ফিফা সভাপতি জিয়ান্নি ইনফান্তিনোর বিশ্বকাপের অংশীদারত্ব বিক্রির পরিকল্পনার বিরুদ্ধে কঠোর অবস্থান নিয়েছে ইউরোপের ফুটবল নিয়ন্ত্রক সংস্থা উয়েফা। গতকাল বৃহস্পতিবার জরুরি বৈঠকের পর ইউরোপের দেশগুলো বিশ্বকাপসহ ফিফার সব ধরনের প্রতিযোগিতা বয়কটের সিদ্ধান্ত নিয়েছে।
উয়েফার ৫৫ সদস্য দেশের এই সিদ্ধান্তের পর ফিফা সভাপতি ইনফান্তিনোর পরিকল্পনা বড় ধাক্কা খেয়েছে। পরে উত্তর, মধ্য আমেরিকা ও ক্যারিবিয়ান অঞ্চলের ফুটবল নিয়ন্ত্রক সংস্থা কনকাকাফও উয়েফার সঙ্গে একাত্ম হয়ে প্রস্তাবটি প্রত্যাখ্যান করেছে।
উয়েফার এই সিদ্ধান্ত কার্যকর থাকলে জার্মানি, ফ্রান্স, ইংল্যান্ড ও বর্তমান বিশ্বচ্যাম্পিয়ন স্পেনের মতো দেশগুলো পুরুষ ও নারী—কোনো বিশ্বকাপেই অংশ নেবে না। এক বিবৃতিতে উয়েফা উল্লেখ করেছে ‘উয়েফা ও এর সদস্য দেশগুলো ফিফার প্রতিযোগিতায় অংশ নেবে না।’
এরপর উত্তর, মধ্য আমেরিকা ও ক্যারিবিয়ান অঞ্চলের ফুটবল নিয়ন্ত্রক সংস্থা কনকাকাফও একই অবস্থান নিয়েছে। ৪১ সদস্যের এই সংস্থাও ফিফার প্রস্তাব প্রত্যাখ্যান করেছে। ২০২৬ বিশ্বকাপের আয়োজক যুক্তরাষ্ট্র, কানাডা ও মেক্সিকো—তিন দেশই কনকাকাফের সদস্য। যুক্তরাষ্ট্র ফুটবল ফেডারেশন সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে জানিয়েছে, তারা কনকাকাফের সিদ্ধান্তের সঙ্গে আছে।
২০ বিলিয়ন ডলারের পরিকল্পনা নিয়ে বিতর্ক
চলতি সপ্তাহের শুরুতে ইনফান্তিনো ঘোষণা দেন, ফিফার অধীন প্রতিষ্ঠান ফিফা ফরওয়ার্ড এন্টারপ্রাইজের (এফএফই) একটি অংশ বিক্রি করার পরিকল্পনা করা হয়েছে। এর মাধ্যমে প্রায় ২ হাজার কোটি ডলার সংগ্রহের লক্ষ্য রয়েছে ফিফার। বিনিময়ে ভবিষ্যৎ বিশ্বকাপের সম্প্রচার ও বাণিজ্যিক কার্যক্রমে বিনিয়োগকারীদের প্রভাব দেওয়ার পরিকল্পনা রয়েছে।
এই উদ্যোগে অর্থায়ন করছে যুক্তরাষ্ট্রের বিনিয়োগকারী জোশুয়া কুশনারের প্রতিষ্ঠান। তিনি মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের জামাতা জ্যারেড কুশনারের ভাই।
ইনফান্তিনোর সাম্প্রতিক বেশ কিছু সিদ্ধান্তের সঙ্গে ট্রাম্পের ঘনিষ্ঠ মহলের সম্পর্ক নিয়েও আলোচনা চলছে। এর মধ্যে রয়েছে ফিফা শান্তি পুরস্কার চালু করা, ট্রাম্পের মধ্যস্থতায় যুক্তরাষ্ট্রের ফরোয়ার্ড ফোলারিন বালোগুনের জাতীয় দল বেছে নেওয়ার প্রক্রিয়া এবং এবার কুশনারের বিনিয়োগ প্রতিষ্ঠানকে দীর্ঘমেয়াদি চুক্তিতে যুক্ত করার উদ্যোগ।
ফিফার পরিকল্পনা অনুযায়ী, ২০৩৭ সাল পর্যন্ত সংস্থাটির ২১১ সদস্য দেশ প্রত্যেকে ৮ কোটি ডলারের বেশি অর্থ পেতে পারে। প্রস্তাব বাস্তবায়নের জন্য ১৯ সেপ্টেম্বর পর্যন্ত সদস্য দেশগুলোর মতামত নেওয়ার সময়সীমা দিয়েছেন ইনফান্তিনো। এটি কার্যকর করতে সংখ্যাগরিষ্ঠ ভোট প্রয়োজন।
‘বিশ্বকাপ বিক্রির জন্য নয়’
ইনফান্তিনো বিশ্বকাপের অংশীদারীত্ব বিক্রি করতে চাইলেও শুরু থেকে এর বিরোধিতা করে আসছে উয়েফা। গতকাল বৃহস্পতিবার উয়েফার ভার্চ্যুয়াল বৈঠকে ৫৫ সদস্য দেশের প্রতিনিধিরা অংশ নেন। সূত্রের বরাত দিয়ে ক্রীড়া বিষয়ক সংবাদমাধ্যম ইএসপিএন জানিয়েছে, ৫০টির বেশি দেশ বৈঠকে নিজেদের বক্তব্য তুলে ধরে এবং ইনফান্তিনোর পরিকল্পনার বিরুদ্ধে ক্ষোভ প্রকাশ করে। পরে এক বিবৃতি প্রকাশ করে উয়েফা। সেই বিবৃতিতে ইউরোপের ফুটবল নিয়ন্ত্রক সংস্থা বলেছে, ‘কিছু বিষয় কখনোই বিক্রির জন্য নয়। ফিফা বিশ্বকাপ ফুটবলের সম্পদ। সব সময় তা-ই থাকবে। ইউরোপের কণ্ঠ যত দিন থাকবে, এটি কখনো বিক্রি হবে না।’
ফিফার পরিকল্পনা নিয়ে যথাযথ আলোচনা না করাকেও বড় সমস্যা হিসেবে দেখছে উয়েফা। তাদের মতে, এটি বিশ্ব ফুটবলের অভিভাবক হিসেবে ফিফার দায়িত্ব পালনে ব্যর্থতার উদাহরণ।
উয়েফা বলেছে, ‘এটি শুধু নেতৃত্বের ব্যর্থতা নয়, বরং বিশ্ব ফুটবলের রক্ষক হিসেবে ফিফার দায়িত্ব থেকে সরে দাঁড়ানোর মতো।’
নারী বিশ্বকাপ নিয়েও শঙ্কা
ইউরোপীয় দেশগুলোর সম্ভাব্য বয়কট নিয়ে এর আগে উদ্বেগ প্রকাশ করেছিল ফুটবল সংশ্লিষ্ট মহল। আগামী নারী বিশ্বকাপ ২০২৭ সালে ব্রাজিলে অনুষ্ঠিত হওয়ার কথা। ফিফা ও উয়েফার দ্বন্দ্ব চলতে থাকলে নারী ফুটবল ‘রাজনৈতিক হাতিয়ার’ হয়ে উঠতে পারে বলে আশঙ্কা তৈরি হয়েছে। এই অবস্থানের প্রথম পরীক্ষা হবে সেপ্টেম্বরে। তখন পোল্যান্ডে অনুষ্ঠিত হওয়ার কথা নারী অনূর্ধ্ব-২০ বিশ্বকাপ।
এশিয়াতেও নড়ছে সমর্থনের ভিত
ফিফা ও ইনফান্তিনোর দীর্ঘদিনের সমর্থক হিসেবে পরিচিত এশিয়ান ফুটবল কনফেডারেশনও এবার উদ্বেগ জানিয়েছে। এএফসি সভাপতি শেখ সালমান বিন ইব্রাহিম আল খলিফা ৪৬ সদস্য দেশকে পাঠানো এক চিঠিতে বলেন, ‘ফিফার একতরফা সিদ্ধান্তগুলো মহাদেশীয় ফুটবলের ভিত্তিকে দুর্বল করে দিতে পারে।’
২০১৬ সালে ফিফা সভাপতি নির্বাচনে ইনফান্তিনোর কাছে হেরে গেলেও পরে তাঁর ঘনিষ্ঠ মিত্র হিসেবে পরিচিত ছিলেন শেখ সালমান। তবে তিনি চিঠিতে লিখেছেন, ‘সব কনফেডারেশনের সমর্থন ছাড়া এমন উদ্যোগ সফল হবে না, আর বর্তমানে সেই সমর্থন নেই।’
ইনফান্তিনোর ভবিষ্যৎ নিয়েও প্রশ্ন
ফিফার এই আর্থিক পরিকল্পনা এখন ইনফান্তিনোর ১১ বছরের সভাপতিত্বকেও ঝুঁকিতে ফেলতে পারে। ফুটবল বিশ্বের বিভিন্ন মহলে তাঁর বিরুদ্ধে ক্ষোভ বাড়ছে। ফিফার ছয়টি মহাদেশীয় সংস্থার মধ্যে তিনটির কাছ থেকেই এখন আপত্তি এসেছে।
আগামী বছরের মার্চে মরক্কোর রাবাতে ফিফা সভাপতির নির্বাচন হওয়ার কথা। সেখানে ভোট দেবে ফিফার ২১১ সদস্য দেশ। সম্ভাব্য প্রার্থীদের আগামী ১৮ নভেম্বরের মধ্যে নিজেদের প্রার্থিতা ঘোষণা করতে হবে।
বিশ্ব ফুটবলের রাজনীতিতে এমন বড় বিভাজন এর আগে খুব কমই দেখা গেছে। ইনফান্তিনোর পরিকল্পনা শেষ পর্যন্ত বাস্তবায়িত হবে কি না, সেটিই এখন ফুটবল বিশ্বের সবচেয়ে বড় প্রশ্ন।



