স্ক্যাবিস নিরাময়যোগ্য চর্মরোগ। এ রোগে পরিবারের একজন আক্রান্ত হলে, অন্যদের মধ্যেও এটি দ্রুত সংক্রমিত হতে পারে। তবে, সময়মতো চিকিৎসা, পাশাপাশি পরিবারের সকলের চিকিৎসা, পরিষ্কার-পরিচ্ছন্নতা ও সচেতনতার মাধ্যমে এ রোগ থেকে সহজেই মুক্তি পাওয়া সম্ভব। ছোঁয়াচে হলেও স্ক্যাবিস প্রাণঘাতী রোগ নয়। চুলকানি ও ফুসকুড়িকে হালকাভাবে না নিয়ে সময়মতো চিকিৎসকের পরামর্শ এবং পরিচ্ছন্নতা বজায় রাখা প্রয়োজন
শনাক্তকরণ
- স্ক্যাবিস শনাক্ত করার প্রাথমিক পদ্ধতি হল রোগীর কাছ থেকে রোগের ইতিহাস নেওয়া এবং আক্রান্ত স্থানগুলি দেখে নেওয়া। ত্বকে স্ক্যাবিসের ফুসকুড়ি, ত্বকে পরজীবী দ্বারা সৃষ্ট বারো ট্র্যাক এবং নোডিউলস দেখে রোগ নির্ণয় করা।
- ত্বকের অন্যান্য রোগের থেকে স্ক্যাবিসকে আলাদা করতে হবে। যেমন একজিমা, কন্টাক্ট ডার্মাটাইটিস, সোরিয়াসিস। যদি একজন রোগীর ক্রমাগত চুলকানি থাকে এবং রাতে চুলকানি বাড়ে তবে তা স্ক্যাবিস বলে ধরে নেওয়া যায়।
- স্ক্যাবিস নির্ণয়ে রোগীর ঘনিষ্ঠ পরিচিতদের রোগের ইতিহাস নেওয়া জরুরি। কেননা পরিবারের অন্য সদস্যদের মধ্যে একই উপসর্গ থাকলে স্ক্যাবিস নির্ণয় সহজ হয়।
- ডার্মাটোস্কোপি পরীক্ষা, যা কেমিলুমিনেসেন্স মাইক্রোস্কোপি নামেও পরিচিত। এটি একটি ডায়াগনস্টিক টুল, যার মাধ্যমে ত্বকে বারো ট্র্যাক এবং মাইট শনাক্ত করা যায়।
- স্কিন স্ক্র্যাপিং এমন একটি পরীক্ষা পদ্ধতি, যেখানে একজন স্বাস্থ্যসেবা প্রদানকারী একটি নমুনা সংগ্রহের জন্য আক্রান্ত ত্বককে আলতোভাবে স্ক্র্যাপ করে। মাইট, ডিম, বা মাইট মলের উপস্থিতি শনাক্ত করতে নমুনাটি একটি মাইক্রোস্কোপের নিচে পরীক্ষা করা হয়। স্কিন স্ক্র্যাপিং স্ক্যাবিসের জন্য একটি নির্দিষ্ট ডায়াগোনস্টিক পদ্ধতি।
স্ক্যাবিস কীভাবে ছড়ায়
- স্ক্যাবিস মূলত আক্রান্ত ব্যক্তির সাথে শারীরিক সংস্পর্শের মাধ্যমে ছড়ায়। যেমন– আলিঙ্গন করা, হাত ধরা বা একই বিছানায় শোওয়া, স্ক্যাবিস ছড়ানোর সম্ভাবনা বাড়ায়।
- সংক্রমিত ব্যক্তির ব্যক্তিগত সামগ্রী ব্যবহার যেমন– আক্রান্ত ব্যক্তির পোশাক, তোয়ালে বা বিছানার চাদর ব্যবহার করলে স্ক্যাবিস সংক্রমিত হতে পারে।
- জনাকীর্ণ পরিবেশে বসবাস যেমন শরণার্থী শিবির, কারাগার, নার্সিং হোম ও ডরমিটরির মতো ঘনবসতিপূর্ণ জায়গায় বসবাস করলে স্ক্যাবিসে আক্রান্ত হওয়ার ঝুঁকি বেড়ে যায়।
- যৌন সংস্পর্শের ফলে স্ক্যাবিস সংক্রমণের ঝুঁকি বেশি থাকে।
স্ক্যাবিস এর চিকিৎসা ও প্রতিরোধ করার উপায়
স্ক্যাবিস চিকিৎসা, ঔষধ এর পাশাপাশি ব্যক্তিগত সচেতনতা, পরিবেশগত ব্যবস্থাপনা জরুরি। স্ক্যাবিস চিকিৎসায় চিকিৎসকের পরামর্শ অনুযায়ী সঠিক মাত্রায় ব্যবহার করতে হবে।
একইসঙ্গে আক্রান্ত ব্যক্তির সংস্পর্শে আসা সকলকেও চিকিৎসা নেওয়া আবশ্যক। প্রতিরোধের ক্ষেত্রে নিয়মিত সাবান দিয়ে গোসল করা, আক্রান্ত ব্যক্তির ব্যবহৃত কাপড়, তোয়ালে ও বিছানার চাদর অন্তত ৬০ ডিগ্রি সেলসিয়াস তাপমাত্রার গরম পানি দিয়ে ধোয়া এবং চিকিৎসা শুরু করার পর আক্রান্ত ব্যক্তির ব্যবহৃত কাপড় ৭২ ঘণ্টার জন্য আলাদা করে রাখা প্রয়োজন।
স্ক্যাবিস প্রতিরোধে জনসচেতনতা বৃদ্ধির জন্য স্কুল-কলেজে সচেতনতামূলক অনুষ্ঠান এবং মিডিয়ার মাধ্যমে স্ক্যাবিসের লক্ষণ ও প্রতিকার সম্পর্কে তথ্য প্রচার করা যেতে পারে। সরকারি ও বেসরকারি পর্যায়ে সহজলভ্য কমিউনিটিভিত্তিক স্বাস্থ্যসেবা কার্যক্রমের মাধ্যমে চিকিৎসা সুবিধা নিশ্চিত করা এবং বস্তি ও দুর্গম এলাকায় মোবাইল মেডিকেল ক্যাম্পের মাধ্যমে চিকিৎসাসেবা পৌঁছে দেওয়া এই রোগের বিস্তার রোধে কার্যকর ভূমিকা রাখতে পারে।
স্ক্যাবিস সম্পর্কে কিছু ভুল ধারণা
১. স্ক্যাবিস শুধু গরিবদের হয় (না, যেকোনো মানুষেরই হতে পারে)।
২. পরিষ্কার থাকলে স্ক্যাবিস হয় না (পরিষ্কার থাকলেও রোগীর সংস্পর্শে এলে হতে পারে)।
৩. স্ক্যাবিস নিজে নিজে সেরে যায় (না, চিকিৎসা নিতে হয়)।
স্ক্যাবিস হলে যা করবেন না
১. বেশি করে নখ দিয়ে খুঁচিয়ে চুলকাবেন না, এতে সেকেন্ডারি ইনফেকশন হতে পারে।
২. নিজের ইচ্ছামতো ওষুধ ব্যবহার করবেন না।
৩. রোগ গোপন করবেন না, পরিবারের অন্য সদস্যদের সতর্ক করুন।
বাংলাদেশে স্ক্যাবিস সংক্রমণের হার বৃদ্ধি পাওয়ায় সরকারি ও বেসরকারি পর্যায়ে কিছু উদ্যোগ লক্ষ্য করা যাচ্ছে। স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণ মন্ত্রণালয়ের অধীনে কমিউনিটি ক্লিনিকগুলোতে বিনামূল্যে স্ক্যাবিসের চিকিৎসা সেবা প্রদান করা হচ্ছে, বিশেষ করে প্রত্যন্ত এলাকায়। এছাড়া স্বাস্থ্য অধিদপ্তর নিয়মিতভাবে স্ক্যাবিস প্রতিরোধে সচেতনতামূলক ক্যাম্পেইন পরিচালনা করে থাকে।
স্ক্যাবিস বাংলাদেশের একটি গুরুত্বপূর্ণ জনস্বাস্থ্য সমস্যা, যা দারিদ্র্য, ঘনবসতি, অস্বাস্থ্যকর পরিবেশ ও সচেতনতার অভাবে বাড়ছে। সময়মতো চিকিৎসা ও প্রতিরোধমূলক ব্যবস্থা গ্রহণ করে স্ক্যাবিসের বিস্তার রোধ করা সম্ভব।
লেখক: জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞ, পরিচালক, বিজিসি ট্রাস্ট মেডিকেল কলেজ হসপিটাল, চট্টগ্রাম


যে কারণে দেশে স্ক্যাবিস সংক্রমণ বৃদ্ধি পাচ্ছে
