ক্লারা জেটকিন যখন কোপেনহেগেনের সম্মেলনে বিশ্বব্যাপী নারীদের জন্যে একটি দিবস পালনের প্রস্তাব করেন, তখন পৃথিবীজুড়ে নারীর মুল দাবিটা ছিল ভোটাধিকারের। ১৯১০ সনের কথা, পৃথিবীর নানা দেশ থেকে কমিউনিস্ট ও সমাজতন্ত্রী নারীদের প্রতিনিধিরা জড়ো হয়েছেন ডেনমার্কের কোপেনহেগেনে। সেইখানে জার্মানির কমিউনিস্ট নেতা ক্লারা জেটকিন প্রস্তাব করেন, একটি দিবস সারা দুনিয়ায় নারী দিবস হিসাবে পালন করা হোক, এর উদ্দেশ্য হবে নারীদের জন্যে ভোটাধিকার এবং নারী‑পুরুষের বৈষম্য দূর করার লক্ষ্যে নারীদের ঐক্য, সচেতনতা ও জনমত তৈরি করা। আর এর পরের বছরই কয়েকটা দেশে নারী দিবস পালিত হয়, তবে ৮ই মার্চকে উপচারিকভাবে আন্তর্জাতিক নারী দিবস গৃহীত হতে বেশ সময় লেগে যায়। মাঝখানে অনেকদিন সে সময়ের সোভিয়েত ইউনিয়ন ও অন্যান্য সমাজতান্ত্রিক দেশে সরকারিভাবে নারী দিবস উদ্যাপিত হতো। সোভিয়েত ইউনিয়নে নারী দিবস হিসেবে ৮ই মার্চ সরকারি ছুটি ছিল।
এইবার আমাদের দেশে নারী দিবসটি একটা ভিন্ন প্রেক্ষাপটে উদ্যাপিত হচ্ছে। দুই রকম ভিন্নতা বিরাজ করছে এখন–প্রথম ভিন্নতা যেটা, সেটা তো হচ্ছে আমাদের দেশে সম্প্রতি ঘটে যাওয়া রাজনৈতিক অভ্যুত্থান ও অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের ক্ষমতা গ্রহণ। দ্বিতীয়টা হচ্ছে সমাজে মিসোজিনি বা নারীবিদ্বেষ এবং সেই সাথে নানাপ্রকার পুরুষতান্ত্রিক উৎপাত আশঙ্কাজনকভাবে বেড়ে যাওয়া। গত ছয় মাসে ধর্ষণের সংখ্যা বেড়েছে আশঙ্কাজনক হারে। ধর্ষণ ছাড়া নারীর প্রতি যৌন হয়রানি ও অন্যান্য সহিংসতা বৃদ্ধি পেয়েছে, রাস্তাঘাটে ও গণপরিবহনে নারীর প্রতি হয়রানি বেড়েছে। শারীরিক সহিংসতার সাথে সাথে বৃদ্ধি পেয়েছে অনলাইনে ও বাস্তবে নারীর প্রতি বাচনিক সন্ত্রাস। প্রেক্ষাপটের এইসব ভিন্নতার মধ্যে প্রথম পরিবর্তনটি তো আমাদের সকলেরই প্রত্যাশিত ও আকাঙ্ক্ষিত ছিল–আমরা সকলেই চেয়েছি দেশে স্বৈরশাসন উৎখাত হোক, একটি গণতান্ত্রিক অভিযাত্রা শুরু হোক। কিন্তু দ্বিতীয় যে ভিন্নতা আমরা দেখতে পাচ্ছি, এটা তো আমাদের প্রত্যাশিত পরিবর্তন নয়, ইতিবাচক তো নয়ই।
পৃথিবীর অন্যান্য দেশে যখন এবারের নারী দিবস পালন হবে নারীর জন্যে অধিকার, সমতা ও ক্ষমতায়নের থিম সামনে রেখে, ঠিক একই সময় আমাদের দেশে নারী দিবসে আমরা দিবসটি পালন করব ধর্ষণ, নির্যাতন, সহিংসতা–এই সবের বিরুদ্ধে নারীর জন্যে ন্যুনতম সুরক্ষার দাবিতে। সেই অর্থে আমরা পৃথিবীর অন্যান্য দেশের তুলনায় যেমন পিছিয়ে গেছি অনেকখানি, এমনকি আমাদের নিজ দেশেও নারীর যতটুকু অর্জন ছিল, সেটার তুলনায়ও আমরা পিছিয়ে গেছি অনেকখানি।
একজন প্রাপ্তবয়স্ক নারী তার জীবনযাপনের ধরন, পেশা, চলাফেরা, ব্যক্তিগত জীবন–এই সবের ক্ষেত্রে নিজের সিদ্ধান্ত নিজেই গ্রহণ করবে–এই ন্যূনতম অধিকারটুকু নিশ্চিত করার লড়াইটাই এখন জরুরি। আর এর জন্য নারীদের ঐক্যের কোনো বিকল্প নাই। লৈঙ্গিক রাজনীতির লড়াইটা একটা অনিবার্য লড়াই এবং এটা রাষ্ট্র ক্ষমতার রাজনীতির লড়াইয়ের পাশাপাশি নারীর এই লড়াইটা সবসময়ই জারি রাখতে হয়।
দুদিন আগে শাহবাগে ঘটে যাওয়া ঘটনাটি যেন সেই বাস্তব অবস্থারই একটা চিত্র। একজন ছাত্রীকে এক যুবক রাস্তায় থামিয়ে মেয়েটিকে ওড়না ঠিক করার জন্যে নসিহত করতে থাকে। মেয়েটির পরনে সালওয়ার‑কামিজ ও ওড়না ছিল, কেবল ওড়নাটি যেভাবে জড়ানো ছিল, সেটা সেই যুবকের কাছে যথেষ্ট শালীন মনে হয়নি বলে সে ভেবেছে তার অধিকার রয়েছে নারীকে যখন ইচ্ছা তখন নসিহত করার। এই হয়রানির জন্যে যুবককে শাহবাগ থানায় আটক করা হলে শাহবাগ থানায় একদল পুরুষ গিয়ে হাজির হয় দল বেঁধে। ওরা দাবি করতে থাকে যুবকটি যা করেছে ঠিক করেছে, ওকে ছেড়ে দিতে হবে। ওদের বিরোধ করার নারীর পক্ষে দাঁড়ানোর জন্যে খুব বেশি কাউকে খুঁজে পাওয়া যায়নি। এইটাই হচ্ছে আমাদের দেশে নারীদের যুদ্ধক্ষেত্রের বাস্তব অবস্থা।
ক্লারা জেটকিনের প্রস্তাবটিকে যদি সূচনা ধরি, তাহলে নারী দিবস উদ্যাপনের এক শ বছর পার হয়ে গেছে অনেক আগে। এর মধ্যে নারীদের ভোটাধিকার অর্জন ছিল একটি বড় বিজয়। ভোটাধিকার ছাড়াও নারীদের সমতার অধিকারের ক্ষেত্রে বিশ্বব্যাপী অনেক সাফল্য অর্জিত হয়েছে। কিন্তু বিশ্বব্যাপী নারী ও পুরুষের মধ্যে অধিকারের সমতা অর্জন হতে যেমন এখনো অনেক দূর। আর আমাদের দেশে তো আমরা নারীর ন্যূনতম মৌলিক অধিকারগুলোও এখনো অর্জন করতে পারিনি। আমাদের দেশে আইনগতভাবে সংবিধানে একটি অধিকার নিশ্চিত করা হয়েছে সেই ১৯৭২ সনে, যে নারী ও পুরুষের মধ্যে বৈষম্য করা যাবে না। কিন্তু বাস্তবে সেই অধিকারটুকু আদৌ কতখানি বাস্তবায়ন হয়েছে, সে কথা আমরা সকলেই জানি। আমাদের দেশে এখনো নারীকে বিবেচনা করা হয় ঊনমানুষ হিসেবেই। এখনো আমাদের দেশে নারীকে একজন সম্পূর্ণ মানুষ বিবেচনা করা হয় না। এখনো রাস্তাঘাটে যেকোনো নারীকে তার পোশাক নিয়ে, তার আচরণ নিয়ে নসিহত করাকে যেকোনো পুরুষ তার অধিকার কেবল নয়, দায়িত্ব মনে করে। এই তো কদিন আগে লালমাটিয়ায় চায়ের দোকানে ধূমপান করায় কয়েকজন নারীকে হয়রানি করা হলো। রাষ্ট্রের প্রতিক্রিয়া কী ছিল, সেটা আমরা জানি।
এই অবস্থা থেকে উত্তরণের পথ কী? না, এটা অজানা কোনো পথ নয়। মুক্তির পথ হচ্ছে লড়াই করা। চূড়ান্ত মুক্তি নিশ্চয়ই আরও অনেক দূরের যাত্রা। এখন আমাদের লড়তে হচ্ছে ন্যুনতম মৌলিক নাগরিক অধিকারসমূহের জন্যে। একজন প্রাপ্তবয়স্ক নারী তার জীবনযাপনের ধরন, পেশা, চলাফেরা, ব্যক্তিগত জীবন–এই সবের ক্ষেত্রে নিজের সিদ্ধান্ত নিজেই গ্রহণ করবে–এই ন্যূনতম অধিকারটুকু নিশ্চিত করার লড়াইটাই এখন জরুরি। আর এর জন্য নারীদের ঐক্যের কোনো বিকল্প নাই। লৈঙ্গিক রাজনীতির লড়াইটা একটা অনিবার্য লড়াই এবং এটা রাষ্ট্র ক্ষমতার রাজনীতির লড়াইয়ের পাশাপাশি নারীর এই লড়াইটা সবসময়ই জারি রাখতে হয়। আমাদের দেশের জন্যে আজকে নারীর লড়াইটি অগ্রসর করে নিয়ে যাওয়া এবং সেই লক্ষ্যে সকল নারীর ঐক্য অন্য যেকোনো সময়ের চেয়েও জরুরি হয়ে দাঁড়িয়েছে। এটা মানুষ হিসেবে নারীর স্বাধীন ও কার্যকর অস্তিত্বের লড়াই।
আশার কথা যেটা, আমাদের তরুণ নারীরা ওদের এই লড়াইয়ের ক্ষেত্রটা জানেন এবং লড়াইটা করার জন্যে ওরা প্রস্তুত। কেবল স্ফুলিঙ্গটার অপেক্ষা, বহ্নিশিখা জ্বলে উঠল বলে।
লেখক: আইনজীবী, বাংলাদেশ সুপ্রিম কোর্ট
[এই মতামত লেখকের নিজস্ব। এর সঙ্গে ইনডিপেনডেন্ট টেলিভিশনের প্রাতিষ্ঠানিক সম্পাদকীয় নীতিমালার কোনো সম্পর্ক নেই।]



