যুক্তরাষ্ট্র আফ্রিকার দেশ ইরিত্রিয়ার ওপর থেকে নিষেধাজ্ঞা তুলে নিতে যাচ্ছে। মার্কিন প্রশাসনের এমন নির্দেশনা জারি করা এক অভ্যন্তরীণ নথি নজরে এসেছে জানিয়ে সংবাদসংস্থা রয়টার্স জানিয়েছে এই তথ্য। বিশ্লেষকদের মতে, লোহিত সাগরের গুরুত্বপূর্ণ নৌপথে ইরিত্রিয়ার কৌশলগত অবস্থানের কারণেই এই সিদ্ধান্ত নিচ্ছে যুক্তরাষ্ট্র।
বিশ্লেষকদের মতে, এই পদক্ষেপের লক্ষ্য ইরিত্রিয়ার সঙ্গে সম্পর্ক উন্নত করা। লোহিত সাগরের উপকূলে ইরিত্রিয়ার বিশাল অংশ আছে, যা সৌদি আরবের বিপরীতে অবস্থিত।
ইরিত্রিয়ার ওপর নিষেধাজ্ঞাই শুধু তুলে নিচ্ছে না, তাদের প্রতিবেশি ইথিওপিয়াকেও ইরিত্রিয়ার বিরুদ্ধে যুদ্ধ না করতে বার্তা দিচ্ছে ওয়াশিংটন। ইথিওপিয়া আর ইরিত্রিয়ার মধ্যে শত্রুতার ইতিহাস পুরোনো।
ইরানে যুদ্ধ পরিস্থিতি এবং হরমুজ প্রণালির বন্ধ হয়ে যাওয়ার প্রেক্ষাপটে লোহিত সাগরের গুরুত্ব আরও বেড়েছে বলে মনে করছেন বিশ্লেষকেরা। সৌদি আরবের পূর্ব উপকূলের কাছে থাকা এই প্রণালি ইউরোপ ও এশিয়ার মধ্যে বাণিজ্যের গুরুত্বপূর্ণ পথ।
তবে আফ্রিকার হর্ন অঞ্চলেও অস্থিরতা কম নয়। সুদানে যুদ্ধ চলছে, সোমালিয়ায় উত্তেজনা আছে, আর এদিকে ইথিওপিয়া–ইরিত্রিয়া সংঘাতের আশঙ্কা পরিস্থিতিকে আরও জটিল করেছে।
যুক্তরাষ্ট্রভিত্তিক সংগঠন ফ্রিডম হাউজ ইরিত্রিয়াকে বিশ্বের সবচেয়ে দমনমূলক দেশগুলোর একটি হিসেবে চিহ্নিত করেছে। তাদের মতে, দেশটি উত্তর কোরিয়ার মতোই একটি সামরিক শাসিত স্বৈরাচারী রাষ্ট্র। ১৯৯৩ সালে ইথিওপিয়া থেকে স্বাধীন হওয়ার পর থেকে ইরিত্রিয়ায় এখন পর্যন্ত কোনো জাতীয় নির্বাচন হয়নি।
২০২১ সালে বাইডেনের নিষেধাজ্ঞা
২০২১ সালে যুক্তরাষ্ট্রের তৎকালীন প্রেসিডেন্ট জো বাইডেন ইরিত্রিয়ার ক্ষমতাসীন দল, দেশটির সামরিক বাহিনী এবং শীর্ষ কর্মকর্তাদের ওপর নিষেধাজ্ঞা আরোপ করেন। প্রতিবেশী ইথিওপিয়ায় যুদ্ধের সময় টাইগ্রে অঞ্চলের যে বিদ্রোহী গোষ্ঠী ওই অঞ্চলের সামরিক বাহিনীর বিরুদ্ধে লড়ছিল, সেই গোষ্ঠীকে ইরিত্রিয়ার সামরিক বাহিনী সহায়তা দিয়েছে – এই অভিযোগেই ওই নিষেধাজ্ঞা দেয় বাইডেন প্রশাসন।
এখন মার্কিন প্রশাসনের যে অভ্যন্তরীণ নথি রয়টার্সের নজরে এসেছে, সেই নথিতে বলা হয়েছে, ‘৪ মে অথবা এর আশপাশের কোনো তারিখে’ বাইডেনের সেই নির্বাহী আদেশ বাতিল করা হবে। অবশ্য বাইডেনের ওই নিষেধাজ্ঞার আগে থেকেই ইরিত্রিয়ার সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্রের সম্পর্ক বেশ শীতল।
নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহারের ঘোষণা কবে দেওয়া হবে, তা এখনো স্পষ্ট নয়। এ বিষয়ে মার্কিন পররাষ্ট্র দপ্তর ও অর্থ বিভাগ কোনো মন্তব্য করেনি বলে জানিয়েছে রয়টার্স। ইরিত্রিয়ার তথ্যমন্ত্রী ইয়েমানে গেব্রেমেসকেল এবং ইথিওপিয়ার প্রধানমন্ত্রীর মুখপাত্র বিলেন সেওমও এ বিষয়ে মন্তব্যের অনুরোধে সাড়া দেননি বলে জানিয়েছে সংবাদ সংস্থাটি।
হাজার মানুষের মৃত্যু ও মানবাধিকার অভিযোগ
জাতিসংঘের বিশেষজ্ঞ ও মানবাধিকার সংগঠনগুলো অভিযোগ করে এসেছে, ইরিত্রিয়ার প্রেসিডেন্ট ইসাইয়াস আফওয়ারকির প্রায় ৩০ বছরের শাসনে দেশটিতে ব্যাপক মানবাধিকার লঙ্ঘনের ঘটনা ঘটেছে। এর মধ্যে রয়েছে সামরিক বাহিনীতে যোগ দিতে বাধ্য করার সীমাহীন নজির – মূলত সুস্থ-সবল পুরুষ ও অবিবাহিত নারীদের দীর্ঘদিন ধরে সেনাবাহিনী বা সরকারি কাজে বাধ্য করা হয়।
ইরিত্রিয়া সরকার এসব অভিযোগ নিয়মিত অস্বীকার করে।
২০২০ থেকে ২০২২ সালের মধ্যে ইথিওপিয়ার যুদ্ধে হাজারো মানুষ নিহত এবং লাখো মানুষ বাস্তুচ্যুত হয়। জাতিসংঘের মতে, ইরিত্রিয়ার সেনারা ওই যুদ্ধে বহু মানবাধিকার লঙ্ঘনের সঙ্গে জড়িত ছিল, যার মধ্যে ছিল বিচারবহির্ভূত হত্যা এবং শরণার্থীদের অপহরণ ও গুম করা।
শুরুতে ইরিত্রিয়া তাদের সেনা মোতায়েনের কথা অস্বীকার করেছিল, তবে পরে টাইগ্রে অঞ্চলে তাদের সেনাদের উপস্থিতি ছিল বলে স্বীকার করে। যদিও সেনাদের হাতে কোনো নির্যাতনের অভিযোগ তারা স্বীকার করেনি।
লোহিত সাগর ও তেলের সংকট
২০২১ সালে ইরিত্রিয়ার ওপর বাইডেন প্রশাসনের নিষেধাজ্ঞার মাত্রা ছিল ব্যাপক, যা ইরিত্রিয়ার সামরিক বাহিনী, ক্ষমতাসীন রাজনৈতিক দল পিপলস ফ্রন্ট ফর ডেমোক্রেসি অ্যান্ড জাস্টিস এবং জাতীয় নিরাপত্তা প্রধানসহ অনেককে লক্ষ্য করে দেওয়া হয়েছিল।
তবে যুক্তরাষ্ট্র–ইরান যুদ্ধের কারণে তেল সরবরাহ ও সমুদ্রপথে বড় ধরনের বিঘ্ন ঘটেছে। এর ফলে লোহিত সাগর এখন আরও কৌশলগতভাবে গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে। যে কারণে ইরিত্রিয়াও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে।
আন্তর্জাতিক ক্রাইসিস গ্রুপের আফ্রিকা বিষয়ক পরিচালক মুরিথি মুটিগা বলেন, হরমুজ প্রণালি যত বেশি সময় বন্ধ থাকবে, ততই লোহিত সাগরের নিয়ন্ত্রণ নিয়ে প্রতিদ্বন্দ্বীতা আরও তীব্র হয়ে উঠবে। আর এটি (নতুন নথি) প্রমাণ করে যে, যুক্তরাষ্ট্রও এই অঞ্চল নিয়ে আরও বেশি আগ্রহী হয়ে উঠেছে।
ইথিওপিয়া ও ইরিত্রিয়ার দীর্ঘ বিরোধ
ইথিওপিয়া ও ইরিত্রিয়ার দীর্ঘ ইতিহাসে একাধিক যুদ্ধ হয়েছে। ২০১৮ সালে শান্তি চুক্তির মাধ্যমে সম্পর্ক স্বাভাবিক করার চেষ্টা হয়েছিল।
তবে টাইগ্রে যুদ্ধের পর দুই দেশের সম্পর্ক আবারও খারাপ হয়েছে। ইথিওপিয়ার প্রধানমন্ত্রী আবি আহমেদ সম্প্রতি বলেছেন, তার দেশের সমুদ্রপথে প্রবেশের অধিকার থাকা উচিত। প্রসঙ্গত, ইথিওপিয়া চারদিক থেকে ভূমিবেষ্টিত বা ল্যান্ডলকড।
ইরিত্রিয়া এই ঘোষণাকে দেখছে সম্ভাব্য সামরিক হুমকি হিসেবে।
আঞ্চলিক কূটনীতিকদের মতে, যুক্তরাষ্ট্রের এই পদক্ষেপ ইথিওপিয়াকে একটি বার্তা দেবে যে, ওয়াশিংটন জোর করে সমুদ্রপথ দখলের কোনো প্রচেষ্টাকে সমর্থন করে না।
মার্কিন সরকারি নথিতে বলা হয়েছে, যুক্তরাষ্ট্র বারবার ইথিওপিয়াকে জানিয়েছে যে, তারা কোনোভাবেই বলপ্রয়োগের মাধ্যমে সমুদ্রপথ দখলের প্রচেষ্টার বিরোধিতা করে। পাশাপাশি দুই দেশকেই একে অপরের অভ্যন্তরীণ বিষয়ে অস্থিতিশীলতা তৈরি করার মতো ভূমিকা রাখার কারণে সতর্ক করা হয়েছে।



