তত্ত্বাবধায়ক সরকারেরর অধীনে জাতীয় সংসদ নির্বাচন প্রক্রিয়া বাতিল হয়ে যায় ২০১১ সালের জুন মাসে। তখন থেকেই এই ব্যবস্থা ফিরিয়ে আনার দাবিতে আন্দোলন করছে বিএনপি। প্রায় সাড়ে ১২ বছরের এই টানা আন্দোলন এখন পর্যন্ত সফল হয়নি। এর মধ্যে ২০১৪ সালের নির্বাচন বর্জন করে তারা। আন্দোলনের মধ্যেই একপর্যায়ে ২০১৮ সালের জাতীয় সংসদ নির্বাচনে নাটকীয়ভাবে অংশ নেয় দলটি। অবশ্য ওই নির্বাচনে মাত্র ১৩ শতাংশ ভোটপ্রাপ্তি আর ৮টি আসনে জয় পাওয়ার পর বিএনপি আবারও তত্ত্বাবধায়ক সরকারের দাবিতে আন্দোলনের মাঠেই থেকেছে।
তবে ২০২৪ সালের ৭ জানুয়ারি হতে যাওয়া নির্বাচন বর্জন করেছে দলটি। ইতিমধ্যে এই নির্বাচনের জন্য তফসিল ঘোষণা হয়েছে। মনোনয়ন দাখিলের সময়ও পার হয়ে গেছে। মনোনয়ন যাচাই–বাছাই শেষ হয়েছে। বিএনপি ও তার সমমনা দলগুলো এবং কয়েকটি বাম দল ভোট বর্জনের কারণে নির্বাচনে প্রতিদ্বন্দ্বিতার সুযোগ সীমিত হয়েছে।
স্বাভাবিকভাবেই সাধারণ মানুষ ও রাজনীতির সাথে সংশ্লিষ্টদের আলোচনায় উঠে আসছে বিএনপি এখন কী করবে? কেননা বিএনপির যে মূল দাবি, সেই শেখ হাসিনার পদত্যাগ ও তত্ত্বাবধায়ক সরকার গঠন, তা হয়নি। অর্থাৎ, এই দাবিটি অসফলই বলা যায়। এবার এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে দলটির বেশ কিছু কেন্দ্রীয় ও জ্যেষ্ঠ নেতার দলত্যাগ এবং নির্বাচনে অংশগ্রহণ।
অবশ্য বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য সেলিমা রহমান মনে করেন, তাঁদের আন্দোলন অসফল বা ব্যর্থ নয়। বরং সুষ্ঠু নির্বাচনের জন্য তত্ত্বাবধায়ক সরকারের প্রয়োজনীয়তা দেশের মানুষকে বিএনপি বোঝাতে সক্ষম হয়েছে। সবাই এটা চাইছে। বিদেশি, যারা বাংলাদেশের বন্ধু, এ দেশের ভালো চায়, তারাও কিন্তু সুষ্ঠু–অবাধ নির্বাচনের কথা বলছে।
বিএনপি টানা ১৭ বছর ক্ষমতার বাইরে। ২০০৭ সালের বাতিল হওয়া নির্বাচনের আগে বিএনপি দুদফা ভাঙনের সম্মুখীন হয়। এই দুবারই দলটির নেতা, সাংসদ ও সেই সময়ের বিএনপি সরকারের মন্ত্রীরা দলত্যাগ করেন। সেটা ছিল বিএনপির অভ্যন্তরীণ দ্বন্দ্ব। কিন্তু ক্ষমতা হারানোর পর যে দুটি নির্বাচন হয়েছে, সেই নির্বাচনে দলটির মধ্যে বিভেদ দেখা যায়নি। নেতাদের মধ্যে দলীয় রাজনীতি নিয়ে মনোমানিল্য থাকলেও দল থেকে কেউ বেরিয়ে গিয়ে ভোটে অংশ নেয়নি। বিশেষ করে ২০১৪ সালে দলটি ভোটে অংশ নেয়নি। সে সময়ও দলের কেউ বেরিয়ে গিয়ে ভোটে আসেনি।
কিন্তু এবার পরিস্থিতি ভিন্ন। বিএনপির কমপক্ষে ৩৩ জন নেতা বিভিন্ন দল থেকে নির্বাচনে অংশ নিচ্ছেন। এই নেতাদের বেশির ভাগই দলটির রাজনীতিতে দীর্ঘদিন ধরে জড়িত আছেন বা ছিলেন। এমন একটা পরিস্থিতি বিএনপির জন্য সামনের দিনগুলোতে কী বার্তা দিচ্ছে, সেটাই এখন আলোচনার বিষয়।
বিএনপি নেতাদের বক্তব্য অনুযায়ী আন্দোলনে চূড়ান্ত সফলতা না এলেও আন্দোলন অনেকটাই সফল। এটা যদি ধরে নেওয়াও হয় তাহলে চূড়ান্ত সফলতা কবে আসবে, তার জন্য কতটা সময় অপেক্ষা করতে হবে–এমন প্রশ্ন বিএনপির মাঠের নেতাদের মধ্যে ঘুরপাক খাচ্ছে। বিশেষ করে শিগগিরই দৃশ্যমান কোনো সফলতা না এলে সংসদ নির্বাচনের পর স্থানীয় সরকার নির্বাচনে দলটির নেতাদের অংশ নেওয়া আটকে রাখা যাবে কি–না, তা নিয়ে বিএনপির মধ্যেই সন্দেহ আছে।
বিএনপির একজন দায়িত্বশীল নেতা ইনডিপেনডেন্ট ডিজিটালকে বলেন, নির্বাচন যদি শেষ পর্যন্ত হয়ে যায়, তাহলে বিএনপির অপেক্ষা আরও বাড়বে। সেটা হয়তো সমস্যা নয়। তবে ভোটে তৃণমূল বিএনপি ও বিএনএম যদি কিছু আসন পায়, তবে দল দুটির অবস্থান রাজনীতিতে পোক্ত হবে। আর তা হলে এই দলে সামনে যারা যাবেন, তাঁদের বেশির ভাগই বিএনপির মাঠের নেতা–কর্মীরাই হবেন। এটা দলটির জন্য একটা চ্যালেঞ্জ। তবে এই নেতা মনে করেন, এবারের নির্বাচনে না যাওয়া সঠিক সিদ্ধান্ত। কেননা এতে কেবল এই সরকারকেই বৈধতা দেওয়া হতো। তাঁর মতে দলীয় সরকারের অধীনে ভোট করে ক্ষমতাসীনদের হারানোর কোনো নজির এ দেশে নেই।
অবশ্য বিএনপির বিভিন্ন পর্যায়ের নেতারা মনে করেন, বিএনপি ভাঙবে না। বিএনপি থেকে দলছুট হতে পারেন কিছু নেতা। তবে বিএনপি পরিবারতান্ত্রিক একটি দল। জিয়া পরিবারের হাতেই এর নেতৃত্ব। পরিবারতান্ত্রিক দলগুলো ভাঙে না। এই পরিবারের নেতৃত্বে যে অংশ থাকবে, সেটিই বিএনপি। তবে দল যদি সঠিকভাবে পরিচালিত না হয়, তাহলে অনেকেই দল ছেড়ে যেতে পারেন বা অনেকেই নিষ্ক্রিয় হয়ে যেতে পারেন। এমন অবস্থা এখনই দলের মধ্যে চলছে। বিএনপি যে দাবিতে আন্দোলনে আছে, সেই দাবি শিগগির পূরণ না হলে সামনের দিনগুলোতে রাজপথে যেমন আন্দোলনে থাকতে হবে, তেমনি নিজের নেতা–কর্মীদের ধরে রাখতে নিজেদের সঙ্গেই লড়াই করতে হবে দলটিকে।


সেই ২৮ আর এই ২৮ অক্টোবর: বিএনপির ভুল যেখানে
ভোটের তারিখ জানানোর ব্রেকিং কতটা জরুরি, কীভাবে নির্ধারণ
