টানা বৃষ্টি ও জলাবদ্ধতার মধ্যেও এইচএসসি পরীক্ষা নেওয়ার প্রতিবাদে শিক্ষামন্ত্রী আ ন ম এহছানুল হক মিলনের পদত্যাগের দাবিতে রাজধানীসহ দেশের বিভিন্ন জেলায় বিক্ষোভ করেছেন শিক্ষার্থীরা। মঙ্গলবার দুপুর থেকে সন্ধ্যা পর্যন্ত ঢাকা, চট্টগ্রাম, রাজশাহী, খুলনা, বরিশাল, কুমিল্লাসহ বিভিন্ন স্থানে সড়ক অবরোধ, মানববন্ধন ও বিক্ষোভ কর্মসূচি পালন করা হয়।
শিক্ষার্থীদের দাবি, বৈরী আবহাওয়ার মধ্যেও সোমবার এইচএসসি পরীক্ষা নেওয়ায় অনেক পরীক্ষার্থী কেন্দ্রে পৌঁছাতে পারেননি। দুর্যোগ পরিস্থিতি পুরোপুরি স্বাভাবিক না হওয়া পর্যন্ত পরীক্ষা স্থগিত রাখতে হবে। পাশাপাশি যারা পরীক্ষায় অংশ নিতে পারেননি, তাদের জন্য পুনঃপরীক্ষার ব্যবস্থা করতে হবে। এছাড়া শিক্ষার্থীদের নিয়ে করা মন্তব্যের জন্য শিক্ষামন্ত্রীকে ক্ষমা চাইতে হবে, অন্যথায় আগামী ২৪ ঘণ্টার মধ্যে তাকে পদত্যাগ করতে হবে।
ঢাকায় সংসদ ভবন এলাকা ও বিভিন্ন সড়কে বিক্ষোভ
রাজধানীতে শিক্ষামন্ত্রীর পদত্যাগের দাবিতে জাতীয় সংসদ ভবন এলাকার সামনে বিক্ষোভ করেন আন্দোলনরত এইচএসসি পরীক্ষার্থীরা। সন্ধ্যা ৬টার দিকে বিভিন্ন এলাকার শিক্ষার্থীরা সেখানে জড়ো হন। একই সময় রাজধানীর সায়েন্স ল্যাব মোড়, উত্তরাসহ বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ সড়ক অবরোধ করে বিক্ষোভ চালান তারা।
সিটি কলেজ, আইডিয়াল কলেজ, বাংলা কলেজ, সিদ্ধেশ্বরী গার্লস কলেজ, লালমাটিয়া কলেজ, শাহীন কলেজসহ ১২ থেকে ১৫টি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের শিক্ষার্থীরা কর্মসূচিতে অংশ নেন। তারা শিক্ষামন্ত্রীর পদত্যাগ দাবিতে বিভিন্ন স্লোগান দেন। এছাড়া ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়সংলগ্ন এলাকাসহ বিভিন্ন সড়কে অবরোধের কারণে যান চলাচল ব্যাহত হয় এবং রাজধানীর বিভিন্ন স্থানে তীব্র যানজটের সৃষ্টি হয়।
চট্টগ্রামে শিক্ষা বোর্ডের সামনে বিক্ষোভ
চট্টগ্রামে শিক্ষামন্ত্রীর পদত্যাগের দাবিতে বিক্ষোভ করেছেন এইচএসসি পরীক্ষার্থীরা। দুপুরে নগরের ষোলশহর এলাকায় চট্টগ্রাম শিক্ষা বোর্ডের সামনে বিভিন্ন কলেজের শিক্ষার্থীরা জড়ো হয়ে বিক্ষোভ করেন। এ সময় আন্দোলনরত শিক্ষার্থীরা শিক্ষা বোর্ডের প্রধান ফটকের একটি অংশ খুলে ফেলেন। বিক্ষোভ চলাকালে মুরাদপুর, দুই নম্বর গেটসহ আশপাশের এলাকায় তীব্র যানজটের সৃষ্টি হয়।

খুলনায় শিববাড়ী মোড়ে অবস্থান
খুলনায় বিকেলে নগরের শিববাড়ী মোড়ে বিক্ষোভ শুরু করেন শিক্ষার্থীরা। এ সময় তারা শিক্ষামন্ত্রীর পদত্যাগ দাবিতে বিভিন্ন স্লোগান দেন। বিক্ষোভে বিভিন্ন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের শিক্ষার্থীরা অংশ নেন।
রাজশাহীতে শিক্ষা বোর্ড ঘেরাও
রাজশাহীতে এইচএসসি পরীক্ষার্থীরা মাধ্যমিক ও উচ্চ মাধ্যমিক শিক্ষা বোর্ড ঘেরাও করে বিক্ষোভ করেন। বেলা সাড়ে ১১টার দিকে বিভিন্ন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের শিক্ষার্থীরা শিক্ষা বোর্ড প্রাঙ্গণে প্রবেশ করে আন্দোলন শুরু করেন।
দুপুরে শিক্ষার্থীদের একটি প্রতিনিধি দল শিক্ষা বোর্ডের চেয়ারম্যান অধ্যাপক ড. শামীম আরা চৌধুরীর কাছে স্মারকলিপি দেন। স্মারকলিপি জমা দেওয়ার পরও শিক্ষার্থীরা বোর্ড প্রাঙ্গণে অবস্থান অব্যাহত রাখেন। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে রাখতে অতিরিক্ত পুলিশ মোতায়েন করা হয়।
বগুড়ায় সাতমাথায় অবস্থান
বগুড়ায় সকাল সাড়ে ১০টার দিকে আলতাফুন্নেছা খেলার মাঠ থেকে বিক্ষোভ মিছিল বের করেন শিক্ষার্থীরা। মিছিলটি শহরের প্রধান সড়ক প্রদক্ষিণ করে সাতমাথায় অবস্থান নেয়। পরে তারা জেলা প্রশাসকের কার্যালয়ে গিয়ে দাবিপত্র তুলে দেন এবং পুনরায় সাতমাথায় ফিরে বিক্ষোভ করেন।
বরিশালে মহাসড়ক অবরোধ
বরিশালে শিক্ষা বোর্ডের সামনে অবস্থান নিয়ে ঢাকা-বরিশাল মহাসড়ক প্রায় দুই ঘণ্টা অবরোধ করে রাখেন এইচএসসি পরীক্ষার্থীরা। পরে দুপুর সোয়া ২টার দিকে অবরোধ তুলে নেওয়া হয়। এ সময় মহাসড়কের দুই পাশে দীর্ঘ যানজটের সৃষ্টি হয়।
নওগাঁয় হুঁশিয়ারি
নওগাঁয় দুপুর ৩টার দিকে জেলা শিক্ষাভবনের সামনে বিক্ষোভ করেন শিক্ষার্থীরা। তারা হুঁশিয়ারি দিয়ে বলেন, আগামী ১৮ জুলাই নওগাঁ বিশ্ববিদ্যালয়ের অনুষ্ঠানে শিক্ষামন্ত্রী জেলায় এলে তাকে প্রবেশ করতে দেওয়া হবে না।
জয়পুরহাটে সড়ক অবরোধ
জয়পুরহাটে বিকেলে শহরের ডা. শহীদ আবুল কাশেম ময়দান থেকে বিক্ষোভ মিছিল বের করে জিরো পয়েন্ট পাঁচুর মোড় অবরোধ করেন শিক্ষার্থীরা। টানা বৃষ্টির মধ্যেও পরীক্ষা চালিয়ে যাওয়া, ত্রুটিপূর্ণ প্রশ্নপত্র এবং পরীক্ষার্থীদের নিয়ে করা মন্তব্যের প্রতিবাদে তারা এই কর্মসূচি পালন করেন।
জামালপুরে ঘণ্টাব্যাপী অবরোধ
জামালপুরে বিকেল ৪টা থেকে ফৌজদারি মোড় এলাকায় বিভিন্ন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের শিক্ষার্থীরা সড়ক অবরোধ করে বিক্ষোভ করেন। এ সময় তারা শিক্ষামন্ত্রীর পদত্যাগ দাবিতে বিভিন্ন স্লোগান দেন।
আন্দোলনরত শিক্ষার্থী নিশান অভিযোগ করে বলেন, দেশের বড় একটি অংশ যখন বন্যাকবলিত, তখনও শিক্ষার্থীদের দুর্ভোগের মধ্যে পরীক্ষা দিতে হয়েছে। এ পরিস্থিতিতে শিক্ষামন্ত্রীর বক্তব্য শিক্ষার্থীদের প্রতি সংবেদনশীল ছিল না।
জামালপুর সরকারি মহিলা কলেজের শিক্ষার্থী টুম্পা বলেন, শিক্ষামন্ত্রী পরিস্থিতি বিবেচনা করে পরীক্ষা পেছানোর আশ্বাস দিলেও তা বাস্তবায়ন হয়নি। ফলে শিক্ষার্থীদের চরম দুর্ভোগের মধ্যেই পরীক্ষায় অংশ নিতে হয়েছে।
প্রায় এক ঘণ্টা অবরোধের পর শিক্ষার্থীরা বিক্ষোভ মিছিল বের করেন। মিছিলটি শহরের বিভিন্ন সড়ক প্রদক্ষিণ শেষে সরকারি আশেক মাহমুদ কলেজ প্রাঙ্গণে গিয়ে শেষ হয়।

সুনামগঞ্জে সংহতি কর্মসূচি
সুনামগঞ্জে বিকেলে পৌর শহরের ট্রাফিক পয়েন্ট এলাকায় বিক্ষোভ মিছিল করেন এইচএসসি পরীক্ষার্থীরা। বন্যা পরিস্থিতিতে পরীক্ষা গ্রহণ না করা এবং শিক্ষাব্যবস্থায় বৈষম্য দূর করার দাবিতে তারা এ কর্মসূচি পালন করেন।
সুনামগঞ্জ সরকারি কলেজের পরীক্ষার্থী আদনান ফুয়াদ নাবিল বলেন, দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে ভয়াবহ বন্যা পরিস্থিতির মধ্যেও পরীক্ষা নেওয়া অমানবিক। সারা দেশের শিক্ষার্থীদের আন্দোলনের সঙ্গে সংহতি জানিয়ে তারা এই কর্মসূচিতে অংশ নিয়েছেন।
কুমিল্লায় শিক্ষা বোর্ড ঘেরাও
কুমিল্লায় শতাধিক এইচএসসি পরীক্ষার্থী শিক্ষা বোর্ডের সামনে অবস্থান কর্মসূচি ও বিক্ষোভ করেন। সকালে কান্দিরপাড় পূবালী চত্বর থেকে মিছিল নিয়ে শিক্ষা বোর্ডের দিকে যাওয়ার পথে পুলিশি বাধার মুখে পড়েন তারা। পরে বাধা উপেক্ষা করে শিক্ষা বোর্ডের প্রধান ফটকের সামনে অবস্থান নিয়ে তিন দফা দাবিতে স্লোগান দেন।
কুমিল্লা সদর উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা ফাতেমা তুজ জোহরা জানান, শিক্ষার্থীদের অবস্থানের পর আইনশৃঙ্খলা রক্ষায় পুলিশ মোতায়েন করা হয়। পরে শিক্ষা বোর্ডের সচিব আন্দোলনরত শিক্ষার্থীদের সঙ্গে কথা বলেন। বিষয়টি নিয়ে জেলা প্রশাসকের কার্যালয়ে জরুরি বৈঠকও আহ্বান করা হয়।
দিনাজপুরে সড়ক ও রেলপথ অবরোধ
দিনাজপুরে দুপুর সাড়ে ১২টার দিকে নিমনগর ফুলবাড়ী বাসস্ট্যান্ড এলাকায় সড়ক ও রেলপথ অবরোধ করেন বিভিন্ন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের শিক্ষার্থীরা। এতে সড়কের দুই পাশে কয়েক কিলোমিটার দীর্ঘ যানজট সৃষ্টি হয় এবং দিনাজপুর হয়ে চলাচলকারী বিভিন্ন রুটের ট্রেন চলাচল সাময়িকভাবে বন্ধ থাকে।
দিনাজপুর কোতোয়ালি থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা নূরনবী জানান, বিকেল সাড়ে ৪টার দিকে শিক্ষার্থীরা অবরোধ তুলে নেন।
টাঙ্গাইলে মহাসড়ক অবরোধ
টাঙ্গাইলে ঢাকা-টাঙ্গাইল মহাসড়ক অবরোধ করে বিক্ষোভ করেন এইচএসসি পরীক্ষার্থীরা। এতে উত্তরবঙ্গগামী লেনে কয়েক কিলোমিটার এলাকায় যানজটের সৃষ্টি হয়।
দুপুর দেড়টা থেকে আড়াইটা পর্যন্ত নগরজালফৈ এলাকায় মহাসড়কে অবস্থান কর্মসূচি পালন করেন আন্দোলনকারীরা। এর আগে টাঙ্গাইল প্রেসক্লাবের সামনে জেলা সদর সড়ক অবরোধ করেন তারা। এ সময় শিক্ষার্থীরা শিক্ষামন্ত্রীর বক্তব্যের প্রতিবাদ জানিয়ে তার পদত্যাগের দাবিতে বিভিন্ন স্লোগান দেন।



