ঢেড়া পিটিয়ে গোটা রাজ্যে জানান দেওয়া হচ্ছে—রাজানুগ্রহ হিসেবে রাজ্যের লোকেদের জন্য কী থাকছে, কিংবা রাজ বিদ্রোহের শাস্তি হিসেবে কী নয়া‑বিধান এলো? রাজশাসনের সময়কার পরিচিত দৃশ্য এটি, যার দেখা মিলবে সে সময়কার পটভূমিতে নির্মিত যেকোনো সিনেমায়। মোটাদাগে হালের একচেটিয়া শাসকেরাও এই একই নীতি অনুসরণ করেন। যদিও দীর্ঘ যাত্রায় ক্ষমতা ও শাসনকাঠামোয় বিস্তর সংস্কার হওয়ায় চক্ষুলজ্জায় হোক, কিংবা পারিপার্শ্বিক চাপ সামলাতেই হোক, হুবহু এই ধারা অনুসরণ করা হয় না। তবে পুরস্কার ও চোখ রাঙানিই থাকে সর্বরোগহরা (পড়ুন সর্ববিরোধহরা) এক নিদারুণ অনুপান হিসেবে।
এখানে মনে রাখা জরুরি যে, মধ্যপ্রাচ্যের যেসব দেশে এখনো রাজ‑শাসন রয়েছে কিংবা যেসব দেশ মোটাদাগে একনায়ক শাসিত দেশ হিসেবেই পরিচিত, সেসব দেশ এখানে সেভাবে বিবেচ্য নয়। মূলত গণতন্ত্রের ছদ্মাবরণে একচেটিয়া শাসন চলছে, বা চলার পথে রয়েছে–এমন দেশগুলোই এখানে আলোচনায় আসছে।
গণতন্ত্রের ছদ্মাবরণে একচেটিয়া শাসন চলছে বা চলার পথে রয়েছে–এমন দেশের সংখ্যা গোটা বিশ্বে এখন অনেক। আরও ভালো করে বলতে গেলে গোটা বিশ্বে গণতন্ত্র ধারণাটি এখন কোমায় আছে বলতে হবে। দীর্ঘ আলাপে যারা এমন শাসনব্যবস্থার দেশের সংখ্যাটি ভুলে গেছেন, তাঁদের জন্য আবারও কিছু তথ্য সংক্ষেপে তুলে ধরা হলো।
ফ্রিডম হাউসের ২০২৩ সালের প্রতিবেদন অনুযায়ী, বিশ্বের মোট জনসংখ্যার ৭১ শতাংশই বর্তমানে একনায়ক বা একচেটিয়া শাসনের অধীনে রয়েছে। এর মধ্যে সবচেয়ে বাজে পরিস্থিতি আফ্রিকায়। অঞ্চলটির ১৪০ কোটি অধিবাসীর ৮৩ শতাংশই হয় রুদ্ধ (একনায়ক) কিংবা আংশিক মুক্ত (একচেটিয়া) শাসনের অধীনে রয়েছে। আমেরিকা মহাদেশের ৩৫টি দেশের ১০০ কোটি মানুষের মধ্যে ৩৪ শাতংশই একচেটিয়া শাসনের অধীনে বাস করছে। ৪৩০ কোটি অধিবাসীর এশিয়া‑প্যাসিফিকে এ হার ৫৬ শতাংশ। আর ইউরেশিয়া অঞ্চলের প্রায় ৩০ কোটি জনতার সবাই এ ধরনের শাসনের অধীনে দিন গুজরান করছে। এমনকি মুক্ত সমাজ হিসেবে সুখ্যাতি থাকা ইউরোপের ৬৩ কোটি জনতার ১৯ শতাংশকেও বজ্র আঁটুনির শাসনকেই মেনে নিতে হচ্ছে।
এখানে বলে রাখা ভালো–ফ্রিডম হাউস, ইকোনমিস্ট ইনটেলিজেন্স ইউনিটসহ আর যারা যারা গণতন্ত্রের সূচক প্রকাশ করে, তারা ‘ভালো’, ‘মন্দ’ অভিধার পাশাপাশি ‘আংশিক মুক্ত’, ‘আধাগণতান্ত্রিক’, ‘প্রায় স্বৈরাচারী’ ইত্যাদি অভিধাও প্রয়োগ করে। বলার অপেক্ষা রাখে না যে, ‘ভালো’ ও ‘মন্দ’ ক্যাটাগরিতে দেশের সংখ্যা থাকে তুলনামূলক কম। বিপরীতে মাঝামাঝি থাকা দেশের সংখ্যাই থাকে বেশি। এর মধ্যে ‘মন্দ’ অভিধা পাওয়া দেশগুলো নিঃসন্দেহে একনায়কতন্ত্রের অধীনে। বাকি থাকে বিচিত্র অভিধা পাওয়া, কিন্তু আদতে শঙ্কর গণতন্ত্রের দেশগুলো। এই বর্গে থাকা দেশগুলোকেই গবেষকেরা বলছেন, একচেটিয়া শাসনের উদাহরণ।
আগেই বলা হয়েছে, এই ক্ষমতার একচেটিয়াকরণ করা হয় সুকৌশলে। পুরস্কার ও শাস্তির এক দারুণ সমন্বয়ের মাধ্যমে পুরো প্রক্রিয়াটি সাধন করা হয়। এ কাজে প্রচার এক বড় ভূমিকা পালন করে। এ ক্ষেত্রে প্রেক্ষাপট ও ইতিহাস বিবেচনায় একেক দেশের শাসকেরা একেক বিষয়কে পাখির চোখ করে প্রচার চালায়। একটা যুদ্ধংদেহী বিষয় এসব প্রচারের কেন্দ্রে পরোক্ষে হলেও থাকে।
একচেটিয়া শাসকদের যুদ্ধংদেহী না হলে অবশ্য চলে না। কারণ, যুদ্ধ না থাকলে তো সেনাপতির ক্যারিশমার প্রয়োজন পড়ে না। ফলে একটা বিভাজনের রেখা টানা হয়, যেখানে পক্ষ ও বিপক্ষ পরিষ্কার করে দেওয়া হয়। পক্ষ‑বিপক্ষ নির্ধারণের পরই আসে মূল লড়াই। এ লড়াই কখনো চলে জাতীয় গৌরব পুনরুদ্ধারের নামে, কখনো চলে উন্নয়নের নামে, কখনো চলে কথিত ‘শত্রু’ খতম করার নামে, এমনকি কখনো কখনো দুর্নীতিবিরোধী বা মাদকবিরোধী অভিযানের নামে। যে নামেই লড়াইটি চালানো হোক না কেন, বিরোধী রজনৈতিক শক্তি ও তাদের সমর্থকগোষ্ঠীই থাকে বরাবর শত্রু শিবিরে। বারবার করে বলা হয়, ‘ওরা এলেই কিন্তু দেশ রসাতলে যাবে।’ যেহেতু শঙ্কর গণতন্ত্রের দেশগুলোতে আসা শাসকেরা সাধারণত লোকরঞ্জনবাদের হাত ধরে ক্ষমতায় আসে এবং এই মতবাদী পন্থাতেই নিজেদের ক্ষমতাকে একচেটিয়া করে নেয়, সেহেতু এক ধরনের বিকল্পহীনতার ভাঙা রেকর্ড বাজিয়ে বারবার নিজের অনুপস্থিতি সম্পর্কে ‘দেশ রসাতলে’ যাওয়ার সতর্কবার্তা দেওয়া হয়।
আগ্রহীরা এমন প্রচারের উদাহরণ হিসেবে সাবেক মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প প্রশাসনের ‘মেক আমেরিকা গ্রেট অ্যাগেইন’, চীনের প্রেসিডেন্ট শি জিনপিংয়ের উচ্চাভিলাষী বৈশ্বিক প্রকল্প, রুশ প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিনের ‘সোভিয়েত’ বলয় পুনরুদ্ধারের প্রতিশ্রুতি, তুরস্কের প্রেসিডেন্ট রিসেপ তাইয়েপ এরদোয়ানের ‘খেলাফত’ পুনরুদ্ধার কিংবা ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির হিন্দুত্ববাদী রাজনীতি কিংবা পাকিস্তান ও মুসলমানভীতির পুনঃ পুনঃপ্রচারের কথা উল্লেখ করা যেতে পারে। আর বাংলাদেশের উদাহরণ তো সামনেই আছে।
মোদ্দা কথা, এ ধরনের শাসকেরা হয় কোনো একটি ভীতিকে জনগণের সামনে রাখেন, নয়তো কোনো স্বর্ণযুগের প্রত্যাবর্তনের প্রতিশ্রুতির প্রচার করেন। এ ক্ষেত্রে সীমান্ত বিরোধ থাকা এবং জাতীয় ইতিহাসে কোনো ক্ষত থাকা দেশগুলোর একচেটিয়া শাসকেরা কয়েকগুণ বেশি সুবিধা পান। খেয়াল করলে দেখা যাবে ডোনাল্ড ট্রাম্প যখন মেক্সিকো কার্ড খেলছেন, তখন নরেন্দ্র মোদি খেলছেন পাকিস্তান ও চীনের সঙ্গে থাকা ভারতের সীমান্ত বিরোধের কার্ড। এমনকি চীনের তরফ থেকেও সীমান্ত কার্ড খেলা হচ্ছে প্রতিনিয়ত।
এই হলো একচেটিয়াকরণের প্রক্রিয়া। এই প্রক্রিয়ায় পুরো রাষ্ট্রযন্ত্রকেই ব্যবহার করে একচেটিয়া শাসকেরা, যেখানে বিরোধীদের দমনই মূল লক্ষ্য থাকে। কিন্তু শুধু দমন করলেই তো হবে না। চাই নিজের প্রচারও। আর এই প্রচারও কিন্তু বিশেষ বৈশিষ্ট্যমণ্ডিত। একটু খেয়াল করলেই দেখা যাবে, এই একচেটিয়া শাসকেরা নিজ শাসনব্যবস্থার প্রচারটি চালায় অনেকটা করপোরেট প্রতিষ্ঠানের ব্র্যান্ড অ্যাম্বাসেডরের ভঙ্গিতে। সেটা কী রকম?
বড় প্রতিষ্ঠানগুলো সাধারণত পণ্যদূত হিসেবে কয়েক বছরের জন্য বড় তারকাদের সাথে চুক্তি করে, যাদের বলা হয় ব্র্যান্ড অ্যাম্বাসেডর। এই তারকারা চুক্তির মেয়াদ থাকা সময়ে শুধু সেই পণ্যের প্রচারে নিযুক্ত থাকেন। ফলে তারকা ও পণ্য মিলেমিশে একাকার হয়ে যায়। ঠিক এই তরিকাতেই নিজেদের প্রচারের কাজটি করেন একচেটিয়া শাসকেরা।
ভারতের সর্বশেষ লোকসভা নির্বাচনের দিকে তাকালেই বিষয়টি পরিষ্কার হবে। দেশটির প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি। তিনি তাঁর দল ভারতীয় জনতা পার্টির (বিজেপি) হয়ে লড়ছেন। কিন্তু আসলেই কি তাই? প্রচার দেখলে মনে হতেই পারে যে, মোদির জন্যই পুরো দল লড়ছে। নির্বাচনী প্রচারে বিজেপির স্লোগান–‘মোদি কি গ্যারান্টি’। ফলে এটা স্পষ্ট যে, দল বা অন্য কেউ এখানে কিছু নয়। একক ব্যক্তিই প্রধান ও একমাত্র। তিনিই ব্র্যান্ড অ্যাম্বাসেডর। এ ক্ষেত্রে আবারও বাংলাদেশের উদাহরণকে স্মরণের অনুরোধ জানাই।
ঠিক একই তরিকা দেখা গিয়েছিল এবং এখনো যাচ্ছে ডোনাল্ড ট্রাম্পের ক্ষেত্রে। ভ্লাদিমির পুতিন, কিংবা শি জিনপিংয়ের কথা না বললেও চলে। এরদোয়ান এখনো একই রাস্তায় হাঁটছেন। কিংবা বলা যেতে পারে ইসরায়েলের প্রধানমন্ত্রী বেনইয়ামিন নেতানিয়াহুর কথাও।
এ ধরনের শাসকেরা ব্যক্তি ব্র্যান্ডকেই সামনে হাজির করেন বারবার। রাষ্ট্রীয় কোনো দুর্যোগে রাষ্ট্রীয় দায়িত্ব পালনকেও ব্যক্তিগত কার্যক্রম হিসেবে তাঁরা উপস্থাপন করেন, যেন তিনিই এই ত্রাণ বা সহায়তা দিচ্ছেন। দেশের উন্নয়ন হোক বা অন্য কোনো অপরাধ দমন বা দেশীয় বা পররাষ্ট্রীয় কোনো নীতি বা অর্জন, তাও ওই বিশেষ নেতার বা শাসকের ব্যক্তিগত অর্জন হিসেবে প্রচার চালানো হয়। অর্থাৎ, ইতিবাচক মাত্রই একচেটিয়া শাসকের ব্যক্তিগত নৈপুণ্য বা ক্যারিশমা, আর নেতিবাচক মানেই হলো বিরোধী কারও ষড়যন্ত্র–এই বাইনারি চালেই চলেন একচেটিয়া শাসকেরা। ঠিক করপোরেট ব্যবসা প্রতিষ্ঠানগুলো যেভাবে বাজার নিয়ন্ত্রণে যাবতীয় নীতি‑নৈতিকতাকে পায় দলে, ঠিক সেভাবেই একচেটিয়া শাসকেরা চলেন। তাঁরা পুরো রাষ্ট্র ও রাষ্ট্রযন্ত্রকে একটি পণ্য ছাড়া আর কিছু মনে করেন না, যার একমাত্র ব্র্যান্ড অ্যাম্বাসেডর তিনি নিজে।
এমন প্রচারের ফল হয় ভয়াবহ। দীর্ঘদিন এমন প্রচারে থাকা জনগণও এমনকি তার অবচেতনে এটা মেনে নেয় বা স্বীকার করে ফেলে যে, যাবতীয় অর্জন আদতে ওই নির্দিষ্ট ব্যক্তির বা ক্ষমতাসীনদের। ফলে তার বিদ্রোহের লক্ষ্যবস্তু হয়ে ওঠে সেই সব বহুল প্রচারিত অর্জনগুলো। সে ভুলে যায়, এই সবই আসলে তার করের টাকায় করা। এসবের মালিক আসলে সে নিজে। ফলে একচেটিয়া শাসকদের বিরুদ্ধে বিদ্রোহের সময় এসব অর্জনকে, তা যত গুরুত্বপূর্ণই হোক না কেন, তাকে ভূলণ্ঠিত হতে দেখা যায়। বাংলাদেশে যেমনটা দেখা গেল গণভবন, সংসদ ভবন, বাংলাদেশ টেলিভিশন, মেট্রোরেল, এলিভেটেড এক্সপ্রেসওয়ে, ধানমন্ডি ৩২ নম্বরের ঐতিহাসিক বাড়িসহ গুরুত্বপূর্ণ ভাস্কর্য ও স্থাপনার আক্রান্ত হওয়ার মাধ্যমে। ক্ষোভ ও ক্রোধে উন্মত্ত জনতা ভুলেই গেল সে আসলে তার সম্পদই নষ্ট করছে। গদিনসীনদের আক্রমণের নামে সে নিজেকে, নিজের ইতিহাস, সংস্কৃতিসহ যাবতীয় অর্জনকে আক্রমণ ও ধ্বংস করে বসল, যা আবার তাকেই নিজের টাকায় নির্মাণ করতে হবে। এই পুরো ঘটনাটি ঘটল শুধু একচেটিয়া শাসনের একতরফা প্রচারের কারণে।
কেন এমন প্রচার চালানো হয়? কারণ, খুব সহজ। এ ধরনের প্রচারে অর্জন মাত্রই ব্যক্তিবিশেষের ক্যারিশমা হিসেবে সাব্যস্ত হলে এই অর্জন যে জনগণের সামষ্টিক, তা আড়াল করা যায়। পাশাপাশি জনগণের করের টাকায় যে উন্নয়ন হলো বা যে অর্জন হলো–তার জবাবদিহি করতে হয় না। জনগণের পয়সায় করা কাজটিকে যখন কোনো ব্যক্তির বদান্যতা হিসেবে প্রচার করা হয়, তখনই জনগণ তার মালিকানা হারিয়ে ফেলে। ফলে তার পক্ষে আর প্রশ্ন তোলাটা সহজ হয় না। যাবতীয় প্রশ্নকে কঠিন করে তোলাটাই এ ধরনের প্রচারের মুখ্য উদ্দেশ্য। কারণ, প্রশ্নহীন হতে না পারলে যে ক্ষমতার একচেটিয়াকরণ হয় না।
একচেটিয়া শাসকেরা মূলত নিজেদের প্রশ্নহীন করে তোলার সাধনায় মত্ত থাকেন। তাঁদের লক্ষ্য থাকে নির্বাচনের মাধ্যমে পাওয়া গদিটিকে প্রায় সমস্ত প্রকরণে সিংহাসনে রূপান্তর করা, যাতে জনগণের খাওয়া‑পরা থেকে শুরু করে সবকিছুই রাজানুগ্রহ হিসেবে সাব্যস্ত হয়। আর থাকে ভীতি, ভীতি এবং ভীতি।
সত্যজিৎ রায়ের সেই হীরক রাজা সিনেমার মতোই বিষয়টা, যেখানে প্রচার চালানো হয়—‘ভরপেট নাও খাই, রাজকর দেওয়া চাই’ কিংবা ‘হীরকের রাজা ভগবান’ বলে। একচেটিয়া শাসকেরা এই প্রচারটিই চালায় বিরোধীদের ফাটকে ভরে এবং বুদ্ধিজীবীসহ জনতার চিন্তাশীল অংশকে যন্তরমন্তরে ভরে।
লেখক: উপবার্তা সম্পাদক, ডিজিটাল বিভাগ, ইনডিপেনডেন্ট টেলিভিশন
[এই মতামত লেখকের নিজস্ব। এর সঙ্গে ইনডিপেনডেন্ট টেলিভিশনের প্রাতিষ্ঠানিক সম্পাদকীয় নীতিমালার কোনো সম্পর্ক নেই।]
আগের পর্ব পড়ুন:



