেক্টর জমির ধান কাটা হয়েছে। আরও ধান পাকলেও অতিরিক্ত পানির কারণে কাটতে পারছেন না চাষিরা।
ঠাকুরগাঁও সদর উপজেলার ভেলাজান হীরামন পাড়া গ্রামের টীয়াবুল রায় বলেন, ‘১৪ কাঠা ধান আবাদ করেছি। সে পাকা ধান বৃষ্টির পানিতে ডুবে গেছে। এখন ডুবে যাওয়া ধান ডুবে ডুবে সংগ্রহ করছি। কারণ এই ধান সংগ্রহ করতে না পারলে আমার পরিবারের ছয়জন সদস্য না খেয়ে থাকবে।’
একই এলাকার সোলেমান আলী বলেন, ‘দুই বিঘা জমিতে বোরো ধান চাষ করেছি, যা পানির নিচে ডুবে গেছে। এখন নিজে কি খাব আর ধার দেনা কেমনে শোধ করব সেই চিন্তা করছি। ধানের উপরে পানি, তার উপরে প্রচুর জোঁক। শ্রমিকেরা ভয়ে ধান কাটতে চায় না।’
একই উপজেলার দক্ষিণ ভেলাজানের কৃষক আবু রায়হান বলেন, ‘এবারের মতো আবহাওয়া কোনোদিন দেখিনি। বৈশাখ মাস থেকেই যেন বর্ষা শুরু হয়ে গেছে। সরকার যদি আমাদের মতো ক্ষতিগ্রস্ত কৃষকের দিকে না দেখে, তাহলে আমরা আর বাঁচবো না।’
ঠাকুরগাঁও কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরে উপ পরিচালক কৃষিবিদ মো. মাজেদুল ইসলাম বলেন, ‘নদীর ধারে বিলে ও নিচু এলাকার বোরো ধান পানি নিচে ডুবে গেছে। ক্ষতিগ্রস্ত কৃষকদের তালিকা করছি সেই সাথে ডুবে যাওয়া ধান দ্রুত কেটে ফেলার পরামর্শ দিচ্ছি। বৈরী আবহাওয়ার কারণে কাঁটা ধানও শুকাতে পারছেন না চাষিরা। ডুবে যাওয়া ধান সংগ্রহ করতে পারলে কিছুটা হলেও ক্ষতি থেকে রক্ষা পাবেন।’
এই কর্মকর্তা বলেন, ‘বৃষ্টির পানিতে বোরো ধান ডুবেছে–এটি এবার ঠাকুরগাঁওয়ে প্রথম। শুধু ধান নয়, ভুট্টা, মরিচসহ শাকসবজি চাষিরাও বেশ ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছেন।’
বৃষ্টির পানি আরও বৃদ্ধি পেলে নিচু এলাকার বোরো ধান সংগ্রহে আরও জটিলতা দেখা দিবে এমনটাই আশঙ্কা করছেন স্থানীয় কৃষকেরা।



