কোনো রাজনৈতিক নেতার বিদেশি নাগরিকত্ব বা বিদেশে স্থায়ীভাবে থাকার অনুমতি পাওয়ার খবরে রাজনীতি যে এক অচলাবস্থার সম্মুখীন হয়েছে, তা বুঝতে পারা যায়। আর এই অচলাবস্থা এমনই যে, সামনে এগোনোর পথ একদম থেমে গেছে। বাংলাদেশে রাজনীতির এই সংকট স্পষ্টভাবে ধরা পড়েছে সম্প্রতি একটি জাতীয় পত্রিকার প্রতিবেদনে, যেখানে জানা গেছে ক্ষমতাচ্যুত স্বৈরাচারী শেখ হাসিনা সরকারের আমলে মন্ত্রী, উপদেষ্টা ও সংসদ সদস্য হিসেবে দায়িত্ব পালন করা ২৪ জন ব্যক্তির বিদেশি নাগরিকত্ব বা বিদেশে স্থায়ীভাবে থাকার অনুমতি রয়েছে। আর এই অপকর্মটি করা হয়ছে দেশের আইন লঙ্ঘন করে।
সদ্য সাবেক হওয়া ক্ষমতাসীন দলের এই রাজনীতিবিদদের বিরুদ্ধে অভিযোগ, তাঁরা তথ্য গোপন করে সুবিধাগুলো অর্জন করেছেন, যা দেশের আইন ও সংবিধানের চূড়ান্ত লঙ্ঘন। বাংলাদেশের সংবিধানের ৬৬ অনুচ্ছেদে বলা হয়েছে, যে ব্যক্তি বিদেশি নাগরিকত্ব অর্জন করেন বা অন্য কোনো রাষ্ট্রের প্রতি আনুগত্য প্রদর্শন করেন, তিনি সংসদ সদস্য পদে আসীন হতে পারবেন না।
রাজনীতির উদ্দেশ্য হচ্ছে দেশ ও জনসাধারণের সেবা করা। অথচ সেই জনগণ ও দেশের প্রতি এই চূড়ান্ত অবহেলা দেখানো সম্ভব হয়েছে, কারণ গত ১৫ বছরে শেখ হাসিনার স্বৈরাচারী শাসনকালে নির্বাচনী ব্যবস্থার কবর রচিত হয়েছে, সুশাসন নির্বাসনে গেছে এবং ব্যাপক আর্থিক দুর্নীতি ও সীমাহীন অর্থপাচারের মচ্ছব হয়েছে। তাঁর শাসন ব্যবস্থা এমন কিছু বৈশিষ্ট্য রেখে গেছে, যা সাধারণত ফ্যাসিবাদের সাথে সম্পর্কিত; যেমন গণতন্ত্র এবং উদার রাজনৈতিক ও সাংস্কৃতিক ব্যবস্থাকে সংকুচিত করা, অভিজাত বা পারিবারিক শাসন প্রতিষ্ঠা, ব্যক্তিগত ও গোষ্ঠী স্বার্থে আইন প্রয়োগকারী এবং নিরাপত্তা বাহিনী ব্যবহারের প্রবণতা এবং যেকোনো জাতীয় সংকট বা ব্যর্থতার জন্য বিরোধী রাজনৈতিক ও সামাজিক পক্ষকে প্রতিনিয়ত দোষারোপ করা। আর সর্বোপরি, রাষ্ট্রের অর্থ ও পৃষ্ঠপোষকতায় ব্যক্তিপূজার অতি মাত্রার চর্চা তো ছিলই।
গত ৫ আগস্ট ২০২৪-এ শেখ হাসিনার পতন এবং পরবর্তী সময়ে ভারতে তাঁর আশ্রয় নেওয়ার পর বাংলাদেশ ২.০-তে, সংস্কার আলোচনায় মূলত নির্বাচন ব্যবস্থা, সংবিধান, বিচার ব্যবস্থা, বেসামরিক প্রশাসন এবং গণমাধ্যমকে প্রাধান্য দেওয়া হয়েছে। তবে সার্বিকভাবে রাষ্ট্র সংস্কারের একটি গুরুত্বপূর্ণ উপাদান হচ্ছে রাজনীতি ও রাজনৈতিক দলগুলোর সংস্কার, যা সামাজিক পরিসরের আলোচনায় তুলনামূলকভাবে অনুপস্থিত।
রাজনীতিবিদদের বিদেশি নাগরিকত্ব গ্রহণ এবং বাংলাদেশের প্রতি আংশিক আনুগত্য প্রদর্শনের দায়ভার তাদের দলগুলোকেও নিতে হবে। কারণ, সংসদ নির্বাচনে অংশ নেওয়া প্রার্থীদের বিষয়ে কোনো রকম তদারকি ছিল না। এমনকি দলীয় সদস্যভুক্ত করার ক্ষেত্রেও নিয়মনীতি নেই। দুর্ভাগ্যবশত, রাজনৈতিক দলগুলোর গঠনতন্ত্র ও বিধিবিধান দেশের অনেক আইন ও নির্বাচনী প্রক্রিয়ার সাথে সঙ্গতিপূর্ণ নয়।
বহুদিন ধরে সংসদ সদস্যদের নিজস্ব মত প্রকাশের অধিকার নিয়ে কথা হচ্ছে এবং সংবিধানের ৭০ অনুচ্ছেদে সংশোধনের দাবি উঠেছে। ৭০ অনুচ্ছেদে বলা আছে: “যে ব্যক্তি সংসদ সদস্য হিসেবে কোনো রাজনৈতিক দলের প্রার্থী হিসেবে নির্বাচিত হয়, তিনি যদি সেই দল ত্যাগ করেন অথবা সংসদে সেই দলের বিরুদ্ধে ভোট দেন, তাহলে তাঁর আসন শূন্য হবে।” অনেকেই মনে করেন, অনাস্থা প্রস্তাব ও অর্থ বিলের মতো কয়েকটি নির্দিষ্ট ক্ষেত্রে ব্যতীত সংসদে সদস্যদের স্বাধীনভাবে ভোট দেওয়ার সুযোগ দেওয়া উচিত, যা গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়াকে আরও শক্তিশালী করবে। তবে বাংলাদেশের প্রধান রাজনৈতিক দলগুলোর–যেমন বিএনপি ও আওয়ামী লীগে আভ্যন্তরীণ গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়ার অভাব রয়েছে। সুতরাং, দেশের সংবিধান সংশোধনের আগে, দলীয় গঠনতন্ত্রে সংস্কার করে আভ্যন্তরীণ গণতন্ত্রকে উৎসাহিত করাই বেশি জরুরি। মনে রাখা জরুরি, “আগে ঘর, তবে তো পর”।
গত কয়েক দশকে বাংলাদেশের প্রধান রাজনৈতিক দলগুলো তাদের শীর্ষ নেতাদের প্রতি অন্ধ ভক্তি প্রদর্শন করে তাদেরকে প্রায় সর্বময় ক্ষমতার অধিকারী বানিয়েছে। ফলে গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্ত গ্রহণের প্রক্রিয়া দুর্বল হয়েছে এবং অভ্যন্তরীণ গণতান্ত্রিক চর্চা স্থবির হয়ে পড়েছে, যা রাজনীতির গভীরে লুকিয়ে থাকা সংকটকে স্পষ্ট করেছে মাত্র।
বাংলাদেশের প্রধান রাজনৈতিক দলগুলোর অধিকাংশ কেন্দ্রীয় ও জেলা কমিটিগুলো গোপন ব্যালট বা কোনো মানসম্মত প্রক্রিয়ার মাধ্যমে গঠিত হয় না।
দলগুলোর শীর্ষ পদগুলো কয়েক দশক ধরে নির্দিষ্ট ব্যক্তিদের জন্য সংরক্ষিত রয়েছে। এই নেতারা অনুপস্থিত থাকলে, তাঁদের পরিবারের সদস্যরা হয় তাঁদের সহকারীর ভূমিকা পালন করেন, যাতে তাঁরা নেতৃত্ব গ্রহণের জন্য প্রস্তুতি নিতে পারেন। এমনকি শীর্ষ পদের পর সবচেয়ে কাঙ্ক্ষিত পদগুলোর মধ্যে অন্যতম হচ্ছে সাধারণ সম্পাদক বা মহাসচিব পদ। কিন্তু গত কয়েক দশকে এইসব দলের সাধারণ সম্পাদক বা মহাসচিব সবাই মনোনীত হয়ে এসেছেন। কোনো নির্বাচন হয়নি।
নেতা নির্বাচনের এই মনোনয়ন প্রক্রিয়ার কারণে প্রায়ই তা বিক্ষোভ ও দলীয় কোন্দলে রূপ নেয়। একটি স্বচ্ছ নির্বাচন বা নির্বাচনী প্রক্রিয়ার অভাবেই এই সংকট দেখা দেয়। বলার অপেক্ষা রাখে না যে, আদর্শ নির্বাচনী প্রক্রিয়া প্রতিষ্ঠিত না করা গেলে রাজনৈতিক দলগুলোর অভ্যন্তরীণ দ্বন্দ্ব এবং কখনো কখনো রক্তক্ষয়ী সহিংসতা চলতেই থাকবে।
সংসদ বা স্থানীয় সরকার নির্বাচনে দলীয় প্রার্থী মনোনয়নের প্রক্রিয়াটিও প্রায় সামন্ত প্রথার মতো, যেখানে নির্দিষ্ট আসন থেকে প্রার্থী হতে আগ্রহী তৃণমূলের নেতা বা ব্যক্তিরা খুব সামান্যই প্রভাব বিস্তার করতে পারেন। কেন্দ্রীয় নেতাদের একটি গোষ্ঠী শুধু তাঁদের তৈরি মানদণ্ডের ভিত্তিতে প্রার্থীদের ভাগ্য নির্ধারণ করে থাকেন।
বাংলাদেশের রাজনৈতিক দলগুলোকে তাদের গঠনতন্ত্র ও দলীয় কাঠামোর ব্যাপারে নতুন করে ভাবতে হবে। বিশ্বের উদার গণতন্ত্র থেকে তারা শিক্ষা নিতে পারে। এই দলগুলোর জন্য সিদ্ধান্ত গ্রহণের প্রতিটি প্রক্রিয়ায় অভ্যন্তরীণ গণতন্ত্রকে প্রাধান্য দিতে হবে। এর ফলে ক্ষমতা নির্দিষ্ট গোষ্ঠী বা পরিবারে কেন্দ্রীভূত হবে না।
রাজনীতি কোনো পেশা নয়, বরং এটি একটি মিশন বা জীবনের ব্রত। রাজনীতিবিদদের উচিত রাজনীতিতে যোগ দিলে বৈধ আয়ের পথ নিশ্চিত করা। রাজনৈতিক দলগুলোর এমন নীতি গ্রহণ করা উচিত, যেখানে সব সদস্যের রাজনীতির বাইরেও একটি বৈধ ও টেকসই পেশা থাকা বাধ্যতামূলক হতে হবে। তবেই দুর্নীতি দূর করা সম্ভব।
নির্বাচনী সংস্কারও রাজনৈতিক প্রক্রিয়ায় শৃঙ্খলা ও স্বচ্ছতা আনতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে। বাংলাদেশের মতো দেশে, যেখানে মিছিল, রাজপথে আন্দোলন এবং ভোটের দিন কার্যক্রম পরিচালনার জন্য বিপুল লোকের প্রয়োজন হয়। প্রযুক্তিগত উন্নয়ন এসব কর্মকাণ্ডকে সহজতর করতে পারে। উদাহরণস্বরূপ, ভোটকেন্দ্রে স্মার্ট আইডি বাধ্যতামূলক করলে রাজনৈতিক দলগুলোর পক্ষ থেকে পোলিং বুথে এজেন্টের প্রয়োজন হবে না। ফলে পূর্ণকালীন কর্মীর ওপর নির্ভরশীলতাও কমে যাবে।
জাতীয় নির্বাচনের সময় ভোটের দিন কার্যক্রম পরিচালনার জন্য বিপুল পরিমাণ কর্মীর প্রয়োজন। দেখা গেছে, ২০১৮ সালের ৩০ ডিসেম্বর অনুষ্ঠিত একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে ৪০ হাজারেরও বেশি কেন্দ্রে দু লাখের বেশি পোলিং বুথ স্থাপন করা হয়েছিল। এতে বোঝা যায় যে, রাজনৈতিক দলগুলোকে কী বিপুলসংখ্যক কর্মীর ওপর নির্ভর করতে হয়।
গণপ্রতিনিধিত্ব আদেশে-১৯৭২-এ আরও সংস্কার আনা উচিত। রাজনৈতিক দলের গুরুত্বপূর্ণ পদগুলো গোপন ব্যালটের মাধ্যমে কাউন্সিলে নির্বাচন করতে হবে এবং প্রয়োজন মনে হলে নির্বাচন কমিশনের তত্ত্বাবধানে হওয়া উচিত। বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতায় নির্বাচনের সুযোগ বন্ধ করতে হবে। এ ছাড়া রাজনৈতিক তহবিলের স্বচ্ছতা নিশ্চিত করতে নির্বাচন কমিশনকে রাজনৈতিক দলগুলোর বার্ষিক আয়-ব্যয়ের হিসাব নিরীক্ষা করতে হতে পারে। দলগুলোর জন্য তাদের আর্থিক দাতাদের পরিচয় প্রকাশ বাধ্যতামূলক করা উচিত, যাতে স্বচ্ছতা নিশ্চিত হয়।
শেষ কথা, যেসব ব্যক্তি মাতৃভূমির প্রতি সম্পূর্ণ আনুগত্য প্রদর্শনে অক্ষম, তাদের কি রাজনৈতিক দলে যোগদানের অধিকার থাকা উচিত? আইনের ব্যত্য়য় ঘটিয়ে বিদেশি নাগরিকত্ব গ্রহণ বা বিদেশে স্থায়ীভাবে থাকার অনুমতি পাওয়া ব্যক্তিদের সদস্যপদ রাজনৈতিক দলগুলো কি স্বেচ্ছায় বাতিল করবে?
(নিবন্ধটি ইংরেজি থেকে অনূদিত।)
লেখক: সহযোগী সম্পাদক, ইনডিপেনডেন্ট টেলিভিশন।
[এই মতামত লেখকের নিজস্ব। এর সঙ্গে ইনডিপেনডেন্ট টেলিভিশনের প্রাতিষ্ঠানিক সম্পাদকীয় নীতিমালার কোনো সম্পর্ক নেই।]


অন্তর্বর্তী সরকারের প্রধান প্রতিপক্ষ কে?
সত্যিকারের আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালের সন্ধানে
বন্যেরা বনে সুন্দর
বাংলাদেশে এখন নতুন রাজনৈতিক বলয় গড়ে তোলার মোক্ষম সময়
