পাঁচ দশক ধরে শিশুদের মাত্র এক টাকার বিনিময়ে পড়াচ্ছেন গাইবান্ধার শিক্ষক লুৎফর রহমান। এবার সেই আলোর দিশারী ‘এক টাকার মাস্টার’ পেয়েছেন রাষ্ট্রীয় স্বীকৃতি। সম্প্রতি বিশ্ব শিক্ষক দিবসে রাজধানীতে এক অনুষ্ঠানে দেশের ১০০ জন গুণী শিক্ষকের মাঝে তাঁর হাতেও রাষ্ট্রীয় সম্মাননা তুলে দেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান।
নিঃস্বার্থভাবে শিক্ষার আলো ছড়িয়ে ৫ দশক পর অবশেষে রাষ্ট্রের সর্বোচ্চ স্বীকৃতি পেলেন লুৎফর রহমান। গত সোমবার বিশ্ব শিক্ষক দিবস উপলক্ষ্যে রাজধানীর ওসমানী স্মৃতি মিলনায়তনে অনুষ্ঠানে তাঁর হাতে সম্মাননা পদক, মেডেল, সনদ ও দুই লাখ টাকার অনুদান তুলে দেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। পাশাপাশি তাঁকে আজীবন অবসরকালীন ভাতা দেওয়ার ঘোষণা হয়। সম্মাননার পর গাইবান্ধা নিজ গ্রাম বাগুড়ায় পৌঁছালে ‘এক টাকার মাস্টার’কে বরণ করে উৎফুল্ল গ্রামবাসী।
স্থানীয় এক নারী বলেন, ‘এক টাকাও কেউ দিছে, কেউ দেয়নি। তাও তিনি পড়াইছেন।’
স্থানীয় এক ব্যক্তি বলেন, ‘আমাদের দুই ভাইকে তিনি পড়িয়েছেন। আমাদের মতো অনেক ছেলেমেয়েকে উনি পড়িয়েছেন।’
১৯৫১ সালে গাইবান্ধার ফুলছড়ির উড়িয়া গ্রামে জন্ম লুৎফর রহমানের। ১৯৭৪ সালে এইচএসসি পাস করেন তিনি। সে বছরই নদীভাঙনে ভিটেমাটি হারিয়ে আশ্রয় নেন বাগুড়িয়া গ্রামে। দারিদ্র্যের কষাঘাতের মাঝেও গ্রামে গ্রামে ছড়ান শিক্ষার আলো। সুবিধাবঞ্চিত শিশুদের পাঠদান করে বদলে দিয়েছেন হাজারও জীবন। গড়ে তুলছেন ‘এক টাকার শিক্ষাশালা’। ৭৪ বছর বয়সেও ছড়িয়ে দিচ্ছেন শিক্ষার আলো।
এক টাকার মাস্টার লুৎফর রহমান বলেন, ‘প্রধানমন্ত্রী ওয়াদা করেছেন যে, আমাকে অবসর ভাতা দেবেন। ভাতা দিলে ওইটাই আমার সম্বল। মাননীয় প্রধানমন্ত্রী আমাকে কিছু অ্যাডভান্স টাকা দিল; দুই লাখ টাকা দিয়েছেন।’
লুৎফর রহমানের বড় ছেলে লাভলু মিয়া বলেন, ‘কেউ টাকা দিয়েছে, কেউ দেয়নি। তা–ও তিনি লেখাপড়া করিয়েছেন। বর্তমান প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান উনি যে আব্বাকে সম্মানিত করেছেন এতে আমাদের পরিবারসহ সবাই খুব আনন্দিত।’
প্রাতিষ্ঠানিক পদ না থাকার পরেও লুৎফর রহমানের অবদানের স্বীকৃতি শিক্ষক সমাজের মর্যাদা বাড়িয়েছে, বলছেন শিক্ষাবিদরা। তাঁরা বলছেন, নিবেদিতপ্রাণ শিক্ষার প্রদীপ যে কখনোই নেভে না, এ সম্মাননা তারই প্রমাণ
গাইবান্ধার ফুলছড়ির চন্দিয়া মহিলা কলেজের অধ্যক্ষ মো. মোসাদ্দেকুল হক মামুন বলেন, ‘বর্তমান প্রধানমন্ত্রীকে ধন্যবাদ দিতে চাই যে, জীবনের শেষ প্রান্তে চলে আসা এরকম একজন গুণী মানুষকে যিনি সমাদৃত করেছেন। শিক্ষকতা জীবনে এটা একটা বড় প্রাপ্তি যদি মুল্যায়ন হয়। এই মুল্যায়নটুকু লুৎফর রহমান সাহেব পেয়েছেন।’
লুৎফর রহমানের ‘এক টাকার শিক্ষাশালা’র উদ্যোগ যুগে যুগে হাজারো সুবিধাবঞ্চিত শিশুর পথকে আলোকিত করবে, এমনটাই প্রত্যাশা এলাকাবাসীর।


