নির্বাচন যতই এগিয়ে আসছে, জাতীয় পার্টিতে ততই মাথাচাড়া দিয়ে উঠছে পুরোনো দ্বন্দ্ব। দলের প্রধান পৃষ্ঠপোষক রওশন এরশাদ এক বিজ্ঞপ্তির মাধ্যমে নিজেকে জাতীয় পার্টির চেয়ারম্যান ঘোষণা করেছেন। অন্যদিকে, দলের মহাসচিব মুজিবুল হক চুন্নু জানিয়েছেন, তথ্যটি সঠিক নয়। জাতীয় পার্টির গঠনতন্ত্রে এভাবে চেয়ারম্যান হওয়ার সুযোগ নেই।
মঙ্গলবার গণমাধ্যমে পাঠানো এক বিজ্ঞপ্তিতে রওশন এরশাদ নিজেকে জাতীয় পার্টির চেয়ারম্যান ঘোষণা করেন।
রওশন এরশাদের সই করা এ সম্পর্কিত সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে বলা হয়েছে, ‘আমি বেগম রওশন এরশাদ, এমপি জাতীয় পার্টির প্রতিষ্ঠাতা কো-চেয়ারম্যান এই মর্মে ঘোষণা করছি যে, পার্টির সিনিয়র নেতাদের পরামর্শ এবং সিদ্ধান্তক্রমে দলের গতিশীলতা বজায় রাখার স্বার্থে দলের চেয়ারম্যানের দায়িত্ব গ্রহণ করলাম।’
পার্টির মেয়াদোত্তীর্ণ কমিটির চেয়ারম্যান জি এম কাদেরকে সরিয়ে দশম জাতীয় কাউন্সিল পর্যন্ত তিনি দলের চেয়ারম্যানের দায়িত্ব পালন করবেন বলে বিজ্ঞপ্তিতে জানানো হয়।
এমন এক সময় এই বিজ্ঞপ্তিটি প্রকাশ করা হলো, যখন জাতীয় পার্টির চেয়ারম্যান জি এম কাদের তিন দিনের সফরে ভারতে অবস্থান করছেন।
অবশ্য এ ঘটনার পরপরই দলটির মহাসচিব মুজিবুল হক চুন্নু এক ভিডিও বার্তায় এ তথ্য নাকচ করে দেন। চুন্নু বলেন, ‘বিভিন্ন গণমাধ্যম ও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে প্রকাশিত খবরটি ভুয়া। আমাদের দলের গঠনতন্ত্রে এইভাবে কারও চেয়ারম্যান হওয়ার সুযোগ নেই।’
জাতীয় পার্টি মহাসচিব বলেন, ‘যাদের স্বাক্ষর করার কথা বলা হচ্ছে, তাঁদের সঙ্গে আমাদের কথা হয়েছে। তাঁরা এ ধরনের কোনো সিদ্ধান্ত নেন নাই। দলের গঠনতন্ত্র অনুযায়ী যে কেউ ইচ্ছা করলেই চেয়ারম্যান হতে পারবে না ও অব্যাহতি দেওয়া যাবে না। এটি নিয়মতান্ত্রিক উপায়ে হতে হবে।’
জাতীয় পার্টিতে গৃহবিবাদ নতুন কিছু নয়। দলের প্রতিষ্ঠাতা হুসেইন মোহাম্মদ এরশাদ দলটির চেয়ারম্যান থাকার সময়েও একাধিকবার তাঁর সাথে দ্বন্দ্বে জড়িয়েছেন তাঁরই স্ত্রী ও দলটির প্রতিষ্ঠাতা কো-চেয়ারম্যান রওশন।
২০১৯ সালে এরশাদের মৃত্যুর পর জাতীয় পার্টির নেতৃত্বে আসেন তাঁর ছোট ভাই জি এম কাদের। শুরু থেকেই এ সিদ্ধান্তের বিরোধিতা করে আসছিলেন রওশন। দুজনই নিজেদের দলের চেয়ারম্যান হিসেবে ঘোষণা করেন। পরে অবশ্য সমঝোতার মাধ্যমে জি এম কাদেরকে চেয়ারম্যান ও রওশন এরশাদকে বিরোধী দলীয় নেতা করা হয়।
এর পর ২০২২ সালে আবারও দলের এই গৃহবিবাদ প্রকাশ্যে আসে। সে সময় এই দুই পক্ষের দ্বন্দ্বের অন্যতম কারণ ছিল আওয়ামী লীগের সাথে জোটে থাকা-না থাকাকে কেন্দ্র করে। জি এম কাদেরপন্থীদের চাওয়া ছিল মহাজোট থেকে বের হয়ে বিএনপির সাথে বা আলাদা করে নির্বাচনে অংশ নেওয়া। অন্যদিকে, রওশনপন্থীদের চাওয়া ছিল মহাজোটেই থেকে যাওয়া।
একপর্যায়ে ওই বছরের আগস্টে থাইল্যান্ডে চিকিৎসাধীন অবস্থাতেই রওশন এরশাদ কেন্দ্রীয় সম্মেলন ডাকেন। সে সময় রওশনের ঘনিষ্ঠ বেশ কয়েকজন নেতাকে দল থেকে বহিষ্কার করেন চেয়ারম্যান জি এম কাদের।
ফলে জি এম কাদেরের চেয়ারম্যান পদে থাকাকে চ্যালেঞ্জ করে একাধিক মামলাও করা হয়। এতে শুরুতে জি এম কাদেরের রাজনৈতিক কর্মকাণ্ডের ওপর নিষেধাজ্ঞা আরোপ করে আদালত। পরে অবশ্য উচ্চ আদালতের রায়ে চেয়ারম্যান পদ ফিরে পান জি এম কাদের।
নির্বাচনের আগে আবারও সেই দ্বন্দ্ব ঘুরে ফিরে সামনে আসছে। আসন্ন জাতীয় নির্বাচনে অংশগ্রহণ নিয়ে দুই ধরনের মত রয়েছে রওশন ও কাদেরপন্থীদের।
দলের প্রধান পৃষ্ঠপোষক ও বিরোধী দলীয় নেতা রওশন এরশাদপন্থী নেতারা বলছেন, দলটি আগামী নির্বাচনে অংশ নেবে। অন্যদিকে, দলের চেয়ারম্যান জি এম কাদেরপন্থী নেতারা বলছেন, নির্বাচনে অংশ নেওয়া নিয়ে চূড়ান্ত কথা বলার সময় এখনও আসেনি।
নির্বাচনকে সামনে রেখে আওয়ামী লীগ নেতৃত্বাধীন মহাজোট বলয় থেকে বের হয়ে স্বতন্ত্রভাবে নির্বাচন করতে চায় চেয়ারম্যান জি এম কাদেরপন্থীরা। আর এর বিপরীত মত রওশনপন্থীদের।
গত রোববার জাতীয় পার্টির গুলশান কার্যালয়ে রওশন এরশাদের রাজনৈতিক সচিব গোলাম মসীহ্ গণমাধ্যমকে জানান, রওশন এরশাদের নেতৃত্বে জাতীয় পার্টি আগামী সংসদ নির্বাচনে অংশ নেবে।
গোলাম মসীহ্ বলেন, ‘জাতীয় পার্টি গণতন্ত্রে বিশ্বাস করে এবং একটি নির্বাচনমুখী দল। সে জন্য আগামী কয়েকটি মাস আমাদের জন্য খুবই গুরুত্ব বহন করে।’
আর জাতীয় পার্টির মহাসচিব মুজিবুল হক চুন্নু জানান, পরিকল্পনা অনুযায়ী এবার ৩০০ সংসদীয় আসনেই নিজেদের প্রার্থী দিতে চায় দলটি।
চুন্নু বলেন, ‘আমরা জোট করেছি কয়েকবার। এটা খুব একটা ভালো ফল আনেনি। অনেক সময় গিয়েছে। আমরাও অনেক পরিপক্ক। আমরা চিন্তা করছি ৩২-৩৩ বছর যারা শাসন করেছে, তাদের প্রতি মানুষের আস্থা নেই। এই দুই দলের বাইরে চিন্তার সময় এসেছে। আমরা এই সুযোগ নিতে পারি। তাই আমাদের ৩০০ আসনেই প্রার্থী বাছাই, দলকে নির্বাচনের জন্য তৈরি করা, ম্যানুফেস্টো তৈরি করা এই কাজগুলো আমরা করছি। পরে অবস্থার প্রেক্ষিতে দল যদি কোনো সিদ্ধান্ত নেয়, সেটি ভিন্ন বিষয়। কিন্তু এখন পর্যন্ত আমরা নিজেরা নির্বাচন করব, সেটা নিয়ে কাজ করছি।’
বিবাদ নিয়ে যা বলছেন নেতারা
জাতীয় পার্টিতে কোনো বিবাদ নেই বলে দাবি করেছেন উভয় পক্ষের নেতারাই। উভয় পক্ষের দাবি, জাতীয় পার্টি ঐক্যবদ্ধ।
রওশন এরশাদের রাজনৈতিক সচিব গোলাম মসীহ্ বলছেন, বিএনপি থেকে আসা কিছু নেতা দলে বিভাজন তৈরি ষড়যন্ত্র করছে।
মসীহ্ ইনডিপেনডেন্ট টেলিভিশনকে বলেন, ‘যারা বিভাজন সৃষ্টি করেছে, দেখা যাচ্ছে তারা জাতীয় পার্টিতে নতুনভাবে আগত। খুব বেশি দিন হয়নি। দ্বিতীয়ত, তারা এসেছে বিএনপি থেকে। বিএনপির রাজনীতিতে তারা অনেকদিন ছিল।
অন্যদিকে মহাসচিব মুজিবুল হক চুন্নুর দাবি, দল থেকে বহিষ্কৃত নেতারা রওশনকে ভুল পথে নিয়ে যাচ্ছেন।
চুন্নু ইনডিপেনডেন্ট টেলিভিশনকে বলেন, ‘আমাদের কিছু লোক যারা বহিষ্কৃত বা পদ নেই, তাঁরা ওনাকে ভুল বুঝিয়ে একটা তৎপরতা করছে, পার্টির নামে কিছু করার জন্য। কিন্তু এটা তো তাদের বিষয়। এর সাথে জাতীয় পার্টির কোনো সম্পর্ক নাই।’


জাপার নতুন চেয়ারম্যান রওশন এরশাদ
রওশনের চেয়ারম্যান হওয়ার খবর ভুয়া: চুন্নু
জিএম কাদেরকে চেয়ারম্যান করা নিয়ে প্রশ্ন তুললেন রওশন এরশাদ
চেয়ারম্যান পদ নিয়ে জাতীয় পার্টিতে বিরোধ
রওশন-কাদের দ্বন্দ্বে ভাঙনের দ্বারপ্রান্তে জাতীয় পার্টি
সংসদের বিরোধীদলীয় নেতা রওশন এরশাদ আর কাদের উপনেতা
