আমাদের দেশের বিভিন্ন শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে বা কর্মক্ষেত্রে যৌন হয়রানির শিকার হচ্ছেন অনেক শিশু, কিশোরী, এমনকি পূর্ণ বয়স্ক নারী। যৌন হয়রানি যে শুধু শারীরিকভাবে হয়, তেমনটি নয়। এটি হতে পারে কথার মাধ্যমে, লিখিত বা অপ্রীতিকর স্পর্শ, অশ্লীল কৌতুক কিংবা আলাপ, কাজের ছুতায় শারীরিক-মানসিক হেনস্তায়।
২০০৯ সালের ১৪ মে হাইকোর্ট কর্মক্ষেত্রে নারীর প্রতি সব ধরনের হয়রানি, নির্যাতন, অনাচার, বৈষম্য বন্ধের জন্য নির্দেশনা দেন। সরকারি কিংবা বেসরকারি- সকল প্রতিষ্ঠানে যৌন হয়রানি প্রতিরোধের জন্য ‘যৌন হয়রানি প্রতিরোধ কমিটি’ গঠনের আদেশও দেওয়া হয়। কর্মক্ষেত্রে এটি থাকা বাধ্যতামূলক করে হাইকোর্ট।
কাজেই ভুক্তভোগীর কর্মক্ষেত্রে যদি এই ধরনের কমিটি থাকে, তাহলে তিনি সেখানে অভিযোগ করতে পারেন। প্রয়োজনীয় প্রমাণ সাপেক্ষে উক্ত অভিযুক্ত ব্যক্তির বিরুদ্ধে পদক্ষেপ নেবে ভুক্তভোগীর প্রতিষ্ঠান। তাছাড়া ভুক্তভোগী লিখিত আকারেও যৌন হয়রানির অভিযোগ করতে পারেন, যেমন: টেক্সট, মেসেঞ্জার, হোয়াটসঅ্যাপ বা ই-মেইলের মাধ্যমে। চিঠি লিখেও অভিযোগ করতে পারা যায়।
ডিজিটাল প্রযুক্তি ব্যবহার করে হয়রানি করার নামই সাইবার বুলিং। এ ক্ষেত্রে যাদের টার্গেট করা হয় তাদের ভয় দেখানো, রাগিয়ে দেওয়া, বিব্রত করার জন্য এ ধরনের আচরণ করা হয়। উদাহরণ হিসাবে বলা যায়, কোন পুরুষ শিক্ষক তার ছাত্রীর সঙ্গে বা কর্মক্ষেত্রে অফিসের বস বা পুরুষ সহকর্মী তাদের নারী সহকর্মীকে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে বিব্রত বা ক্ষতিকর বার্তা পাঠালে কিংবা হুমকি দিলে তা আইনের চোখে অপরাধ। মুখোমুখি বুলিং এবং সাইবার বুলিং প্রায়শই একে অপরের পাশাপাশি ঘটতে পারে। তবে, সাইবার বুলিং একটি ডিজিটাল পদচিহ্ন রেখে যায়। এই ডিজিটাল পদচিহ্ন এমন একটি রেকর্ড যা কার্যকর প্রমাণ হিসাবে কাজ করতে পারে এবং অপব্যবহার বন্ধে প্রমাণ হিসেবে সহায়তা করে।
শুধু সাইবার বুলিং ই নয়, এ ধরনের অপরাধ কিন্তু ইভটিজিং এর আওতায় ও পরে। ইভটিজিং বলতে সাধারণত কোনো নারী বা কিশোরীকে তার স্বাভাবিক চলাফেরা বা কাজকর্ম করা অবস্থায় অশালীন মন্তব্য, ভয় দেখানো, তার নাম ধরে ডাকা এবং চিৎকার করা,বিকৃত নামে ডাকা, কোনো কিছু ছুঁড়ে দেয়া, ব্যক্তিত্বে লাগে এমন মন্তব্য করা,যোগ্যতা নিয়ে টিটকারি করা, তাকে নিয়ে অহেতুক হাস্যরসের উদ্রেক করা, রাস্তায় হাঁটতে বাধা দেওয়া, অশ্লীল অঙ্গভঙ্গি করা, ইঙ্গিতপূর্ণ ইশারা দেওয়া, সিগারেটের ধোঁয়া গায়ে ছাড়া, উদ্দেশ্যেমূলকভাবে পিছু নেওয়া, অশ্লীলভাবে প্রেম নিবেদন করা, উদ্দেশ্যেমূলকভাবে গান, ছড়া বা কবিতা আবৃত্তি করা, চিঠি লেখা, পথ রোধ করে দাঁড়ানো, প্রেমে সাড়া না দিলে হুমকি প্রদান ইত্যাদি।
ঢাকা মেট্রোপলিটন পুলিশ অধ্যাদেশের ৭৫ ধারায় বলা হয়েছে- সমাজে অশালীন বা উচ্ছৃঙ্খল আচরণের শাস্তি হিসেবে তিন মাস মেয়াদ পর্যন্ত কারাদণ্ড বা ৫০০ টাকা জরিমানা বা উভয় দণ্ডের বিধান রয়েছে। ১৮৬০ সনের দণ্ডবিধি আইনের ৩৫৪ ধারায় বলা হয়েছে- যদি কোন ব্যক্তি কোন নারীর শালীনতা নষ্ট করার অভিপ্রায় বা শ্লীলতাহানির জন্য নারীকে আক্রমণ অথবা অপরাধমূলক বলপ্রয়োগ করে, তাহলে সেই ব্যক্তি ২ বছর পর্যন্ত কারাদণ্ডে বা জরিমানা বা উভয় দণ্ডে দণ্ডিত হবেন।
দণ্ডবিধির আইনের ২৯৪ ধারায় বলা হয়েছে, যে ব্যক্তি অন্যদের বিরক্তি সৃষ্টি করে, কোনো প্রকাশ্য স্থানের কাছাকাছি কোনো অশ্লীল কাজ করে অথবা কোনো প্রকাশ্য স্থানে কোনো অশ্লীল গান গায়, আবৃত্তি করে বা উচ্চারণ করে, সেই ব্যক্তি তিন মাস পর্যন্ত কারাদণ্ড বা অর্থদণ্ডে বা উভয় দণ্ডে দণ্ডনীয় হবেন।
কাজেই যৌন হয়রানির শিকার হলে ভুক্তভোগীর স্থানীয় থানায় গিয়ে অপরাধীর বিরুদ্ধে মামলা করার সুযোগ আছে। আর যদি ভুক্তভোগীর কাছে লিখিত প্রমাণ থাকে তাহলে তা অবশ্যই থানায় দাখিল করবেন।
লেখক: অ্যাডভোকেট, বাংলাদেশ সুপ্রিম কোর্ট


ব্যক্তিগত ছবি ইন্টারনেটে প্রকাশের ভয় দেখালে কী করবেন?
কোনগুলো স্ত্রীর ওপর মানসিক নির্যাতন, আইন কী বলে
