আসন্ন জাতীয় নির্বাচনে অংশগ্রহণ নিয়ে দুই ধরনের মত দিয়েছেন জাতীয় পার্টির নেতারা। দলের প্রধান পৃষ্ঠপোষক ও বিরোধী দলীয় নেতা রওশন এরশাদপন্থী নেতারা বলছেন, দলটি আগামী নির্বাচনে অংশ নেবে। অন্যদিকে, দলের চেয়ারম্যান জি এম কাদেরপন্থী নেতারা বলছেন, নির্বাচনে অংশ নেওয়া নিয়ে চূড়ান্ত কথা বলার সময় এখনও আসেনি।
গত রোববার জাতীয় পার্টির গুলশান কার্যালয়ে রওশন এরশাদের রাজনৈতিক সচিব গোলাম মসীহ্ গণমাধ্যমকে জানান, রওশন এরশাদের নেতৃত্বে জাতীয় পার্টি আগামী সংসদ নির্বাচনে অংশ নেবে।
গোলাম মসীহ্ বলেন, ‘জাতীয় পার্টি গণতন্ত্রে বিশ্বাস করে এবং একটি নির্বাচনমুখী দল। সে জন্য আগামী কয়েকটি মাস আমাদের জন্য খুবই গুরুত্ব বহন করে।’
রওশন এরশাদের নেতৃত্বে জাতীয় পার্টি আগামী সংসদ নির্বাচনে অংশ নেবে। জাতীয় পার্টি গণতন্ত্রে বিশ্বাস করে এবং একটি নির্বাচনমুখী দল। সে জন্য আগামী কয়েকটি মাস আমাদের জন্য খুবই গুরুত্ব বহন করে।
গোলাম মসীহ্, রওশন এরশাদের রাজনৈতিক সচিব
এর একদিন পর দলটির মহাসচিব মুজিবুল হক চুন্নু ইনডিপেনডেন্ট টেলিভিশনকে বলেন, ‘আগামী নির্বাচন করবোই এমন কোনও কথা না। আমরা চাই নির্বাচন ফেয়ার হোক। সরকার যদি ফলপ্রসু উদ্যোগ নেয়, যদি আমরা বুঝি যে নির্বাচন ফেয়ার হবে, তাহলে অংশ নেব। আর যদি বুঝতে পারি যে, নির্বাচন ফেয়ার হবে না দেশের মানুষ যা চায় আমরাও দলীয় সিদ্ধান্ত নেব। চূড়ান্ত কথা বলার সময় এখনও আসেনি।’
পরিকল্পনা অনুযায়ী এবার ৩০০ সংসদীয় আসনেই নিজেদের প্রার্থী দিতে চায় জাতীয় পার্টি। দলের মহাসচিব চুন্নুর মতে, আগে বিভিন্ন সময় করা নির্বাচনী জোটগুলো জাতীয় পার্টির জন্য ভালো ফল আনেনি।
চুন্নু বলেন, ‘আমরা জোট করেছি কয়েকবার। এটা খুব একটা ভালো ফল আনেনি। অনেক সময় গিয়েছে। আমরাও অনেক পরিপক্ক। আমরা চিন্তা করছি ৩২-৩৩ বছর যারা শাসন করেছে, তাদের প্রতি মানুষের আস্থা নেই। এই দুই দলের বাইরে চিন্তার সময় এসেছে। আমরা এই সুযোগ নিতে পারি। তাই আমাদের ৩০০ আসনেই প্রার্থী বাছাই, দলকে নির্বাচনের জন্য তৈরি করা, ম্যানুফেস্টো তৈরি করা এই কাজগুলো আমরা করছি। পরে অবস্থার প্রেক্ষিতে দল যদি কোনো সিদ্ধান্ত নেয়, সেটি ভিন্ন বিষয়। কিন্তু এখন পর্যন্ত আমরা নিজেরা নির্বাচন করব, সেটা নিয়ে কাজ করছি।’
৯০-এর দশকে জাতীয় পার্টির প্রতিষ্ঠাতা স্বৈরশাসক এরশাদের পতনের পর বিভিন্ন সময় বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের সাথে জোট করেছে দলটি। ১৯৯৬ সালে সপ্তম জাতীয় সংসদ নির্বাচনের পর সরকার গঠন করতে জাতীয় পার্টির সহায়তা নেয় আওয়ামী লীগ। সেই নির্বাচনে ৩০০ সংসদীয় আসনের মধ্যে আওয়ামী লীগ পেয়েছিল ১৪৬টি। জাতীয় পার্টি পায় ৩২টি এবং বিএনপির আসন ছিল ১১৬টি।
সরকার যদি ফলপ্রসু উদ্যোগ নেয়, যদি আমরা বুঝি যে নির্বাচন ফেয়ার হবে, তাহলে অংশ নেব। আর যদি বুঝতে পারি যে, নির্বাচন ফেয়ার হবে না আমরাও দলীয় সিদ্ধান্ত নেব। চূড়ান্ত কথা বলার সময় এখনও আসেনি।
মুজিবুল হক চুন্নু, জাতীয় পার্টির মহাসচিব
২০০১ সালের জাতীয় নির্বাচনের দুই বছর আগে বিএনপি, জামায়াত এবং ইসলামী ঐক্যজোটের সাথে জোট গঠন করে এরশাদের জাতীয় পার্টি। ভোটের ঠিক আগ মুহূর্তে জোট ছেড়ে বেরিয়ে যায় দলটি। তবে দল ভেঙে একটি অংশ বিজেপি নামে থেকে যায় সেই জোটের সাথে।
২০০৭ সালে জাসদ, বাংলাদেশ ওয়ার্কার্স পার্টি, গণফোরাম ও এলডিপির সাথে জাতীয় পার্টিকেও জোটে নেয় আওয়ামী লীগ। অবশ্য এই জোট টেকেনি। সেনা নিয়ন্ত্রিত তত্ত্বাবধায়ক সরকারের অধীনে ২০০৮ সালের নির্বাচনের আগে আওয়ামী লীগ নেতৃত্বাধীন মহাজোট থেকে বাদ পড়ে এলডিপি ও গণফোরাম। সে সময় জোটে জাতীয় পার্টিই ছিল আওয়ামী লীগের মূল শরিক।
সেই নির্বাচনে মহাজোটের কাছে বিএনপি নেতৃত্বাধীন জোট কোনো পাত্তাই পায়নি। নির্বাচনে দুই-তৃতীয়াংশ সংখ্যাগরিষ্ঠতা নিয়ে সরকার গঠন করে এই জোট।
বিএনপি নেতৃত্বাধীন জোটের বর্জনের মধ্য দিয়ে ২০১৪ সালে আরেক দফা জাতীয় নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়। সেই নির্বাচনে আওয়ামী লীগের ছেড়ে দেওয়া আসনে ভোট করে জাতীয় পাটি। নির্বাচনের পর সংসদে প্রধান বিরোধী দল হিসেবেও মর্যাদা পায় দলটি। বিরোধী দলে থাকলেও দলটির বেশ কয়েকজন নেতা সেই সরকারে মন্ত্রী-প্রতিমন্ত্রীর দায়িত্ব পালন করেছেন। এ নিয়ে সে সময় দলটিকে নানা সমালোচনার মুখে পড়তে হয়।
এর পর বহুবার জাতীয় পার্টি আওয়ামী লীগের জোট থেকে বের হয়ে যেতে চাইলেও শেষ পর্যন্ত জোটে থেকে যায়। ২০১৮ সালেও আওয়ামী লীগের সাথে অনেকটা সমঝোতা করেই নির্বাচনে আসে তারা। ওই নির্বাচনে বিএনপির ভরাডুবি হলে ২২টি আসন নিয়ে সংসদে প্রধান বিরোধী দলের স্থান ধরে রাখে জাতীয় পার্টি।
আগামী নির্বাচনে নির্বাচন পদ্ধতি নিয়ে বড় দুই রাজনৈতিক শক্তি আওয়ামী লীগ ও বিএনপিকে সমঝোতায় আসার আহ্বান জানিয়েছে জাতীয় পার্টি।
দলের মহাসচিব চুন্নু বলেন, ‘নির্বাচন ফেয়ার হবে কিনা, এই ইস্যুটা সামনে আসছে। একটি বৃহৎ রাজনৈতিক দল তাদের সঙ্গে আরও কয়েকটি রাজনৈতিক সংগঠন আন্দোলন করছে ফেয়ার নির্বাচনের জন্য। আবার সরকার বলছে যে, নির্বাচিত হয়ে তারা ক্ষমতায় আছে এবং নির্বাচনের সময়ও তারা ক্ষমতায় থাকবে। এর আগেও এ সিস্টেমে আমাদের এখানে নির্বাচন হয়েছে। আমরাও পার্টিসিপেট করেছি। কিন্তু গত দুটি নির্বাচনে আমরা অংশ নিলেও এগুলো নিয়ে অনেকে প্রশ্ন তুলেছেন। ফলে নির্বাচন ফেয়ার হওয়াটা একান্ত প্রয়োজন। বড় দুটো দল এখন চূড়ান্ত পথে চলে গিয়েছে। জাতীয় পার্টির পক্ষ থেকে প্রস্তাব, এটা নো রিটার্ন বা এক দফার কথা না বলে সম্মিলিতভাবে বসে প্রয়োজনে সংবিধানের আলোকে আন্তরিকতা থাকলে ফেয়ার নির্বাচনের ব্যবস্থা করা যায়।’
জাপা মহাসচিব বলেন, ‘বড় দুটো দল ইগো নিয়ে এমন অবস্থায় যে, তারা নিজেদের ইগো অনুযায়ী তাদের ইচ্ছাই বজায় রাখতে চান। জাতীয় পার্টি চায় এই ইস্যু নিয়ে দেশে কোনো হানাহানি বা সংঘর্ষ না হোক। এ জন্য উচিত সবার এক সাথে বসা। আমাদের একটাই দাবি থাকবে, আওয়ামী লীগের প্রতি আহ্বান, তারা যেহতু সরকারে আছে তাদের দায়িত্ব বেশি। হানাহানি করবেন না। সবাইকে ডাকেন, আলোচনা করেন। নিশ্চয়ই পথ বেরিয়ে আসবে। বিএনপিকে বলব, এক দফা নিয়ে থাকবেন না।’
বর্তমান সংসদের মেয়াদ প্রায় শেষ। সাংবিধানিক বাধ্যবাধকতা থাকায় দ্বাদশ সংসদ নির্বাচন অনুষ্ঠিত হতে হবে এ বছরের নভেম্বর থেকে আগামী বছরের জানুয়ারির মধ্যে। এরই মধ্যে নির্বাচন কমিশন জানিয়েছে, আগামী নভেম্বরে দ্বাদশ সংসদ নির্বাচনের তফসিল ঘোষণা হতে পারে। আর ভোট হতে পারে ডিসেম্বরের শেষ অথবা জানুয়ারির শুরুতে।
নির্বাচন এগিয়ে এলেও এখনও নিজেদের অবস্থানে অনড় আওয়ামী লীগ ও বিএনপি। এরই মধ্যে সরকারের পদত্যাগ ও নির্দলীয় সরকারের অধীনে নির্বাচনের এক দফা দাবিতে আন্দোলন শুরু করেছে বিএনপি। অন্যদিকে আওয়ামী লীগ বলছে, উচ্চ আদালত তত্ত্বাবধায়ক সরকার ব্যবস্থা বাতিল করায় এটি সংবিধানে ফিরিয়ে আনার কোনো সুযোগ নেই।
এদিকে, নির্বাচনকে সামনে রেখে বিদেশি কূটনীতিকদের আনাগোনাও বেড়েছে। আগামী সংসদ নির্বাচনে বিএনপিকে ভোটে আনতে বিদেশি রাষ্ট্রগুলোর চাপও আছে আওয়ামী লীগের ওপর।


নির্বাচনকালীন সরকারে দায়িত্ব নিতে আপত্তি নেই: জিএম কাদের
আমাদের কিছু মানুষের পা দুই নৌকায়: জিএম কাদের
