যে ম্যাচ কেউ খেলতে চায় না, সে ম্যাচেই হলো ১০টি গোল। এবারের বিশ্বকাপটা এমনই। প্রতিটি ম্যাচেই থাকছে কিছু না কিছু চমক। গতকাল রাতে রুদ্ধশ্বাস এক ম্যাচে ফ্রান্সকে ৬-৪ গোলে হারিয়ে সান্ত্বনা পুরস্কার হিসেবে তৃতীয় স্থান নিশ্চিত করেছে ইংল্যান্ড। আপাতদৃষ্টিতে ফ্রান্স-ইংল্যান্ড ম্যাচের গুরুত্ব কেবলই তৃতীয় হওয়ার লড়াই হলেও গোল্ডেন বুটের সমীকরণটাও পালটে দিয়েছে এই ম্যাচ। কীভাবে, চলুন জেনে নেওয়া যাক।
গোল্ডেন বুটের দৌড়ে মেসিকে ছাড়িয়ে শীর্ষে এমবাপ্পে
ফ্রান্স-ইংল্যান্ড ম্যাচের আগ পর্যন্ত গোল্ডেন বুটের দৌড়ে ৮টি গোল আর ৪টি অ্যাসিস্ট নিয়ে শীর্ষেই ছিলেন লিওনেল মেসি। কিন্তু গতকালের ম্যাচে ফ্রান্সের কিলিয়ান এমবাপ্পে ২টি গোল করে মেসিকে টপকে আবারও শীর্ষে উঠে এসেছেন। ২০২২ কাতার বিশ্বকাপের গোল্ডেন বুট বিজয়ী এমবাপ্পে এবারের টুর্নামেন্ট শেষ করলেন ১০টি গোল আর ৪টি অ্যাসিস্ট নিয়ে।
বিশ্বকাপের ইতিহাসে কোনো এক আসরে ১০ বা তার চেয়ে বেশি গোল করার দৃষ্টান্ত আছে আর মাত্র তিনটি। ১৯৫৮ বিশ্বকাপে ফরাসি স্ট্রাইকার জাঁ ফন্টেইন মাত্র ৬ ম্যাচে করেছিলেন ১৩টি গোল। তার চার বছর আগে ১৯৫৪ বিশ্বকাপে হাঙ্গেরির স্যান্ডর ককসিস ১১টি গোল করেছিলেন। এছাড়া ১৯৭০ সালের বিশ্বকাপে পশ্চিম জার্মানির জার্ড মুলারও ১০টি গোল করেছিলেন।
গতকাল রাতে ইংল্যান্ডের বিপক্ষে জোড়া গোল করে এবারের টুর্নামেন্টে নিজের গোলসংখ্যা ১০-এ উন্নীত করার মাধ্যমে ফ্রান্সের কিলিয়ান এমবাপ্পে আরও একটি রেকর্ড আপাতত নিজের করে নিয়েছেন। বিশ্বকাপের ইতিহাসে ২২ গোল নিয়ে এই মুহুর্তে সর্বোচ্চ গোল এমবাপ্পের, যেখানে মেসির গোল ২১টি।
মেসি কি পারবেন গোল্ডেন বুট জিততে?
বিশ্বকাপের ইতিহাসে রেকর্ড ২ বার গোল্ডেন বল জয় করেছেন লিওনেল মেসি। কাতারে বিশ্বকাপ ট্রফিটাও স্পর্শ করেছেন তিনি। কিন্তু একবারও গোল্ডেন বুটের দেখা পাননি। প্রশ্ন হচ্ছে, নিজের ষষ্ঠ এবং সম্ভবত শেষ বিশ্বকাপে মেসি কি পারবেন গোল্ডেন বুট জয় করতে?
এক্ষেত্রে সমীকরণটা জটিল কিছু নয়। এমবাপ্পেকে ছাড়িয়ে যেতে হলে ফাইনালে স্পেনের বিপক্ষে অন্তত ৩টি গোল করতে হবে মেসিকে। তবে ২টি গোল আর অন্তত ১টি অ্যাসিস্ট দিয়েও গোল্ডেন বুটটা নিজের করে নিতে পারেন ৩৯ বছর বয়সী এই আর্জেন্টাইন সুপারস্টার।
গোল্ডেন বুটের বিজয়ী নির্ধারণের ক্ষেত্রে গোলসংখ্যা যদি সমান হয় তবে দেখা হবে কার অ্যাসিস্ট বেশি। গোল আর অ্যাসিস্ট দুটোই যদি সমান হয়, সেক্ষেত্রে কে কম সময় মাঠে ছিলেন সেটা বিবেচনায় আনা হবে।
১০ গোল আর ৪ অ্যাসিস্ট নিয়ে আপাতত এমবাপ্পেই তালিকার শীর্ষে আছেন। অন্যদিকে, ৮ গোল আর ৪ অ্যাসিস্ট নিয়ে দ্বিতীয় অবস্থানে মেসি। মিনিটের হিসেবে মেসি এখন পর্যন্ত ৫৭ মিনিট কম খেলেছেন এমবাপ্পের চেয়ে। তবে ফাইনালে মেসি ৯০ মিনিট খেললে সেখানেও এমবাপ্পেই এগিয়ে থাকবেন।
ফলে গোল্ডেন বুট জয়ের জন্য ফাইনালে মেসিকে হয় হ্যাটট্রিক করতে হবে, অথবা অন্তত ২টি গোল ও ১টি অ্যাসিস্ট দিতে হবে।
আরেকটি গোল্ডেন বল কি তবে নিশ্চিত মেসির?
টুর্নামেন্টের সেরা খেলোয়াড় হিসেবে ২০১৪ ও ২০২২ বিশ্বকাপে গোল্ডেন বল জয় করেছেন আর্জেন্টাইন অধিনায়ক। এবার আরও একটি গোল্ডেন বল জেতার সুযোগ তাঁর সামনে। প্রশ্ন হচ্ছে, ফাইনালে আর্জেন্টিনা যদি স্পেনের কাছে হেরে যায় এবং মেসি নিজে কোনো গোল বা অ্যাসিস্ট না পান, সেক্ষেত্রে গোল্ডেন বলটা কি তিনি পাবেন?
গোল্ডেন বল বিজয়ী নির্ধারণের ক্ষেত্রে কেবলমাত্র গোল আর অ্যাসিস্টের গাণিতিক হিসাব দেখা হয় না। এটি নির্ধারিত হয় ফিফার একটি বিশেষজ্ঞ প্যানেল এবং সাংবাদিকদের ভোটের মাধ্যমে। এক্ষেত্রে ফিফার টেকনিক্যাল স্টাডি গ্রুপ টুর্নামেন্টের সেরা খেলোয়াড়দের একটি সংক্ষিপ্ত তালিকা প্রকাশ করে এবং সেখান থেকে আন্তর্জাতিক গণমাধ্যমের প্রতিনিধি ও সাংবাদিকদের ভোটে একজনকে গোল্ডেন বল বিজয়ী নির্ধারণ করা হয়।
এক্ষেত্রে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, ভোটদানের এই প্রক্রিয়াটি শেষ হয় বিশ্বকাপের ফাইনাল ম্যাচের আগেই। ফলে, ফাইনালে মেসির পারফরম্যান্সের ওপর তাঁর গোল্ডেন বল জয় নির্ভর করছে না। এখন পর্যন্ত গোল্ডেন বলের দৌড়ে লিওনেল মেসিই শীর্ষে আছেন।
গোল-অ্যাসিস্ট মিলিয়ে এমবাপ্পে এগিয়ে থাকলেও দলের সার্বিক পারফরম্যান্স ও সাফল্যে প্রভাব রাখার দিক থেকে অনেকটাই এগিয়ে আছেন মেসি। এছাড়া ইংল্যান্ডের হ্যারি কেইন ও জুড বেলিংহাম এবং নরওয়ের আরলিং হালান্ডও আছেন এ তালিকায়।
সার্বিকভাবে বললে, বিশ্বকাপে আরও একবার সেরা খেলোয়াড় হিসেবে লিওনেল মেসির গোল্ডেন বল জয় প্রায় নিশ্চিত। তবে মেসির প্রথম গোল্ডেন বুট জয়ের কাজটা বেশ কঠিন করে তুলেছেন কিলিয়ান এমবাপ্পে। কিন্তু এবারের আসরে যে ফর্মে তিনি আছেন, তাতে ফাইনালে এমবাপ্পেকে টপকে যাওয়া অসম্ভব নয় এলএমটেনের জন্য।



