আগামী ১২ ফেব্রুয়ারির জাতীয় সংসদ নির্বাচনে ব্রাহ্মণবাড়িয়া-২ (সরাইল,আশুগঞ্জ ও বিজয়নগর আংশিক) আসনে জাতীয় পার্টি সমর্থন দিয়েছে এক প্রার্থীকে আর দলটির মনোনীত লাঙ্গল প্রতীকের প্রার্থী সমর্থন দিয়েছেন আরেকজনকে। ভোটের আগে দল আর দলের প্রার্থীর এই সমর্থন ভাগাভাগি আলোচনায় উঠে এসেছে।
সোমবার রাতে জাতীয় পার্টির মহাসচিব ব্যারিস্টার শামীম হায়দার পাটোয়ারীর নির্দেশে আলোচিত স্বতন্ত্র প্রার্থী হাঁস মার্কা প্রতীকের রুমিন ফারহানাকে সমর্থন দেয় দলটি। নির্বাচনী এলাকার শাহবাজপুরে রুমিন ফারহানার বাসভবনে এক সংবাদ সম্মেলনে এ সমর্থন ব্যক্ত করেন দলের কেন্দ্রীয় সহ-সভাপতি অ্যাডভোকেট আবদুল হামিদ ভাসানী। এসময় উপজেলার নেতারাও সেখানেও উপস্থিত ছিলেন।
এরপর আজ মঙ্গলবার বিকেলে নির্বাচন থেকে সরে দাঁড়ানো জাতীয় পার্টি মনোনীত প্রার্থী অ্যাডভোকেট জিয়াউল হক মৃধা নিজের ফেসবুক অ্যাকাউন্ট থেকে দেওয়া এক ভিডিও বক্তব্যে ওই আসনে রুমিনের প্রতিদ্বন্দ্বী বিএনপি জােট প্রার্থী খেজুর গাছ প্রতীকের মাওলানা জুনায়েদ আল হাবিবকে সমর্থন ব্যক্ত করেন।
এর আগে গত রোববার স্বাধীন ও স্বতঃস্ফূর্তভাবে নির্বাচনী প্রচারণা চালাতে না পারার অভিযোগ এনে এক প্রেস বিজ্ঞপ্তিতে নির্বাচন থেকে সরে দাঁড়ানোর ঘোষনা দেন দুইবারের সাবেক এমপি অ্যাডভোকেট মৃধা। তার নির্বাচন থেকে সরে যাওয়ার ঘোষণার একদিন পরই ওই আসনের স্বতন্ত্র প্রার্থী হাঁস প্রতীকের রুমিন ফারহানাকে সমর্থন দেয় জাতীয় পার্টি।
সোমবার রাত ১০টার দিকে সরাইলের শাহবাজপুরে রুমিন ফারহানার বাসায় আয়োজিত সংবাদ সম্মেলনে জাতীয় পার্টির কেন্দ্রীয় সহ-সভাপতি অ্যাডভোকেট আবদুল হামিদ ভাসানী জানান, দলের মহাসচিব ব্যারিষ্টার শামীম হায়দার পাটোয়ারীর নির্দেশে স্বতস্ফুর্তভাবে রুমিন ফারহানাকে এ সমর্থন দেওয়া হয়েছে। জাতীয় পার্টির প্রার্থী জিয়াউল হক মৃধা মিথ্যা মামলা এবং হুমকির মুখে নির্বাচন থেকে সরে দাঁড়িয়েছেন বলেও উল্লেখ করেন তিনি।
রুমিনকে সমর্থন দেওয়া প্রসঙ্গে অ্যাডভোকেট আবদুল হামিদ ভাসানী আরও বলেন, ‘৫ই আগস্টের পর মব এবং জাতীয় পার্টির অফিসে বারবার অগ্নিসংযোগ করা হয়। এর প্রথম প্রতিবাদ করেছেন রুমিন ফারহানা। আওয়ামী লীগকে নিষিদ্ধ করার দাবি উঠলে তিনি বলেছেন, “রাজনীতি করা এ দেশের মানুষের অধিকার। কারো অধিকার হরণ করা যাবে না। তিনি এক প্রতিবাদী কন্ঠ। এছাড়া আশুগঞ্জ, সরাইল ও বিজয়নগরের সকল মানুষকে নিরাপদ, জুলুম-নির্যাতনের হাত থেকে রক্ষা করতে পারবেন এবং উন্নয়ন কাজ করতে পারবেন। এই বিশ্বাস থেকে আমরা তাকে স্বতস্ফুর্তভাবে সমর্থন জানাচ্ছি।’
সোমবার কেন্দ্রীয় জাতীয় পার্টির তরফ থেকে রুমিনকে সমর্থন দেওয়ার পর মঙ্গলবার বিকেলেই নিজের ফেসবুক অ্যাকাউন্টে ভিডিও বক্তব্যে বিএনপি সমর্থিত জোট প্রার্থীকে সমর্থন দেওয়ার ঘোষণা দেন জিয়াউল হক মৃধা।
ভিডিওতে অ্যাডভোকেট জিয়াউল হক মৃধা বলেন, ‘অনিবার্য কারনবশত এক বিবৃতি দিয়ে আমি নির্বাচন থেকে সরে দাঁড়াই। পরবর্তীকালে নেতিবাচক মন্তব্যের প্রেক্ষিতে আমি আমার ফেসবুক পোস্টে উল্লেখ করি, আমি কারও স্বার্থে নির্বাচন থেকে সরে দাঁড়াইনি। আমি কারও পক্ষে-বিপক্ষে নই, আমার অবস্থান স্পষ্ট। আমি সম্পূর্ণ নিরপেক্ষ। পরবর্তীকালে লক্ষ্য করলাম সরাইল উপজেলা জাতীয় পার্টির একাংশের কতিপয় নেতাকর্মী একজন প্রার্থীর পক্ষে (রুমিন ফারহানা) প্রচারণা চালাচ্ছেন। আমি নানাদিক থেকে প্রশ্নের সম্মুখীন হচ্ছি। তাই আমার অবস্থান স্পষ্ট করার জন্য আমার বলা। আমি বলত চাই, যারা প্রচারণা চালিয়েছে তারা আমার সাথে কোনো পরামর্শ করেনি। তারা জেলা জাতীয় পার্টি এবং কেন্দ্রীয় জাতীয় পার্টির নির্দেশ গ্রহণ করেনি।’
নিজেকে ‘নিরপেক্ষ’ দাবি করার পরই জিয়াউল হক মৃধা বিএনপি জোট প্রার্থীকে সমর্থন দেওয়ার ঘোষণা দেন। কারণ হিসেবে তিনি বলেন, ‘আমি গণতন্ত্রে বিশ্বাস করি। জাতীয় পার্টিও গণতান্ত্রিক দল। সচেতন নাগরিক হিসেবে আমার ভূমিকা স্পষ্ট করতে চাই। আমি মনে করি বিএনপি এবং জাতীয় পার্টি উভয় দলই বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদ, উদার গণতন্ত্র, ধর্মীয় মুল্যবোধে বিশ্বাসী। নীতি এবং আদর্শের দিক থেকে উভয় দলের মিল আছে। তাই বিএনপি সমর্থিত জোট প্রার্থীকে ভোট দেওয়া আমার দলের পক্ষে উচিত বলে মনে করি। আমি আরও বলতে চাই, জাতীয় পার্টি নিষিদ্ধের জন্য যখন রাজপথে আন্দোলন চলছিল এবং নানা ধরনের প্রচেষ্টা চলছিল, তখন বিএনপির ভূমিকা ছিলো জাতীয় পার্টির পক্ষে।’
এ বিষয়ে কথা বলতে অ্যাডভোকেট জিয়াউল হক মৃধাকে কল করা হলে তাঁর মুঠোফোনটি বন্ধ পাওয়া যায়। নির্বাচন থেকে সরে দাঁড়ানোর পর থেকেই বন্ধ রয়েছে তাঁর মুঠোফোনটি।
এদিকে ইনডিপেনডেন্টের তরফ থেকে যোগাযোগ করা হলে জাতীয় পার্টির কেন্দ্রীয় সহ-সভাপতি অ্যাডভোকেট আবদুল হামিদ ভাসানী বলেন, ‘আমার এখন গুরুতরভাবে সন্দেহ হচ্ছে মিথ্যা মামলা, গ্রেপ্তারের ভয় বা অন্যকােনো ভীতির মুখে তিনি (জিয়াউল হক মৃধা) এ বক্তব্য দিয়েছেন।’
এ প্রসঙ্গে তিনি আরও বলেন, ‘তাঁর (অ্যাডভোকেট মৃধার) বক্তব্য (ভিডিও বক্তব্য) দেওয়ার সময় আশপাশে দলের কেউ, এমনকি কোনো লোকজন, পরিবারের কেউ ছিল না। সে কোন অবস্থায় আছে, বোধগম্য নয়। গোপন আতাতের কারণেও তিনি এরকম করতে পারেন।’
রুমিন ফারহানাকে সমর্থন দেওয়ার বিষয়ে দলের মহাসচিব শামীম পাটোয়ারী তাকে যে নির্দেশনা দিয়েছেন মোবাইলের সেই কল রেকর্ডও সাংবাদিকদের শোনান অ্যাডভোকেট ভাসানী।
উল্লেখ্য, জিয়াউল হক মৃধা ব্রাহ্মণবাড়িয়া-২ আসন থেকে তিনি ২০০৮ ও ২০১৪ সালে মহাজোট প্রার্থী হিসেবে এমপি নির্বাচিত হন। এরপর ২০১৮ সালের নির্বাচনে মহাজোটের মনোনয়নকে কেন্দ্র করে মেয়ের জামাতার সঙ্গে প্রকাশ্য বিবাদে জড়ান।



