ফিলিস্তিনে ইসরায়েল ও তার বন্ধুদের আসল উদ্দেশ্য

আপডেট : ২৬ নভেম্বর ২০২৪, ০১:১৪ পিএম

ইসরায়েলের ভেতরে হামাস যোদ্ধাদের হামলার পর মাস পেরিয়ে গেছে। এই সময়ে হামাস যা করেছে, ‘আত্মরক্ষা’র নামে তার হাজারগুণ ধ্বংসযজ্ঞ চালিয়েছে ইসরায়েল। বিশ্বের একমাত্র ‘উন্মুক্ত কারাগারে’ গত ৩৭ দিনে ইসরায়েল যে পরিমাণ বোমা ফেলেছে, তা ১৯৪৫ সালে জাপানের হিরোশিমায় ফেলা পারমাণবিক বোমা লিটল বয়-এর দুটির সমান শক্তিশালী। এখনো স্থল ও আকাশ থেকে আক্রমণ অব্যাহত আছে। শেষমেষ তা হয়তো হিরোশিমা-নাগাসাকির যোগফলকেও ছাড়িয়ে যেতে পারে।

আরেকটি হিসাব একটু দেখুন: রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধের ২১ মাসে ৯৭০০ জন বেসামরিক নাগরিক নিহত হয়েছে। অন্যদিকে হামাসের বিরুদ্ধে লড়াইয়ে এক মাসে ১০ হাজারের বেশি বেসামরিক ফিলিস্তিনি নাগরিককে হত্যা করেছে ইসরায়েলের সেনাবাহিনী। কিন্তু মানবাধিকারের রক্ষাকর্তাদের কপালে ভাঁজ কোন ঘটনায় বেশি পড়েছে বা কোনটা একেবারে ধর্তব্যের মধ্যে নেই, তা এতদিনে বিজ্ঞ পাঠক বুঝে গেছেন।

তিন. হামাসের বিরুদ্ধে বা লেবাননের ইরানপন্থী হিজবুল্লার ওপর ইসরায়েলের হামলার ঘটনা নতুন কিছু নয়। মাঝেমধ্যেই আকাশ থেকে নেমে আসে বোমাবৃষ্টি অথবা ভয়ংকর বিস্ফোরক-সমৃদ্ধ দূর-নিয়ন্ত্রিত অত্যাধুনিক ক্ষেপণাস্ত্র। আর এ জন্য প্রকাশ্যে বা গোপনে আমেরিকা থেকে জাহাজ বোঝাই হয়ে বিনা মূল্যে এই ব্রহ্মাস্ত্রের চালান আসে তেল আবিবে। এবারও সবকিছুই আসছে। সাথে যোগ হয়েছে, ভূমধ্যসাগরে দুটি যুদ্ধবিমানবাহী বিশাল মার্কিন রণতরী। যুক্ত হয়েছে আমেরিকার পারমাণবিক অস্ত্রে সজ্জিত ডুবোজাহাজ, যাকে সাবমেরিন নামেই সবাই চেনে। আমেরিকার পিছ পিছ ফেউ-এর মতো জুটেছে ব্রিটেশ যুদ্ধজাহাজ ও সর্বোচ্চ প্রশিক্ষিত সেনাদল।

এবার আসি যাদের বিরুদ্ধে ইসরায়েল ও তার মিত্ররা লড়াইয়ে নেমেছে তাদের সংখ্যা আসলে কত—সে প্রসঙ্গে। লন্ডনভিত্তিক বার্তা সংস্থা রয়টার্সের হিসাব বলছে, হামাসের মিলিটারি শাখার সদস্য সংখ্যা ৩০-৪০ হাজার। কেউ কেউ বলে হামাসের সক্রিয় যোদ্ধার সংখ্যা ১০ হাজারের বেশি হবে না। অন্যদিকে কাতারভিত্তিক টিভি চ্যানেল আল–জাজিরার অনলাইনের এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, হিজবুল্লাহ–এরর দাবি তাদের সশস্ত্র সদস্যের সংখ্যা এক লাখ। অর্থ বা বয়স বাদে অন্য সবকিছু সবাই একটু বাড়িয়েই বলে, এমনটাই দস্তুর। ফলে হামাস বা হিজবুল্লাহ–এর সশস্ত্র সদস্যের সংখ্যা নিয়ে যেটা বলা হচ্ছে, তা নিরপেক্ষ সূত্র থেকে যাচাই করা কঠিন। কারণ তারা কোনো সরকারি নিরাপত্তাবাহিনী নয়। এ জন্য সংখ্যার মধ্যে অতিশোয়াক্তি থাকতেই পারে।

এর বিপরীতে ইসরায়েলের সশস্ত্র বাহিনীর সদস্য সংখ্যা ১ লাখ ৭০ হাজার। এই বাহিনীকে সমীহ করে না—এমন লোক খুঁজে পাওয়া কঠিন। আছে ৩৪ হাজার বিমান সেনার সাথে ৬৮০টি অত্যাধুনিক যুদ্ধবিমান। ট্যাংক, কামানসহ অন্যান্য অস্ত্রের কথা নাই-বা বললাম। আমেরিকার ঘরে যে ধন (অস্ত্র) আছে, ইসরায়েলের কাছেও সেটা আছে। আর দেশটির প্রতিরক্ষা বাজেট কত জানেন ২০৫০ কোটি ডলার বা ২ লাখ ৩৬ হাজার কোটি টাকা। এর বাইরের দানধ্যান-সাহায্যে কত আসে কে জানে। এই রকম একটা শক্তিশালী বাহিনীর কাছে হামাস কি কিছু?

আর কথা হলো, এই হামাস বা হিজবুল্লাহকে এতদিন তো ইসরায়েলের সেনাবাহিনী নিজেই মোকাবিলা করে এসেছে। ১৯৬৭ সালের আরব-ইসরায়েল যুদ্ধের পর থেকে তো তাদের অন্যের সেনাবাহিনীর সাহায্যের দরকার হয়নি। তাহলে এবার কী এমন ঘটল যে, শৌর্যে-বীর্যে খ্যাতির শিখরে থাকা ইসরায়েলের প্রতিরক্ষা বাহিনীর (আইডিএফ) আমেরিকা ও ব্রিটেনের সাহায্য লাগছে? তাহলে কি এর পিছনে অন্য কোনো কাহিনী আছে? আমরা সেটিই বোঝার চেষ্টা করব এই লেখার পরের অংশে।

নেতানিয়াহু: খলনায়ক থেকে নায়ক হওয়ার ইচ্ছা

ইসরায়েলের ইতিহাসে সবচেয়ে বেশি দিন ধরে প্রধানমন্ত্রী পদে আসীন আছেন বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু। আকণ্ঠ দুর্নীতিতে নিমজ্জিত লিক্যুদ পার্টির ৭৪ বছর বয়সী এই নেতা গত বেশ কিছু দিন ধরে নাস্তানাবুদ হচ্ছিলেন দেশের রাজনীতিতে। এখন উগ্র ডানপন্থীদের ডানায় ভর করে টিকে আছেন। এরই মধ্যে নেসেটে আইন পাস করে আদালতের অধিকার খর্ব করেছেন। এ নিয়ে দেশের ভেতরে শিক্ষিত ইহুদিদের প্রচণ্ড বাধার মুখে তিনি। এমন বাধার মুখে তিনি বারবার পড়েছেন, আবার উৎরেও গেছেন। ভাগ্যবান বটে! হামাসের ৭ অক্টোবরের হামলার ঘটনা বলা যায় তাঁর হাতে পরশপাথর এনে দিয়েছে।

 ব্রিটিশ সাংবাদিক ম্যাক্স হিউজ ম্যাকডোনাল্ড হেস্টিংসের বই গোয়িং টু দ্য ওয়ারসের একটি অংশবিশেষ। ছবি: সংগৃহীতএই নেতানিয়াহুর অতীতটা একবার দেখে আসা যাক। ১৯৭০ সালে ব্রিটিশ সাংবাদিক ম্যাক্স হিউজ ম্যাকডোনাল্ড হেস্টিংসের সাথে জেরুজালেমে দেখা হয়েছিল ২১ বছরের নেতানিয়াহুর। হেস্টিংসকে তিনি বলেছিলেন, এরপর যদি আরবদের সাথে কোনো যুদ্ধ বাধে তাহলে তাদের সামনে একটা বড় সুযোগ আসবে। আর সেই সুযোগে ফিলিস্তিন এলাকা থেকে সব ফিলিস্তিনিকে বিদায় করা হবে। ওয়েস্ট ব্যাংক খালি করে ফেলবেন তাঁরা। ঠিক করে ফেলবেন জেরুজালেম। নেতানিয়াহুর এই কথাগুলোই হেস্টিংস তাঁর গোয়িং টু দ্য ওয়ারস বইয়ে হুবহু লিখেছেন। বইটি ২০০০ সালের ১ জানুয়ারি লন্ডনের প্রকাশনা সংস্থা ম্যাকমিলান প্রকাশ করে। ২৮টির বেশি বইয়ের লেখক হেস্টিংস সাংবাদিকতা করেছেন বিবিসি, ইভিনিং স্ট্যান্ডার্ড, ডেইলি টেলিগ্রাফে। সাংবাদিকতা করেছেন উত্তর আয়ারল্যান্ড, ভিয়েতনাম, কম্বোডিয়া, মধ্যপ্রাচ্য, সাইপ্রাস, ভারতসহ বিশ্বের বিভিন্ন সংঘাতপ্রবণ এলাকায়। এ নিয়ে তাঁর একাধিক বই আছে।

ফলে হেস্টিংসের কথা একেবারে উড়িয়ে দেওয়া যায় না। হেস্টিংসকে বলা কথার ৫৩ বছর পর গত সেপ্টেম্বরে জাতিসংঘের সাধারণ অধিবেশনে নেতানিয়াহু ইসরায়েলের যে নতুন মানচিত্র তুলে ধরেন, সেখানে ফিলিস্তিনের কোনো অস্তিত্বই ছিল না। দেখছেন, কেমন দুয়ে দুয়ে চার হয়। অর্থাৎ, সুদূরপ্রসারি পরিকল্পনার কীভাবে ধীরে ধীরে বাস্তবায়ন হয়, তা তো বুঝতেই পারছেন।

ম্যাক্স হিউজ ম্যাকডোনাল্ড হেস্টিংসের বই গোয়িং টু দ্য ওয়ারসের প্রচ্ছদ। ছবি: রয়টার্স

আসুন, আমরা আরেকটু পিছিয়ে যাই। ইসরায়েলের প্রথম প্রধানমন্ত্রী ছিলেন ডেভিড বেন গুরিয়ান (১৮৮৬–১৯৭৩)। পোল্যান্ডে জন্ম নেওয়া গুরিয়ান ১৯০৬ সালে তৎকালিন ফিলিস্তিনে (বর্তমান ইসরায়েল) চলে আসেন। জাতিসংঘে ইসরায়েলের জন্ম-প্রস্তাবে স্বাধীন ফিলিস্তিন রাষ্ট্রের কথাও উল্লেখ ছিল। গুরিয়ান তখন শুধু হেসেছিলেন। বলেছিলেন, ‘একবার হতে দাও। তারপর দেখা যাবে। এর কিছুই হবে না।’ হয়ওনি। ডেভিড বেন গুরিয়ান ও তাঁর পরবর্তী ইসরায়েলের রাজনৈতিক নেতৃবৃন্দ জাতিসংঘের স্বাধীন ফিলিস্তিন প্রস্তাবকে তামাশাপত্রে পরিণত করেছেন। সহযোগী ছিল আমেরিকা, ব্রিটেনসহ পশ্চিমা মিত্ররা।

ইসরায়েলের প্রথম প্রধানমন্ত্রী ডেভিড বেন গুরিয়ান। ছবি: সংগৃহীত

১৯৪৮ সাল থেকে শুরু নাকাবার (মহাবিপর্যয়) পর থেকে ফিলিস্তিনিরা শুধুই বাস্তুচ্যুত হয়েছে। আর কখনো ফিরে পায়নি নিজের বাড়ি-ঘর। এটাই যেন নিয়তি হয়ে দাঁড়িয়েছে তাদের জন্য। মিত্রদের সরব সম্মতিতে নেতানিয়াহু ও ইসরায়েল ২০২৩ সালের অক্টোবরে যা শুরু করেছে, তাতে মনে হতেই পারে—ফিলিস্তিনিদের জন্য শেষ ও স্থায়ী নাকাবা শুরু হয়ে গেছে। ফিলিস্তিন অধিকৃত পশ্চিম তীরে প্রতিদিন একটু একটু করে দখল বাড়িয়েছে ইসরায়েল। আর সেখানে দখলদার ইহুদিদের বসতি গড়ে উঠছে। ঘনবসতিপূর্ণ গাজায় এটা সম্ভব হচ্ছিল না। হামাসের কারণে সে সুযোগ এখন ইসরায়েলের হাতের মুঠোয়। উত্তরের বিস্তীর্ণ অঞ্চল বোমা মেরে গুঁড়িয়ে দেওয়া হয়েছে। মানুষজনকে তাড়িয়ে ঠেলে দেওয়া হয়েছে দক্ষিণে। তারা আর কোনো দিন উত্তরে ফিরতে পারবে—এ আশা বলতে গেলে সুদূর পরাহত। ইতিমধ্যে গাজাকে দুভাগ করার প্রস্তাব দিয়েছে ইসরায়েল। অর্থাৎ, এখন যে অংশ জনশূণ্য, তা কখনো আর ফিলিস্তিনিরা ফিরে পাবে না। এমনিই গাজা বিশ্বের অন্যতম ঘনবসতিপূর্ণ এলাকা। এখন যদি ২৩ লাখ মানুষকে তাদের আগের জায়গার অর্ধেক পরিসরে বাস করতে বাধ্য করা হয়, তাহলে বোধহয় নরকের সংজ্ঞা বদলাতে হবে।

এখানে আরেকটি বিষয় খেয়াল করুন। ৭ অক্টোবর হামাসের হামলার পর বলা হলো, প্রায় দুই বছর ধরে প্রস্তুতি নিয়ে হামাস এই ভয়াবহ হামলা চালিয়েছে। কিন্তু এই দুই বছরে বিশ্বের সবচেয়ে দক্ষ গোয়েন্দা সংস্থা হিসেবে পরিচিত মোসাদ বা ইসরায়েলের নিরাপত্তাবাহিনী (আইডিএফ) ঘুণাক্ষরেও টের পেল না? আর এখন কোন ঘরে, কোন স্কুলে, কোন হাসপাতালে, কোন ধর্মীয় স্থানে, কোন শৌচালয়ে হামাস সদস্যরা লুকিয়ে আছে, তা নাকি ইসরায়েলি সেনাদের জানা। এবং সেই অনুযায়ী বোমা মেরে মেরে তাদের খতম করার কাজ চলছে। হঠাৎ করে এই হামাস খোঁজার দক্ষতার এই পতন আর উত্থান ইঙ্গিত দেয় অন্য কিছুর। যা আসলে লোকচক্ষুর অন্তরালে ধীরে ধীরে ঘটে চলেছে। কী সেটা?

তেল-গ্যাসের স্বাদ রক্তের চেয়ে মধুর!

গত ৩০ অক্টোবর গাজায় যখন ঝাঁকে ঝাঁকে বোমা পড়ছে, শিশু-নারীসহ সাধারণ মানুষ মরছে, তখন ইসরায়েলের রাজধানী তেল আবিবে ভূমধ্যসাগরের গ্যাসক্ষেত্রের ভাগ-বাঁটোয়ারা চূড়ান্ত করা হচ্ছে। লেভিয়াথান নামে যে গ্যাসক্ষেত্রে অনুসন্ধান চালানোর কথা বলা হচ্ছে, সেখানে নাকি ২২ ট্রিলিয়ন কিউবিক ফিট (টিসিএফ) গ্যাস মজুত আছে। আমাদের ১৮ কোটি জনসংখ্যার দেশে প্রতি বছর এক টিসিএফের একটু বেশি গ্যাস লাগে। অর্থাৎ, এই ২২ টিসিএফ গ্যাস পেলে আমরা হেসে-খেলে ১৮-২০ বছর কাটিয়ে দিতে পারতাম। আর এক কোটির কম জনসংখ্যার দেশ ইসরায়েলের কথা ভাবুন। তাদের জন্য এটা কী বিরাট প্রাপ্তি। শুধু কি ইসরায়েল? বড় বড় তেল কোম্পনিগুলো সেখানে হামলে পড়েছে।

ভূমধ্যসাগরে ইসরায়েলের তামার নামে আরেকটি গ্যাসক্ষেত্র আছে। এখানে উত্তোলনযোগ্য গ্যাস আছে প্রায় সাড়ে ১১ টিসিএফ। এই তামার গ্যাসক্ষেত্র গাজার উত্তরাংশ থেকে মাত্র ২৫ কিলোমিটার দূরে। জেনে রাখুন, হামাসের হামলার পরপরই এখানে গ্যাস উত্তোলন বন্ধ করে দেওয়া হয়। কারণ তা হামাসের রকেটের পাল্লার মধ্যে পড়ে। পাঠক, ৭ সেপ্টেম্বরের হামলার পর ইসরায়েলের প্রথম নির্দশনার কথা মনে আছে? ওই নির্দেশনায় গাজাবাসীকে যত দ্রুত সম্ভব উত্তর থেকে দক্ষিণে চলে যেতে বলা হয়েছিল। অন্তঃমিল খুঁজে পাচ্ছেন কোথাও?

তামার থেকে নতুন লেভিয়াথান গ্যাসক্ষেত্রের দূরত্ব মাত্র ৪৭ কিলোমিটার। সেই হিসাবে গাজা থেকে এর দূরত্ব ৭২ কিলোমিটার মাত্র। গাজার পাশেই ভূমধ্যসাগর। হিসাবটাও খুব সহজ। ফিলিস্তিন যদি কোনো স্বাধীন দেশ হতো, তাহলে তার উপকূলের এত কাছের গ্যাসক্ষেত্রের ভাগ অবশ্যই তাকে দিতে হতো। আন্তর্জাতিক আইন তো তাই বলে। কিন্তু ভবিষ্যতে গাজায় যদি কেউ না থাকে, তাহলে ভাগ চাইবে কে? আর জান-ই যেখানে বাঁচে না, সেখানে গ্যাসের হিস্যা তো দূরস্তান। এখন মহামূল্যবান গ্যাসক্ষেত্রগুলোর হিসাব তো পরিষ্কার। এভাবেই হয়তো আপনি পরিষ্কার হয়ে যাবেন, হামাসকে বাহানা করে আসলে কী হতে যাচ্ছে। ইসরায়েলের জন্য সবার আগে দরকার এসব গ্যাসক্ষেত্রকে হামাসের রকেট হামলার পাল্লার বাইরে রাখা। হামাসকে গাজায় রেখে কি সেটা সম্ভব? কী মনে হয় আপনার?

বেন গুরিয়ান ক্যানাল। ছবি: সংগৃহীতএবার দেখা যাক, ৩০ অক্টোবর গ্যাসক্ষেত্রগুলো কাকে দিল ইসরায়েল। এই তালিকায় আছে ব্রিটিশ পেট্রোলিয়াম (বিপি-যুক্তরাজ্য), ইএনআই (ইতালি), ডানা পেট্রোলিয়াম (কোরিয়া), রেসিও এনার্জিস (ইসরায়েল), সকার (আজারবাইজান) ও নিউমেড (ইসরায়েল)। ইসরায়েলের উল্লেখিত দুটি প্রতিষ্ঠানের নেতৃত্বে দুটি গ্রুপ থাকবে। এরা প্রথমে তিন বছর কাজের সুযোগ পাবে। কাজে সন্তুষ্ট হলে আরও দুই বছর। সর্বোচ্চ ৭ বছর পর্যন্ত যুক্ত থাকতে পারবে এসব প্রতিষ্ঠান। তামার গ্যাসক্ষেত্রে ইতিমধ্যে সহযোগী প্রতিষ্ঠান হিসেবে কাজ করছে মার্কিন জ্বালানি প্রতিষ্ঠান শেভরন। লেভিয়াথানেও তারা আছে রেসিও এনার্জিসের সহযোগী হিসেবে। বুঝতেই পারছেন, কারা কেন আগ বাড়িয়ে ভূমধ্যসাগরে বিমানবাহী রণতরী থেকে পারমাণবিক যুদ্ধজাহাজ নিয়ে হাজির হলো।

সুয়েজ খালের সহোদর চাই

আদার ব্যাপারী হয়েও যারা জাহাজ চলাচলের খোঁজ রাখেন, তাঁদের কাছে সুয়েজ খাল এক অতি পরিচিত নাম। এশিয়া আর ইউরোপের মধ্যে জাহাজ চলাচলকে সহজতর করেছে এই খাল। ১৮৬৯ সাল থেকে গত ১৫৪ বছর ধরে এই সেবা দিয়ে চলেছে সুয়েজ। এতে কতটা সুবিধা হয়েছে, তার একটা উদাহরণ দেওয়া যাক। ব্রিটিশরা ভারতে আসার পর আফ্রিকা উপকূলের দীর্ঘ পথ ঘুরে ভারতের মুম্বাই বন্দরে আসতে হতো তাদের। সুয়েজ খাল হওয়ার পর লন্ডন থেকে মুম্বাই বন্দরের দূরত্ব কমে যায় ৪১ শতাংশ।

১৯৩ কিলোমিটার লম্বা, ২০৫ মিটার চওড়া ও ২৪ মিটার গভীর এই খাল লোহিত সাগর ও ভূমধ্যসাগরকে যুক্ত করেছে। বলা যায়, বিশ্বের জাহাজ চলাচলের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ পথ এটি। অনেক যুদ্ধ-বিগ্রহের পরও এর বিকল্প আর তৈরি হয়নি বা তৈরি করা সম্ভব হয়নি। চেষ্টা হয়নি তা নয়। এখনো হচ্ছে না, তা জোর দিয়ে বলা কঠিন।

আগে একটু ইতিহাসটা দেখে নেওয়া যাক। শুরু থেকে সুয়েজ খালের মালিক ছিল মিশর ও ফ্রান্স। মিশরের শাসক ইসমাইল পাশা এক পর্যায়ে তাঁর শেয়ার ব্রিটেনের কাছে বেচে দেন। তারপর থেকে সুয়েজ খালের নিয়ন্ত্রণ চলে যায় ফ্রান্স ও ব্রিটেনের হাতে। ১৯৫৬ সালে মিশরের প্রেসিডেন্ট গামাল আবদেল নাসের সুয়েজ খালের ওপর ফ্রান্স ও বিট্রেনের অধিকার অস্বীকার করেন এবং একে একটি রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানের নিয়ন্ত্রণে আনেন। এই সিদ্ধান্ত সহজে মেনে নেওয়ার বান্দা নয় ব্রিটেন ও ফ্রান্স। তারা ইসরায়েলকে সাথে নিয়ে যুদ্ধে ঝাঁপিয়ে পড়ে মিশরের বিরুদ্ধে। এই অসম লড়াইয়ে মিশর রক্ষা পায় তৎকালিন সোভিয়েত ইউনিয়নের জন্য। সেই থেকে সুয়েজ খাল মিশরের অধিকারে। গত বছরও এই পথে জাহাজ চলাচল থেকে মিশরের আয় হয়েছে ৯৪০ কোটি মার্কিন ডলার, যা বিশ্বব্যাংকের হিসাব অনুয়ায়ী, দেশটির জিডিপির ২ শতাংশের বেশি।

সুয়েজ খালের এই গুরুত্বের কথা ইসরায়েল রাষ্ট্রের জনকেরা প্রথম থেকে বুঝতে পেরেছিলেন। আর দু-তিন দফায় আরবদের সাথে যুদ্ধে জড়িয়ে নিজেদের জাহাজ চলাচল বন্ধ হওয়ার পর আরও ভালোভাবে অনুধাবন করেন তাঁরা। সে কারণে ১৯৬০ সালে তাঁরা সুয়েজ খালের বিকল্প হিসেবে বেন গুরিয়ান ক্যানাল প্রজেক্টের পরিকল্পনা করেছিলেন। এই পরিকল্পনা অনুযায়ী ইসরায়েলের নেগেভ মরুভূমির বুক চিরে একটি খাল কাটা হবে, যা লোহিত সাগরের পূর্বাংশ আকাবা উপসাগরকে ভূমধ্যসাগরের সাথে যুক্ত করবে। আর এই পথের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ এলাকা হলো গাজা স্ট্রিপ। বেন গুরিয়ান ক্যানাল হলে গাজা বলে আর কোনো এলাকার অস্তিত্ব থাকবে না। ভূমধ্যসাগরের তীরে গাজাতেই আসলে তৈরি হবে বেন গুরিয়ান পোর্ট। এবার কি কিছুটা পরিষ্কার হলো কেন ইসরায়েল গাজাকে ফিলিস্তিনি-মুক্ত করতে চায়?

এই খাল কাটা হবে কি, হবে না সেটা পরের কথা। কিন্তু পরিকল্পনা যদি করতেই হয়, তাহলে গাজাকে জনশূণ্য করার কোনো বিকল্প নেই। এবার দেখা যাক, সুয়েজের এই বিকল্প আসলে কতটা বাস্তবসম্মত?

ইসরায়েলকে যদি সুয়েজের বিকল্প খাল খনন করতেই হয়, তাহলে তা করতে হবে নিজেদের নেগেভ মরুভূমি এলাকার ওপর দিয়ে। এই প্রস্তরময় মরুপ্রান্তরে এত দীর্ঘ, চওড়া ও গভীর খাল খনন চাট্টিখানি কথা নয়। এর জন্য বিপুল মাটি সরাতে প্রয়োজন হতে পারে পারমাণবিক বিস্ফোরণ, যা অনেক আগেই আমেরিকানরা পরিকল্পনা করে রেখেছে। এই মুহূর্তে একটা জনবহুল এলাকার পাশে পাঁচ শতাধিক পারমাণবিক বিস্ফোরণ ঘটানো কতটা বাস্তবসম্মত? বলা কঠিন! কারণ এরা চাইলে সব পারে। যারা একটি জাতিকে ৭৫ বছরের মধ্যে নির্মূল করতে পারে, তাদের কাছে এটাও হয়তো জলভাত। এর সবচেয়ে বড় দিক হলো খরচ। বেন গুরিয়ান ক্যানাল তৈরিতে খরচ হতে পারে এক শ বিলিয়ন বা ১০ হাজার কোটি মার্কিন ডলারেরও বেশি। এই অর্থ কোথা থেকে আসবে? আসার সুযোগ আছে।ইসরায়েল একে কোম্পানি করে তার বন্ধুদের কাছে শেয়ার বিক্রি করে অর্থ সংগ্রহ করতে পারে। আমেরিকা ও ইউরোপের দেশগুলো দীর্ঘ দিন ধরে সুয়েজ খালের একটা বিকল্প খুঁজছে। তারা যদি এগিয়ে আসে, তবে মুশকিল আসান হতেই পারে। সেজন্য ইসরায়েলের প্রথম দরকার গাজা ফাঁকা করা।

তবে বেন গুরিয়ান ক্যানাল তৈরির পরিকল্পনা কল্পনায় যতটা মধুর, বাস্তবে তারচেয়েও অনেক অনেক কঠিন। গাজা খালি করার বিষয় তো আছেই। পাশাপাশি এখান দিয়ে যে পণ্যবাহী জাহাজ যাবে, তার নিরাপত্তা নিশ্চিত করাটা সবচেয়ে জটিল। কারণ হামাস, ইসলামি জিহাদ, হিজবুল্লাহসহ এতগুলো প্রতিপক্ষকে চটিয়ে শুধু গায়ের জোরে কোথাও নিরাপত্তা নিশ্চিত করা সম্ভব হয়নি। সোমালীয় জলদস্যুদের অব্যাহত তৎপরতা তারই প্রমাণ।

বেন গুরিয়ান ক্যানালের আরেকটি নেতিবাচক দিক হলো—এটি সুয়েজ খালের চেয়ে প্রায় এক শ কিলোমিটার বেশি দীর্ঘ (২৯২.৯ কিমি) হবে। ফলে এই খাল অতিক্রমে জাহাজগুলোর সময়, অর্থ—দুইই বেশি যাবে। সে কারণে এটা কতটা লাভজনক হবে, তা বলা কঠিন। তবে এই খাল ইসরায়েল, আমেরিকা ও ইউরোপের জন্য যে একটা বিকল্প পথ খুলে দেবে, তাতে সন্দেহ নেই। যারা রাশি রাশি ডলার ঢেলে এতদিন ইসরায়েল নামের রাষ্ট্রটিকে টিকিয়ে রেখেছে, তারা না হয় আর কিছু বাড়তি পয়সা দিয়ে এই বেন গুরিয়ান ক্যানালকে রক্ষা করবে। আর ফিলিস্তিন ভূখন্ডে কোনো ভূমিপুত্র না থাকার মৌতাতে মেতে উঠবে তারা। এটাই বা কম কী!

এত কিছুর পরও কী বলবেন, ‘হামাস জঙ্গী’ নিকেশ করাই ইসরায়েল ও তার মিত্রদের একমাত্র লক্ষ্য।

লেখক: নির্বাহী সম্পাদক, ডিজিটাল বিভাগ, ইনডিপেনডেন্ট টেলিভিশন

একদিক থেকে দেখলে একে যুদ্ধ বলা যায় কি না, তা-ই প্রশ্নসাপেক্ষ। আক্রমণ যেখানে বলতে গেলে একপাক্ষিক, সে তো যুদ্ধের চেয়ে বরং নিপীড়িতের ওপর নিপীড়কের আগ্রাসনের সংজ্ঞায় পড়ে। ২০২৩ সালের অক্টোবরে হামাসের...
গাজা যুদ্ধের দুই বছর হতে চলল। জাতিসংঘে সাধারণ পরিষদের অধিবেশন সামনে রেখে যুক্তরাজ্য, ফ্রান্স, কানাডার মতো জি৭ জোটভুক্ত তিন দেশ ও অস্ট্রেলিয়া ফিলিস্তিনকে স্বীকৃতির বিষয়ে ঘোষণা দিয়ে রেখেছে। এই ঘোষণা...
ফিফা রাশিয়াকে নিষিদ্ধ করেছে ২০২২ সালের ২৮ ফেব্রুয়ারি, রাশিয়া ইউক্রেনে হামলা চালানোর চার দিনের মাথায়। উল্টোদিকে ইসরায়েল দুই বছর ধরে গাজায় হত্যাযজ্ঞ চালানোর পরও ফিফায় তারা বহাল-তবিয়তে। রাশিয়ার...
ইরানের ওপর আকস্মিক হামলার প্রথম কয়েক ঘণ্টার মধ্যে ইসরায়েলের হাই কমান্ড যে ‘পূর্ণ বিজয়’ দাবি করেছিল, তা একটি কৌশলগত পরাজয়ের মতো দেখতে ১২ দিন লেগেছে। আর তাই মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পকে...
রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের এক শিক্ষার্থীর সঙ্গে পদ্মা ট্রেনের টিটির কথা-কাটাকাটি ও হাতাহাতির ঘটনাকে কেন্দ্র করে রেললাইন অবরোধ করেছেন শিক্ষার্থীরা। আজ মঙ্গলবার সকাল ৭টা থেকে বিশ্ববিদ্যালয় স্টেশন সংলগ্ন...
সুফল পেয়ে ঢাকার ট্রাফিক নিয়ন্ত্রণে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তাযুক্ত ক্যামেরা বাড়ানোর পরিকল্পনা করছে ঢাকা মহানগর পুলিশ (ডিএমপি)। যান চলাচলের চারটি অপরাধ নিয়ন্ত্রণে সাফল্য দাবি করে, সড়কে আরও দুটি অপরাধ...
চাঁপাইনবাবগঞ্জে বিদ্যুতায়িত হয়ে শিশুসহ তিনজনের মৃত্যু হয়েছে। আজ মঙ্গলবার সকালে সদর উপজেলার বারঘোরিয়া-বাদুরতলায় এলাকায় এই দুর্ঘটনা ঘটে।
পার্লামেন্ট অভিমুখে ককরোচ জনতা পার্টি-সিজেপির বিক্ষোভ ঘিরে উত্তাল ভারতের রাজধানী নয়াদিল্লি। বিক্ষোভকারীদের ছত্রভঙ্গ করতে টিয়ারশেল নিক্ষেপ ও লাঠিচার্জ করে পুলিশ। দফায় দফায় সংঘর্ষে বেশ কয়েকজন আহত হন।
লোডিং...
পঠিতনির্বাচিত

এলাকার খবর