বিয়ে হলো একটি সামাজিক বন্ধন, যেখানে দুজন মানুষের মধ্যে দাম্পত্য জীবনের সূত্রপাত হয়। এই বন্ধনের মধ্য দিয়ে শুরু হয় নতুন অধ্যায়ের। তবে, যে কেউ চাইলেই বিয়ের পিঁড়িতে বসতে পারে না। বিয়ের জন্য রয়েছে রাষ্ট্র নির্ধারিত বয়সসীমা। রাষ্ট্র এই সীমা বিশেষত নারীদের স্বাস্থ্য সম্পর্কিত নানা ঝুঁকি বিবেচনায় নির্ধারণ করেছে। সেই বয়সসীমার আগে কেউ বিয়ে করলে তাকে বলা হয় বাল্যবিবাহ, যা বাংলাদেশের আইনে দণ্ডনীয়ও বটে। তাও বাল্যবিবাহ বাড়ছে। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, আইন থাকলেও তার কঠোর প্রয়োগ নেই বলেই এমনটা হচ্ছে।
বাল্যবিবাহ হলো এমন বিয়ে, যেখানে এক পক্ষ বা উভয় পক্ষ অপ্রাপ্তবয়স্ক। দেশের আইনে বাল্যবিবাহকে অপরাধ হিসেবে গণ্য করা হয়। আইনের ভাষায়, ২১ বছর পূর্ণ না করে কোনো পুরুষ কিংবা ১৮ বছর পূর্ণ না করে কোনো নারী যখন বিয়ে করে, তখন তাকে বাল্যবিবাহ বলা হয়। বাল্যবিবাহ নিরোধ আইন অনুযায়ী, নারীর বিয়ের ন্যূনতম বয়স ১৮। এই বয়সের আগে বিয়ে মানবাধিকার লঙ্ঘন বলে ধরে নিতে হবে।
বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর (বিবিএস) জরিপে জানা গেছে, এ দেশে অপ্রাপ্ত বয়সের নারীদের বাল্যবিবাহের অনুপাত বিগত বছরের তুলনায় বেড়েছে। ২০২৩ সালে নারীদের (১৫ বছর বয়সের কম) বিয়ের হার বেড়ে দাঁড়ায় ৮.২ শতাংশ, যা ২০২২ সালে ছিল ৬.৫ শতাংশ, আর ২০১৯ সালে ছিল ৬.২ শতাংশ। গত রোববার (২৪ মার্চ) বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর (বিবিএস) সদরদপ্তরে ‘বাংলাদেশ স্যাম্পল ভাইটাল স্ট্যাটিসটিক্স ২০২৩’ এর প্রকাশিত ফলাফলে এমন তথ্য উঠে এসেছে।
বাল্যবিবাহের কারণে অপরিণত বয়সে অনেক নারী মা হন। অপ্রাপ্ত বয়সে বিয়ে হওয়ার কারণে নারীকে পারিবারিক ও সামাজিকভাবে অনেক বেশি দায়িত্ব নিতে হয়। এতে নারী শিক্ষাজীবন ক্ষতিগ্রস্ত হয় ভীষণভাবে। অধিকাংশ ক্ষেত্রেই বিয়ের পর আর শিক্ষাজীবনে ফিরতে পারে না নারীরা। পাশাপাশি স্বাস্থ্যঝুঁকিতে পড়েন।
এ বিষয়ে বাংলাদেশ মহিলা পরিষদের সভাপতি ডা. ফওজিয়া মোসলেম ইনডিপেনডেন্ট ডিজিটালকে বলেন, ‘বাল্যবিবাহের কারণগুলো হলো সামাজিক প্রথা, দরিদ্রতা, শিক্ষার অভাব। বাল্যবিবাহ যে সামাজিক ক্ষত—এই ধারণাটাই সমাজের মধ্যে নেই। সবাই মনে করে নারীদের বেশি পড়ালেখার দরকার নেই। মেয়ে হয়ে যখন জন্মগ্রহণ করেছে, তাই তাকে তাড়াতাড়ি বিয়ে দিতে হবে। এখানে মূল বিষয়টা হলো, নারীকে ভালো পাত্রস্থ করার যে ধ্যান–ধারণা—সেই অবস্থান থেকে আমরা কেউ বের হয়ে আসতে পারছি না। এটা বাল্যবিবাহের প্রথম কারণ। দ্বিতীয় কারণ হলো—কন্যা শিশুর প্রতি সহিংসতা, নির্যাতন। এই সহিসংতার পরিমাণ এত বেড়েছে যে, বাবা–মা কন্যা সন্তানকে নিয়ে দুশ্চিন্তাগ্রস্ত থাকেন। সমাজে নিজের মেয়েকে অনিরাপদ মনে করে তাঁরা অপ্রাপ্ত বয়সেই তাকে পাত্রস্থ করেন। পাত্রস্থ করার পর তাদের নিজেদের যাবতীয় দায়িত্ব শেষ বলে মনে করেন। এরপর তাদের মেয়েকে নিয়ে চিন্তা করবে তার স্বামী। করোনার সময়ে বাল্যবিবাহ বেশি হয়েছে। কারণ করোনাকালে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান বন্ধ ছিল। অনেকের লেখাপড়াও বন্ধ হয়ে যায়। এ কারণে সে সময় বাল্যবিবাহের হার বেশি ছিল।’
মহিলা পরিষদের সভাপতি ডা. ফওজিয়া মোসলেম মনে করেন, বাল্যবিবাহ প্রতিরোধে প্রাতিষ্ঠানিক উদ্যোগ হাতে নিতে হবে। বাল্যবিবাহ নিরোধ আইনের মধ্যে কিছু অসংগতি রয়েছে। সেই অসংগতি দূর করতে হবে। জেলায় জেলায় যে বাল্যবিবাহের প্রতিরোধ কমিটি রয়েছে, সেই কমিটিগুলোর কার্যক্রম সচল করতে হবে। এ ছাড়া কাজীরা যে অপ্রাপ্ত বয়সীদের বিয়ে দিচ্ছেন, তা বন্ধ করতে হবে। যেসব কাজী আইনের বিরুদ্ধে গিয়ে বিয়ে করাচ্ছেন, তাঁদের শাস্তির ব্যবস্থা করতে হবে। বিয়ের কাজ ম্যাজিস্ট্রেট দিয়ে সম্পন্ন করতে হবে। এ ছাড়া নারীদের লেখাপড়ার বিষয়ে পরিবার থেকে আরও অনেক বেশি উদ্যোগী হতে হবে। বিয়ের জন্য মাঝপথে লেখাপড়া বন্ধ করা যাবে না।
বাল্যবিবাহের কারণে নারীরা দুর্বিসহ জীবনের পাশাপাশি দীর্ঘমেয়াদি ভোগান্তিতেও পড়েন। অনেকের ক্ষেত্রে দেখা যায়, তারা ধর্ষণের শিকার হয় তার চেয়ে দ্বিগুণ বয়সের স্বামী নামক মানুষটির দ্বারা। এতে সে নারী মানসিক, শারীরিকভাবে বিপর্যস্ত হয়ে পড়ে।
এ বিষয়ে কুমুদিনী উইমেন্স মেডিকেল কলেজের অধ্যাপক (স্ত্রী রোগ ও প্রসূতি বিদ্যা) বিলকিস বেগম চৌধুরী বলেন, ‘বেশির ভাগ বাল্যবিবাহের ক্ষেত্রে দেখা যায়, তারা পরিবার পরিকল্পনার পদ্ধতির নিয়মকানুন ঠিকমতো মেনে চলেন না এবং তারা সচেতনও না। এ কারণে অপ্রাপ্ত বয়সে গর্ভধারণ করেন। তখন একজন গর্ভবতী হিসেবে সেই কিশোরী অনেক ধরনের স্বাস্থ্যঝুঁকিতে পড়েন। কারণ, তাঁর প্রসবপথ গর্ভধারণের উপযোগী হওয়ার আগেই তিনি সন্তানসম্ভবা হয়ে পড়েন। ফলে তিনি ও নবজাতক স্বাস্থ্যঝুঁকিতে পড়ে। এমনকি সন্তান জন্মের আগে মারাও যেতে পারে। এ কারণে আমরা বলে থাকি, বাল্যবিবাহ করা উচিত না।’
বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর (বিবিএস) প্রকাশিত প্রতিবেদন অনুযায়ী, ১৮ বছর বয়সের আগে নারীদের বিয়ের হার ২০২৩ সালে ৪১.৬ শতাংশ দাঁড়িয়েছে, যা ২০২২ সালে ছিল ৪০.৯ শতাংশ। এ হার ২০২১ সালে ছিল ৩২.৪, ২০২০ সালে ছিল ৩১.৩ ও ২০১৯ সালে ৪১.১ শতাংশ ছিল। এই জরিপে দেখা যায়, নারীদের বাল্যবিবাহের অনুপাত বিগত বছরের তুলনায় অনেকাংশে বেড়েছে।
বাল্যবিবাহের কারণে নারীরা কী ধরনের ভোগান্তির শিকার হচ্ছেন জানতে চাইলে ‘নিজেরা করি’ সংগঠনের সমন্বয়ক খুশী কবির বলেন, ‘বাল্যবিবাহের কারণে নারীরা শুধু স্বাস্থ্যঝুকিঁতেই পড়ছে না, পাশাপাশি মানসিক সংকটেরও মুখোমুখি হচ্ছে। যে বয়সে সে নিজের জগতে বেড়ে ওঠার কথা, খেলাধুলা বা পড়ালেখা করার কথা, সে বয়সে তাকে চলে যেতে হচ্ছে অপরিচিত একজনের ঘরে। সেখানে গিয়ে সে চার দেয়ালে বন্দি হয়ে পড়ছে। সে কিশোরীর কাছ থেকে তো তার শৈশব কেড়ে নেওয়া হচ্ছে। তাকে থাকতে বলা হচ্ছে, তারচেয়ে বয়সে অনেক বড় একজন মানুষের সঙ্গে। এটা তো আন্তর্জাতিক শিশু সনদের পরিপন্থী কাজ।’
সমাজের অব্যস্থাপনাকেই বাল্যবিবাহের কারণ হিসেবে চিহ্নিত করেছেন খুশী কবির। তাঁর মতে, সমাজ মনে করে, কন্যা সন্তান মানেই তার মূল গন্তব্য বিয়ে। জন্মের পর তাকে শেখানো হয়, স্বামী বা শ্বশুর বাড়িতে গিয়ে মানিয়ে নিয়ে সবার মন জয় করে চলতে হবে। কিন্তু এই ধরনের কথা তো ছেলেদের বলা হয় না। এই সমাজে ছেলেরা আক্রমণের স্বীকার হলে তার চরিত্রে কোনো দাগ পড়ে না। কিন্তু একটা মেয়ে নির্যাতনের শিকার হলে তার চরিত্রের ওপর দাগ পড়ে। মেয়ের চরিত্র নিয়ে টানাটানি শুরু হয়। এই মানসিকতার পরিবর্তন জরুরি। বাল্যবিবাহ বন্ধে সমাজের মানসিকতার পরিবর্তন দরকার।
খুশী কবির বলেন, ‘বাল্যবিবাহ বন্ধ করতে সমাজে সচেতনতা বাড়াতে হবে। প্রত্যেক স্কুলে এই উদ্যোগ হাতে নেওয়া প্রয়োজন। স্কুল থেকে যদি শিক্ষার্থীদের সচেতন করা হয়, তবে বাল্যবিবাহ অনেকাংশে কমে যাবে। পাশাপাশি সমাজের সর্বস্তরের মানুষদের মধ্যে সচেতনতা বাড়াতে হবে। প্রয়োজন শক্ত পদক্ষেপ। মানুষের সদিচ্ছা থাকলে অবশ্যই বাল্যবিবাহ কমানো সম্ভব।
বাল্যবিবাহের ক্ষেত্রে আইন আছে, কিন্তু তা সত্ত্বেও কমছে না। এই প্রশ্নের উত্তরে বাংলাদেশ সুপ্রিম কোর্টের আইনজীবী তান্ইয়া নাহার বলেন, ‘বাল্যবিবাহ নিরোধের লক্ষ্যে বাংলাদেশ সরকার ২০১৭ সালে Child Marriage Restraint Act, 1929 বাতিল পূর্বক বাল্যবিবাহ নিরোধ আইন, ২০১৭ নামে একটি নতুন আইন প্রণয়ন করে। এই আইনের ৭ ধারায় বলা হয়েছে, “প্রাপ্তবয়স্ক কোনো নারী বা পুরুষ বাল্যবিবাহ করলে তিনি অনধিক ২ বছর কারাদণ্ড বা অনধিক ১ লক্ষ টাকা অর্থদণ্ড বা উভয় দণ্ডে দণ্ডনীয় হবেন এবং অর্থদণ্ড অনাদায়ে অনধিক ৩ (তিন) মাস কারাদণ্ড যুক্ত হবে।” আরও বলা আছে, “যদি অপ্রাপ্ত বয়স্ক কোনো নারী বা পুরুষ বাল্যবিবাহ করেন, তবে তিনি অনধিক ১ মাসের আটকাদেশ বা অনধিক ৫০ হাজার টাকা জরিমানা বা উভয় দণ্ডে দণ্ডনীয় হবেন।” এই আইনের ৮ ধারা অনুসারে, “পিতা-মাতা, অভিভাবক অথবা অন্য কোনো ব্যক্তি, আইনগতভাবে বা আইনবহির্ভূতভাবে কোনো অপ্রাপ্তবয়স্ক ব্যক্তির ওপর কর্তৃত্ব সম্পন্ন হইয়া বাল্যবিবাহ সম্পন্ন করিবার ক্ষেত্রে অনধিক ২ (দুই) বছর ও অন্যূন ৬ (ছয়) মাস কারাদণ্ড বা অনধিক ৫০ (পঞ্চাশ) হাজার টাকা অর্থদণ্ড বা উভয় দণ্ডে দণ্ডনীয় হইবেন এবং অর্থদণ্ড অনাদায়ে অনধিক ৩ (তিন) মাস কারাদণ্ডে দণ্ডনীয় হইবেন।”’
আইনজীবী তান্ইয়া নাহার মনে করেন, আইনের বিধিবিধান সত্ত্বেও বাল্যবিবাহ নিরোধ করা পুরোপুরি সম্ভব হচ্ছে না। আর এর পেছনে দায়ী বাল্যবিবাহের ভয়ানক কুফলগুলো সম্পর্কে সচেতনতার অভাব, ধর্মীয় গোঁড়ামি, কুসংস্কার, অশিক্ষা, স্বল্পশিক্ষা, আইন কার্যকরে কঠোরতার অভাব, সঠিক প্রচারের অভাব এবং সর্বোপরি গণসচেতনতা সৃষ্টির জন্য কার্যকর পদক্ষেপের অভাব।
আরও পড়ুন: