স্কুলে ভর্তি হওয়ার সময় যে শিশুটির চোখে থাকে রঙিন স্বপ্ন, সেই শিশুটিই হঠাৎ করে পথ হারিয়ে ফেলছে কোথায়? যে বয়সে তার হাতে খাতা-কলম থাকার কথা, সে বয়সে সে কীভাবে যেন হারিয়ে যাচ্ছে কঠিন কোনো বাস্তবতার মাঝে। গত কয়েক বছরে প্রাথমিক শিক্ষায় যে অগ্রগতি হয়েছিল, তা হঠাৎ করেই উল্টো পথে চলতে শুরু করেছে। চলুন জানার চেষ্টা করি, শিক্ষার্থীরা আসলে কেন স্কুল থেকে ঝরে পড়ছে?
ছেলেরাই বেশি ঝরে পড়ছে?
প্রাথমিক শিক্ষা অধিদপ্তরের ২০২৪ সালের রিপোর্ট অনুযায়ী, ১৪ বছরের ধারাবাহিক উন্নতি ভেঙে দিয়ে ড্রপআউটের হার হঠাৎ বেড়ে গেছে। সবচেয়ে আতঙ্কের বিষয় হলো, মেয়েদের তুলনায় ছেলেদের পড়াশোনা ছেড়ে দেওয়ার হার আকাশচুম্বী—প্রায় ১৯ শতাংশ। প্রশ্ন হলো, এই ছেলেরা স্কুল ছেড়ে কোথায় যাচ্ছে?
উত্তরটা বড় করুণ। দেশের বর্তমান উচ্চ মূল্যস্ফীতি ও দ্রব্যমূল্যের ঊর্ধ্বগতির কারণে গরিব ও সাধারণ পরিবারের সংসার চালানোই দায় হয়ে পড়েছে। পেটের টানে বাধ্য হয়ে এই কোমলমতি ছেলেদের বাবা-মা নামিয়ে দিচ্ছেন শিশুশ্রমে। কেউ গ্যারেজে কাজ করছে, কেউ দোকানে, আবার কেউ ভারী কোনো কাজ বেছে নিচ্ছে পরিবারের চার পয়সা আয়ের জন্য। অন্যদিকে, কিছু ক্ষেত্রে দেখা যাচ্ছে অল্প বয়সে মেয়েদেরও পড়তে হচ্ছে বাল্যবিয়ের নির্মম বাস্তবতার মুখে। সরকারের দেওয়া সামান্য উপবৃত্তির টাকা দিয়ে এখন আর সংসার বা পড়াশोनার খরচ কোনোভাবেই কুলাচ্ছে না।
কলেজ পর্যায়ে বিশাল ধাক্কা
প্রাথমিক স্তর পার হয়ে শিক্ষার্থীরা যখন উচ্চ মাধ্যমিকে পা রাখছে, সেখানেও চলছে এক ভয়ভয়হ শূন্যতা। দেশের কলেজগুলোতে প্রায় ২৫ লাখ সিট থাকার পরও এবার আবেদন করেছে মাত্র ৯ লাখ ৯৫ হাজার শিক্ষার্থী। এসএসসিতে পাস করা ১১ লাখ ৪৩ হাজার শিক্ষার্থীর মধ্যে প্রায় দেড় লাখ শিক্ষার্থী কলেজেই ভর্তি হয়নি। তারা জেনেশুনে উচ্চশিক্ষা থেকে নিজেদের গুটিয়ে নিয়েছে।
কেন এমন হচ্ছে? ঢাকা শিক্ষা বোর্ডের চেয়ারম্যান স্পষ্টই বলছেন, দীর্ঘদিন ধরে চলে আসা সিস্টেমের অবহেলা এবং ক্লাসে নিয়মিত উপস্থিত না থাকার সংস্কৃতি এর জন্য দায়ী। এ বছর ৩৭ শতাংশ শিক্ষার্থী এসএসসিতে ফেল করেছে, যার মূল কারণ ছিল দিন পর দিন ক্লাস থেকে দূরে থাকা। শিক্ষা খাতকে দীর্ঘদিন অগ্রাধিকার না দেওয়ার ফল আজ হাতেনাতে মিলছে।
কারিগরি শিক্ষায় এত টান কেন?
আপনার মনে হতে পারে, সাধারণ পড়াশোনা ছেড়ে শিক্ষার্থীরা হয়তো কারিগরি বা ভোকেশনাল শিক্ষায় ঝুঁকছে। কিন্তু খবর কি জানেন? সেখানেও এক অদ্ভুত প্যারাডক্স বা লুকোচুরি চলছে। বাংলাদেশ কারিগরি শিক্ষা বোর্ডের তথ্য বলছে, ১৪৯টি সরকারি টেকনিক্যাল স্কুল ও কলেজের প্রায় ৯৭ হাজার সিট ফাঁকা—সোজা কথায় ৬৩ শতাংশ!
অবকাঠামো আর বড় বড় ভবন তৈরি হলেও সেখানে ছাত্র টিকছে না। কারিগরি শিক্ষা বোর্ডের ডিরেক্টর বলছেন, শুধু সার্টিফিকেট পাওয়ার একটা প্রবণতা তৈরি হয়েছে, কিন্তু তরুণদের মধ্যে আসল হ্যান্ডস-অন বা হাতেকলমে শেখার মানসিকতাটাই যেন দিন দিন হারিয়ে যাচ্ছে। আধুনিক যন্ত্রপাতির অভাব আর মানহীন শিক্ষার কারণে শিক্ষার্থীরা বুঝেশুনেই এই জায়গাগুলো এড়িয়ে চলছে।
নীতিনির্ধারকদের খেলা আর ভবিষ্যৎ সংকট
শিক্ষার্থীরা কেন ঝরে পড়ছে, তার শেকড়টা আসলে গভীরে। ১৯৭২ সালে ড. কুদরত-ই-খুদার নেতৃত্বে অসাধারণ একটি শিক্ষা কমিশন গঠিত হলেও পরবর্তী সময়ে সরকার বদলের সাথে সাথে আমাদের শিক্ষানীতিকেও বারবার কাটাছেঁড়া করা হয়েছে। রাজনৈতিক পালাবদলের সাথে পাল্টে গেছে শিক্ষাদর্শন। বিশেষজ্ঞরা বারবার বলছেন, দলীয় এজেন্ডা বাদ দিয়ে একটি স্থায়ী ও স্বাধীন শিক্ষা কমিশন না বসালে এই ঝরে পড়ার মিছিল থামানো যাবে না। নীতিনির্ধারকদের উদাসীনতা আর শুধু ব্যক্তিগত ফায়দা তোলার মানসিকতা আজ পুরো একটা প্রজন্মকে অনিশ্চয়তার দিকে ঠেলে দিচ্ছে।
শিক্ষার্থীরা ঝরে পড়ে হারিয়ে যাচ্ছে কলকারখানায়, রাজপথে কিংবা অশিক্ষার অন্ধকারে। এই স্রোত যদি এখনই না ঠেকানো যায়, তবে আগামী দিনে জাতি হিসেবে আমাদের চড়া মূল্য দিতে হবে।



