সম্প্রতি এক অভাবনীয় রায়ে ২৫ হাজার শিক্ষকের নিয়োগ বাতিল করেছেন কলকাতা হাইকোর্ট। এ নিয়ে শোরগোল শুধু কলকাতাতেই নয়, ছড়িয়ে পড়েছে সারা ভারতেই। চলমান লোকসভা নির্বাচনে হাইকোর্টের এই রায় কতটা প্রভাব ফেলবে, তা নিয়েও চলছে জোরেসোরে আলোচনা।
গত ২২ এপ্রিল পশ্চিমবঙ্গে শিক্ষাক্ষেত্রে নিয়োগ সংক্রান্ত দুর্নীতি মামলায় ২০১৬ সালের স্কুল সার্ভিস কমিশনের (এসএসসি) সম্পূর্ণ নিয়োগ প্রক্রিয়া বাতিলের পাশাপাশি ওই প্যানেলে নিয়োগ করা ২৫ হাজার ৭৫৩ জনের চাকরি বাতিল করেন কলকাতা হাইকোর্ট। একই সঙ্গে মেয়াদোত্তীর্ণ প্যানেল মারফত যে প্রার্থীরা চাকরি পেয়েছিলেন, তাদের সুদ-সহ বেতন ফেরত দেওয়ার নির্দেশও দিয়েছেন আদালত।
২০১৬ সালে রাজ্য–পরিচালিত স্কুলগুলোতে শিক্ষক নিয়োগের জন্য পরীক্ষা নিয়েছিল পশ্চিমবঙ্গ স্কুল সার্ভিস কমিশন। আদালত বলেছে, এই নিয়োগ প্রক্রিয়ায় দুর্নীতির বিষয়টি সন্দেহাতীতভাবে প্রমাণিত হয়েছে।
এই নিয়োগপ্রক্রিয়ার সঙ্গে যেসব অনিয়ম হয়েছে, তা গা শিউরে ওঠার মতো বলেও মন্তব্য করেছেন আদালত। যেমন, পরীক্ষায় ব্যবহৃত প্রার্থীদের অপটিক্যাল মার্ক রিকগনিশন শীট নষ্ট করে ফেলা, স্ক্যান করা ছবি কমিশনের সার্ভারে সংরক্ষণ না করা, প্রার্থীদের নম্বর সম্বলিত কোনো মেধা তালিকা প্রকাশ না করা, মেধা তালিকার নিচে থাকা প্রার্থীদের নিয়োগ দেওয়া ইত্যাদি। এমনকি এই অবৈধ নিয়োগ প্রক্রিয়া থেকে লাভবানদের রক্ষা করার জন্য রাজ্য সরকারকেও অভিযুক্ত করেছেন আদালত।
সুতরাং এই রায়ের পর পশ্চিমবঙ্গ রাজ্য সরকারের ব্যাপক দুর্নীতির ব্যাপারে আর কোনো সন্দেহ পোষণ করার সুযোগই থাকল না। ভারতের ইতিহাসে এই রায় নজিরবিহীন। ফলে খুবই যৌক্তিকভাবেই অস্বস্তিতে পড়েছে পশ্চিমবঙ্গের ক্ষমতাসীন দল তৃণমূল কংগ্রেস। পশ্চিমবঙ্গের মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় বলেছেন, ‘এই রায় বেআইনি। আমরা এই রায়কে চ্যালেঞ্জ করছি। কারণ ২৬ হাজার চাকরি মানে প্রায় এক দেড় লক্ষ পরিবার।’
মমতার এই তড়িৎ প্রতিক্রিয়াই প্রমাণ করে, ভোটের মাঠে এই রায়ের নেতিবাচক প্রভাব পড়ার সম্ভাবনা প্রবল।
অন্যদিকে বিজেপি নেতারাও তৎক্ষণাৎ প্রতিক্রিয়া জানিয়ে তৃণমূল কংগ্রেস সরকারকে ‘দুর্নীতিগ্রস্ত’ বলে আক্রমণ করেছেন এবং মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের পদত্যাগ দাবি করেছেন।
এমনকি তৃণমূল কংগ্রেসের শরিকদের মধ্যেও অনেকেই তৃণমূল কংগ্রেসকে তুলোধুনা করছেন। যেমন কংগ্রেসের পশ্চিমবাংলার প্রধান অধীর রঞ্জন চৌধুরী বলেছেন, ‘বাংলায় দুর্নীতি প্রতিষ্ঠা করেছে তৃণমূল।’ আর ভারতের কমিউনিস্ট পার্টির (মার্কসবাদী) রাজ্য সম্পাদক মহম্মদ সেলিম বলেছেন, ‘মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় ও অভিষেক ব্যানার্জিকে গ্রেপ্তার করা উচিত।’
বোঝাই যাচ্ছে, ঘটনাটি বেশ রাজনৈতিক রঙ পেয়েছে। মামলাটি যে রাজনৈতিক রঙ পাবে, তা আগেই বুঝেছিলেন বেশ কয়েকজন বিচারক। তাই তাঁরা মামলাটি স্পর্শ করতে রাজি হননি। পরে যারা মামলাটি পরিচালনা করতে রাজি হন, তাঁরাও পরস্পরবিরোধী আদেশ দিয়েছিলেন।
শেষ পর্যন্ত কলকাতা হাইকোর্টের বিচারপতি দেবাংশু বসাক ও বিচারপতি মহম্মদ সবির রশিদির ডিভিশন বেঞ্চ যে রায় দিয়েছেন, তা নিঃসন্দেহে উদাহরণ হয়ে থাকবে। তবু কোনও কোনও বিশ্লেষক খোদ আদালতের দিকেই আঙুল তুলছেন। যেমন শিক্ষাবিদ অনুজ ভুওয়ানিয়া বলেন, ‘আদালতগুলোও রাজনৈতিক প্রতিক্রিয়ার খেলোয়াড় হয়ে উঠেছে। একটি বিশেষ রাজনৈতিক পক্ষের সেবা করার ক্ষেত্রে তারা কোনো ভূমিকা রাখতে পারে কি না, তা তাদের ভাবা উচিত।’
অনুজ ভুওয়ানিয়ার এমন অভিযোগ তোলার যৌক্তিক কারণ রয়েছে বৈকি। প্রথম এই মামলার শুনানি যিনি পরিচালনা করেছিলেন, সেই বিচারপতি অভিজিৎ গাঙ্গুলি লোকসভা নির্বাচনে বিজেপির হয়ে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করছেন।
রায় ঘোষণার পরপরই অভিজিৎ গাঙ্গুলী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের পদত্যাগ দাবি করেছেন। তিনি বলেন, ‘যাঁরা যোগ্য প্রার্থী, তাঁদের বঞ্চিত করা হয়েছে। তাঁদের ঠকিয়েছেন এই মিথ্যাচারী মুখ্যমন্ত্রী। বঞ্চিতদের মধ্যে হিন্দু–মুসলমান সবাই আছেন, সবার উচিত মমতাকে বর্জন করা।’
লোকসভা নির্বাচনে মেদিনীপুরের তমলুক থেকে লড়ছেন অভিজিৎ গাঙ্গুলী। বলার অপেক্ষা রাখে না, এই আসনে তাঁর জেতার সম্ভাবনা এখন অনেকটাই বেড়ে গেল।
এখান দেখার বিষয়, নিজেদের কলঙ্কিত মুখ লুকাতে মমতা–সরকার এই নির্বাচনের ডামাডোলের মধ্যেই সুপ্রিম কোর্টের দ্বারস্ত হয় কি না। বিষয়টি যে অত্যন্ত স্পর্শকাতর, তা ভারতীয় গণমাধ্যমগুলোর দিকে নজর রাখলেই বোঝা যায়। পশ্চিমবঙ্গের বাংলা ভাষাভাষি গণমাধ্যমগুলো তো বটেই, দিল্লিভিত্তিক হিন্দি ও ইংরেজি সংবাদমাধ্যমগুলোতেও কলকাতা হাইকোর্টের রায় ও তৃণমূল কংগ্রেসের সীমাহীন দুর্নীতি নিয়ে প্রবল চর্চা শুরু হয়েছে। এই চর্চার ক্ষতিকর দিকগুলো তৃণমূল কংগ্রেস কীভাবে সামাল দেয়, সেটি দেখতেই সবাই এখন আগ্রহভরে তাকিয়ে আছে।
এখানে তিনটি বিষয় স্পষ্ট। এক. তৃণমূল কংগ্রেসের দুর্নীতি। শিক্ষক নিয়োগের দুর্নীতির সঙ্গে তৃণমূল সরকার যে জড়িত, তাতে সন্দেহ করার কোনো সুযোগ নেই। দুই. বিজেপি নিয়ন্ত্রিক গণমাধ্যমগুলোত সেই দুর্নীতির ব্যাপক প্রচার। তিন. কোনও কোনও ক্ষেত্রে ক্ষমতাসীনদের পক্ষে আদালতের পক্ষপাত। এক সঙ্গে ২৫ হাজার শিক্ষককে চাকরিচ্যূত করা এবং তাদের সুদসহ বেতন ফেরত দিতে বলায় আদালতকে প্রশ্নবিদ্ধ করছেন অনেকেই। তাদের ধারণা, নির্বাচনে তৃণমূলকে কোণঠাসা করতেই বিচারকেরা ‘লঘুপাপে গুরুদণ্ড’ দিয়েছেন। তাদের ধারণা আদৌ সঠিক কি না, তা হয়তো তখনই বোঝা যাবে, যখন মামলাটি সুপ্রিম কোর্টে যাবে।
এখন দেখার বিষয়, মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় কি এই রায়ের বিরুদ্ধে সুপ্রিম কোর্টে আপিল করবেন? করলে, কবে? নির্বাচন তো ফুরিয়ে আসছে। ইতিমধ্যে দুই দফা ভোট অনুষ্ঠিত হয়ে গেছে। বাকি আছে আর পাঁচ দফা। শেষ দফা অনুষ্ঠিত হবে ১ জুন।
সুতরাং, যা করার, এরই মধ্যে করতে হবে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়কে।
লেখক: সহ–সম্পাদক, ডিজিটাল বিভাগ, ইনডিপেনডেন্ট টেলিভিশন


টাকা ঢোকে মোদি–মমতার পকেটে, মাশুল জনগণের
ভোটের মাঝেই কংগ্রেসে বড় ধাক্কা, পদত্যাগ করলেন দিল্লি প্রধান 
