আমেরিকার প্রেসিডেন্ট জো বাইডেন আজ ২০ নভেম্বর ৮১ বছরে পা দেবেন। তাঁকে তো অশীতিপর বলাই যায়। এই বয়সে বিশ্বের সবচেয়ে পরাক্রমশালী দেশকে সামলানো চট্টিখানি কথা না। এরমধ্যে আবার আছে সারা দুনিয়াকে দেখেশুনে রাখার মহান দায়িত্ব। এত দায়িত্বের মধ্যে তিনি সময় করে প্রায় বাইশ শ শব্দের একটা লেখা লিখেছেন। সেটা আবার গত ১৮ নভেম্বর, ২০২৩ ছাপা হয়েছে বিখ্যাত মার্কিন দৈনিক ওয়াশিংটন পোস্টে, মতামত কলামে।
আমেরিকার মহাব্যস্ত প্রেসিডেন্ট লিখবেন সেটা পত্র-পত্রিকায় গুরুত্ব দিয়ে ছাপা হবে, এটা কোনো কথাই নয়। কথাটা হলো বাইডেন সাহেব ক্ষমতার মেয়াদ থাকার এক বছরের মাথায় এমন একটা লেখা লিখতে গেলেন কেন? এটা বুঝতে গেলে লেখার শিরোনামটা একটু খেয়াল করতে হবে। ‘দ্য ইউএস উডনট ব্যাক ডাউন ফ্রম দ্য চ্যালেঞ্জ অব পুতিন অ্যান্ড হামাস’, অর্থাৎ পুতিন ও হামাসের চ্যালেঞ্জ থেকে পিছু হটবে না যুক্তরাষ্ট্র– শিরোনামই ইঙ্গিত দিচ্ছে লেখার উদ্দেশ্য।
গত বছর ফেব্রুয়ারি থেকে (আমেরিকার কথায়) রাশিয়া ইউক্রেনে আগ্রাসন চালাচ্ছে। আর বন্ধু ইউক্রেনও আমেরিকা ও তার আরও অর্ধ শতাধিক সঙ্গীকে সাথে নিয়ে রাশিয়ার বিরুদ্ধে রুখে দাঁড়ানোর চেষ্টা করছে। এই তরজা নরমে-গরমে ভালোই চলছিল। এরমধ্যে গত ৭ অক্টোবর সব ওলট-পালট করে দিল হামাস ‘জঙ্গীরা’। ফলে আমেরিকার দৃষ্টি স্বাভাবিকভাবে ঘুরে গেল প্রাণের বন্ধু আক্রান্ত ইসরায়েলের দিকে। প্রমাদ গুনলেন ইউক্রেনের প্রেসিডেন্ট ঝেলেনস্কি। এখন যদি মাঝপথে আমেরিকা সরে যায় তাহলে তাঁকে তো স্বখাতসলিলে ডুবে মরতে হবে। এই ইউক্রেনকে আশ্বস্ত করতেই এ লেখা সন্দেহ নেই। পুতিন ও হামাসকে এক কাতারে নামিয়ে এনে তিনি সে প্রমাণ দিয়েছেন। পাশাপাশি গোটা লেখায় ইসরায়েলের প্রতি সহানুভূতির ফল্গু বয়ে গেছে। হামাসের হামলায় ১২শ মানুষ নিহত হওয়ার ঘটনার (যাদের অধিকাংশ ইসরায়েলি ইহুদি) প্রতিক্রিয়ায় গত প্রায় ৪৩ দিনে ইসরায়েলের নির্বিচার হামলায় ১২ হাজার নিরিহ ফিলিস্তিনির মৃত্যু নিয়ে তেমন কোনো কথা নেই। বিষয়টা এমন, হামাস এটা না করলে ইসরায়েল ‘আত্মরক্ষা’র স্বার্থ তো এত ফিলিস্তিনিকে মারত না।
প্রেসিডেন্ট বাইডেন্ট দীর্ঘ নিবন্ধের এক পর্যায়ে লিখেছেন, ‘আমিও, গাজার ছবি দেখে এবং শিশুসহ হাজার হাজার বেসামরিক নাগরিকের মৃত্যু দেখে হৃদয় ভেঙে পড়েছে। বাবা-মাকে হারিয়ে কাঁদছে ফিলিস্তিনি শিশুরা। পিতামাতারা তাদের হাত বা পায়ে সন্তানের নাম লিখছেন যাতে সবচেয়ে খারাপ ঘটনা ঘটলে তাদের সনাক্ত করা যায়। ফিলিস্তিনি নার্স ও ডাক্তাররা তাদের সম্ভাব্য প্রতিটি মূল্যবান জীবন বাঁচানোর জন্য মরিয়া চেষ্টা করছেন, সামান্য বা কোনো উপকরণ ছাড়াই। প্রতিটি নিরাপরাধ ফিলিস্তিনি জীবন হারানো একটি ট্র্যাজেডি, যা পরিবার এবং সম্প্রদায়কে বিচ্ছিন্ন করে দেয়।’ লক্ষ্য করুন, ১২ হাজার ফিলিস্তিনির মত্যুর জন্য দায়ী ইসরায়েলের কথা একবারও উল্লেখ করেননি বাইডেন।
গাজায় ইসরায়েলি বাহিনীর নৃশংসতা বাইডেন কিছু না বললেও পশ্চিম তীর নিয়ে মুখ খুলেছেন। প্রেসিডেন্ট বাইডেন পশ্চিম তীরে ফিলিস্তিনিদের বিরুদ্ধে সহিংসতা বন্ধের আহ্বান জানিয়ে বলেছেন, যারা এ কাজ করছে আমেরিকা তাদের বিরুদ্ধে ভিসা নিষেধাজ্ঞা জারি করতে প্রস্তুত। ইসরায়েলিরা এখন ভিসা ছাড়াই আমেরিকায় ঢোকার অনুমতি পেয়ে থাকে। গত অক্টোবর থেকে এই ব্যবস্থা কার্যকর হয়েছে।
বাইডেন লিখেছেন, ‘আমি ইসরায়েলের নেতাদের সাথে আলাপকালে জোর দিয়েছি যে, পশ্চিম তীরে ফিলিস্তিনিদের বিরুদ্ধে সহিংসতা বন্ধ করতে হবে। যারা সহিংসতা করছে তাদের অবশ্যই জবাবদিহি করতে হবে। আমেরিকা পশ্চিম তীরের বেসামরিক নাগরিকদের ওপর হামলাকারী চরমপন্থীদের বিরুদ্ধে ভিসা নিষেধাজ্ঞা জারিসহ নিজস্ব পদক্ষেপ নিতে প্রস্তুত।’
মার্কিন পররাষ্ট্র দপ্তরের মুখপাত্র ম্যাট মিলারও বলেছেন, এ ধরনের ব্যবস্থা নেওয়া হবে যদি ইসরায়েল এই কর্মসূচি মেনে না নেয়। অর্থাৎ গাজা ও পশ্চিম তীরে ইসরায়েলের কার্যকলাপে আমেরিকা যে বেশ চাপের মধ্যে আছে তা বাইডেন প্রশাসনের বক্তব্যে পরিস্কার।
সাম্প্রতিক সময়ে আমেরিকা কথায় কথায় যেভাবে ভিসা নিষেধাজ্ঞার হুমকি দিচ্ছে তাতে এর কার্যকারিতা নিয়ে সন্দেহ থেকেই যায়। বাংলাদেশেরই এক বিরাট সংখ্যাক মানুষের মার্কিন ভিসা নিষেধাজ্ঞার বিষয়টি বলতে গেলে মুখস্থ হয়ে গেছে। এতে কেউ পুলকিত, কেউ কিঞ্চিত চিন্তাগ্রস্ত। কিন্তু এটা যে আসলে কী তা মনে হয় এই বিরাট সংখ্যক বাংলাদেশির মাথার ওপর দিয়ে চলে যাচ্ছে। সম্প্রতি শ্রম অধিকার লঙ্ঘিত হলেও ভিসা নিষেধাজ্ঞা আসতে পারে বলে পররাষ্ট্রমন্ত্রী অ্যান্টনি ব্লিঙ্কেন এক ঘোষণায় জানিয়েছেন।
এ বছরই প্রায় ১৩টির বেশি দেশের ওপর ভিসা নিষেধাজ্ঞা জারি করেছে আমেরিকা। এই তালিকায় আছে ইরান, ইরাক, লিবিয়া, উত্তর কোরিয়া, সোমালিয়া, নাইজেরিয়া, সুদান, সিরিয়া, মিয়ানমার, কম্বোডিয়া, কিরঘিজিস্তান, হাইতি, তানজানিয়া ও ইরিত্রিয়া। এই তালিকা যেকোনো সময় পরিবর্তন হতে পারে। কিন্তু লক্ষ্য করার বিষয়, একেক দেশ একেক কারণে মার্কিন ভিসা নিষেধাজ্ঞার কবলে পড়েছে। কেউ নির্বাচন নিয়ে তো কেউ নারী শিক্ষা নিয়ে। আবার কেউ মানবাধিকারসহ বিভিন্ন বিষয়ে অভিযুক্ত হয়ে। এখন এই প্রশ্ন খোদ আমেরিকায় উঠতে শুরু করেছে, অন্য দেশের ক্ষমতাশালীদের বিরুদ্ধে এই ভিসা নিষেধাজ্ঞায় আসলে তাদের কতটা উদ্দেশ্য সাধিত হচ্ছে। প্রশ্ন যখন সেখানেই ফলে উত্তরটা অন্যদের অজানা।
তারচেয়ে আসুন, ইসরায়েল ভিসা নিষেধাজ্ঞার বিষয়টি দেখা যাক। বিশ্বের বিভিন্ন দেশ থেকে ইহুদিরা এসে ইসরায়েলে রাষ্ট্রীয় মদদে বসতি গেড়ে ‘সেটেলার’-এর মর্যাদা পেয়েছে। এরা কীভাবে বসতি গড়েছে? কোনো ফাঁকা জায়গায়? না। স্থানীয় ফিলিস্তিনিদের বাড়িঘর গুড়িয়ে, তাদের এলাকা ছাড়া করে সেখানে গড়ে উঠেছে আধুনিক ইসরায়েলি বসতি, যার শুরু সেই ১৯৪৮ সাল থেকে। এই সেটেলাররা একবার দেশ ছেড়ে এসে আবার কবে আমেরিকায় যাবে তার কোনো ঠিক আছে? এদের জন্য ভিসা নিষেধাজ্ঞা কী কাজে দেবে? তাহলে কী এটা লোক দেখানো মাত্র! গাজায় যেখানে হাজার শিশুর প্রাণহানি বন্ধ করতে ব্যর্থ ‘হৃদয় ভেঙে’ পড়া প্রেসিডেন্ট বাইডেন, সেখানে তিনি পশ্চিম তীরে সহিংসপন্থায় বসতি গড়া বন্ধ করবেন কীভাবে!
লেখক: নির্বাহী সম্পাদক, ডিজিটাল বিভাগ, ইনডিপেনডেন্ট টেলিভিশন