নারীদের সংরক্ষিত আসন নিয়ে জাতীয় ঐকমত্য কমিশনের সিদ্ধান্ত কার্যত একটি ‘নারীবিষয়ক সিদ্ধান্ত, নারীবিহীন বাস্তবায়ন’-এর উদাহরণ হয়ে রইল। চার মাসের আলোচনার পর যে প্রস্তাব এলো, তা যতটা না নারী প্রতিনিধিত্ব বাড়ানোর পথে এক ধাপ এগিয়ে গেল, তার চেয়ে ঢের বেশি পেছনের পথে এক কঠিন দৃষ্টান্ত গড়ল। একুশ শতকে এসেও যখন দেশের অর্ধেক জনগোষ্ঠীকে তাদের নিজেদের অধিকার নিয়ে আলোচনা থেকে কার্যত দূরে রাখা হয়, তখন তা কেবল পশ্চাৎপদতাই নয়, বরং এক ধরনের রাজনৈতিক ভণ্ডামিরও ইঙ্গিত দেয়।
বস্তুত, যে কমিশনের উদ্দেশ্যই ছিল ‘সমাজের সব পক্ষের অংশগ্রহণ নিশ্চিত করা’, সেখানে শুরু থেকেই নারীর অনুপস্থিতি বিষয়টিকে কেবল উপেক্ষা নয়, বরং কাঠামোগত অবহেলার স্পষ্ট প্রমাণ হিসেবে দাঁড় করিয়েছে। প্রস্তাবটি সংরক্ষিত ৫০টি আসন বহাল রাখার পক্ষে এবং দলগুলোকে ৫ শতাংশ আসনে নারী প্রার্থী দেওয়ার ‘অনুরোধ’ জানালেও এই সুপারিশের ভিত্তি কতটা গণতান্ত্রিক বা সমানুভূতিশীল, তা নিয়ে প্রশ্ন ওঠাই স্বাভাবিক। এই প্রশ্ন শুধু নারীবাদীদের নয়, এটি এখন হয়ে উঠেছে গণতন্ত্র, প্রতিনিধিত্ব ও সমাজিক ন্যায়ের প্রশ্ন।
এমন একটি বিষয়, যা সরাসরি নারীর রাজনৈতিক অধিকার ও প্রতিনিধিত্ব নিশ্চিত করার কথা, সেখানে নারীদের অনুপস্থিতি শুধুই দৈববলে হয়নি। জাতীয় ঐকমত্য কমিশনের দীর্ঘ আলোচনায় না ছিল নারী সদস্য, না অধিকাংশ দলের পক্ষ থেকে নারী আলোচক। এটি অনিচ্ছা, অবহেলা, কিংবা আরও পরিষ্কারভাবে বললে, নারীর সিদ্ধান্তে নারীর অংশগ্রহণ অগ্রাহ্য করার এক প্রাতিষ্ঠানিক মানসিকতা।
গণমাধ্যমে শিরীন পারভিন হক, নারীবিষয়ক সংস্কার কমিশনের প্রধান, একেবারে স্পষ্ট করে বলেন, ‘অর্ধেক জনগোষ্ঠীকে উপেক্ষা করে বৈষম্য দূর করা সম্ভব নয়।’ প্রশ্ন সহজ: যদি পুরুষদের সঙ্গে নারীর সমান অংশগ্রহণ নিশ্চিত করাই লক্ষ্য হয়, তবে প্রথম ধাপে নারীদের বাদ দিয়ে সিদ্ধান্ত নেওয়া কোন ন্যায়ের কথা বলে?
রাজনৈতিক দলগুলো মাঝে মাঝে নারীবিষয়ক দিবস, আলোচনা সভা বা নারী নেত্রীদের পোস্টার দিয়ে নিজেদের পক্ষপাতিত্ব প্রমাণে তৎপর থাকে। কিন্তু নীতিগত সিদ্ধান্ত গ্রহণের পর্যায়ে এসে নারী যেন ‘প্রসঙ্গের চামচ’ হয়ে দাঁড়ায়–কেবল না থাকলেই বোঝা যায়, কিছু একটা অনুপস্থিত। এমনকি যেসব দল নারী অধিকারের বড় বড় কথা বলে, তারাও এই আলোচনায় কোনো নারীকে পাঠায়নি। বিষয়টা এমন যেন, নারী বিষয় নারীর না, পুরুষের ‘উদারতার’ আলোচ্য।
বিএনপির পক্ষ থেকে গণমাধ্যমে যে ব্যাখ্যা এসেছে, তা আরও হতাশাব্যঞ্জক। তাদের দাবি, ‘এই বিষয়ে দায়িত্বপ্রাপ্তদের মধ্যে হয়তো নারী নেই, কিন্তু অন্য জায়গায় নারীরা রয়েছেন।’ প্রশ্ন হলো, সিদ্ধান্তটি তো নারীদের বিষয়ে, সেখানে ‘হয়তো’ কেন? কে কোথায় আছে, তা নয়–যেখানে থাকা প্রয়োজন, সেখানে অনুপস্থিতিই আসল সংকট।
ঐকমত্য কমিশনের প্রস্তাবে এখন পর্যন্ত দুটি বড় ধরনের আপত্তি এসেছে: এক, সংরক্ষিত আসন বহাল রেখে পরিবর্তন না আনা-নারীবিষয়ক সংস্কার কমিশন সরাসরি নির্বাচনের মাধ্যমে ৩০০টি সংরক্ষিত আসনের সুপারিশ দিয়েছিল। অর্থাৎ, শুধু সংখ্যায় নারী নয়, বাস্তব রাজনৈতিক ক্ষমতায়নার মাধ্যমেই তাদের উপস্থিতি বাড়ানো হোক–এটাই ছিল মূল কথা। দুই, ৫ শতাংশ নারী প্রার্থী মনোনয়নের ‘অনুরোধ’ মাত্র–এই প্রস্তাব এতটাই দুর্বল যে, নারীর প্রতিনিধিত্ব নিয়ে রাজনৈতিক দলগুলো চাইলেই উদাসীন থাকতে পারে। এতে নারীর পক্ষে আইনগত কোনো রক্ষাকবচ তৈরি হচ্ছে না। এ বিষয়ে শিক্ষাবিদ মাহিন সুলতানের ভাষায়, ‘এই প্রস্তাব নারীদের পিছিয়ে দেওয়ার নামান্তর।’
নারী অধিকার আন্দোলনের প্রবীণ নেতা ও বাংলাদেশ মহিলা পরিষদের সভাপতি ডা. ফওজিয়া মোসলেমও এটিকে ‘পশ্চাৎপদ’ বলে নাকচ করে দিয়েছেন। তিনি যেমন ১০০টি সংরক্ষিত আসন এবং সরাসরি নির্বাচনের দাবি তুলেছেন, তেমনি সাধারণ মানুষও প্রশ্ন তুলেছে, অতীতে যেসব আন্দোলনে নারীরা ছিল অগ্রণী, আজ সেই নারী কোথায়?
এখানে স্মরণ করা যায় এক প্রতিনিধির নাম না-জানা মন্তব্য, ‘আন্দোলনে নারীদের ঢাল হিসেবে ব্যবহার করে এখন সব জায়গা থেকে তাদের সরিয়ে নেওয়া হচ্ছে।’ এই বক্তব্যে শুধু হতাশা নয়, লুকিয়ে আছে দীর্ঘদিনের রাজনৈতিক বাস্তবতার এক নির্মম চিত্র। বাংলাদেশের রাজনৈতিক আন্দোলনের ইতিহাসে নারীরা বারবার সামনে ছিলেন–লাঠি, টিয়ারগ্যাসে, ব্যারিকেডে, ব্যালটেও। কিন্তু নীতিনির্ধারকের টেবিলে তারা যেন শুধুই সংখ্যালঘু, কখনো কখনো অনুপস্থিত।
মনে রাখা দরকার যে, নারীর প্রতিনিধি মানে নারী মুখ নয়, নারী ভাবনার বাস্তব রূপ। একটি সমাজে নারী প্রতিনিধিত্ব তখনই অর্থবহ হয়, যখন তা সংখ্যায় নয়, প্রভাব ও ক্ষমতায় প্রতিফলিত হয়। একজন নারী সংসদ সদস্য কেবল নারী বলেই যথেষ্ট নয়, তার পেছনে যদি না থাকে নারীর নিজস্ব বাস্তবতা, নিজস্ব রাজনৈতিক ক্ষমতা, নিজের কথা বলার জায়গা।
রাজনীতি যখন নারীর পক্ষে না গিয়ে, নারীর হয়ে কথা বলার ধাঁধাঁয় পড়ে যায়, তখন আসল সমস্যা হয় প্রতিনিধিত্বের নামে প্রতিনিধি তৈরি না হওয়া। ঐকমত্য কমিশনের সুপারিশ এই সমস্যাটিকেই বৈধতা দিয়েছে। এই পরিস্থিতি কেবল নারীদের জন্য নয়, আমাদের গণতন্ত্রের জন্যও বিপদসংকেত। যদি নারীকে বাদ দিয়েই নারী নিয়ে সিদ্ধান্ত হয়, তাহলে ভবিষ্যতে অন্যদের ক্ষেত্রেও তা হতে পারে। তরুণদের নিয়ে কথা হবে প্রবীণদের ঘরে বসে, সংখ্যালঘুদের নিয়ে সিদ্ধান্ত আসবে সংখ্যাগরিষ্ঠদের বৈঠকে।
গণতন্ত্র কেবল সংখ্যার খেলা নয়, অংশগ্রহণের প্রতীক। আর অংশগ্রহণ মানে শুধু উপস্থিতি নয়, অংশীদারত্ব। আমরা এখন এক ভয়ংকর ভুলে আছি। আমরা ভাবছি নারী সংরক্ষণের কথা বললেই নারীকে সম্মান জানানো হয়। অথচ সংরক্ষণের কাঠামো নারীর প্রতিনিধি তৈরি না করে তাকে মঞ্চ সাজানোর প্রপস করে রাখছে। নারী যদি নিজের কথায় না থাকতে পারে, তাহলে সেই ‘সংরক্ষণ’ আসলে কী রক্ষা করছে?
জাতীয় ঐকমত্য কমিশনের নারী আসনবিষয়ক সিদ্ধান্ত একটি গভীরতর বাস্তবতা উন্মোচিত করেছে–এই দেশে নারীর রাজনৈতিক অবস্থান এখনো দর্শকসারির বাইরে। কমিশনের গঠনে নারী অনুপস্থিতি এবং সিদ্ধান্ত গ্রহণে তাঁদের অকার্যকর ভূমিকা প্রমাণ করে, দেশে এখনো নারীর রাজনৈতিক প্রতিনিধিত্ব কেবল ‘প্রদর্শনমূলক’ (tokenism)। এই ধরনের ‘ঐকমত্য’ আসলে একটি একতরফা অভিসন্ধি, যা পুরুষতান্ত্রিক রাজনৈতিক সংস্কৃতির এক নির্লজ্জ বহিঃপ্রকাশ। এখানে মূল প্রশ্নটি হলো, কীভাবে একটি জাতীয় ঐকমত্য সম্ভব, যখন সমাজের অর্ধেক জনগোষ্ঠীই তাতে অনুপস্থিত? এই তথাকথিত ঐকমত্য কেবল নারীদের রাজনৈতিক প্রান্তিকতা আরও গভীর করে না; এটি একটি অন্তর্ভুক্তিমূলক, ন্যায্য ও গণতান্ত্রিক সমাজ বিনির্মাণের পথেও বাধা হয়ে দাঁড়ায়।
যেখানে নারীর পক্ষে সিদ্ধান্ত আসা উচিত ছিল নারীর কণ্ঠে, সেখানে পুরুষকণ্ঠে নারীর ‘ভবিষ্যৎ’ নির্ধারিত হয়েছে—এটা কেবল রাজনৈতিক বৈষম্য নয়, এটি এক প্রাতিষ্ঠানিক অযাচিত অভিভাবকত্ব, যা নারীকে নাগরিক নয়, করুণার পাত্রে রূপান্তর করে।
সত্যিকার অর্থে একটি উন্নত, গণতান্ত্রিক রাষ্ট্র তখনই গড়ে ওঠে, যখন সেই রাষ্ট্র তার প্রতিটি নাগরিককে–লিঙ্গ, শ্রেণি বা পরিচয়ের পার্থক্য ছাড়াই সমানভাবে রাজনৈতিক সিদ্ধান্ত গ্রহণে সম্পৃক্ত করে। নারীকে সিদ্ধান্ত থেকে বাদ দিয়ে সেই রাষ্ট্র কেবল নারীবিরোধী নয়, গণতন্ত্রবিরোধীও হয়ে ওঠে।
বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে নারীদের বিষয়ে সিদ্ধান্ত নেওয়া হচ্ছে নারীদের ছাড়াই–এটা শুধু একটি গভীর রাষ্ট্রীয় বৈষম্য নয়, বরং রাষ্ট্রীয় দ্বিচারিতার একটি প্রকৃষ্ট উদাহরণ। একদিকে নারীর ক্ষমতায়নের বুলি, অন্যদিকে সিদ্ধান্ত গ্রহণে তাঁদের গায়ে ‘অনুপযুক্ত’ বা ‘অপ্রয়োজনীয়’ সিল মারা হচ্ছে। এটি যে কেবল নারীদের প্রতি অবমাননা নয়, বরং একটি জাতির অগ্রগতির পথকেও সংকুচিত করে।
সুতরাং, যদি সত্যিই নারীদের রাজনৈতিকভাবে ক্ষমতায়িত করতে হয়, তবে প্রথম কাজ হওয়া উচিত তাঁদের সিদ্ধান্ত গ্রহণের কেন্দ্রবিন্দুতে জায়গা দেওয়া। আলোচনা-সভার টেবিলে, নীতিনির্ধারণী বৈঠকে, কমিশনের চেয়ার ও উপচেয়ারগুলিতে নারীর উপস্থিতি নিশ্চিত করতে হবে–কেবল আলোকচিত্রে নয়, বাস্তব ক্ষমতায়।
অন্যথায়, এই সব সিদ্ধান্ত শুধু পুরুষতন্ত্রের আত্মমুগ্ধ জয়গান হয়ে থাকবে। আর নারী থেকে যাবে সেই ক্লান্ত প্রতীক্ষার নাম, যে তার প্রতিনিধিত্বের অধিকার চায়, করুণা নয়। একটি রাষ্ট্র তার গণতন্ত্রের পরিপক্বতা প্রমাণ করে তখনই, যখন সে নারীর উপস্থিতিকে অলংকার নয়, অধিকার হিসেবে গ্রহণ করে। এখন সময় এসেছে সেই অধিকার প্রতিষ্ঠার, কেবল মুখে নয়–প্রতিটি সিদ্ধান্তে, প্রতিটি আসনে, প্রতিটি নীতিতে।
লেখক: গবেষক ও কলাম লেখক
[এই মতামত লেখকের নিজস্ব। এর সঙ্গে ইনডিপেনডেন্ট টেলিভিশনের প্রাতিষ্ঠানিক সম্পাদকীয় নীতিমালার কোনো সম্পর্ক নেই।]


সংসদে সংরক্ষিত নারী আসনে সরাসরি নির্বাচনের দাবি মহিলা পরিষদের
