অফিসে যাওয়ার ব্যস্ততা কিংবা দিনের কর্মব্যস্ততার মাঝেই হঠাৎ মোবাইল ফোনে একটি এসএমএস, “আপনার গাড়ি ট্রাফিক সিগন্যাল অমান্য করেছে। জরিমানা পরিশোধ না করলে আইনগত ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে।” মেসেজে বাংলাদেশ সড়ক পরিবহন কর্তৃপক্ষ (বিআরটিএ)-এর ওয়েবসাইটের মতো দেখতে একটি লিংক।
সরকারি প্রতিষ্ঠানের নাম ও সম্ভাব্য আইনি ঝামেলার ভয় থেকে অনেকেই তড়িঘড়ি করে লিংকটিতে প্রবেশ করলে দেখতে পারেন বাংলাদেশ সড়ক পরিবহন কর্তৃপক্ষ (বিআরটিএ)-এর ওয়েবসাইটের আদলে একটি ওয়েবসাইট। সেখানে জরিমানা পরিশোধের নামে ব্যাংক কার্ডের তথ্য প্রদান করেন। কিছুক্ষণের মধ্যেই মোবাইলে আসে ওটিপি। ভুক্তভোগী বুঝে ওঠার আগেই তার ব্যাংক হিসাব বা কার্ড থেকে টাকা কেটে নেওয়া হয়।
পুলিশের অপরাধ তদন্ত বিভাগ (সিআইডি) এক প্রেস বিজ্ঞপ্তিতে তুলে ধরেছে অভিনব এমন প্রতারণার কথা। এ ঘটনায় প্রতারক চক্রের তিন সদস্যকে গ্রেপ্তারও করা হয়েছে।
বিজ্ঞপ্তিতে বলা হয়, সম্প্রতি ঠিক এমন কৌশলেই সাধারণ মানুষের সঙ্গে প্রতারণা করে আসছিল একটি সংঘবদ্ধ প্রতারক চক্র। বিআরটিএ-এর ওয়েবসাইটের আদলে ভুয়া ওয়েবসাইট তৈরি করে ট্রাফিক জরিমানা আদায়ের নামে মানুষের ব্যক্তিগত ও ব্যাংকিং তথ্য সংগ্রহ করে অর্থ আত্মসাৎ করার অভিযোগে চক্রের তিন সদস্যকে গ্রেপ্তার করেছে সিআইডি। সাইবার পুলিশ সেন্টার (সিপিসি) এর সাইবার ইন্টেলিজেন্স অ্যান্ড রিস্ক ম্যানেজমেন্টের একাধিক আভিযানিক দল প্রযুক্তিগত তদন্ত বিশ্লেষণ ও গোয়েন্দা তথ্যের ভিত্তিতে খুলনা, ফেনী ও ঢাকা (ডিএমপি)–এর বিভিন্ন এলাকায় অভিযান পরিচালনা করে তাদেরকে গ্রেপ্তার করে।
গ্রেপ্তারকৃতরা হলো– খুলনার বটিয়াঘাটা থানার মো. সাইফুদ্দিন শেখের ছেলে মো. রাব্বি শেখ (২৪), ফেনীর সোনাগাজী থানার মৃত মিন্টু মিয়ার ছেলে মো. রিয়াদ হোসেন (৩১), ও ডিএমপির অধীন ঢাকার দক্ষিণখান থানার মো. আনিছুর রহমানের ছেলে মো. সাজ্জাদ হোসেন (৩১)।
বিজ্ঞপ্তিতে উল্লেখ করা হয়, প্রথমে খুলনা জেলার বটিয়াঘাটা এলাকায় অভিযান পরিচালনা করে মামলার অন্যতম অভিযুক্ত মো. রাব্বি শেখকে গ্রেপ্তার করা হয়। পরবর্তীতে গ্রেপ্তারকৃতের দেওয়া তথ্য ও প্রাপ্ত সূত্রের ভিত্তিতে ফেনী জেলার সদর থানাধীন এলাকা থেকে প্রতারক চক্রের অপর সদস্য মো. রিয়াদ হোসেনকে গ্রেপ্তার করা হয়। অপর একটি আভিযানিক দল ডিএমপির দক্ষিণখান থানাধীন এলাকায় অভিযান পরিচালনা করে একই মামলার অপর অভিযুক্ত মো. সাজ্জাদ হোসেনকে গ্রেপ্তার করে।
মামলাটির এজাহার সূত্রে জানা যায় যে, ভুক্তভোগী বাদী তার মোবাইল ফোনে বাংলাদেশ সড়ক পরিবহন কর্তৃপক্ষ (বিআরটিএ)-এর নামে ট্রাফিক জরিমানা ও মামলা সংক্রান্ত এসএমএস পান। এসএমএসে দেওয়া লিংকে প্রবেশ করে তিনি দেখতে পান যে তার অফিসের গাড়ির বিরুদ্ধে ট্রাফিক আইন লঙ্ঘনের অভিযোগে ৩ হাজার টাকা জরিমানা ধার্য করা হয়েছে, যা ৪৮ ঘণ্টার মধ্যে পরিশোধ করলে ১ হাজার ৫০০ টাকা পরিশোধ করতে হবে। বিষয়টি সত্য মনে করে তিনি জরিমানা পরিশোধের উদ্দেশ্যে একটি অনলাইন পেমেন্ট পোর্টালে প্রবেশ করেন এবং সেখানে তার স্ত্রীর ক্রেডিট কার্ডের তথ্য, ব্যাংক অ্যাপের লগইন তথ্য ও ওটিপি প্রবেশ করান।
পরবর্তীতে দেখতে পান জরিমানার অর্থ পরিশোধের পরিবর্তে তার স্ত্রীর ব্যাংক হিসাব থেকে ৩ লাখ টাকা প্রতারণার মাধ্যমে অন্য একটি ব্যাংক হিসাবে স্থানান্তর করা হয়েছে। বিষয়টি বুঝতে পেরে তিনি সিআইডির সাইবার পুলিশ সেন্টারে (সিপিসি) অভিযোগ দায়ের করেন। সিপিসিতে একই ধরনের আরও দুটি অভিযোগে দেখা যায়, প্রতারক চক্র ভুয়া ট্রাফিক মামলা ও জরিমানার ভয় দেখিয়ে এসএমএসের মাধ্যমে ফিশিং লিংক পাঠিয়ে ভুক্তভোগীদের ব্যাংক কার্ড, অ্যাকাউন্ট ও ওটিপি তথ্য সংগ্রহ করে তাদের হিসাব থেকে অর্থ আত্মসাৎ করেছে। পরবর্তীতে বাদী উত্তরা পশ্চিম থানার মামলা নং-১০(০৬)২৬, ধারা- সাইবার সুরক্ষা আইন, ২০২৬ এর ২১(২)/২২(২)/২৩(২)/২৭(২)/২৮(২) রুজু করেন। সিআইডির সাইবার পুলিশ সেন্টার বিষয়টিকে গুরুত্ব সহকারে তদন্ত ও তথ্য- উপাত্ত সংগ্রহ করতে শুরু করে।
মামলাটির তদন্তকালে সিআইডি জানতে পারে যে, একটি সংঘবদ্ধ প্রতারক চক্র বাংলাদেশ সড়ক পরিবহন কর্তৃপক্ষ (বিআরটিএ)-এর ওয়েবসাইটের আদলে একটি ভুয়া ওয়েবসাইট তৈরি করে সাধারণ মানুষের সঙ্গে প্রতারণা করছিল। চক্রটি বিভিন্ন ব্যক্তির মোবাইল নম্বরে এসএমএস প্রেরণ করে ট্রাফিক সিগন্যাল অমান্য, ট্রাফিক জরিমানা বা মামলা সংক্রান্ত ভীতিকর বার্তা পাঠাত এবং সেই বার্তার সঙ্গে একটি ভুয়া ওয়েবসাইটের লিংক যুক্ত করত।
সরকারি ওয়েবসাইটের সঙ্গে সাদৃশ্যপূর্ণ হওয়ায় অনেক ভুক্তভোগী সেটিকে প্রকৃত বিআরটিএ ওয়েবসাইট মনে করে লিংকে প্রবেশ করে। পরবর্তীতে জরিমানা পরিশোধ কিংবা মামলা সংক্রান্ত তথ্য যাচাইয়ের উদ্দেশ্যে তারা তাদের ব্যাংক কার্ডের নম্বর, ব্যক্তিগত তথ্য ও অন্যান্য আর্থিক তথ্য প্রদান করে। প্রতারক চক্রটি বিভিন্ন কৌশলে ভুক্তভোগীদের নিকট থেকে ওটিপি সংগ্রহ করে এবং সেই তথ্য ব্যবহার করে তাদের ব্যাংক হিসাব ও কার্ড থেকে অননুমোদিত লেনদেনের মাধ্যমে অর্থ আত্মসাৎ করে। তদন্তে এ পর্যন্ত একই কৌশলে প্রতারক চক্রটি একাধিক ভুক্তভোগীর কাছ থেকে সর্বমোট ৭ লক্ষ ২৫ হাজার ৬০০ টাকা আত্মসাৎ করেছে মর্মে জানা যায়।
সাইবার পুলিশ সেন্টার, সিআইডির একটি চৌকস আভিযানিক দল প্রাপ্ত তথ্য প্রযুক্তি দ্বারা বিশ্লেষণ ও গোয়েন্দা তথ্যের ভিত্তিতে দেশের বিভিন্ন স্থানে সমন্বিত অভিযান পরিচালনা করে অভিযুক্ত মো. রাব্বি শেখ, মো. রিয়াদ হোসেন ও মো. সাজ্জাদ হোসেনকে গ্রেপ্তার করে।
প্রাথমিক জিজ্ঞাসাবাদে গ্রেপ্তারকৃত আসামিদের বিরুদ্ধে প্রতারণামূলক কার্যক্রমে জড়িত থাকার গুরুত্বপূর্ণ তথ্য পাওয়া গেছে। মামলাটির তদন্ত অব্যাহত রয়েছে এবং চক্রের অন্যান্য সদস্যদের শনাক্ত ও গ্রেপ্তারের লক্ষ্যে সিআইডির অভিযান চলমান রয়েছে। গ্রেপ্তারকৃতদেরকে আদালতে সোপর্দ করার প্রক্রিয়া চলমান।



