জাতীয় সংসদ নির্বাচনই এখন সবচেয়ে আলোচিত বিষয়। যে ভোটে এল, আর যে এল না—উভয়েরই আলোচনার কেন্দ্রে ওই ভোটই। এমনকি নিজেকে ভোটবিমুখ দাবি করা ব্যক্তিটিও দিনশেষে ভোটের মাঠের খবর নিচ্ছে। এরই মধ্যে মনোনয়নপত্র জমা শেষ। চলছে যাচাই–বাছাই। এতে কেউ কেউ হয়তো বাদ পড়বে। কিন্তু যা–ই ঘটুক—এবারের নির্বাচনে স্বতন্ত্র প্রার্থীরা বিশেষ মনোযোগ আকর্ষণ করেছেন। এত বিপুলসংখ্যক স্বতন্ত্র প্রার্থী এর আগের কোনো নির্বাচনে অংশ নিয়েছেন কি? উত্তর হচ্ছে—না। তাহলে এই ঘটনাকে ব্যক্তির বিকাশ হিসেবে, নাকি বিদ্যমান রাজনৈতিক দলগুলোর ব্যর্থতা হিসেবে দেখা হবে?
প্রশ্নটি উঠেই যায়। এ প্রশ্নের উত্তরে খোঁজার আগে দেখা যাক আসন্ন নির্বাচনে কতজন স্বতন্ত্র প্রার্থী হিসেবে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করতে চাইছেন?
নির্বাচন কমিশনের (ইসি) হিসাব অনুযায়ী, আসন্ন দ্বাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে অংশ নিতে মোট মনোনয়নপত্র দাখিল করেছেন ২ হাজার ৭৪১ জন প্রার্থী। এর মধ্যে ৭৪৭ জন প্রার্থী নির্বাচন করবেন স্বতন্ত্র হিসেবে। যেকোনো সময়ের বিবেচনাতেই এ সংখ্যা সর্বোচ্চ। এর আগে শুধু ১৯৭৯, ১৯৮৬, ১৯৯১ ও ২০০১ সালেই শুধু চার শতাধিক প্রার্থী স্বতন্ত্র হিসেবে নির্বাচন করেছিলেন।
ইসির তথ্যমতে, ২০১৮ সালের নির্বাচনে মোট ৪৯৮ জন স্বতন্ত্র প্রার্থী মনোনয়নপত্র দাখিল করেছিলেন। এর মধ্যে ১২৮ জন নির্বাচনে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করেছিলেন। ২০১৪ সালে এ সংখ্যা ছিল প্রায় দেড় শ। তবে নির্বাচন করতে পেরেছিলেন ১০৪ জন। আরও পেছনে গেলে ১৯৭৩ সালে ১২০ জন, ১৯৭৯ সালে ৪২২ জন, ১৯৮৬ সালে ৪৫৩ জন, ১৯৮৮ সালে ২১৪ জন, ১৯৯১ সালে ৪২৪ জন, ১৯৯৬ সালে ২৮৪ জন, ২০০১ সালে ৪৮৬ জন ও ২০০৮ সালের নির্বাচনে ১৫১ জন স্বতন্ত্র প্রার্থী ছিলেন।
ফলে সকল বিচারেই এবারই সর্বোচ্চসংখ্যক স্বতন্ত্র প্রার্থী নির্বাচনে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করতে মনোনয়নপত্র দাখিল করেছেন। এর মধ্যে গত শুক্রবার থেকে শুরু হওয়া যাচাই–বাছাই প্রক্রিয়ায় বাদ পড়তেও শুরু করেছেন অনেকে। এই বাদ পড়া নিয়ে আবার নানা ধরনের হৃদয় বিদারক দৃশ্যের অবতারণাও হচ্ছে। এই যেমন মানিকগঞ্জের মো. আবদুল আলী বেপারীর কথা বলা যায়। ভদ্রলোক নির্বাচন করতে ভীষণভাবে ইচ্ছুক। কিন্তু মনোনয়ন যাচাই–বাছাই প্রক্রিয়ায় তিনি বাদ পড়েছেন। এতে ভীষণ কষ্ট পেয়ে তিনি জেলা রিটার্নিং কর্মকর্তার কার্যালয়ের বারান্দায় লুটিয়ে পড়ে কেঁদেছেন। তিনি হয়তো আপিল করবেন। আপিলে সব ঠিক থাকলে প্রার্থিতা ফিরেও পেতে পারেন। এ সুযোগ সবার জন্যই থাকছে।
আবদুল আলী বারবার করে বলেছেন—তিনি সংসদে যেতে চান। মানুষের জন্য কাজ করতে চান। এটা শুধু আবদুল আলী নন, যতজন প্রার্থী হয়েছেন, সবারই চাওয়া নিশ্চয় একই, জনগণের সেবা।
এই হিসাবে বাংলাদেশের জন্য এত সুখের সময় তো আর আসেনি নিশ্চয়। কারণ, প্রচলিত রাজনৈতিক দলগুলোর নেতাদের পাশাপাশি এত এত ব্যক্তি দেশের সাধারণ মানুষের কথা ভাবছেন, তাঁদের জন্য কাজ করতে চান—এটা তো ভীষণ আনন্দের বিষয়। তারপরও প্রশ্ন উঠছে। তারপরও একঝাঁক ‘কিন্তু’ ভ্রু কুঁচকে তাকিয়ে আছে।
নিন্দুকেরা যথারীতি বলছেন—সাধারণ মানুষের সেবা নয়, আধিপত্যের আকাঙ্ক্ষাই মূলত এত এত ক্ষমতাধর মানুষের মনে সংসদ সদস্য হতে উদগ্র বাসনার জন্ম দিয়েছে। দুর্মুখেরা তো এসব বলবেই। সেসবে কান না দিলেও কিন্তু এত এত স্বতন্ত্র প্রার্থীর প্রেক্ষাপট নিয়ে প্রশ্ন থাকে।
অবশ্য কেউ কেউ দ্বিদলীয় গণতন্ত্রের কথা বলবেন। এবং তেমন কথা তুললে খুব একটা এড়িয়ে যাওয়ার সুযোগ নেই। কারণ, তাঁরা এটা বলার সাথে সাথে সামনে আনবেন যুক্তরাজ্য, আমেরিকা—ইত্যাদি দেশের উদাহরণ। কিন্তু বিষয় হচ্ছে—একটি চর্চা, আরেকটি ব্যবস্থা। এসব দেশে গণতন্ত্র বহুদলীয়ই। কিন্তু কার্যত দুই দলই ঘুরে–ফিরে শাসন করে। যুক্তরাজ্যের ক্ষেত্রে দল দুটি যদি হয় লেবার পার্টি ও কনজারভেটিভ পার্টি; তবে আমেরিকার ক্ষেত্রে আসবে ডেমোক্রেটিক পার্টি ও রিপাবলিকান পার্টির নাম।
কথা সত্য—ঘুরেফিরে এ দুটি যুগলই দেশ দুটিকে শাসন করছে। কিন্তু এও তো সত্য যে, এই দুই দেশেই দল–যুগলের ছাতার নিচে আরও অনেকে এসে ঠাঁই নিয়েছে। আর বাইরে যারা আছে, তাদের প্রভাব বলয় এতটাই কম যে, তারা সরকার গঠনের মতো জনমতের জোগাড়যন্ত্রই করতে পারে না। এর মূল কারণ ‘উইনার টেকস অল’ ব্যবস্থা। ফলে এ ধাঁচের গণতন্ত্র মূলত সংখ্যাগরিষ্ঠ্যের শাসন। বাকি যা, তা হলো অপজিশন বা বিরোধী দল, যাঁদের একমাত্র ক্ষমতা চিৎকার চেঁচামেচিতেই সীমাবদ্ধ।
আমেরিকায় দ্বিদলীয় কাঠামো থাকলেও একটি বিচারে তা ‘ওয়েস্টমিনিস্টার’ ধাঁচ থেকে কিছুটা আলাদা। আর এই আলাদা হওয়ার কাজটি তারা করেছে প্রাইমারি দিয়ে। দলীয় মনোনয়ন পাওয়ার জন্যই তাদের প্রাইমারির খাঁড়া পার হতে হয়। ফলে ছোটখাটো হলেও এক ধরনের ঝাড়াই–বাছাইয়ের সুযোগ থাকে। অন্য জায়গাগুলোতে দলের পক্ষ থেকে ঘোষিত মনোনয়নই শেষ কথা। বাংলাদেশও এই ধারাতেই হাঁটে।
সে যাক। এ নিয়ে বিস্তর আলোচনা অন্যরা করেছেন। জনপ্রতিনিধিত্বকে সত্যিকারের প্রতিনিধিত্বশীল করার বিষয়ে নানা দাওয়াইও হাজির আছে আমাদের সামনে। সেগুলো আমরা গ্রহণ করিনি।
এবার আসা যাক ‘স্বতন্ত্র’ প্রার্থীর বিষয়ে। যে বা যারা স্বতন্ত্র প্রার্থী হিসেবে আসন্ন নির্বাচনে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করতে চান, তাঁরা প্রত্যেকেই আদতে রাজনীতিটা করতে চান। আর রাজনীতির মূল কথা হলো—জনগণের সেবা করা, তাদের প্রতিনিধি হিসেবে তাদের অভাব–অভিযোগ এবং অবশ্যই অধিকারের প্রসঙ্গে সোচ্চার হওয়া।
ফলে এই যে ৭৪৭ জন প্রার্থী স্বতন্ত্র হিসেবে নির্বাচন করতে চাইছেন, তাঁরা এই রাজনীতির ছকটাতেই প্রবেশ করতে চাইছেন। যদি ধরেই নেওয়া হয় যে, আধিপত্যের সমীকরণ নয় জনগণের সেবাই তাঁদের লক্ষ্য, তবে কাঠগড়ায় তুলতে হয় রাজনৈতিক দলগুলোকেই। কারণ, দেশের নিবন্ধিত ৪৪টি রাজনৈতিক দলের মধ্যে ৩০টি নির্বাচনে এলেও এগুলোর কোনোটিকেই তাঁরা জনগণের সেবা করার প্ল্যাটফর্ম হিসেবে নিতে চাইছেন না। অর্থাৎ, তাঁরা মনে করেন না যে, এসব রাজনৈতিক দলের হয়ে তাঁরা সত্যিকার অর্থেই জনগণের সেবা করতে পারবেন।
অনেকে বলবেন হয়তো—ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগ দলীয় প্রার্থী ঘোষণা করলেও দলের নেতাদের বলে দিয়েছেন—এর বাইরে যে কেউ চাইলে স্বতন্ত্র হিসেবে নির্বাচন করতে পারবেন। দলটির সাধারণ সম্পাদক ওবায়দুল কাদের অভয় দিয়ে বলেছেন—দলীয় সিদ্ধান্তের বাইরে কেউ স্বতন্ত্র নির্বাচন করলে তাঁকে দল থেকে বহিষ্কার করা হবে না। এটা তাঁদের দলীয় সিদ্ধান্ত। এ নিয়ে বলবার কিছু নেই। একে বরং উদারতাই বলা যায়। একইভাবে জাতীয় পার্টি বা অন্য দল থেকেও অনেকে স্বতন্ত্র প্রার্থিতা ঘোষণা করেছেন।
কিন্তু তারপরও প্রশ্ন ওঠে নানা দলের সদস্য বা নেতা হওয়া সত্ত্বেও যারা স্বতন্ত্র প্রার্থী হিসেবে নির্বাচনে মনোনয়নপত্র জমা দিলেন, তাঁদের রাজনৈতিক নিবেদন নিয়ে। স্বতন্ত্র প্রার্থী হলেন মানে তিনি দলটির সিদ্ধান্ত মানছেন না। অর্থাৎ, কোনো একটি নীতিগত জায়গায় তাঁর সাথে দলের মতবিরোধ হয়েছে। শুধু তাই নয়, স্বতন্ত্র প্রার্থী হতে গেলে যেহেতু নির্দিষ্ট আসনের মোট ভোটারের একটি অংশের সমর্থন থাকতে হয়, সেহেতু ওই নেতার মতো করে দলের একটি অংশও এ সিদ্ধান্ত নীতিগতভাবে মানছেন না। ফলে মূলগত অর্থে রাজনৈতিক লাইনই পৃথক হয়ে গেল।
গত তিনটি নির্বাচনে জয়ের মাধ্যমে একটানা ১৫ বছর রাষ্ট্রক্ষমতায় আছে বাংলাদেশ আওয়ামী লীগ নেতৃত্বাধীন সরকার। এই সময়ে যুক্তরাজ্য ও আমেরিকার মতো করে ১৯৯১ সালের পরবর্তী সময়ে যে দ্বিদলীয় বৃত্ত গড়ে উঠছিল বাংলাদেশে, তা ভেঙে গেছে বলা যায়। আওয়ামী লীগের প্রতিদ্বন্দ্বী হিসেবে এখনো বিএনপির নাম ঘুরেফিরে এলেও নির্বাচন বর্জনসহ নানা কারণে তারা আর নির্বাচনের মাঠে প্রধান প্রতিদ্বন্দ্বী শক্তি হিসেবে নেই। এটা অনেক দিন ধরেই নেই। নির্বাচন প্রক্রিয়া নিয়ে দলটির একটি আলাদা অবস্থান আছে। এ নিয়ে তাদের নানামাত্রিক আলোচনাও আছে। ফলে বিএনপির দলত্যাগী নেতাদের স্বতন্ত্র বা অন্য দলের টিকিটে নির্বাচন করতে চাওয়ার একটা ব্যাখ্যা হয়তো আছে। কিন্তু তাতে এই ১৫ বছরে বিএনপির নির্জীবতার সময়ে আর কোনো দলের প্রতিদ্বন্দ্বী শক্তি হিসেবে সামনে আসতে না পারার যে ব্যর্থতা, তা মুছে যায় না। আর এই ব্যর্থতাই জন্ম দিচ্ছে এত এত স্বতন্ত্র প্রার্থীর, যারা বিদ্যমান কোনো প্ল্যাটফর্মকেই নিজেদের রাজনীতির জন্য যোগ্য বলে মনে করছেন না।
স্বতন্ত্র হিসেবে রেকর্ডসংখ্যক মনোনয়নপত্রের মধ্যে শেষ বিচারে কতটি টিকবে, তা সময়ই বলে দেবে। কিন্তু তাতে বাংলাদেশের রাজনৈতিক মানচিত্রে ওঠা নতুন এই প্রশ্নচিহ্নটি মুছে যাবে না। রাজনৈতিক দল, রাজনীতিক ও রাজনৈতিক বিশ্লেষকেরা এ নিয়ে গুরুত্ব দিয়ে ভাববেন—এ আশা করাই যায়।
লেখক: উপবার্তা সম্পাদক, ইনডিপেনডেন্ট টেলিভিশন