‘আইসক্রিম’ সিনেমাটি চরকিতে মুক্তি পেতে যাচ্ছে ২০ অক্টোবর– এ কথা শুনলেই যেন শরতের মিষ্টি রোদের মতো অনেক দর্শকের কাছে উজ্জ্বল হয়ে উঠতে পারে ১০ বছর আগের সেই স্মৃতিগুলো। ২০১৬ সালের ২৯ এপ্রিল প্রেক্ষাগৃহে সিনেমাটির মুক্তি পাওয়া; অভিনয়শিল্পী রাজ, তুষি, উদয়ের অভিষেক, নিজেদের প্রথম সিনেমা নিয়ে তাদের অবেগঘন মুহূর্ত, আরও কত কী! দর্শক–শ্রোতাদের কানে শীতের আগমনীর মতো স্পর্শ করে যেতে পারে অর্ণব কিংবা মিনারের ‘বোকা চাঁদ’ ও ‘পথ’ গান দুটি প্রথম শোনার অনুভূতি।
নির্মাতা রেদওয়ান রনিও তখন একজন তরুণ ও নবীন নির্মাতা। তাঁর স্মৃতির পাতাতেও ঝলমল হয়ে উঠতে পারে নিজের দ্বিতীয় সিনেমা মুক্তির উচ্ছ্বাস। এমন আরও অনেক স্মৃতির ঝাঁপি খুলে আজ রাত ১২টায়, অর্থাৎ ২০ অক্টোবর এক্সক্লুসিভলি চরকিতে মুক্তি পাচ্ছে ‘আইসক্রিম’।
শরীফুল রাজ, নাজিফা তুষি, কুমার উদয়—যারা এখন নিজেদের কাজের মাধ্যমে দর্শকের কাছে অন্যতম জনপ্রিয়, এটি ছিল তাঁদের প্রথম সিনেমা। শরিফুল রাজ সেসময় অশ্রুশিক্ত হয়ে বলেছিলেন, ‘আমি জীবনে অনেক কষ্ট করে এই পর্যায়ে এসেছি। রনি ভাইয়ের (রেদওয়ান রনি) কাছে কৃতজ্ঞ।’ আর রেদওয়ান রনি? প্রেক্ষাগৃহে দর্শকদের প্রতিক্রিয়াই ছিল তাঁর অর্জন এবং একদম নতুন কিছু অনুভূতি দেখানোর জন্যই নতুন মুখ নিয়ে কাজ করেছিলেন তিনি। বলেছিলেন, ‘গল্পের জন্যই নতুন মুখ দরকার ছিল। আমি এমন কিছু হাসি–কান্না–দুঃখ দেখাতে চেয়েছি, যেটা আগে পর্দায় কেউ দেখেনি, তাই নতুন মুখ নেয়া। আর দর্শকদের উচ্ছ্বাসই আমার অর্জন।’
সিনেমার নাম ‘আইসক্রিম’ কেন? জবাবে নির্মাতা বলেছিলেন, ‘আমি একটা সম্পর্কের গল্প বলতে চেয়েছি, আর সম্পর্কটা আইসক্রিমের মতো, একটা নির্দিষ্ট তাপমাত্রায় রাখতে হয়। তাপমাত্রা কম হলে গলে যায়, আবার বেশি হলে বরফ হয়ে যায়।’
এ তো গেল অভিনয়শিল্পী-নির্মাতার স্মৃতি রোমন্থন! অন্যদিকে, সিনেমাটি নিয়ে এখনও অনেক দর্শকের বেশ আগ্রহ লক্ষ্য করা যায়। গত ১৬ অক্টোবর চরকির ভেরিফায়েড ফেসবুক পেজে পোস্ট করা হয় আইসক্রিম’র একটি থিমেটিক পোস্টার, যা শেয়ার করছেন রেদওয়ান রনি নিজেও। তাঁর সেই ফেসবুক পোস্টের মন্তব্যঘরে এক দর্শক লিখেছেন, ‘অপেক্ষায় আছি সিনেমাটি দেখার জন্য।’ কেউ-বা আবার নস্টালজিক; একজন লিখেছেন, ‘এটা ছিল আমার জন্য প্রথম বাংলা সিনেমা, যেটা আমি প্রেক্ষাগৃহে গিয়ে দেখেছিলাম।’
এ প্রজন্মের আলোচিত অভিনেত্রী নাজিফা তুষি। ‘আইসক্রিম’ ছিল তাঁর অভিনীত প্রথম চলচ্চিত্র, এমনকি মিডিয়ায় প্রথম কোনো কাজ। কোনো নাটক, বিজ্ঞাপনে কাজ না করেই সরাসরি সিনেমায় নাম লিখিয়েছিলেন তিনি। এখন সেই সময়ের কথা ভাবলে কী মনে হয়, কেমন মনে হয়? তুষি বলেন, ‘সিনেমা যে একটা বড় ক্যানভাস, এসব কিছু না বুঝেই–না জেনেই সিনেমার ক্যানভাসে দাঁড়িয়ে গিয়েছিলাম। তখন আমি ইন্ডাস্ট্রির কিছুই জানি না, বুঝি না। আমার জাস্ট একটা ইচ্ছে ছিল যে আমি অভিনয় করতে চাই। আর তখন এফডিসির বাইরে অল্টারনেটিভ সিনেমা হচ্ছিল অনেক কম। আমার কাছে মনে হয়েছিল যে আইসক্রিম একটা ভালো ফিল্ম এবং রেদওয়ান রনি ভালো ডিরেক্টর। ওই জায়গা থেকে আমি ছোট মানুষ, ভেবেছি যে সিনেমাটা করা যায়।’
যোগ করে তিনি বলেন, ‘এখন দর্শকরা আবারও সিনেমাটি দেখতে পারবে, সেটা বেশ ভালোলাগার। তখনও বলেছি, সিনেমাটা সবাই দেখুন, একবার হলেও দেখুন, এখনও তাই বলছি। কিন্তু সত্যি খুব অবাক লাগে যে, কীভাবে কীভাবে সিনেমাটি করেছিলাম এবং তারও ১০ বছর পার হয়ে গেল।’
অভিনেতা কুমার উদয় এখন ব্যস্ত সময় পার করছেন মঞ্চ নাটকে। এতদিন অনেকেই তাঁর কাছে প্রথম অভিনীত সিনেমাটি দেখতে চেয়েছেন। এবার সেই আবদার রাখতে পারবেন তিনি। অভিনেতা বলেন, ‘সিনেমার তো অনেক স্মৃতি এবং সেগুলো সবই রঙিন। এমন না যে সেগুলো পাস্ট মেমোরি, সেগুলো সব কালারফুল মেমোরি হয়ে আছে আমার কাছে। সিনেমা শুরু হওয়ার আগে আমাদের তিনজনের যে বন্ডিংটা হচ্ছিল, সেই সময়টা আমার কাছে অসাধারণ। আমার আরেকটা জায়গায় খুব অবাক লাগছে, আইসক্রিম সিনেমাটি ১০ বছর পরেও কীভাবে এত প্রাসঙ্গিক! আমার তো মনে হচ্ছে এই সময় বা এই প্রজন্মের কাছে সিনেমাটি আরও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠবে।’
আরেকটা স্মৃতির কথা জানান উদয়। তিনি বলেন, ‘প্রথম লটের শুটিং হয়েছিল সেন্টমার্টিনে। সেখানে শুটিং শেষ হওয়ার পর ইউনিটের সবাই হাতে হাত ধরে সাগরে লাফিয়ে পড়েছিলাম। সেই স্মৃতিটা এখনও উজ্জ্বল হয়ে আছে।’
পরিচালক রেদওয়ান রনি বলেন, ‘১০ বছর আগের কথা, যখন আইসক্রিম বানিয়েছিলাম, তখন এর পেছনে ছিল কিছু তরুণের অক্লান্ত পরিশ্রম আর তরতাজা স্বপ্ন, একঝাঁক নতুন মুখ আর সীমাহীন আবেগ। সময়ের সঙ্গে সঙ্গে জীবনের সমীকরণ বদলালেও কিছু অনুভূতি ও বাস্তবতা কখনও ফিকে হয় না। এক দশক পর যখন সিনেমাটি চরকির পর্দায় নতুন করে আসতে যাচ্ছে, তখনও মনে হচ্ছে সিনেমার বিষয়বস্তু খুবই প্রাসঙ্গিক, মনে হচ্ছে যেন পুরনো সেই স্বপ্ন নতুন সাজে ফিরছে আবার। প্রেক্ষাগৃহে সিনেমাটি যারা মিস করেছিলেন বা দেশের বাইরে ছিলেন, তারা এখন যে কোনো দেশ থেকে বা দেশের যে কোনো জায়গা থেকে চরকিতে আইসক্রিম সিনেমাটি দেখতে পারবেন, এটাও অনেক আনন্দের।’
শরীফুল রাজের কাছে আইসক্রিম শুধু সিনেমা নয়, বরং আজকে তাঁর অবস্থানের ভিত বা শেকর। তিনি বলেন, ‘১০ বছর আগের রাজ আর আজকের রাজের মধ্যে নিশ্চয়ই কিছু পরিবর্তন আছে। কিন্তু আইসক্রিম আমার জীবনের সেই ভিত্তি, যা আমাকে আজকের এই জায়গায় আসতে সাহায্য করেছে। রিহার্সাল, ক্যামেরার পেছনের সেই নার্ভাসনেস, রেদওয়ান রনি ভাইয়ের গাইডেন্স আর শুটিং সেটের মুহূর্ত এখনও জীবন্ত। ক্যারিয়ারের শুরুতে যেই প্যাশন নিয়ে ক্যামেরার সামনে দাঁড়িয়েছিলাম, দর্শকরা চরকিতে আইসক্রিম সিনেমার মাধ্যমে আমার শুরুর দিনগুলোকে দেখতে পাবেন। সত্যি অদ্ভুত অনুভূতি।’
সিনেমাটি প্রযোজনা করেছেন শুক্লা বনিক, রেদওয়ান রনি ও সালমা আদিল। সিনেমার গানগুলোতে কণ্ঠ দিয়েছেন অর্ণব, আরমিন মুসা, শারমিন সুলতানা সুমি, মিনার রহমান। পর্দায় আরও অভিনয় করেছেন এটিএম শামসুজ্জামান, দিতি, ওমর সানি, সায়েম সাদাত, নাদিয়া খানম।


