মানুষ অসুস্থ হতেই পারেন। মানুষের যে জীবনটা চিকিৎসাবিজ্ঞান রক্ষা করার কথা, সেই জীবনটা যদি চিকিৎসার সময় অজ্ঞতা বা অবহেলা অথবা বাণিজ্যিকরণের কারণে অকালে ঝরে যায়, তাকে কি অকালমৃত্যু নাকি হত্যা বলা হবে? নাকি চিকিৎসাপদ্ধতির অব্যবস্থাপনা, ব্যক্তির ভুল নাকি অবহেলা বলা হবে? মানবিক ভুলের প্রতিরোধের যে বিজ্ঞান স্বীকৃত উপায় তার প্রয়োগের অভাব নাকি অস্তিত্বহীনতা? কেন একজন চিকিৎসক এই পরিস্থিতির মুখোমুখি হবেন?
এ ক্ষেত্রে অনেক প্রশ্ন মনের মধ্যে ঘুরছে। সব তথ্যের সূত্র অনলাইন আর নিজের জল্পনা। আমি সুইডেনের যে হাসপাতালে কর্মরত আছি, সেখানে প্রতিনিয়ত এ জাতীয় চিকিৎসাসংক্রান্ত জটিলতা এবং দুর্ঘটনার কারণ নিয়ে কাজ করি। আমার মূল উদ্দেশ্য কোন খলনায়ক বা অপরাধী খুঁজে বের করা নয়। বরং এই ধরনের ঘটনার যেন পুনরাবৃত্তি না ঘটে এবং রোগী ক্ষতির কারণ না হয় তা খুঁজে বের করা। সে কারণে যেসব জায়গায় পরিবর্তন প্রয়োজন, নিজের আয়ত্তের মধ্যে থাকলে তা সংশোধন করি। এসব বিষয় পদ্ধতিগত ভুলের কারণে হয়ে থাকে। মানবিক ভুলগুলি সঠিক সময়ে শনাক্ত করার সীমাবদ্ধতা বা অভাব থাকলে, সেখানে মূল ভুলটা হয়ে থাকে এবং এটাই পদ্ধতিগত ভুল।
অন্যদের না চিনলেও চিকিৎসক দম্পতিকে ফেসবুকে বন্ধুত্বের সূত্রে চিনি। শহীদ বুদ্ধিজীবী ডাক্তার আলীম চৌধুরীর কন্যা নুজহাত চৌধুরী শম্পা এবং তাঁরা স্বামী অধ্যাপক মামুন আল মাহতাব স্বপ্নীল। তাঁরা পরিপাকতন্ত্রের চিকিৎসক।
একজন চিকিৎসক হিসেবে আমি সর্বপ্রথম এবং পরিপূর্ণভাবে ভুক্তভোগী রোগীর পক্ষে থাকি। আবার চিকিৎসক হিসেবে সহকর্মীদের পাশেই থাকি, তাঁদের মনোবলকে শক্ত রাখার জন্য। তাদের মানবিক ভুলগুলি প্রাধান্য না দিয়ে সেই ভুলগুলি স্ক্রিনিং জন্য বলি।
পৃথিবীর যে কোন দেশের চিকিৎসক এমন পরিস্থিতির সম্মুখীন হতে পারেন। এটাই বাস্তবতা। সুপার ম্যান থাকতে পারে। কিন্তু সুপার ডাক্তার বলে কিছু নেই। বিনয়, আচরণ এবং জ্ঞানই একজন চিকিৎসককে অন্যদের থেকে আলাদা করে। মানবসেবার চরম ব্রতকে ধারণ করে আমি এই পেশার জন্য গর্বিত কিন্তু অহংকারী নয়।
চিকিৎসক পেশাটাই তো মানবিক। মানবিক থাকাটাই তো পেশাদারত্ব। আর সেই পেশাদারত্ব, নৈতিকতা থেকে সরে আসলে পেশাদারত্বের এবং পেশার যে বিচ্যুতি ঘটে -তার ক্ষতি অপরিবর্তনীয়। গুটি কয়েক পদস্খলিত ব্যক্তি ছাড়া চিকিৎসাসেবায় নিয়োজিত কেউই মানবতার অসম্মান যেমন করে না, তেমনি অবিচার ও করে না। এটাই আমার বিশ্বাস।
কিছুদিন আগে এন্ডোস্কোপি করতে গিয়ে এক যুবকের মৃত্যু হয়। এর অল্প কয়েকদিন আগে দুই শিশুর খতনা করতে গিয়ে মৃত্যু ঘটে। এসব ঘটনায় পত্রিকা, অনলাইন, ইউটিউবের চায়ের কাপে ঝড় উঠেছে। মানে বসন্তে অকালবৈশাখী।
তবে নিয়মের অভাবে কিংবা উত্তেজনা অথবা মিডিয়ার চাপের কাছে নতি স্বীকার করে রোগীর তথ্য এবং রোগী সম্পর্কে মিডিয়ায় কথা বলাটা শুধু অনুচিত ই নয়, নীতিশাস্ত্রের বহির্ভূত এবং দণ্ডনীয় অপরাধ।
এই তিনটি মৃত্যুই যেন যথেষ্ট হয়। এদের মৃত্যুই যেন আগামীতে রোগীর সুরক্ষা আর নিরাপত্তা রক্ষার মাইলফলক হয়ে ওঠে। সবার জন্য স্বাস্থ্যসেবা নিশ্চিত করা হোক। পাশাপাশি বাণিজ্যিকরণের হাত থেকে স্বাস্থ্যখাত অবমুক্ত হোক।
লেখক: ইমারজেন্সি ফিজিশিয়ান ও বিভাগীয় প্রধান, উপসলা ইউনিভার্সিটি হসপিটাল, সুইডেন



