বেশ বেকায়দায়ই পড়েছেন বলে মনে হচ্ছে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প। এই তো নিজে থেকে ইচ্ছা প্রকাশ করলেন উত্তর কোরিয়ার প্রেসিডেন্ট কিম জং উনের সঙ্গে বৈঠক করতে। কিন্তু ট্রাম্পের এই প্রস্তাবে মনে হয় একটু ‘ভাবসাব’ নিয়ে ফেলল পিয়ংইয়ং। ট্রম্পের প্রস্তাবে পিয়ংইয়ং জানিয়েছে তারা এত তাড়াতাড়ি মার্কিন প্রেসিডেন্টের বৈঠকে বসবে না। আর এর জন্য বেশ কিছু কঠিন শর্তও জুড়ে দিতে চায় উত্তর কোরিয়া। খবর রয়টার্সের।
চলতি সপ্তাহের শুরুতে দক্ষিণ কোরিয়ার সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্রের যৌথ সামরিক মহড়া ‘উলচি ফ্রিডম শিল্ড’ কমিয়ে আনার সিদ্ধান্ত নেয় ওয়াশিংটন। এরপর বুধবার ট্রাম্প জানান, চলতি বছরের শেষ দিকে কিমের সঙ্গে বৈঠকের আশা করছেন তিনি।
মার্কিন ও দক্ষিণ কোরীয় কর্মকর্তাদের আলোচনার ভিত্তিতে জানা গেছে, উত্তর কোরিয়ার সঙ্গে আবারও আলোচনা শুরু করে আন্তর্জাতিক অঙ্গনে একটি কূটনৈতিক সাফল্য অর্জনে আগ্রহী ট্রাম্প। এদিকে ইরান যুদ্ধ প্রায় ছয় মাসে গড়ালেও তা শেষ হওয়ার তাৎক্ষণিক কোনো সম্ভাবনা দেখা যাচ্ছে না। একই সময়ে ইউক্রেনের বিরুদ্ধে যুদ্ধে রাশিয়াকে ক্ষেপণাস্ত্র, সেনা ও অন্যান্য সামরিক সরঞ্জাম দিয়ে সহায়তা করে যাচ্ছে পিয়ংইয়ং। এর মধ্যেই উত্তর কোরিয়ার দিকে কূটনৈতিকভাবে হাত বাড়িয়েছেন ট্রাম্প।
সূত্রগুলো বলছে, দক্ষিণ কোরিয়া ব্যক্তিগতভাবে ট্রাম্পের এই কৌশলকে ইতিবাচকভাবে দেখলেও যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে যৌথ সামরিক মহড়া কমানোর সিদ্ধান্ত নিয়ে সিউলের কর্মকর্তাদের মধ্যে এখনও দ্বিধাদ্বন্দ্ব রয়েছে।
চলতি বছরের শেষ দিকে চীনের শেনঝেনে অনুষ্ঠেয় এশিয়া-প্যাসিফিক ইকোনমিক কোঅপারেশন (এপেক) সম্মেলনে ট্রাম্প অংশ নিতে পারেন। উত্তর কোরিয়া আলোচনায় সম্মত হলে ওই অঞ্চলে দুই নেতার বৈঠকের একটি সুযোগ তৈরি হতে পারে।
মার্কিন পররাষ্ট্র দপ্তরের এক মুখপাত্র বলেছেন, ‘যুক্তরাষ্ট্র পূর্বশর্ত ছাড়াই উত্তর কোরিয়ার সঙ্গে আলোচনায় বসতে উন্মুক্ত। উপযুক্ত সময়ে প্রেসিডেন্ট ও কিম জং উন আবার বৈঠক করবেন।’
হোয়াইট হাউস এ বিষয়ে কোনো মন্তব্য করতে রাজি হয়নি। দক্ষিণ কোরিয়ার প্রেসিডেন্টের কার্যালয়ও মন্তব্যের অনুরোধে সাড়া দেয়নি। তবে দেশটির পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় আগের একটি বিবৃতির দিকে ইঙ্গিত করেছে। সেখানে আশা প্রকাশ করা হয়েছিল, ট্রাম্পের বক্তব্য পিয়ংইয়ংয়ের সঙ্গে অর্থবহ আলোচনার পথ সুগম করবে।
কেয়ংনাম ইউনিভার্সিটির ইনস্টিটিউট ফর ফার ইস্টার্ন স্টাডিজের অধ্যাপক লিম ইউল-চুল বলেন, ‘উত্তর কোরিয়ার প্রতিক্রিয়ায় কিম ও ট্রাম্পের চমৎকার ব্যক্তিগত সম্পর্কের প্রশংসা করা হলেও একই সঙ্গে স্পষ্ট করা হয়েছে, যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে কূটনৈতিক যোগাযোগের বিষয়টি ব্যক্তিগত সম্পর্কের বাইরে আলাদাভাবে বিবেচনা করে পিয়ংইয়ং।’
লিম বলেন, ‘ব্যক্তিগত সম্পর্ককে কখনোই জাতীয় নিরাপত্তা স্বার্থ বা সামরিক সক্ষমতা শক্তিশালী করার প্রচেষ্টার সঙ্গে আপস করতে দেওয়া হবে না। অন্য কথায়, পিয়ংইয়ং ইঙ্গিত দিচ্ছে যে ব্যক্তিগত কূটনীতির সীমাবদ্ধতা রয়েছে এবং তা কৌশলগত অগ্রাধিকারকে অতিক্রম করবে না।’
কিমের প্রভাবশালী বোন কিম ইয়ো জং ‘উলচি ফ্রিডম শিল্ড’ মহড়া কমানোর বিষয়টিকে গুরুত্ব না দিয়ে বলেছেন, মহড়া চালিয়ে যাওয়া একটি আক্রমণাত্মক পদক্ষেপ এবং উত্তর কোরিয়ার প্রতি যুক্তরাষ্ট্রের নীতি এখনও শত্রুতাপূর্ণ। ট্রাম্প ও কিমের মধ্যে কোনো যোগাযোগ হয়েছে বলেও তিনি অস্বীকার করেন। তবে দুই নেতার ব্যক্তিগত সম্পর্ককে ‘চমৎকার’ বলে বর্ণনা করেন তিনি।
দক্ষিণ কোরিয়ার সামরিক বাহিনী জানিয়েছে, বৃহস্পতিবার উত্তর কোরিয়া তার পূর্ব উপকূল থেকে প্রায় ১০টি ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র উৎক্ষেপণ করেছে। বিশ্লেষকদের ধারণা, চলমান যুক্তরাষ্ট্র-দক্ষিণ কোরিয়া যৌথ সামরিক মহড়ার প্রতিবাদেই এসব ক্ষেপণাস্ত্র ছোড়া হয়েছে।
উত্তর কোরিয়ার রাষ্ট্রীয় সংবাদ সংস্থা কেসিএনএর বরাতে জানা গেছে, কিম ইয়ো জং তার বিবৃতিতে বলেছেন, ‘মার্কিন পক্ষ যদি এবার তাদের নেওয়া পদক্ষেপগুলোকে এক ধরনের সদিচ্ছার নিদর্শন হিসেবে প্রচার করার চেষ্টা করে, তবে তারা কাঙ্ক্ষিত উত্তর পাবে না।’
পিয়ংইয়ং যে শর্ত দিল
ওয়াশিংটনভিত্তিক স্টিমসন সেন্টারের সিনিয়র ফেলো জেনি টাউন বলেন, ‘উত্তর কোরিয়া স্পষ্ট করেছে—কোন শর্তগুলো পূরণ হলে একটি বৈঠক তাদের কাছে গ্রহণযোগ্য হতে পারে। তবে এসব শর্ত পূরণ করা যুক্তরাষ্ট্রের জন্য অত্যন্ত কঠিন হবে।’
তার মতে, এসব শর্তের মধ্যে থাকতে পারে উত্তর কোরিয়ার প্রতি যুক্তরাষ্ট্রের নীতিতে বড় ধরনের পরিবর্তন আনা, পিয়ংইয়ং যেসব বিষয়কে শত্রুতাপূর্ণ মনে করে সেগুলো প্রত্যাহার করা এবং উত্তর কোরিয়ার পারমাণবিক শক্তিধর রাষ্ট্রের মর্যাদা মেনে নেওয়া। অন্ততপক্ষে পারমাণবিক নিরস্ত্রীকরণকে ওয়াশিংটনের লক্ষ্য নয়—এমন ঘোষণা দেওয়ার দাবিও আসতে পারে।’
টাউন বলেন, ‘ট্রাম্প যে সময়সীমা নির্ধারণ করেছেন, তার মধ্যে বৈঠক নিশ্চিত করতে তিনি এসব শর্ত মানতে কতটা ইচ্ছুক—তা নিয়ে প্রশ্ন থেকেই যায়।’
তবে মার্কিন পররাষ্ট্র দপ্তরের মুখপাত্র বলেছেন, যুক্তরাষ্ট্র উত্তর কোরিয়ার পূর্ণাঙ্গ পারমাণবিক নিরস্ত্রীকরণের লক্ষ্যে অটল রয়েছে।
২০১৮ ও ২০১৯ সালে কিমের সঙ্গে অভূতপূর্ব ধারাবাহিক শীর্ষ বৈঠক করেছিলেন ট্রাম্প। তবে উত্তর কোরিয়াকে পারমাণবিক অস্ত্র ত্যাগ করতে হবে—ওয়াশিংটনের এই দাবির কারণে শেষ পর্যন্ত সেই কূটনৈতিক প্রচেষ্টা ব্যর্থ হয়।
এরপর থেকে ট্রাম্প একাধিকবার উত্তর কোরিয়াকে পারমাণবিক শক্তিধর হিসেবে উল্লেখ করেছেন। যদিও তার প্রশাসন এখনও দেশটির পারমাণবিক নিরস্ত্রীকরণের দাবি জানিয়ে আসছে এবং আনুষ্ঠানিকভাবে উত্তর কোরিয়াকে পারমাণবিক অস্ত্রধারী রাষ্ট্র হিসেবে স্বীকৃতি দেয়নি।
ট্রাম্পের প্রথম মেয়াদের তুলনায় এবার কিমের বৈঠকে বসার আগ্রহ বা প্রয়োজন কম বলে মনে করছেন বিশ্লেষকেরা। প্রথম মেয়াদে নিষেধাজ্ঞা শিথিলের জন্য কূটনৈতিক প্রচেষ্টায় ছিলেন কিম। এরপর উত্তর কোরিয়া চীন ও রাশিয়ার আরও ঘনিষ্ঠ হয়েছে। দেশ দুটির সঙ্গে ক্রমবর্ধমান বাণিজ্যও উত্তর কোরিয়ার অর্থনীতিকে এগিয়ে নিতে সহায়তা করছে।
টাউন বলেন, ‘উত্তর কোরিয়ার হাতে এখন একাধিক বিকল্প রয়েছে। তারা এমন রাষ্ট্রগুলোর সঙ্গে সম্পর্ক জোরদার করছে, যেখানে কোনো ত্যাগ স্বীকারের প্রয়োজন নেই; বরং সম্পর্কগুলো উভয় পক্ষের জন্যই লাভজনক। তাই যেখানে তাদের কিছু ছাড় দেওয়া বা প্রতিরক্ষার জন্য গুরুত্বপূর্ণ কিছু ত্যাগ করার প্রত্যাশা করা হচ্ছে, সেখানে তাড়াহুড়ো করে আলোচনায় ফিরে আসার প্রণোদনা খুবই কম।’
আলোচনার পথ এখনও খোলা
কোরিয়া ইনস্টিটিউট ফর ন্যাশনাল ইউনিফিকেশনের সিনিয়র রিসার্চ ফেলো হং মিন বলেন, ‘কিম ইয়ো জংয়ের বিবৃতিটি এমনভাবে তৈরি করা হয়েছে, যাতে কূটনীতির সম্ভাবনা পুরোপুরি বন্ধ না হয়।’
হং বলেন, ‘এর মূল উদ্দেশ্য মনে হচ্ছে যুক্তরাষ্ট্রকে আরও নমনীয় অবস্থানে আসতে উৎসাহিত করা।’ তার মতে, ট্রাম্পকে বিরক্ত করা এড়াতেই পিয়ংইয়ং সম্ভবত ইরান ইস্যুতে মন্তব্য করা থেকে বিরত থেকেছে।
তিনি বলেন, ‘কিম ইয়ো জংয়ের বিবৃতিটি আলোচনা প্রত্যাখ্যানের চেয়ে ট্রাম্পের ধারণা পরিচালনা করা, উত্তর কোরিয়া সম্পর্কে তার বোঝাপড়া তৈরি করা এবং ভবিষ্যতে সম্ভাব্য মার্কিন-উত্তর কোরিয়া আলোচনার ভিত্তি তৈরির একটি প্রচেষ্টা বলে মনে হচ্ছে।’
বিবৃতিতে জাপানেরও কঠোর সমালোচনা করা হয়েছে। দেশটির সামরিক প্রস্তুতি এবং যুক্তরাষ্ট্র ও দক্ষিণ কোরিয়ার সঙ্গে নিরাপত্তা সম্পর্ক পিয়ংইয়ংয়ের ক্ষোভের অন্যতম কারণ।
হং আরও বলেন, ‘পিয়ংইয়ং এমন একটি মার্কিন-উত্তর কোরিয়া সম্পর্কের কাঠামোর ইঙ্গিত দিচ্ছে, যেখানে দক্ষিণ কোরিয়াকে একপাশে সরিয়ে রাখা হবে এবং জাপানকে মূলত সামরিক প্রতিপক্ষ হিসেবে দেখা হবে।’
তিনি বলেন, ‘মার্কিন-উত্তর কোরিয়ার সম্পর্ক এখন পারস্পরিক পর্যবেক্ষণ ও সংকেত পাঠানোর একটি পর্যায়ে প্রবেশ করতে পারে।’



