রাজনীতির তপ্ত রোদে হেমন্তের নিঃশব্দ আগমন

আপডেট : ০৯ নভেম্বর ২০২৩, ১০:০০ এএম
দেশে এখন দ্বাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনকে ঘিরে সৃষ্টি হয়েছে উত্তপ্ত পরিস্থিতি। ক্ষমতাসীনেরা সংবিধানের কথা বলে প্রথাগত কায়দায় তাদের পরিচালনাতেই নির্বাচন হবে বলে ঘোষণা দিয়েছে। ওদিকে বিএনপি দলীয়রা ‘ঐতিহ্য’ মেনে তত্ত্বাবধায়ক সরকারের অধীনে নির্বাচনের দাবিতে হরতাল-অবরোধ কর্মসূচি পালন করছে। মাঝে মাঝে কিছু গাড়িতে আগুন জ্বালানো হচ্ছে। পেটের জ্বালায় মানুষ তীব্র ভয় নিয়ে বাইরে বের হচ্ছে, নিয়মিত অফিস-আদালতও করছে। 
 
দেশের মানুষের হয়েছে মরণ-জ্বালা। পেটের দায়ে তাদের ঠিকই কাজে যেতে হয়। ধান্দা করতে হয়। তারা চায় শান্তি ও স্বস্তি। কে ক্ষমতায় গেল, কে যেতে পারল না—এসব বিষয় নিয়ে বেশির ভাগ মানুষেরই কোনো মাথাব্যথা নেই। হরতাল-অবরোধ হলে বরং তাদের কষ্ট বাড়ে। যাতায়াতের সমস্যা হয়। জিনিসপত্রের দাম আরেক দফা বাড়ে। এতে তাদের নাজেহাল হতে হয় বেশি। তারা ক্ষমতাসীনদের গোঁয়ার্তুমি পছন্দ করে না। বিরোধী দলের ধ্বংসাত্মক কর্মসূচিও মেনে নিতে পারে না। কিন্তু তাদের কিছুই করণীয় নেই। তারা এসবে হতাশ ও বিরক্ত!
 
রাজনীতিতে যখন গ্রীস্মের খরতাপ বইছে, তখন প্রকৃতিতে শিশির-কুয়াশা নিয়ে হাজির হয়েছে হেমন্ত। ভোররাতে উত্তুরে-পশ্চিমি ঠান্ডা বাতাসে ভর করে হাজির হচ্ছে একটু করে শিরশিরানিও। কোথাও দেখা মিলতে শুরু করেছে, ‘একটি ধানের শীষের উপরে একটি শিশিরবিন্দু’। তাপমাত্রা একটু একটু করে নামছে।
 
আবহাওয়া বিজ্ঞান অনুযায়ী ঋতু মূলত তিনটি। গ্রীষ্ম, বর্ষা ও শীত। এক ঋতু থেকে অন্য ঋতুতে পরিবর্তনের ফাঁকে হাজির হয় শরৎ, হেমন্ত, বসন্ত। দুই ঋতুর মাঝে আসায় অনেক সময় এই ঋতুগুলোর চরিত্র মালুম হয় না আমাদের কাছে। প্রধান দুই রাজনৈতিক দলের আচরণ ও প্রকৃতির এই খেয়ালিপনা নিয়ে আক্ষেপের শেষ নেই ভাবপ্রবণ বাঙালি মধ্যবিত্তের।
 
এবার যেমন বর্ষার পর দুম করে শুকিয়ে যায় বাতাস। আকাশে মেঘের লেশমাত্র ছিল না। পরে আবার ঘূর্ণিঝড়ের জেরে আকাশভরা কালো মেঘ কিছুদিন ঘিরে ছিল। শরতের অস্তিত্বই টের পাচ্ছিল না জনতা। শরৎ ফুরোনোর পর হেমন্ত আসতেও দেরি করেনি। ভোরের দিকে হালকা ঠান্ডার অনুভূতি। সঙ্গে কুয়াশা-শিশিরের উপস্থিতি। রাজধানীতে তেমন খোলাসা না-হলেও, উত্তরের বিভিন্ন প্রান্তিক জেলার বাসিন্দারা বুঝতে পারছেন, বাংলার ঋতু এবার শীতের পথে এগোচ্ছে।
 
হেমন্তে শীতের আগমন বার্তার মধ্যেই রাজনৈতিক উত্তাপ শুরু হয়েছে। নির্বাচন কমিশনের নেতৃত্বে কিছু রাজনৈতিক দলের সংলাপ অনুষ্ঠিত হলো। কিন্তু নির্বাচন ও আলোচনায় প্রধান বিরোধী দল ও তার মিত্রদের অনুপস্থিতির কারণে হেমন্তেও সবাই ‘কালো মেঘ’ দেখছেন।
 
তবে অন্ধ হলেও প্রলয় যেমন বন্ধ থাকে না, বিএনপি হরতাল-অবরোধ দিলেও যেমন নির্বাচন আয়োজন থেমে থাকে না, ঠিক তেমনি সকল প্রতিকূলতা সত্ত্বেও বাংলার মায়াবী ঋতু হেমন্তের আগমনও ঠেকে থাকে না। আহ হেমন্ত! এই ঋতুর রূপ, রং, গন্ধ সবকিছুই আলাদা। এই মৌসুমে চারপাশ আলোকিত করে ফোটে দেবকাঞ্চন, হিমঝুরি, ধারমার, রাজঅশোক।
 
কিন্তু তার লক্ষণ কি আমরা দেখতে পাচ্ছি? সন্ধ্যা ইদানীং যেন একটু তাড়াতাড়ি চলে আসছে। কাজে ব্যস্ত নাগরিকের চোখে পরিবর্তনের লক্ষণ বলতে এটুকুই। ফুলে ফুলে ভরা শিউলি, ছাতিম কোথায় মুখ লুকিয়ে আছে কে জানে? রোদ তো এখনো সেই আগের মতোই ঘাম ঝরানো। আচমকা কোনো দুর্যোগ ছাড়া আকাশ বরাবর যেমন থাকে, তেমনি আছে রৌদ্রকরোজ্জ্বল। দিনের লোডশেডিংয়ে পাখার চক্কর থেমে গেলে শরীর স্যাঁতসেঁতে হয়। সবকিছু আগের মতোই আছে, এর মধ্যে হেমন্ত কোথায়?
 
আমাদের প্রিয় রাজধানী ঢাকায় হেমন্ত পড়েছে নগরায়ণ আর কৃত্রিমতার ক্রসফায়ারে। এখানে যা আছে, সেটি তার শবদেহ। হেমন্ত সজীব-সপ্রাণ শহরের কোলাহল, মেকি জাঁকজমক, বিত্ত-বেসাতের জৌলুস থেকে দূরে। সেখানে সকাল-সন্ধ্যায় আকাশে কুয়াশার ঘনঘোর। হাওয়ায় হিমেল স্পর্শ। পথের পাশের জংলা গাছপালা, ঝোপঝাড়, মাঠের দূর্বা ঘাস সারা রাত ঝরে পড়া শিশিরে ভিজে ওঠে। আর সেই শিশির বিন্দুতে সকালের সোনা রোদ হীরার কুচির মতো দ্যুতিময় হয়ে ছড়ায় তার সাত রঙের বর্ণালি।
 
বিকেল বেলায় গ্রামগুলোর ওপর চেপে থাকা কুয়াশার সঙ্গে রান্নাঘর থেকে ওঠা ধোঁয়া মিশে গিয়ে মলিন ধূসর বিশাল এক শামিয়ানার মতো আড়াল করে রাখে আকাশ। সন্ধ্যায় সবাই মিলে গলা সাধতে শুরু করে শেয়াল পণ্ডিতেরা। ডানা ঝাপটে নৈশ অভিসারে যাত্রা শুরু করে বাদুড়ের ঝাঁক। ধানখেত, আখখেত, সবজি খেতের মধ্য দিয়ে এঁকেবেঁকে এগিয়ে যাওয়া নদীটির মন্থর স্রোতে ঝিলমিল করে ওঠে কুয়াশার ভেতর দূর দিগন্তে ডুবতে থাকা সূর্যের ম্লান আলো। সেদিকে তাকালে ‘চোখের সকল ক্ষুধা মিটে যায় এইখানে’ এসে।
 
কুয়াশাচ্ছন্ন হেমন্তের রূপ আছে জীবনানন্দের কবিতায়। বাংলার বর্ষার রূপ যেমন নতুন করে আবিষ্কার করেছিলেন রবীন্দ্রনাথ, তেমনি হেমন্তের অন্তর্গত সত্তাটি ধরা পড়েছিল জীবনানন্দের চোখে। ‘হেমন্তের ঝড়ে আমি ঝরিব যখন/ পথের পাতার মতো তুমিও তখন/ আমার বুকের পরে শুয়ে রবে? অনেক ঘুমের ঘোরে ভরিবে কি মন’, ‘প্রথম ফসল গেছে ঘরে/ হেমন্তের মাঠে মাঠে ঝরে/ শুধু শিশিরের জল’, এমন অজস্র পংক্তিতে তিনি এঁকেছেন হেমন্তের ছবি। চালতার পাতা থেকে ঝরে পড়ছে শিশির বিন্দু, স্তব্ধ রাতের অন্ধকারে গাছের শাখায় শিকার ধরতে ওঁত পেতে আছে পেঁচা, মাকড়সার জালে জমেছে মুক্তোর মতো শিশির বিন্দু। আর মাঠে মাঠে পেকে উঠছে ধান। কেমন করে পরিপুষ্ট হচ্ছে সেই ধান? তিনি লিখেছেন, ‘শুয়েছে ভোরের রোদ ধানের উপর মাথা রেখে/ অলস গেঁয়োর মতো এই খানে কার্তিকের ক্ষেতে;/ মাঠের ঘাসের গন্ধ বুকে তার, চোখে তার শিশিরের ঘ্রাণ/তাহার আস্বাদ পেয়ে অবসাদে পেকে ওঠে ধান’। এই ধানে কেটে যাবে কৃষকের আকাল-অনটন। সচ্ছলতার সুখ আসবে গ্রামের ঘরে ঘরে।
 
হেমন্তে প্রকৃতি একটু অন্যরকম। জংলা জলাজমিতে ফোটে অজস্র শালুকফুল। এ সময় জীবজন্তুর মধ্যেও কেমন উদাস উদাস ভাব আসে। নতুন কাপড় নিয়ে তাদের কোনো আদিখ্যেতা নেই। রোদ-হিম মাখতে, সাদা মেঘের ভেলা দেখতে তো আর পয়সা লাগে না। তারা বিনে পয়সায় পাওয়া প্রকৃতির উত্তাপ গায়ে মাখে।
 
নির্মম সত্য হচ্ছে, এই সব দৃশ্য দেখবার, উপভোগ করবার মানুষ এখন আর খুঁজে পাওয়া যায় না। সবাই আচ্ছন্নের মতো ছুটছে। কখনো গাড়ি-বাড়ি কখনো প্রতিষ্ঠা, পদ-পদবি, খ্যাতির মোহে, আবার কখনো উৎসবের দাবিতে সবার মধ্যে ছুটে চলার প্রবণতা। মাঝে দু-একটা চোরাগোপ্তা খুন, অদৃশ্য ঘাতকের আনাগোনা, ‘সব ষড়যন্ত্র, ষড়যন্ত্রকারীদের বিষদাঁত ভেঙে ফেলা হবে’ বলে মিথ্যে আশ্বাস! এমন পরিবেশে প্রকৃতি বা প্রাকৃতিক দৃশ্য দেখা এখন বাতুলতা। এখন প্রকৃতির সৌন্দর্য অনুসন্ধানের ‘বাতুলতা’ কারও মধ্যে খুব একটা দেখা যায় না।
 
রবীন্দ্রনাথ মানুষ আর পশুর পার্থক্য করতে গিয়ে বলেছিলেন, পশুর আছে গুহা, মানুষের আছে পথ। গুহাতে পশুরা আটকে যায়, মানুষ কিন্তু আটকায় না। সে অনাগারিক। তার আগার নেই, পথ আছে। মানুষের সে-পথ প্রকৃতির সঙ্গে সংযোগে নানা অভিজ্ঞতায় ভরে ওঠে। তবে রবীন্দ্রনাথ এটাও বুঝেছিলেন, মানুষ তার এই চলার পথকে মাঝে মাঝে নিজেরাই আটকে দেয়। আদর্শ থেকে বিচ্যুত হয়। প্রকৃতিকে লুঠ করে নিজের ভাণ্ডার পূর্ণ করতে চাইলে মানুষ ধনের কারাগারে আটকে যায়। নাগরিক সভ্যতা আকাশ-আঁচড়া বাড়ি তৈরি করে। সে বাড়ি আর বিত্ত যখন বেজায় রকম চেহারা নেয়, তখন প্রকৃতির সঙ্গে মানুষের বিচ্ছিন্নতা অনিবার্য, সমাজের থেকেও আলাদা হয়ে যায় মানুষ। এ মানুষের নিজের তৈরি গুহা। 
 
পশুরা গুহাতে বন্দি থাকে না, কোনো কোনো সময় তারা প্রকৃতির টানে বাইরে আসে। আর যে মানুষ প্রকৃতির টানে নানা কল্পনায় সাজিয়ে তুলত তাদের উৎসবের গল্প, তারাই এখন ইভেন্টের গুহায় বন্দি। বেচারা মানুষ রুদ্ধশ্বাসে ছুটছে বিত্ত আর বৈভবের পেছনে। ক্ষমতার পেছনে। এ চলার যেন শেষ নেই!
 
তবে এ বছর হেমন্তের কোমল আবহাওয়াকে উত্তপ্ত করে রাজপথের সরকারবিরোধী প্রধান দল বিএনপি এবং তার জোট সুষ্ঠু ও নিরপেক্ষ নির্বাচনের দাবিতে ‘কঠোর আন্দোলনের’ হুঁশিয়ারি দিচ্ছে। দাবি আদায় না হলে আগামী নির্বাচনে অংশ না নেওয়ার সতর্কবার্তাও দিচ্ছে তারা। নির্বাচনকে কেন্দ্র করে ক্ষমতাসীন ও বিরোধী উভয় পক্ষের জোট-মহাজোটের নানা সমীকরণ মেলানোর চেষ্টা অব্যাহত আছে। সব মিলিয়ে রাজনীতিতে এখন বেশ গরম হাওয়াই বইতে শুরু করেছে। হেমন্তের শেষ দিনগুলো তো বটেই সামনের শীতের দিনগুলোও এবার গনগনে হয়ে উঠবে বলেই মনে করছেন বিশ্লেষকরা।
 
লেখক: গবেষক ও লেখক
প্রতিশ্রুতি আছে, পরিকল্পনা নেই— বাস্তবায়ন তো দূরের কথা! জাতীয় নির্বাচন সামনে রেখে দেশের প্রায় সব রাজনৈতিক দলই তাদের নির্বাচনী ইশতেহার ঘোষণা করেছে। স্বাস্থ্য, শিক্ষা, খাদ্য নিরাপত্তা, কর্মসংস্থান,...
একই দিনে দেশের মালিক সাধারণ জনগণের প্রাপ্তি তিনটি। এক, নতুন নির্বাচন কমিশন; দুই, একজন জ্যেষ্ঠ উপদেষ্টার কাছে থেকে নির্বাচন অনুষ্ঠানের সম্ভাব্য দিনক্ষণ এবং প্রধান উপদেষ্টার কাছ থেকে ছাত্র-জনতার...
নির্বাচন দিনক্ষণ নিয়ে আপতত সরকারের ভাবনা নেই। মূল ভাবনায় সংস্কার। বর্তমান সরকার প্রথমে সংবিধান সংস্কার কমিশনের প্রধান হিসেবে দায়িত্ব দিয়েছিল আইনজ্ঞ শাহদীন মালিককে। এই বিশিষ্ট আইনজীবীকে খালেদ...
দুর্ভাগ্যের বিষয় হলো, ১৯৯১ বা ১৯৯৬ সাল ছাড়া আমাদের জাতীয় সংসদে সেভাবে কোনো দিন শক্তিশালী বিরোধী দল ছিল না। বিরোধী দল ২০০১ থেকে ক্রমক্ষীয়মাণ হতে হতে ২০২৪-এ অপসৃতই হয়ে গেল। ২০১৪, ২০১৮ বা ২০২৪-এ যাদের...
কুয়েতের আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে ড্রোন হামলায় চার বাংলাদেশি আহত হয়েছেন। বুধবার কুয়েতে বাংলাদেশ দূতাবাস এক বিবৃতিতে এ তথ্য জানিয়েছে।
শিশু রামিসা ধর্ষণ ও হত্যার মামলায় যুক্তিতর্ক উপস্থাপন হবে আজ বৃহস্পতিবার। আগামী সপ্তাহেই এ মামলার রায় হতে পারে। 
এক মাস পর পণ্য রপ্তানি আবার কমল। গেল মে মাসে আগের বছরের একই মাসের তুলনায় রপ্তানি হ্রাস পেয়েছে ৭ শতাংশ। বুধবার রপ্তানি উন্নয়ন ব্যুরোর হালনাগাদ প্রতিবেদনে এই তথ্য জানানো হয়।
এডিসের মারাত্মক ঝুঁকিতে দেশের চার জেলা- ঢাকা, বরিশাল, নরসিংদী ও কক্সবাজার। এখানে ব্রুটো ইনডেক্সে এডিসের লার্ভার ঘনত্ব ৭৬ থেকে ৯৩ পর্যন্ত মিলেছে। জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের ল্যাবে গবেষণায় মিলেছে...
লোডিং...

এলাকার খবর