পাকিস্তান: ইয়াহিয়ার ভুল কি আসিম মুনিরও করতে চলেছেন

আপডেট : ২৬ নভেম্বর ২০২৪, ০১:১৪ পিএম

পাকিস্তানের জন্মলগ্ন থেকে নির্বাচন নিয়ে দোলাচল আর গেল না। কোনোভাবে গুছিয়েই উঠতে পারল না দেশটা। এর একটা বড় কারণ মনে হয়, দেশের সাধারণ মানুষের ওপর অবিশ্বাস। জন্মকাল থেকেই দেশটির এলিট শাসকগোষ্ঠী ধরেই নিয়েছে, দেশ চালানোর মতো নেতৃত্ব নির্বাচনের যোগ্যতা এখনো পাকিস্তানের মানুষ অর্জন করেনি। একাত্তরে বড় ধরনের খেসারত দেওয়ার পরও তাদের সেই খাসলত আজও যায়নি। পাকিস্তান বোধহয় বিশ্বের একমাত্র দেশ, যেখানে নির্বাচিত প্রধানমন্ত্রী তাঁর পাঁচ বছর মেয়াদ পূর্ণ করতে পারেন না। অথচ তাঁরই নিয়োগপ্রাপ্ত সেনাপ্রধান শুধু মেয়াদই পূরণ করেন না, প্রায়শই চাকরির মেয়াদ বৃদ্ধিরও সুযোগ পান। আর কপাল ভালো হলে তো কথাই নেই। দেশের ত্রাতা সেজে নিদেনপক্ষে কয়েক বছর সামরিক শাসনের জাঁতাকলে দেশবাসীকে পিষ্ট করে তবেই বিশ্রাম নেন। কী মজা,কেউ টুঁ শব্দটিও করে না!

এখন অবশ্য অবস্থা কিছুটা বদলেছে। পাকিস্তানের সশস্ত্র বাহিনী এখন কিং সাজার পরিবর্তে কিং মেকার হওয়ায় অনেক বেশি আগ্রহী। আর আগ্রহ থাকবে নাই-বা কেন! পাশে যদি একাধিক ধামাধারী রাজনৈতিক দল পাওয়া যায় তো কথাই নেই। পাকিস্তানের আইনসভার (প্রতিনিধি পরিষদ) মেয়াদ পার হয়ে গেছে আগেই। বিদায়ী প্রধানমন্ত্রী শাহবাজ শরিফ পদত্যাগ করে তত্ত্বাবধায়ক সরকারের অন্তর্বর্তী প্রধানমন্ত্রী আনোয়ার উল হক কাকরের হাতে ক্ষমতা তুলে দিয়ে গেছেন। ঠিক ছিল গত অক্টোবরে নির্বাচন হবে। কারণ, পার্লামেন্ট ভেঙে দেওয়ার তিন মাসের মধ্যে ভোটের মাধ্যমে নতুন পার্লামেন্ট গঠনের কথা। সে তো আসলে কথার কথা। সংবিধান নামের কেতাবে তা লেখা আছে। তা যে মানতে হবে—এমন দিব্যি কি কেউ দিয়েছে? দেয়নি। অতএব যস্মিন দেশে যদাচার!

তত্ত্বাবধায়ক সরকার হলো, নির্বাচন কমিশন প্রস্তুতি নিল, তারপরও যথাসময়ে ভোট হলো না। কেন? সে এক বিরাট ইতিহাস। এই ইতিহাসের শিরোনাম ‘মাইনাস ওয়ান’। সেটা আবার কী, প্রশ্ন তুলতেই পারেন। সে গল্পে পরে আসছি। এখন মোটামুটি ঠিক হয়েছে আগামী বছরের ফেব্রুয়ারি মাসের দ্বিতীয় সপ্তাহে ভোট গ্রহণ হবে। ৮ বা ১১ বা ১২—এই তিনটি তারিখ এখন ভোটের আসরে আলোচিত। দেখা যাক, কে জয়যুক্ত হয়।

পাকিস্তানের জাতীয় নির্বাচন তিন মাস পিছিয়ে দেওয়ার কারণ হিসেবে বলা হচ্ছে সংসদীয় আসনগুলোর সীমানা পুনর্নির্ধারণ। এটা আসলে কথার কথা। কালক্ষেপণের একটা অছিলা মাত্র। আসলে ২০১৮ সালের সাজানো নির্বাচনে ইমরান খানের দলকে জিতিয়ে আনার আক্কেলসেলামি দিচ্ছে পাকিস্তান সেনাবাহিনী। তৎকালীন সেনাপ্রধান কামার জাভেদ বাজওয়া ভেবেছিলেন ইমরান নামের একটা পুতুল পেয়ে গেছেন, একে যেমন নাচাবেন তেমনি নাচবে। বছর দুয়েক তেমনটাই চলছিল। কিন্তু যিনি পাকিস্তান ক্রিকেট দলের অধিনায়ক হয়ে বোর্ডের কর্তাদের নাকানি-চোবানি খাইয়েছেন, তিনি প্রধানমন্ত্রী হিসেবে  অধীনস্থ সেনাপ্রধানের ‘জো হুজুর’ হয়ে থাকবেন–এ ভাবাটা বড্ড বাড়াবাড়ি। আবার আইএসআই প্রধান পদে ইমরান নিজের পছন্দের লোককে নিয়োগ দেবেন, এটা কোনোভাবে জেনারেল বাজওয়া বা সেনা নেতৃত্ব মানতে পারেননি। ফলে দ্বন্দ্বযুদ্ধে হেরে প্রধানমন্ত্রী পদ খুইয়ে খেসারত দিতে হয়েছে ইমরানকে।

ইমরান খান। ফাইল ছবিকপালের কী ফের, যে আসিম মুনিরকে মহাক্ষমতাধর সেনা-গোয়েন্দা সংস্থা আইএসআই-এর প্রধান পদে রাখতে চাননি ইমরান খান, সেই আসিমই এখন সেনাপ্রধান। আর ইমরান খান জেলে, কবে ছাড়া পাবেন—তার কোনো ঠিক নেই। নির্বাচনের আগে তো নয়ই, তা জোর দিয়ে বলা যায়। ক্ষমতা হারিয়ে ইমরান অপরিপক্বতার পরিচয় দিয়েছেন। এর মধ্যে মূল হলো: তাঁর সরকারকে ফেলে দেওয়ার জন্য সেনাবাহিনীকে দায়ী করা; দুই. আইএসআই-এর বিরুদ্ধে তাঁকে হত্যা চেষ্টার প্রকাশ্য অভিযোগ আনা; তিন. আদালতের মাধ্যমে গ্রেপ্তার হওয়ার পর তাঁর দলের সমর্থকদের সেনা স্থাপনায় হামলা। এই তিনটি কাজ করে একদা ‘নয়নের মণি’ ইমরান এখন সেনাবাহিনীর চক্ষুশূল। তাঁকে বা তাঁর দল তেহরিক-ই ইনসাফ (পিটিআই)কে কোনোভাবেই নির্বাচনে অংশ নিতে দিতে চায় না পাকিস্তান সেনাবাহিনী। প্রধানমন্ত্রী কাকর স্পষ্ট বলেছেন, ইমরানের দলের মধ্যে যে নেতারা আন্দোলন বা সহিংসতায় অংশ নেননি, তাঁরা নির্বাচনে দাঁড়াতে পারবেন। মোদ্দা কথা, ইমরানের সাথে থাকলে নির্বাচন থেকে দূর হটো। কাকরের মুখে তো আসলেই আসিম মুনিরেরই কথা।

কিন্তু বললেই তো হলো না। কাকর বা মুনির যেটা ভাবছেন সেটা যে হবে, এ নিশ্চয়তা তাঁরা পেলেন কোত্থেকে? পাকিস্তানের সবচেয়ে বড় প্রদেশে পাঞ্জাব। জাতীয় প্রাদেশিক পরিষদের ২৬৬টি আসনের অর্ধেকই সেখানে। কিছুদিন আগেও ইমরানের দল এই রাজ্যে ক্ষমতায় ছিল। ইমরান গ্রেপ্তার হওয়ার পর পাঞ্জাবে তাঁর জনপ্রিয়তা ঊর্ধ্বমুখী। এই মুহূর্তে সুষ্ঠু নির্বাচন হলে সেখানে পিটিআইকে হারানো অসম্ভব। আর এই প্রদেশে যে ভালো করবে, সেই পাকিস্তানে ক্ষমতায় বসবে—এমনটাই দস্তুর।

নওয়াজ শরিফ। ফাইল ছবিসেজন্য জেনারেল আসিম মুনিররা অনেক পরিকল্পনা করে পাকিস্তান মুসলিম লীগ (এন)-এর নির্বাসিত নেতা নওয়াজ শরিফকে লন্ডন থেকে জামাই আদরে দেশে ডেকে এনেছেন। কিছুদিন আগেও যিনি দুর্নীতির দায়ে সাজা ভোগ করছিলেন, যার জেলে থাকার কথা, যিনি গুরুতর অসুস্থ অবস্থায় উন্নত চিকিৎসার জন্য লন্ডনে ছিলেন, তিনিই এখন বেকসুর। চতুর্থবারের মতো প্রধানমন্ত্রী হবেন কি না—এটাই এখন বড় প্রশ্ন। তবে পাকিস্তানের সামরিক বাহিনী ও নিরাপত্তা বিষয়ে বিশেষজ্ঞ আয়েশা সিদ্দিকির মতে, ইমরান ঠেকাতে নওয়াজকে আনা হয়েছে ঠিকই, তবে প্রধানমন্ত্রীর পদ দেওয়ার জন্য নয়। কারণ সেনাবাহিনী দেশ চালাতে দেওয়ার ব্যাপারে  তাঁকে বিশ্বাস করে না। 

তাহলে সেনাবাহিনী কী চায়? চায় একটা দুর্বল জাতীয় পরিষদ, যেখানে কেউ খুব বেশি আসন পাবে না। তাহলে ইচ্ছামতো দল ও দলনেতাকে টেনে নামানো-ওঠানো যাবে। সেনাবাহিনী হিসেবে জেনারেল আসিম মুনিরদের ভাবনাটা খুব একটা অযৌক্তিক না, বরং এতে ইতিহাস ও পরম্পরা রক্ষা পায়। কারণ ১৯৪৭-এর পর থেকে তো তাঁরা এমনটাই ভেবে এসেছেন। ১৯৭০-এর নির্বাচনে জেনারেল ইয়াহিয়া খানও এমনটাই ভেবেছিলেন। পূর্ব-পশ্চিমে কেউ গরিষ্ঠতা পাবে না। ফলে নিজেদের মধ্যে মারামারিতে ব্যস্ত থাকবে। আর মাঝখানে তিনি ক্ষমতার মধু তারিয়ে তারিয়ে উপভোগ করবেন। কিন্তু কে জানত পুবের মানুষ এভাবে তাঁর পাশার দান উল্টে দেবে? তাঁর সোনার সংসার সিন্ধুর পানিতে ভেসে যাবে? ভেঙে ‘খান খান’ হয়ে যাবে ইয়াহিয়া খানের পেয়ারা পাকিস্তান।

সেই ’৭০-এর সাথে ২০২৪ এর কোথায় যেন একটা মিল পাওয়া যাচ্ছে। হয়তো দূরতম।

গৃহবাসী ইমরানের চেয়ে কারাবন্দি ইমরান এখন অনেক শক্তিশালী। শুধু পাঞ্জাব না, খাইবার পাখতুনখাওয়া প্রদেশেও তাঁর দল ক্ষমতায় আসবে, এটা নিশ্চিত। সিন্ধু ও বেলুচিস্তানে পিটিআই-এর সমর্থন বাড়ছে। এমনটাও হতে পারে, বহুদিন পর পাকিস্তানের সাধারণ মানুষ এমন একজন নেতাকে পেয়েছে, যিনি শক্তিশালী সেনা নেতৃত্বের সামনে বুক চিতিয়ে দাঁড়াতে পারেন। কেমন যেন একাত্তরের গন্ধ পাচ্ছেন, না? সেদিনও অনেকে ভাবতে পারেনি ‘পরাক্রমশালী পাকিস্তানি সেনারা’ মাত্র নয় মাসের যুদ্ধে পর্যুদস্ত হয়ে ‘৯০ হাজার বন্দী’ হয়ে হাতকড়া পরে মাথা নিচু করে দেশে ফিরবে।

ইয়াহিয়া খান। ফাইল ছবি

ইমরানের ভাঙাচোরা দল যদি এবার সত্যিই ভালো করে ফেলে তো কী হবে? কোথায় যাবে মাইনাস ওয়ান ফরমুলা? একাত্তরের ৭ই মার্চ বঙ্গবন্ধুর সেই ঐতিহাসিক ভাষণের কথা মনে আছে। “নির্বাচন হলো। আমি প্রেসিডেন্ট ইয়াহিয়া খান সাহেবের সঙ্গে দেখা করেছি। আমি, শুধু বাংলার নয়, পাকিস্তানের মেজরিটি পার্টির নেতা হিসাবে তাকে অনুরোধ করলাম, ১৫ই ফেব্রুয়ারি তারিখে আপনি জাতীয় পরিষদের অধিবেশন দেন। তিনি আমার কথা রাখলেন না, তিনি রাখলেন ভুট্টো সাহেবের কথা। তিনি বললেন, প্রথম সপ্তাহে মার্চ মাসে হবে। আমরা বললাম, ঠিক আছে, আমরা এসেম্বলিতে বসবো। আমি বললাম, এসেম্বলির মধ্যে আলোচনা করব; এমনকি আমি এ পর্যন্ত বললাম, যদি কেউ ন্যায্য কথা বলে, আমরা সংখ্যায় বেশি হলেও, একজনও যদি সে হয়, তার ন্যায্য কথা আমরা মেনে নেব।’ বাকিটা ইতিহাস।

জেনারেল আসিম মুনির যদি ইয়াহিয়ার মতো গোঁ ধরে থাকেন যে, ইমরান বা তাঁর দলকে নির্বাচনে আসতেই দেবেন না, তাহলে পাকিস্তানের ইতিহাস অন্যভাবে লেখা হতে পারে। ঠিক যেমনটা হয়েছে ১৯৭১-এ। জেনারেল মুনির মনে রাখলে ভালো করবেন, হোসেন শহীদ সোহরাওয়ার্দী, জুলফিকার আলী ভুট্টো, নওয়াজ শরিফ—এরা সবাই জেল থেকে বেরিয়ে রাজনীতিতে আরও শক্তিশালী হয়েছেন। আর একজন তো জেল থেকে বেরিয়ে স্বাধীন দেশের প্রধানমন্ত্রী হলেন—জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান। ইতিহাসকে কোন পথে চালিত করবেন, তা এখন জেনারেল আসিম মুনিরকে ঠিক করতে হবে।

লেখক: নির্বাহী সম্পাদক, ডিজিটাল বিভাগ, ইনডিপেনডেন্ট টেলিভিশন

প্রতিশ্রুতি আছে, পরিকল্পনা নেই— বাস্তবায়ন তো দূরের কথা! জাতীয় নির্বাচন সামনে রেখে দেশের প্রায় সব রাজনৈতিক দলই তাদের নির্বাচনী ইশতেহার ঘোষণা করেছে। স্বাস্থ্য, শিক্ষা, খাদ্য নিরাপত্তা, কর্মসংস্থান,...
ভারত যে পাকিস্তানের বিরুদ্ধে এক ধরনের সামরিক পদক্ষেপ নেবে, সেটি এক অর্থে অনুমিতই ছিল। অন্তত ভারত ও পাকিস্তানের গত ১০ বছরের রাজনৈতিক ও সামরিক কর্মকাণ্ডের বিষয়ে যারা একটু-আধটু খোঁজখবর রাখেন, তারা এই...
তুচ্ছ ধর্মীয় ইস্যুতে যেমন গোমাংস ভক্ষণের দায়ে মুসলমানদের পিটিয়ে মেরে ফেলা হয়। অথচ স্বাধীনতা সংগ্রামে তাদের অবদান বাদই দিলাম, বর্তমানেও ভারতে তাদের অবদান হিন্দুদের চেয়ে কোনো অংশে কম না। বিশেষ করে...
কাশ্মীরের পেহেলগামে সন্ত্রাসী হামলায় ২৬ জন নিহত হওয়ার পর সিন্ধু জলচুক্তি স্থগিত করেছে ভারত। এই স্থগিতাদেশ আনুষ্ঠানিকভাবে বাস্তবায়িত হয় ভারতের পানিসম্পদ মন্ত্রণালয়ের সচিব দেবাশ্রী মুখার্জির একটি...
আসন্ন স্থানীয় সরকার নির্বাচনে প্রার্থিতা নিয়ে বড় সিদ্ধান্ত নিতে যাচ্ছে নির্বাচন কমিশন (ইসি)। মঙ্গলবার এ সংক্রান্ত একটি বৈঠক শেষে সাংবাদিকদের এ তথ্য জানান নির্বাচন কমিশনের জ্যেষ্ঠ সচিব আখতার আহমেদ।
ভারতের রাজধানী দিল্লির রাজপথ রবিবার উত্তাল হয়ে ওঠে নিট পরীক্ষায় অনিয়মের অভিযোগ ও শিক্ষাব্যবস্থার সংস্কারের দাবিতে আয়োজিত ‘চলো সংসদ’ কর্মসূচিকে কেন্দ্র করে। হাজার হাজার শিক্ষার্থীর...
বিশ্বকাপের ফাইনাল শেষে এবার বড় রহস্যের জন্ম দিয়েছে লিওনেল মেসির দেওয়া একটি সংক্ষিপ্ত বক্তব্য। বিশ্বকাপের ফাইনালে মাঠে নামার আগে সতীর্থদের উদ্দেশে মেসির দেওয়া সেই সংক্ষিপ্ত বক্তব্য এখন সামাজিক...
ফেসবুকে এক নারীর সঙ্গে সাতক্ষীরা-৪ আসনের সংসদ সদস্য (এমপি) গাজী নজরুল ইসলামের ঘনিষ্ঠ মুহূর্তের ভিডিও ছড়িয়ে পড়ার পর বিবৃতি দিয়েছে জামায়াতে ইসলামী। এতে দাবি করা হয়েছে, দলের পক্ষ থেকে প্রকৃত ঘটনা...
লোডিং...
পঠিতনির্বাচিত

এলাকার খবর