প্রকাশ : ০৫ মে ২০২৩, ০৯:২৫ পিএমআপডেট : ২৪ নভেম্বর ২০২৪, ১০:১০ পিএম
রাজধানী ঢাকা। ছবি: উইকিমিডিয়া কমনস
উৎপত্তিস্থল যেখানেই হোক রাজধানী ঢাকায় মৃদু ভূকম্পন অনুভূত হলেই নাগরিকেরা ভয়ে সিঁটিয়ে যান। কেন এতটা আতঙ্ক? এক কথায় এর উত্তর দেওয়া মুশকিল হলেও প্রধান দুটি কারণ অবশ্যই ঢাকার অপরিকল্পিত নগরায়ণ ও অতিমাত্রায় জনঘনত্ব।
রাজধানী ঢাকার গড়ে ওঠা অপরিকল্পিতভাবে। এটা প্রায়ই বলা হয়। কিন্তু কতটা? যুক্তরাষ্ট্রভিত্তিক মানচিত্র-বিষয়ক সেবাদাতা প্রতিষ্ঠান ম্যাপকোয়েস্ট বিশ্বের সবচেয়ে অগোছালো শহরের তালিকা করে। তাদের করা এই তালিকায় ঢাকার অবস্থান ৬-এ।
গত ফেব্রুয়ারিতে তুরস্কে ভূমিকম্প হওয়ার পর দেশের ভূমিকম্প মোকাবিলা প্রস্তুতি নিয়ে প্রশ্ন তোলেন বিশেষজ্ঞরা। সে সময় তাঁরা সতর্ক করে বলেন, বাংলাদেশে ৮ মাত্রা বা তার চেয়ে বড় ধরনের ভূমিকম্প হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে। সে রকম ভূমিকম্প হলে ঢাকা শহরের অন্তত ৬ হাজার ভবন সম্পূর্ণ ধ্বংস হয়ে যাবে। প্রাণহানি হবে অন্তত ৩ লাখ মানুষের।
বড় ভূমিকম্প হলে ঠিক কতসংখ্যক ভবন ধ্বসে পড়বে বা ঠিক কতজনের প্রাণহানি হবে, তা আগে থেকে বলা সম্ভব নয়। তাহলে বিশেষজ্ঞরা এমনটা কেন বলছেন? বলছেন সতর্ক করতে। বলছেন প্রস্তুতি নিতে। সাথে পরামর্শ দিচ্ছেন, ভূমিকম্প নিয়ে খুব বেশি আতঙ্কিত না হতে।
এ বিষয়ে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ভূতত্ত্ব বিভাগের অধ্যাপক ড. আনোয়ার হোসেন ভূঁইয়া ইনডিপেনডেন্ট টেলিভিশনকে বলেন, আতঙ্কিত হয়ে তো কোনো সমাধান আসবে না। বরং প্রস্তুতি নিলে বিপর্যয়ের মাত্রা কমানো যায়। সে জন্য সতর্ক হতে হবে।
রাজধানী ও এর আশপাশে ভূমিকম্প প্রবণতা কেমন, তা নিয়ে কথা বলেছেন এই বিশেষজ্ঞ। তিনি বলেন, প্রথমে বুঝতে হবে ভূমিকম্প কেন হয়। ভূপৃষ্ঠের নিচে যে নরম শিলার স্তর, তার নিচে আছে শক্ত শিলার স্তর। এই শক্ত শিলার স্তরের মুখোমুখি, বা পাশাপাশি বা বিপরীতমুখী গতির কারণেই ভূমিকম্প হয়। এই গতি অনেক কম বলে আমরা টের পাই না। পৃথিবীতে প্রতিদিন গড়ে প্রায় ৫০ হাজার ভূমিকম্প হয়। এর মাত্রা যখন বেশি হয়, তখনই আমরা টের পাই। আমরা তো ভারতীয় প্লেটে আছি। এটি উত্তরে ইউরেশিয়া সাবপ্লেট এবং পূর্বে বার্মিজ (মিয়ানমার) সাবপ্লেটের সাথে যুক্ত। এই দুই সাবপ্লেটের সাথে ভারতীয় প্লেট মুখোমুখি সংঘর্ষে লিপ্ত। আর আমাদের ভারতীয় প্লেট ক্রমান্বয়ে আমাদের বিপরীত দিকের প্লেটের নিচে তলিয়ে যাচ্ছে। অনেক ধীরে। এই সাবডাকশন বা তলিয়ে যাওয়ার ফলে সৃষ্ট যেকোনো ভূমিকম্প সবচেয়ে বিপর্যয়কর হতে পারে।
ড. আনোয়ার হোসেন ভূঁইয়া বলেন, এই ভারতীয় প্লেট আবার ইউরেশিয়ান বা বার্মিজ সাবপ্লেটের নিচে তলিয়ে যাচ্ছে বাঁকাভাবে। ফলে যতই তলিয়ে যাচ্ছে, এতে সৃষ্ট ভূমিকম্পের হাইপোসেন্টার ততই ঢাকার মতো বড় শহরগুলোর অবস্থান থেকে দূরে সরে যাচ্ছে। এই ভূমিকম্প যত গভীরে হবে, ততই ঢাকার মতো শহর থেকে এটি দূরে সরে যাবে। আর ঢাকার আশপাশে যেগুলো হচ্ছে, সেগুলোর গভীরতা কম। ৩০ কিলোমিটার পর্যন্ত গভীরে হলে আমরা এটাকে শ্যালো বা অগভীর বলি। এই ভূমিকম্প সাবডাকশন বা মুখোমুখি সংঘর্ষের কারণে সৃষ্ট ভূমিকম্পের সাথে সম্পৃক্ত নয়। এটা হতে পারে স্থানীয় কোনো অংশে চ্যুতি বা ফল্ট সংঘটিত হওয়ার কারণে। এটা বড় ভূমিকম্পের জন্য যথেষ্ট শক্তি সঞ্চয় করতে পারে না। তাই এ ধরনের ছোটখাটো ভূমিকম্প হলেই যে বড় ভূমিকম্প হবে, এমন আতঙ্কের কোনো কারণ নেই।
তাহলে কি এই অঞ্চলে বড় ভূমিকম্পের তেমন আশঙ্কা নেই? আছে। তবে তা ভারতীয় প্লেট, ইউরেশিয়ান ও বার্মিজ সাবপ্লেটের সীমানায়। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ভূতত্ত্ব বিভাগের এই অধ্যাপক বলেন, আজ হোক কাল হোক এই সীমানায় বড় ভূমিকম্প হবে। কবে হবে, তা জানা না গেলেও হবে যে তা নিশ্চিত।
সে ক্ষেত্রে বড় ভূমিকম্পে রাজধানী ঢাকা বা এর আশপাশের অঞ্চল গুঁড়িয়ে যাবে, এমন আশঙ্কা প্রবল নয় বলেই মনে করেন বিশেষজ্ঞরা। তবে ঢাকা নিয়ে আশঙ্কা কি একেবারেই নেই? আছে। সেই আশঙ্কার উৎস আসলে অন্য জায়গায়।
প্রথমেই বলা হয়েছে যে, ঢাকা গড়ে উঠেছে অপরিকল্পিতভাবে। এর সাথে যুক্ত ঢাকার জনঘনত্বের বিষয়টি। ওয়ার্ল্ড পপুলেশন রিভিউয়ের দেওয়া তথ্যমতে, রাজধানী ঢাকায় প্রতি বর্গকিলোমিটারে ২৩ হাজার ২৩৪ জন লোক বাস করে। আর ঢাকায় জনসংখ্যা প্রতি বছর বাড়ছে ৩ শতাংশের বেশি হারে। ফলে এই জনঘনত্ব দিনদিন বাড়ছে।
বলে রাখা প্রয়োজন যে, তুরস্কে গত ফেব্রুয়ারিতে যে ভূমিকম্পে প্রায় ৬০ হাজার মানুষ নিহত হলো, সেই অঞ্চলে কিন্তু জনঘনত্ব ছিল প্রতি বর্গ কিলোমিটারে প্রায় ৩১৬ জন। এ থেকেই ঢাকার জনঘনত্ব কত বেশি, তা বোঝা যাচ্ছে।
আনোয়ার হোসেন ভূঁইয়াও এই বিষয়টিকেই ঝুঁকির অন্যতম কারণ হিসেবে চিহ্নিত করেছেন। তিনি বলেন, জনঘনত্ব একটা বড় চিন্তার বিষয়। বাংলাদেশে এটা নিয়ন্ত্রণ করা কঠিন। ঢাকার কোনো কোনো জায়গায় জনঘনত্ব প্রতি বর্গকিলোমিটারে ৫০ হাজারের মতো। খোলা স্থান একেবারেই কম। পৃথিবীর অন্যতম ঘনবসতিপূর্ণ শহর, কোনো সন্দেহ নেই। পুরোনো এলাকাগুলোয় এমনকি সড়কের জন্যও ঠিকমতো জায়গা রাখা হয়নি। রানা প্লাজার কথা মনে করে দেখুন। একটি ভবন ধ্বসে গেল। সেখানে উদ্ধারকাজ শেষ করতে আমাদের দুই সপ্তাহ লেগে গেল। বড় ভূমিকম্প হলে ঢাকায় এমন হাজার হাজার রানা প্লাজা হবে। তখন আমরা কী করব?
ড. আনোয়ার হোসেন বলেন, ঢাকায় ডোবা বা জলাশয় ভরাট করে অল্প সময়েই আমরা ইমারত গড়েছি। এর পাশাপাশি আরেকটা সমস্যা হলো যে, ভিত্তি শিলার ওপর ঢাকা দাঁড়িয়ে, সেটা তুলনামূলক নরম পাললিক শিলা। এ রকম শহর কিন্তু লন্ডনও। কিন্তু তারা আজ থেকে দুই-আড়াই শ বছর আগে অসংখ্য পিলার গেঁড়ে দিয়ে এই ভিতটাকে কিছুটা শক্ত করে নিয়েছে। আমরা কিন্তু তা করিনি। বরং হাজার হাজার ভবন দাঁড়িয়ে আছে কোনো বিল্ডিং কোড না মেনে। এগুলো ভূমিকম্পসহনীয় করে তৈরি করা হয়নি। কোনো পরিকল্পনা করে করা হয়নি। ফলে আমাদের গড়া ইমরাতই আমাদের মৃত্যুর কারণ হয়ে উঠতে পারে।
ভূমিকম্পের ঝুঁকি তো আছে এবং থাকবে। আজ হোক কাল হোক, ভূমিকম্প তো হতেই পারে। কোন ধরনের ভূমিকম্প আসলে ঢাকার জন্য বেশি বিপর্যয়কর হতে পারে- এমন প্রশ্নের জবাবে এই বিশেষজ্ঞ বলেন, যদি উচ্চ কম্পনাঙ্কের ভূমিকম্প হয়, তাহলে সে দ্রুত ছড়িয়ে পড়ে। তবে এটি দুর্বল হয় দ্রুত। এতে ধ্বংসযজ্ঞ বেশি হয়। আবার কম কম্পনাঙ্কের ভূমিকম্প দ্রুত ছড়িয়ে না পড়লেও দুর্বল হয় ধীরে। আমাদের এখানে যদি উচ্চ কম্পনাঙ্কের ভূমিকম্প হয়, তাহলে এখানকার নরম পাললিক শিলায় তা দ্রুত শোষিত হবে। এতে ক্ষতি কম হতে পারে। উল্টোটা হলে নরম শিলার মধ্য দিয়ে প্রবাহিত তরঙ্গ এত দ্রুত দুর্বল হবে না। অনেক ক্ষেত্রে শক্তি আরও বেশি হতে পারে। অগভীর ভূমিকম্প হলো উচ্চ কম্পনাঙ্কের, আর গভীরে হয় নিম্ন কম্পনাঙ্কের ভূমিকম্প। আমাদের জন্য বেশি বিপজ্জনক হবে কম কম্পনাঙ্কের ভূমিকম্প।
করণীয় কী তবে? করণীয় হিসেবে প্রথমেই আসে বিল্ডিং কোড মেনে চলার বিষয়টি। এ নিয়ে বহুদিন ধরেই বিশেষজ্ঞরা বলে আসছেন। তাঁদের পরামর্শ হচ্ছে, এমন ঝুঁকিপূর্ণ অজস্র ভবন আছে। এগুলো রাতারাতি ভেঙে ফেলা যাবে না। তবে সবচেয়ে ঝুঁকিপূর্ণ ভবন চিহ্নিত করে সেগুলো হয় ধ্বংস, নয় তো সংস্কার করে ভূমিকম্পসহনীয় করার চেষ্টা করতে হবে। সচেতনতা কার্যক্রম চালানো। উন্মুক্ত এলাকা রাখা। গ্যাস, বিদ্যুৎ, পানি, সুয়ারেজ ইত্যাদির সরবরাহ লাইন এমনভাবে তৈরি করা, যাতে ভূমিকম্প হলে এগুলো মড়ার ওপর খাঁড়ার ঘা না হয়ে ওঠে। সবচেয়ে বড় কথা হলো সচেতন করা, সিটি করপোরেশনসহ সরকারি-বেসরকারি বিভিন্ন সংস্থাকে এই কাজে এগিয়ে আসতে হবে। দুর্যোগ মোকাবিলায় সাধারণ মানুষকে প্রশিক্ষণ দিতে হবে। জলাশয় ভরাট করে বা উন্মুক্ত স্থান না রেখে ভবন নির্মাণ যেন না করা যায়, সে বিষয়ে কঠোর হতে হবে।
বাতাসে আদ্রতা বেড়েছে স্বাভাবিকের চেয়ে দশ ভাগ। দিন ও রাতের তাপমাত্রা এক থেকে তিন ডিগ্রি সেলসিয়াস বাড়তি। তাই অক্টোবরে এবার রাতে অসহনীয় গরম অনুভূত হচ্ছে। আবহাওয়া অধিদপ্তর বলছে, নভেম্বরের শেষে শীত শুরু...
সুন্দরবন ঘেঁষে গড়ে ওঠা ১৮টি কটেজ বন্ধের নির্দেশ দিয়েছে পরিবেশ অধিদপ্তর। ছাড়পত্র না থাকায় এবং সংকটাপন্ন এলাকার ভেতরে অবস্থান হওয়ায় এই ব্যবস্থা। তবে পরিবেশ সংকটাপন্ন এলাকায় ভারী শিল্পকারখানা গড়ে উঠতে...
ব্যক্তি পর্যায়ের পালন করা হাতির জন্য আশ্রয়কেন্দ্র গড়ে তুলতে বেসরকারি বিনিয়োগ খুঁজছে সরকার। সারা দেশে এমন ৮৬টি হাতি ব্যবস্থাপনার মতো অর্থ ও জনবল নেই বন বিভাগের। তবে এ বিষয়ে হাতির মালিক ও দেশি-বিদেশি...
দেশের কোথাও কোথাও মাঝারি ধরনের ভারি বর্ষণের সম্ভাবনা রয়েছে। একই সঙ্গে কমতে পারে তাপমাত্রা। আজ শুক্রবার সকাল ৯টা থেকে পরবর্তী ২৪ ঘণ্টার পূর্বাভাসে আবহাওয়া অধিদপ্তর এ তথ্য জানিয়েছে।
ইসরায়েল সৌদি আরবকে অনেক সহায়তা করেছে বলে মন্তব্য করেছেন মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প। হুতিদের বিরুদ্ধে লড়াইয়ে ইসরায়েলের সহায়তার প্রস্তাব সৌদি আরবের গ্রহণ করা উচিত বলেও মনে করেন তিনি। হোয়াইট...
নেত্রকোণার দুর্গাপুরে সোমেশ্বরী নদীর চরের কাশফুল চত্বরে কথা, কবিতা ও গানে অনুষ্ঠিত হয়েছে ‘শরৎ উৎসব’। শুক্রবার বিকেলে শহীদ সন্তোষ স্মৃতি ফাউন্ডেশনের আয়োজনে এ উৎসব অনুষ্ঠিত হয়। উৎসবে বিভিন্ন এলাকা...
ডেঙ্গু প্রতিরোধে শুধু সরকারের উদ্যোগের ওপর নির্ভর না করে সবাইকে সম্মিলিতভাবে কাজ করার আহ্বান জানিয়েছেন প্রধানমন্ত্রী। বিশেষ করে শিক্ষার্থী ও তরুণ প্রজন্মকে নিজেদের বাসাবাড়ি, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান ও...
ভূমিকম্প কেন হয়, ঢাকার ঝুঁকি আসলে কত
উৎপত্তিস্থল যেখানেই হোক রাজধানী ঢাকায় মৃদু ভূকম্পন অনুভূত হলেই নাগরিকেরা ভয়ে সিঁটিয়ে যান। কেন এতটা আতঙ্ক? এক কথায় এর উত্তর দেওয়া মুশকিল হলেও প্রধান দুটি কারণ অবশ্যই ঢাকার অপরিকল্পিত নগরায়ণ ও অতিমাত্রায় জনঘনত্ব।
রাজধানী ঢাকার গড়ে ওঠা অপরিকল্পিতভাবে। এটা প্রায়ই বলা হয়। কিন্তু কতটা? যুক্তরাষ্ট্রভিত্তিক মানচিত্র-বিষয়ক সেবাদাতা প্রতিষ্ঠান ম্যাপকোয়েস্ট বিশ্বের সবচেয়ে অগোছালো শহরের তালিকা করে। তাদের করা এই তালিকায় ঢাকার অবস্থান ৬-এ।
গত ফেব্রুয়ারিতে তুরস্কে ভূমিকম্প হওয়ার পর দেশের ভূমিকম্প মোকাবিলা প্রস্তুতি নিয়ে প্রশ্ন তোলেন বিশেষজ্ঞরা। সে সময় তাঁরা সতর্ক করে বলেন, বাংলাদেশে ৮ মাত্রা বা তার চেয়ে বড় ধরনের ভূমিকম্প হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে। সে রকম ভূমিকম্প হলে ঢাকা শহরের অন্তত ৬ হাজার ভবন সম্পূর্ণ ধ্বংস হয়ে যাবে। প্রাণহানি হবে অন্তত ৩ লাখ মানুষের।
বড় ভূমিকম্প হলে ঠিক কতসংখ্যক ভবন ধ্বসে পড়বে বা ঠিক কতজনের প্রাণহানি হবে, তা আগে থেকে বলা সম্ভব নয়। তাহলে বিশেষজ্ঞরা এমনটা কেন বলছেন? বলছেন সতর্ক করতে। বলছেন প্রস্তুতি নিতে। সাথে পরামর্শ দিচ্ছেন, ভূমিকম্প নিয়ে খুব বেশি আতঙ্কিত না হতে।
এ বিষয়ে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ভূতত্ত্ব বিভাগের অধ্যাপক ড. আনোয়ার হোসেন ভূঁইয়া ইনডিপেনডেন্ট টেলিভিশনকে বলেন, আতঙ্কিত হয়ে তো কোনো সমাধান আসবে না। বরং প্রস্তুতি নিলে বিপর্যয়ের মাত্রা কমানো যায়। সে জন্য সতর্ক হতে হবে।
রাজধানী ও এর আশপাশে ভূমিকম্প প্রবণতা কেমন, তা নিয়ে কথা বলেছেন এই বিশেষজ্ঞ। তিনি বলেন, প্রথমে বুঝতে হবে ভূমিকম্প কেন হয়। ভূপৃষ্ঠের নিচে যে নরম শিলার স্তর, তার নিচে আছে শক্ত শিলার স্তর। এই শক্ত শিলার স্তরের মুখোমুখি, বা পাশাপাশি বা বিপরীতমুখী গতির কারণেই ভূমিকম্প হয়। এই গতি অনেক কম বলে আমরা টের পাই না। পৃথিবীতে প্রতিদিন গড়ে প্রায় ৫০ হাজার ভূমিকম্প হয়। এর মাত্রা যখন বেশি হয়, তখনই আমরা টের পাই। আমরা তো ভারতীয় প্লেটে আছি। এটি উত্তরে ইউরেশিয়া সাবপ্লেট এবং পূর্বে বার্মিজ (মিয়ানমার) সাবপ্লেটের সাথে যুক্ত। এই দুই সাবপ্লেটের সাথে ভারতীয় প্লেট মুখোমুখি সংঘর্ষে লিপ্ত। আর আমাদের ভারতীয় প্লেট ক্রমান্বয়ে আমাদের বিপরীত দিকের প্লেটের নিচে তলিয়ে যাচ্ছে। অনেক ধীরে। এই সাবডাকশন বা তলিয়ে যাওয়ার ফলে সৃষ্ট যেকোনো ভূমিকম্প সবচেয়ে বিপর্যয়কর হতে পারে।
ড. আনোয়ার হোসেন ভূঁইয়া বলেন, এই ভারতীয় প্লেট আবার ইউরেশিয়ান বা বার্মিজ সাবপ্লেটের নিচে তলিয়ে যাচ্ছে বাঁকাভাবে। ফলে যতই তলিয়ে যাচ্ছে, এতে সৃষ্ট ভূমিকম্পের হাইপোসেন্টার ততই ঢাকার মতো বড় শহরগুলোর অবস্থান থেকে দূরে সরে যাচ্ছে। এই ভূমিকম্প যত গভীরে হবে, ততই ঢাকার মতো শহর থেকে এটি দূরে সরে যাবে। আর ঢাকার আশপাশে যেগুলো হচ্ছে, সেগুলোর গভীরতা কম। ৩০ কিলোমিটার পর্যন্ত গভীরে হলে আমরা এটাকে শ্যালো বা অগভীর বলি। এই ভূমিকম্প সাবডাকশন বা মুখোমুখি সংঘর্ষের কারণে সৃষ্ট ভূমিকম্পের সাথে সম্পৃক্ত নয়। এটা হতে পারে স্থানীয় কোনো অংশে চ্যুতি বা ফল্ট সংঘটিত হওয়ার কারণে। এটা বড় ভূমিকম্পের জন্য যথেষ্ট শক্তি সঞ্চয় করতে পারে না। তাই এ ধরনের ছোটখাটো ভূমিকম্প হলেই যে বড় ভূমিকম্প হবে, এমন আতঙ্কের কোনো কারণ নেই।
তাহলে কি এই অঞ্চলে বড় ভূমিকম্পের তেমন আশঙ্কা নেই? আছে। তবে তা ভারতীয় প্লেট, ইউরেশিয়ান ও বার্মিজ সাবপ্লেটের সীমানায়। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ভূতত্ত্ব বিভাগের এই অধ্যাপক বলেন, আজ হোক কাল হোক এই সীমানায় বড় ভূমিকম্প হবে। কবে হবে, তা জানা না গেলেও হবে যে তা নিশ্চিত।
সে ক্ষেত্রে বড় ভূমিকম্পে রাজধানী ঢাকা বা এর আশপাশের অঞ্চল গুঁড়িয়ে যাবে, এমন আশঙ্কা প্রবল নয় বলেই মনে করেন বিশেষজ্ঞরা। তবে ঢাকা নিয়ে আশঙ্কা কি একেবারেই নেই? আছে। সেই আশঙ্কার উৎস আসলে অন্য জায়গায়।
প্রথমেই বলা হয়েছে যে, ঢাকা গড়ে উঠেছে অপরিকল্পিতভাবে। এর সাথে যুক্ত ঢাকার জনঘনত্বের বিষয়টি। ওয়ার্ল্ড পপুলেশন রিভিউয়ের দেওয়া তথ্যমতে, রাজধানী ঢাকায় প্রতি বর্গকিলোমিটারে ২৩ হাজার ২৩৪ জন লোক বাস করে। আর ঢাকায় জনসংখ্যা প্রতি বছর বাড়ছে ৩ শতাংশের বেশি হারে। ফলে এই জনঘনত্ব দিনদিন বাড়ছে।
বলে রাখা প্রয়োজন যে, তুরস্কে গত ফেব্রুয়ারিতে যে ভূমিকম্পে প্রায় ৬০ হাজার মানুষ নিহত হলো, সেই অঞ্চলে কিন্তু জনঘনত্ব ছিল প্রতি বর্গ কিলোমিটারে প্রায় ৩১৬ জন। এ থেকেই ঢাকার জনঘনত্ব কত বেশি, তা বোঝা যাচ্ছে।
আনোয়ার হোসেন ভূঁইয়াও এই বিষয়টিকেই ঝুঁকির অন্যতম কারণ হিসেবে চিহ্নিত করেছেন। তিনি বলেন, জনঘনত্ব একটা বড় চিন্তার বিষয়। বাংলাদেশে এটা নিয়ন্ত্রণ করা কঠিন। ঢাকার কোনো কোনো জায়গায় জনঘনত্ব প্রতি বর্গকিলোমিটারে ৫০ হাজারের মতো। খোলা স্থান একেবারেই কম। পৃথিবীর অন্যতম ঘনবসতিপূর্ণ শহর, কোনো সন্দেহ নেই। পুরোনো এলাকাগুলোয় এমনকি সড়কের জন্যও ঠিকমতো জায়গা রাখা হয়নি। রানা প্লাজার কথা মনে করে দেখুন। একটি ভবন ধ্বসে গেল। সেখানে উদ্ধারকাজ শেষ করতে আমাদের দুই সপ্তাহ লেগে গেল। বড় ভূমিকম্প হলে ঢাকায় এমন হাজার হাজার রানা প্লাজা হবে। তখন আমরা কী করব?
ড. আনোয়ার হোসেন বলেন, ঢাকায় ডোবা বা জলাশয় ভরাট করে অল্প সময়েই আমরা ইমারত গড়েছি। এর পাশাপাশি আরেকটা সমস্যা হলো যে, ভিত্তি শিলার ওপর ঢাকা দাঁড়িয়ে, সেটা তুলনামূলক নরম পাললিক শিলা। এ রকম শহর কিন্তু লন্ডনও। কিন্তু তারা আজ থেকে দুই-আড়াই শ বছর আগে অসংখ্য পিলার গেঁড়ে দিয়ে এই ভিতটাকে কিছুটা শক্ত করে নিয়েছে। আমরা কিন্তু তা করিনি। বরং হাজার হাজার ভবন দাঁড়িয়ে আছে কোনো বিল্ডিং কোড না মেনে। এগুলো ভূমিকম্পসহনীয় করে তৈরি করা হয়নি। কোনো পরিকল্পনা করে করা হয়নি। ফলে আমাদের গড়া ইমরাতই আমাদের মৃত্যুর কারণ হয়ে উঠতে পারে।
ভূমিকম্পের ঝুঁকি তো আছে এবং থাকবে। আজ হোক কাল হোক, ভূমিকম্প তো হতেই পারে। কোন ধরনের ভূমিকম্প আসলে ঢাকার জন্য বেশি বিপর্যয়কর হতে পারে- এমন প্রশ্নের জবাবে এই বিশেষজ্ঞ বলেন, যদি উচ্চ কম্পনাঙ্কের ভূমিকম্প হয়, তাহলে সে দ্রুত ছড়িয়ে পড়ে। তবে এটি দুর্বল হয় দ্রুত। এতে ধ্বংসযজ্ঞ বেশি হয়। আবার কম কম্পনাঙ্কের ভূমিকম্প দ্রুত ছড়িয়ে না পড়লেও দুর্বল হয় ধীরে। আমাদের এখানে যদি উচ্চ কম্পনাঙ্কের ভূমিকম্প হয়, তাহলে এখানকার নরম পাললিক শিলায় তা দ্রুত শোষিত হবে। এতে ক্ষতি কম হতে পারে। উল্টোটা হলে নরম শিলার মধ্য দিয়ে প্রবাহিত তরঙ্গ এত দ্রুত দুর্বল হবে না। অনেক ক্ষেত্রে শক্তি আরও বেশি হতে পারে। অগভীর ভূমিকম্প হলো উচ্চ কম্পনাঙ্কের, আর গভীরে হয় নিম্ন কম্পনাঙ্কের ভূমিকম্প। আমাদের জন্য বেশি বিপজ্জনক হবে কম কম্পনাঙ্কের ভূমিকম্প।
করণীয় কী তবে? করণীয় হিসেবে প্রথমেই আসে বিল্ডিং কোড মেনে চলার বিষয়টি। এ নিয়ে বহুদিন ধরেই বিশেষজ্ঞরা বলে আসছেন। তাঁদের পরামর্শ হচ্ছে, এমন ঝুঁকিপূর্ণ অজস্র ভবন আছে। এগুলো রাতারাতি ভেঙে ফেলা যাবে না। তবে সবচেয়ে ঝুঁকিপূর্ণ ভবন চিহ্নিত করে সেগুলো হয় ধ্বংস, নয় তো সংস্কার করে ভূমিকম্পসহনীয় করার চেষ্টা করতে হবে। সচেতনতা কার্যক্রম চালানো। উন্মুক্ত এলাকা রাখা। গ্যাস, বিদ্যুৎ, পানি, সুয়ারেজ ইত্যাদির সরবরাহ লাইন এমনভাবে তৈরি করা, যাতে ভূমিকম্প হলে এগুলো মড়ার ওপর খাঁড়ার ঘা না হয়ে ওঠে। সবচেয়ে বড় কথা হলো সচেতন করা, সিটি করপোরেশনসহ সরকারি-বেসরকারি বিভিন্ন সংস্থাকে এই কাজে এগিয়ে আসতে হবে। দুর্যোগ মোকাবিলায় সাধারণ মানুষকে প্রশিক্ষণ দিতে হবে। জলাশয় ভরাট করে বা উন্মুক্ত স্থান না রেখে ভবন নির্মাণ যেন না করা যায়, সে বিষয়ে কঠোর হতে হবে।