শিশু, জন্মের পর পরিবারে নিয়ে আসে আনন্দ আর আশার আলো। এই আনন্দে শ্রেণি বিভাজন থাকে না। বাবা-মা শিশুকে পৃথিবীতে আনেন পরিবার বিস্তারের জন্য, বৃহৎ অর্থে আমরা যাকে বলি, মানবসভ্যতার ধারা বহমান রাখতে। আগামী দিনে সমাজ এগিয়ে যাবে আজকের শিশুদের হাত ধরেই- এ প্রত্যাশা থাকে সকলেরই। তাই বলা হয়, আজকের শিশুই ভবিষ্যতের নাগরিক। সকল আশা-ভরসা নিয়ে রাষ্ট্র তাকিয়ে থাকে তার ভবিষ্যৎ প্রজন্মের দিকে।
ধনাঢ্য বা সচ্ছল পরিবারগুলোতে শিশুরা লালিত-পালিত হয় আদরে-আহ্লাদে, সকল সুযোগ-সুবিধা নিয়ে। কিন্তু সোনার চামচ মুখে জন্ম হয় আর কজনের? বাংলাদেশের বেশিরভাগ শিশু জন্মায় মাথায় ঋণের বোঝা নিয়ে। ছেলে শিশু জন্মালে খুশি হন বাবা-মা, তারা মনে করেন সংসারে আয়ের একজন এলো। আর কন্যা শিশুকে বোঝা মনে করা হলেও, একটু বড় হতে হতে তাকেও কোনো একটা কাজে জুড়ে দেওয়ার চেষ্টা চলে। এভাবেই হারিয়ে যায় শিশুর শৈশব। গালভরা যে বুলি আছে ‘সবার জন্য শিক্ষা’ তাকে বুড়ো আঙুল দেখিয়ে ৭/৮ বছরের একটি শিশু বাবার হাত ধরে একটি পুঁটলি কাঁখে নিয়ে চলে আসে আলো ঝলমল ঢাকা শহরে। যে শহর তার কাছে রূপকথার মতো। লঞ্চ, বাস বা ট্রেন থেকে নেমে চোখভরা বিস্ময় নিয়ে জনস্রোতে ভেসে যেতে যেতে মাথা ঘুরিয়ে ঘুরিয়ে দেখে সুউচ্চ ইমারত, লাল-নীল আলো আর বড়ো বড়ো নানা ধরনের যানবাহন। মনে আনন্দের খই ফোটে এটা ভেবে যে, আজ থেকে এ চাকচিক্যের অংশ সেও।
কিন্তু বুঝতেও পারে না কোন জঙ্গলে কোন বাঘের থাবায় পড়তে যাচ্ছে সে। এসে ঢুকে এক কবুতরের খোপের মধ্যে। সেখানেও আলোর কমতি নেই, তবে তার কতটুকু তার জন্য সেটা জানার অপেক্ষা মাত্র। বাবার পেছন থেকে পাঞ্জাবির ফাঁক দিয়ে অবাক চোখ দুটো দেখে মাথার ওপরের পাখা, টেলিভিশন, ফ্রিজ, কম্পিউটার যেসবের নামই সে জানে না। অজানা এক সুখের বেলুন ফুলতে থাকে মনে। হাজারো কথা, প্রতিশ্রুতি আর হাতে টাকা নিয়ে চলে যান বাবা, ঠোঁটে তার হাসি। বাবা দরজার আড়াল হতেই শিশুটির বুক ভেঙে কান্না আসে আর এতক্ষণ বাবার কাছে প্রতিশ্রুতি দেওয়া মানুষটির বদলে যাওয়া কণ্ঠের রূঢ়তায় মনের আনন্দের বেলুনটি ফটাস করে ফেটে যায়। সাত বছর বয়সেই আছড়ে পড়ে নিষ্ঠুর বাস্তবের মাটিতে।
রাষ্ট্র যে শিশুর জন্য অবৈতনিক শিক্ষার ব্যবস্থা করেছে, নিষিদ্ধ করছে শিশুশ্রম; সে শিশুই সূর্যোদয় থেকে গভীর রাত পর্যন্ত কঠিন সব কাজ করতে থাকে। তারই বয়সী বা বড়ো মনিব সন্তানের স্কুলব্যাগ কাঁধে নিয়ে স্কুল গেইট পর্যন্ত এগিয়ে দেয়, তবু এখতিয়ার নেই ভিতরে ঢোকার। পেটে দাউ দাউ খিদে নিয়ে সুন্দর থালায় চোব্য-চোষ্য সাজিয়ে টেবিলে পরিবেশন করে ক্ষুধা না-থাকা চকচকে মানুষের সামনে। জোর করে তুলে দেওয়া হয় পাতে। সব শেষে উচ্ছিষ্ট ছুঁড়ে দিয়ে পরের কাজের নির্দেশ দেওয়া হয়। সে শুকনা খাবার গলায় ঢুকিয়েই ছুটতে হয় পরের কাজে। পড়ার টেবিল গুছাতে গিয়ে ছবির বইয়ে কিংবা চলতি পথে টেলিভিশনের পর্দায় চোখ আটকে গিয়ে হাত শিথিল হলে বা দাঁড়িয়ে গেলে ছুটে আসে ভর্ৎসনার তীর, কখনোবা শারীরিক নির্যাতন। কোনো কিছু ভাঙলে বা কাজে ভুল হলে তো কথাই নেই। কিছু হারালে বা নষ্ট হলে সন্দেহের তীর প্রথমেই তার দিকে। শুরু হয়ে যায় নির্যাতন। যার কিছু নমুনা আমরা প্রায়শই দেখি পত্রিকার পাতায়, টেলিভিশনের পর্দায়।
তবুও বেশিরভাগের খবর অজানাই থেকে যায়। মনিবের সন্তানের বড় কিংবা আটোসাঁটো জামা গায়ে জড়িয়ে দোকান, বাজার-হাটেও যেতে হয় তাকে। শত নির্যাতনেও মুখে শব্দ করা যাবে না। বাবা ফোন করলে কী কথা বলছে, তা পাহারা দেওয়ার জন্য সামনে দণ্ডায়মান থাকে কেউ না কেউ। তাই মনের কথা, কষ্টের কথা জানতে পারেন না বাবা-মা।
বাবার কাছে মাসের টাকা চলে যায় মোবাইল ব্যাংকিংয়ের বদৌলতে। এতেই পরিবার খুশি। টাকার মেশিন কেমন আছে, কী লাভ সে খবরে। দেখতে যাওয়া খরচের ব্যাপার, সময়ও নষ্ট। আবার কোনো অপারগ দরদী বাবা-মা খোঁজ নিতে চাইলেও তা নির্ভর করে মনিবের ইচ্ছার ওপর। বেশিরভাগ ক্ষেত্রে জানতে পারে না সন্তান। অভিমানের দলা জমে থাকে গলার কাছে।
যুগ যুগ ধরে পত্রিকার পাতায় গৃহকর্মী নির্যাতনের খবর ছাপা হচ্ছে, ভেসে উঠছে টেলিভিশনের পর্দায়। দগ্ধ হয়ে হাসপাতালে, ১০ তলা থেকে পড়ে গিয়ে ফেটে চৌচির, শরীরভর্তি খুন্তির ছেঁকা, পিটিয়ে প্রাণ নিয়ে নেওয়া নিথর শরীরের ছবি এখন আর কোনো ছাপ ফেলে না আমাদের পাথর নাগরিক মনে। অশ্রুসজল বাবা সন্তানের মৃত বা অর্ধমৃত শরীরটা আর ক্ষতিপূরণের কিছু টাকা নিয়ে মুখে টুঁ শব্দটি না করে ফিরে যান বাড়ি। আইন আদালত তো দুরস্ত, প্রশ্ন করারও সাহস হয় না জলজ্যান্ত সন্তান তার লাশ হলো কী করে। গৃহকর্তা যদি কেউকেটা কেউ হন, তখন সাংবাদিক, পুলিশ সব ম্যানেজড; তখন দেখা যায় না কাউকে। ভাগ্যক্রমে তেমন প্রভাবশালী কেউ না হলে দেখা যায় কিছু সাংবাদিকের তৎপরতা। তাও ততক্ষণ, যতক্ষণ টিআরপি থাকে। তারপর সব শেষ। সাবেক এক ক্রিকেটার ও তার স্ত্রীর বিরুদ্ধে এই অভিযোগ ছিল। আইনি পদক্ষেপও নেওয়া হয়েছিল। কিন্তু প্রতিকার কই? ডেইলি স্টারের নির্বাহী সম্পাদক সৈয়দ আশফাকুল হক ও তার স্ত্রীর নির্যাতনের শিকার হয়ে নিহত হলেন প্রীতি উরাং। তাঁদেরও আনা হয়েছে আইনের আওতায়। কিন্তু রাষ্ট্র যদি ঠিকঠাক তৎপর না হয়, তবে এর প্রতিকার কখনোই সম্ভব নয়। কারণ, আইন আছে, কিছু কিছু ঘটনায় আইনের প্রয়োগও হচ্ছে, কিন্তু সমস্যার সমাধান হচ্ছে না।
উন্নয়নশীল, প্রগতির, ডিজিটাল আর স্মার্ট বাংলাদেশ জাতিসংঘে নানা দলিলে সই করে শিশু অধিকার রক্ষায় অঙ্গীকারবদ্ধ। তবু কেন বারবার সাংবাদিকের বাড়ির বারান্দা থেকে পড়ে যায় শিশু গৃহকর্মী, পুলিশ কর্মকর্তা, বড় ব্যবসায়ীর ঘরে পিটিয়ে মৃতপ্রায় শিশু গৃহকর্মীকে উদ্ধার করা হয়, তার কোনো উত্তর আমাদের জানা নেই। চিপস আর কোমল পানীয় কারখানায় দগ্ধ হয়ে মরে শিশুশ্রমিক, রাষ্ট্র নির্বিকার। রাষ্ট্রের কী কোনো দায় নেই?
লেখক: শিক্ষক ও সংস্কৃতিকর্মী


ফেব্রুয়ারিতে ২৯১ টি নারী ও শিশু নির্যাতনের ঘটনা ঘটেছে : এমএসএফ
নির্যাতনের শিকার নারী–শিশুর জন্য যত আইন
