গতকাল রোববার রাতে নতুন মাইলফলক দেখেছে ফিফা ক্লাব বিশ্বকাপ। নিউজিল্যান্ডের ক্লাব অকল্যান্ড সিটিকে ১০-০ গোলে উড়িয়ে দিয়েছে বায়ার্ন মিউনিখ। ৩২ দলের ক্লাব বিশ্বকাপ এবারই প্রথম। প্রথমবারেই গড়া ইতিহাস হতো বহুদিন ভাঙতে পারবে না কোনো দল।
শুধু ৩২ দল কেন, আগের ফরম্যাটের ক্লাব বিশ্বকাপেই এমন কিছু হয়নি। ২০০০ সালে শুরু হওয়া সে প্রতিযোগিতায় আগের সবচেয়ে বড় জয়টি ছিল ৫ গোলের ব্যবধানের। ২০০২ সালে আল হিলালের বিপক্ষে ৬-১ গোলে জিতেছিল আল জাজিরা। গতকাল রাতে সে রেকর্ডটা বিশাল ব্যবধানে নিজেদের করে নিয়েছে জার্মান ক্লাব বায়ার্ন।
স্বাভাবিকভাবে মনে প্রশ্ন জাগতে পারে, ক্লাব বিশ্বকাপে অংশ নেওয়া একটা দল কীভাবে ১০ গোল খেতে পারে? আর যে দল এত বড় ব্যবধানে হারে, তাদের দলটাই-বা কাদের দিয়ে বানানো? কীভাবেই বা তারা পেশাদার ক্লাবের বৈশ্বিক এ টুর্নামেন্টে খেলার সুযোগ পায়?
নিউজিল্যান্ডের ক্লাব অকল্যান্ড মূলত অপেশাদার খেলোয়াড়দের নিয়ে গড়া একটি দল। এবারের বিশ্বকাপে অংশ নেওয়া এ দলটার অধিকাংশ ফুটবলারদের মূল পেশা ফুটবল নয়। ইংলিশ সংবাদমাধ্যম বিসিবির প্রতিবেদনের তথ্যানুসারে, এ দলটাতে যেমন প্রাইমারি স্কুল শিক্ষক আছেন, তেমনি আছেন ইন্স্যুরেন্স ব্রোকার, বিক্রয় প্রতিনিধি, গাড়ির রিটেইলার এবং কয়েকজন শিক্ষার্থী।
উদাহরণ হিসেবে নাথান লোবোর কথা উল্লেখ করা যেতে পারে। ২২ বছর বয়সী এ লেফটব্যাক প্রতিযোগিতা চলাকালেই বিশ্ববিদ্যালয়ের পরীক্ষার হলেও বসবেন!
এমন একটা দলের সঙ্গে বায়ার্ন মিউনিখের শক্তির পার্থক্য যে যোজন যোজন হবে, সেটা বোধহয় না বললেও চলে। ক্রীড়া বিশ্লেষণী ওয়েবসাইট অপটার পাওয়ার র্যাঙ্কিং অনুসারে, বৈশ্বিক র্যাঙ্কিংয়ে বর্তমানে ছয়ে আছে বায়ার্ন, অন্যদিকে অকল্যান্ড ৫০৭৪তম।
নিউজিল্যান্ডের ক্লাবটিকে হিসেবের বাইরে রাখলে, এবারের টুর্নামেন্টে অংশ নেওয়া সবচেয়ে দলগুলোর মধ্যে সবচেয়ে বাজে র্যাঙ্কিং সংযুক্ত আরব আমিরাতের ক্লাব আল আইনের (৬২৫তম)। এরপরও অকল্যান্ডের চেয়ে প্রায় সাড়ে চার হাজার ধাপ এগিয়ে আছেন আইন।
শুধু র্যাঙ্কিং নয়, আর্থিক অবস্থাতেও বায়ার্নের সঙ্গে আকাশ-পাতাল ব্যবধান অকল্যান্ডের। সর্বশেষ আর্থিক বছরের হিসেব অনুযায়ী, অকল্যান্ডের বার্ষিক আয় ছিল ৪ লাখ ৮৮ হাজার পাউন্ড। অন্যদিকে এ সময় বায়ার্নের আয় ৮১ কোটি পাউন্ড! ট্রান্সফার মার্কেটের তথ্যানুযায়ী, অকল্যান্ডের বর্তমান মার্কেট ভ্যালু প্রায় ৩৯ লাখ পাউন্ড। জার্মান ক্লাবটির ক্ষেত্রে যা প্রায় ৭৬ কোটি ৯ লাখ পাউন্ড!
খেলোয়াড়দের বেতনের ফারাকটাও যে আসমান-জমিন হবে, সেটাও অনুমেয়। উল্লেখ করা প্রয়োজন, অ্যামেচার খেলোয়াড়দের সঙ্গে পেশাদার ফুটবলের হিসাব মেলানো কিছুটা অবান্তর। যেমন, নিউজিল্যান্ডের নিয়ম অনুযায়ী, একজন অ্যামেচার ফুটবলারের সাপ্তাহিক বেতনের সর্বোচ্চ সীমা ৬৬ ইউরো। অন্যদিকে বায়ার্নের হয়ে এক সপ্তাহে ৪ লাখ ইউরো আয় করেন হ্যারি কেইন। যার অর্থ দাঁড়ায়, হ্যারি কেইনের এক সপ্তাহের বেতনের সমান আয় করতে অকল্যান্ডের সর্বোচ্চ বেতনধারী ফুটবলারের ১১৭ বছর লাগবে!
যে দলটা এমন অ্যামেচার ফুটবলার দিয়ে ভর্তি, যাদের অর্থনৈতিক কাঠামো এত দুর্বল- তারা কীভাবে ক্লাব বিশ্বকাপে অংশ নেয়?
ফিফা ক্লাব বিশ্বকাপের নিয়মানুযায়ী, প্রত্যেক মহাদেশীয় চ্যাম্পিয়নরা কিংবা মহাদেশ সেরার টুর্নামেন্টে সর্বশেষ চার বছরের (২০২১-২০২৪) র্যাঙ্কিং অনুযায়ী দল নির্ধারিত হয়েছে। ওশেনিয়া অঞ্চল থেকে এ টুর্নামেন্টে একটা স্লট বরাদ্দ।
মজার বিষয়, অবস্থানগতভাবে ওই অঞ্চলে হলেও অস্ট্রেলিয়ান ক্লাবগুলো এএফসিতে (এশিয়া) অংশ নেওয়ায় ওএফসিতে একক আধিপত্য চলে অকল্যান্ড সিটির। কোভিড-১৯ এর কারণে ২০২১ সালে এ প্রতিযোগিতা হয়নি। নির্ধারিত সময়সীমায় পরের ৩ বছরই ওশেনিয়া চ্যাম্পিয়ন হয়েছে অকল্যান্ড সিটি। এমনকি সর্বশেষ ২০২৫ সালের শিরোপাও গেছে এ ক্লাবটির ঘরে।
ওয়েনিয়া অঞ্চলে একক আধিপত্যের সুবাদে ক্লাব বিশ্বকাপেও ওএফসি থেকে সবচেয়ে বেশিবার অংশ নেওয়া দলটা অকল্যান্ড। চমকে দেওয়ার মতো ব্যাপার হচ্ছে, শুধু ওএফসি নয়, এবারের টুর্নামেন্টসহ ক্লাব বিশ্বকাপের ইতিহাসেই রেকর্ড ১২বারের মতো খেলছে অকল্যান্ড। আর ১১তম বারের মতো অংশ নিয়ে তালিকার দুইয়ে আল আহলি।
আর গতকালের ম্যাচে অকল্যান্ডের প্রতিপক্ষ বায়ার্নের অবস্থান? এবার সহ মোট ৩বার ফিফা ক্লাব বিশ্বকাপে খেলছে জার্মান ক্লাবটি!



