চলে গেলেন 'আরশী নগরের' সাধিকা–ফরিদা পারভীন

আপডেট : ১৪ সেপ্টেম্বর ২০২৫, ০৬:০০ পিএম

‘বাড়ির কাছে আরশী নগর, আমি একদিনও না দেখিলাম তারে’–এই পঙ্‌ক্তিটি যখন ফরিদা পারভীনের কণ্ঠে ধ্বনিত হতো, তখন সেটা শুধু সুর নয়, ছিল আত্মার এক নিঃশব্দ আকুলতা। লালনের সহজিয়া দর্শনকে হৃদয়ে ধারণ করে যিনি সারা জীবন গেয়েছেন বাউলের গান, যিনি সংগীতকে ধর্ম কিংবা আনুষ্ঠানিকতার বাইরে নিয়ে গিয়েছেন চেতনার গভীরে, সেই অনন্য সাধিকা আজ আর নেই। বাংলা লোকসংগীতের এক নক্ষত্রের পতন ঘটল ২০২৫ সালের ১৩ সেপ্টেম্বর রাত ১০.২৫টায়। শরতের বাতাসে মিলিয়ে গেল এক কিংবদন্তি কণ্ঠ, যাঁর প্রতিটি গানে ছিল দর্শনের ব্যঞ্জনা, অন্তরের ধ্বনি।

শিল্পী ফরিদা পারভীন যে কেবল গেয়েছেন তা-ই নয়–তিনি নিজেই হয়ে উঠেছিলেন গান। গানের ভেতরে বাস করতেন, দর্শনের ভেতরে লুকিয়ে রাখতেন আত্মার আত্মীয়তা। আর সেই আত্মার সাধনাই থেমে গেছে এক অনির্বচনীয় নীরবতায়। তিনি শুধু একজন সংগীতশিল্পী ছিলেন না, ছিলেন বাংলার লোক-সংগীতের আত্মা, ছিলেন এক নিভৃত শক্তি, যাঁর কণ্ঠে জীবন্ত হতো লালনের ভাব, বাংলার মাটি, মানুষের প্রাণ।

ফরিদা পারভীনের সংগীতচর্চা কেবল পেশাগত কর্ম ছিল না, ছিল এক নিরবিচ্ছিন্ন সাধনার ধারা। তিনি নিজেকে কখনো কেবল ‘গায়িকা’ বলে পরিচয় দিতেন না, বরং সংগীতকে তিনি দেখতেন জীবনদর্শনের বাহক হিসেবে। এ কারণেই তাঁর কণ্ঠে ‘খাঁচার ভেতর অচিন পাখি’ গানটি যেন হয়ে উঠত বোধের প্রকাশ, আত্মার এক অশ্রুত কান্না। তাঁর কণ্ঠে লালনের গান হারিয়ে ফেলত বাইরের ঝাঁ-চকচকে সাজ, আর খুঁজে পেত তার আদিম, সহজিয়া সত্তা।

শিশু বয়সেই সংগীতের প্রতি তাঁর ভালোবাসার বহিঃপ্রকাশ ঘটে। নাটোরে জন্ম, তবে বেড়ে ওঠা কুষ্টিয়ায়–যেখানে মাটির গভীরে মিশে আছে লালনের নিঃশব্দ প্রভাব। ছেলেবেলা থেকেই নজরুলগীতি, রবীন্দ্রসংগীত, লোকগান–সব শাখায় দখল ছিল তাঁর। কিন্তু পরিণত বয়সে এসে তিনি যখন লালন ফকিরের গানে নিজেকে বিলিয়ে দিলেন, তখন তা ছিল আত্মবোধের এক নিঃশব্দ বিপ্লব। এই রূপান্তরের পেছনে ছিল তাঁর গুরু মাদানী মওলা বক্স‑এর প্রজ্ঞাময় দীক্ষা, যিনি তাঁকে কেবল গান শেখাননি, লালনের অন্তর্নিহিত দর্শনের পথেও উৎসাহ দিয়েছেন। সেই সঙ্গে সংগীতচর্চায় পাশে ছিলেন ওস্তাদ ওমরান খান, আবদুল কাদিরের মতো গুণীজনেরা, যাঁদের পরিশ্রম ও আদর্শ ফরিদা পারভীনকে গড়ে তুলতে সাহায্য করেছে এক অনন্য শিল্পীসত্তায়।

বাংলাদেশ বেতার রাজশাহী কেন্দ্র থেকে তাঁর গান প্রচার শুরু হয় ১৯৭৩ সালে। প্রথমদিকে আধুনিক গান, নজরুলগীতি ও অন্যান্য শাস্ত্রীয় রীতিতে চর্চা করলেও দ্রুতই তিনি আত্মস্থ করেন লালনের বাউলভাব। এই বোধ কেবল কণ্ঠস্বরের সৌন্দর্য ছিল না, ছিল আত্মিক সত্যে উপনীত হওয়ার পথ। তাঁর গাওয়া ‘নিন্দা করিলে মন্দ হবি রে মন’ গানটি ছিল আশির দশকে যেন এক ধ্বনিত প্রতিবাদ–ভণ্ড সাধুর মুখোশ উন্মোচনের এক দার্শনিক আহ্বান। এর পরপরই জনপ্রিয়তা পায় ‘মিলন হবে কত দিনে’, ‘পাপী তোর পরশে রে’, ‘তোমরা কুপমণ্ডূক’–যেগুলোতে শুধু লালনের কথা নয়, ছিল ফরিদা পারভীনের কণ্ঠস্বরের গভীর আবেদন ও স্বভাবজাত সত্য-অন্বেষা।

এই গায়িকা নিজেকে কখনোই প্রচারের কেন্দ্রে আনেননি। যশ কিংবা নামের মোহ তাঁকে গ্রাস করেনি। বরং তিনি নিজেকে স্থাপন করেছিলেন স্রোতের এক বিপরীত ধারায়–যেখানে শিল্পী বিত্ত নয় বরং আত্মশুদ্ধির এক অনুসারী। বাংলাদেশের সাংস্কৃতিক পরিসরে এমন শিল্পী দুর্লভ, যিনি একই সঙ্গে রাষ্ট্রীয় ও আন্তর্জাতিক পরিসরে সমানভাবে গৌরবজনক উপস্থিতি রেখেছেন, অথচ কখনো উচ্চকণ্ঠ হননি নিজের প্রশংসায়।

ফরিদা পারভীন গেয়েছেন যুক্তরাষ্ট্র, যুক্তরাজ্য, জাপান, ফ্রান্স, জার্মানি, ভারতসহ বহু দেশের মঞ্চে। তাঁর গানে বাংলার লোকজ আত্মা যখন ধ্বনিত হতো বিদেশের মাটিতে, তখন শ্রোতা বুঝত–সংগীত ভাষার সীমা মানে না। তিনি ছিলেন লালনের আন্তর্জাতিক দূত, বাংলার লোকদর্শনের প্রাণবান ব্যাখ্যাকার।

ফরিদা পারভীন। ছবি: সংগৃহীততাঁর অনন্য অবদানের স্বীকৃতি হিসেবে তিনি অর্জন করেন একুশে পদক (১৯৮৭), জাতীয় চলচ্চিত্র পুরস্কার (২০১৪), বাংলা একাডেমির সম্মাননা, শিল্পকলা একাডেমির পদকসহ বহু পুরস্কার ও সম্মান। তবে এসব পদক তাঁর কাছে দায়িত্বের চিহ্ন হিসেবে বিবেচিত হতো। সুনামের মোহে তিনি নিজেকে হারাননি, বরং আরও নিভৃত হয়ে গিয়েছেন সংগীতের গহীন ভেতরে।

জীবনের অন্তিম বছরগুলোতে তিনি থেকেছেন অনেকটা আড়ালে–শারীরিক অসুস্থতা, বয়সের ভার, সংগীতের নীরব নির্জনতা তাঁকে করে তুলেছিল আরও গভীর। কিন্তু তাঁর কণ্ঠের গান থেকে যায় ইউটিউব, মঞ্চ, শ্রোতার হৃদয়ে। সেখানেই আজও তিনি বেঁচে আছেন, জেগে আছেন। তাঁর প্রয়াণ শুধু নিরীহ শোক নয়, বরং এক সাংস্কৃতিক শূন্যতা–যা সহজে পূরণ হবার নয়।

আমরা কতটা বুঝে উঠেছিলাম এই মানুষটিকে? যাঁর কণ্ঠে বাংলার লোকসংগীত পেয়েছিল প্রাণ, যাঁর সুরে আত্মিক মুক্তি খুঁজে পেত শ্রোতার অন্তর? আজ তাঁর চলে যাবার দিনে ফের প্রশ্ন আসে–আমরা কি চিনতে পেরেছিলাম ফরিদা পারভীনকে? নাকি ‘আরশী নগর’ আমাদের চোখের সামনে থেকেও হারিয়ে গিয়েছে আমাদের অচিন ভ্রমে?

ফরিদা পারভীন নেই। কিন্তু তিনি আমাদের ছেড়ে যাননি। তাঁর কণ্ঠ, তাঁর গান, তাঁর সুরের গহনে যে জীবন, যে দর্শন–তা রয়ে যাবে অনন্তকাল। বাংলার প্রকৃতি, মানুষ, দর্শন এবং সংগীতের মধ্যে গড়ে উঠবে সেই ‘নৈসর্গিক’ সম্পর্ক, যার প্রতীক হয়ে থাকবেন এই সাধক নারী। তিনি হয়তো বলতেন–‘মানুষ ভজলে সোনার মানুষ হবি...’–আর আমরা জানি, তিনি নিজেই ছিলেন সেই সোনার মানুষ, যিনি গানে, ধ্যানে আর আত্মিক অভিসারে রচনা করেছেন এক অন্যরকম বাংলার প্রতিচ্ছবি।

ভিডিও দেখুন:তাঁর প্রয়াণ আমাদের মনে করিয়ে দেয়, আমরা কত সহজে হারিয়ে ফেলি আমাদের জীবন্ত ঐতিহ্যকে। তিনি ছিলেন সেই আরশী নগরের বাসিন্দা, যাঁকে আমরা চোখের সামনে পেয়েও পুরোপুরি চিনতে পারিনি। তাঁর গান ছিল বাউলচেতনার ব্যাকরণ, মানবতাবাদের প্রতিধ্বনি। আজ তিনি নেই, কিন্তু তাঁর গাওয়া প্রতিটি গান, প্রতিটি সুর, তাঁর কণ্ঠে ধারণ করা দর্শন আমাদের ভেতরে রয়ে যাবে, ঠিক সেই জায়গায়–যেখানে সুর মিশে যায় আত্মার ধ্বনিতে।

লেখক: ডেপুটি রেজিস্ট্রার, বরিশাল বিশ্ববিদ্যালয়

[এই মতামত লেখকের নিজস্ব। এর সঙ্গে ইনডিপেনডেন্ট টেলিভিশনের প্রাতিষ্ঠানিক সম্পাদকীয় নীতিমালার কোনো সম্পর্ক নেই।]

তিনবার প্রধানমন্ত্রী। কখনও নির্বাচনে পরাজিত নন। দেশের প্রথম নারী সরকারপ্রধান। কিন্তু এই পরিচয়গুলোও তাঁর রাজনৈতিক জীবনের পূর্ণতা প্রকাশ করে না। খালেদা জিয়া ছিলেন মূলত এক নীতির নাম, আপসহীনতার রাজনীতি।
আমি একজন মধ্যমমানের ছাত্রী ছিলাম, যার কারণে স্যারকে নিয়ে আমার পড়াশোনা সংক্রান্ত স্মৃতি নেই, বলা যায়। আমি এবং আমার মতো অনেকেই এসএমআই (সৈয়দ মনজুরুল ইসলাম) স্যারকে পেয়েছি কখনও বাবার মতো, কখনও বড় ভাই...
আমরা প্রায়ই দুটি শব্দ শুনি–‘নির্মোহ’ এবং ‘সততা’। কিন্তু বাস্তব জীবনে কতজন মানুষকে আমরা সত্যিই নির্মোহ ও পরিশুদ্ধ রূপে দেখতে পাই? কথায় নয়, জীবনের প্রতিটি পদক্ষেপে সততা বজায় রাখেন–এমন মানুষ কি...
সাম্প্রতিক সময়ে সাংবাদিক বিভুরঞ্জন সরকারের মৃত্যুকে ঘিরে যে আলোচনার ঝড় উঠেছে, সেটি আমাদের সামনে সেই প্রশ্নকেই ফের উসকে দিয়েছে। তিনি একটি ‘খোলা চিঠি’ লিখে গিয়েছেন। কিন্তু তাঁর মৃত্যু আত্মহত্যা, নাকি...
বিশ্বকাপের তৃতীয় স্থান নির্ধারণী ম্যাচে ইংল্যান্ডের মুখোমুখি হওয়ার আগে ফ্রান্স কোচ দিদিয়ের দেশম স্পষ্ট জানিয়ে দিয়েছেন, এই ম্যাচ খেলতে তাদের তেমন কোনো আগ্রহ নেই। তবে জাতীয় দলের দায়িত্বের...
গত বছরের ২৭ মে তালিকাভুক্ত শীর্ষ সন্ত্রাসী সুব্রত বাইনকে গ্রেপ্তার করে সেনাবাহিনী। আরও গ্রেপ্তার হয় তার ঘনিষ্ঠ সহযোগী মোল্লা মাসুদ, শ্যুটার আরাফাত ও শরীফ। ২৪ এর ৫ আগস্টের পর একের পর এক হত্যাকাণ্ডে...
আগামী পাঁচ বছরের মধ্যে দেশের প্রতিটি ইউনিয়নে একটি করে খেলার মাঠ এবং পর্যায়ক্রমে সারা দেশে আন্তর্জাতিক মানের ১০টি স্পোর্টস ভিলেজ নির্মাণ করা হবে বলে জানিয়েছেন যুব ও ক্রীড়া মন্ত্রণালয়ের প্রতিমন্ত্রী...
সংবাদ সম্মেলনে মেজর ফারহান মাহমুদ মোক্তাদা জানান, চক্রটি সরকারের উচ্চপদস্থ কর্মকর্তাদের নাম-ছবি ব্যবহার করে অবৈধ সুবিধা আদায়ের অপচেষ্টা চালাচ্ছিল। গ্রেপ্তারকৃতের কাছ থেকে ১টি মাইক্রোবাস, ৭টি মোবাইল...
লোডিং...
পঠিতনির্বাচিত

এলাকার খবর