ভারী বৃষ্টি, জলাবদ্ধতা ও বন্যা পরিস্থিতির মধ্যেই সোমবার সারা দেশে এইচএসসি ও সমমানের পরীক্ষা অনুষ্ঠিত হয়েছে। তবে বন্যা পরিস্থিতির কারণে চট্টগ্রাম শিক্ষা বোর্ডের আওতাধীন পাঁচ জেলায় এদিন পরীক্ষা নেওয়া হয়নি। অন্যদিকে দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে কোমরসমান পানি, জলাবদ্ধতা ও দুর্যোগ উপেক্ষা করে পরীক্ষাকেন্দ্রে পৌঁছাতে হয়েছে হাজারো পরীক্ষার্থীকে। এমন পরিস্থিতিতে পরীক্ষা নেওয়ার সিদ্ধান্তকে কেন্দ্র করে শিক্ষার্থী, অভিভাবক ও নেটিজেনদের মধ্যে তীব্র ক্ষোভ ও সমালোচনা দেখা দিয়েছে।
সোমবার আটটি সাধারণ শিক্ষা বোর্ড (চট্টগ্রাম বোর্ড ছাড়া) এবং মাদ্রাসা ও কারিগরি শিক্ষা বোর্ডের পরীক্ষা পূর্বঘোষিত সূচি অনুযায়ী অনুষ্ঠিত হয়। পদার্থবিজ্ঞান প্রথমপত্র, হিসাববিজ্ঞান প্রথমপত্র ও যুক্তিবিদ্যা প্রথমপত্রের পরীক্ষা অনুষ্ঠিত হলেও দেশের বিভিন্ন জেলায় পরীক্ষার্থীদের চরম দুর্ভোগ পোহাতে হয়। কুমিল্লা, লক্ষ্মীপুর, চাঁদপুর, সিলেট, হবিগঞ্জ, মৌলভীবাজার, সুনামগঞ্জ ও নোয়াখালীর বিভিন্ন এলাকায় হাঁটু থেকে কোমরসমান পানি পেরিয়ে, কোথাও নৌকা বা ভ্যানে চড়ে কেন্দ্রে পৌঁছাতে দেখা যায় শিক্ষার্থীদের।
দেশের কয়েকটি অঞ্চলে বন্যার কারণে পরিস্থিতি ছিল অত্যন্ত দুর্বিষহ। নোয়াখালীর হাতিয়ার কয়েকটি পরীক্ষাকেন্দ্রে পানি জমে যায় এবং উপজেলার শত শত পরিবার জলাবদ্ধতায় আটকে পড়ে। কুমিল্লার সরকারি মহিলা কলেজ, ভিক্টোরিয়া কলেজ ও ভাষাসৈনিক অজিত গুহ কলেজ কেন্দ্রের জলাবদ্ধতার ভিডিও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়লে ব্যাপক আলোচনা শুরু হয়। অনেক পরীক্ষার্থী ভেজা পোশাকেই তিন ঘণ্টার পরীক্ষা দিয়েছেন। অভিভাবকদেরও পানিতে দাঁড়িয়ে অপেক্ষা করতে দেখা যায়। এমন পরিস্থিতিতে পরীক্ষার্থীদের নিরাপত্তা ও মানসিক চাপের বিষয়টি বিবেচনায় নেওয়া হয়নি বলে অভিযোগ করেন তারা।
পরীক্ষা স্থগিত না করার সিদ্ধান্তের সমালোচনা করেন অনেকেই। অনেকে আবহাওয়া স্বাভাবিক না হওয়া পর্যন্ত সারা দেশে পরীক্ষা স্থগিতের দাবি জানান। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে বিভিন্ন পোস্টে দুর্যোগের মধ্যে পরীক্ষা নেওয়াকে অমানবিক বলে মন্তব্য করা হয়। একই সঙ্গে শিক্ষামন্ত্রী ও সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের সিদ্ধান্ত নিয়েও প্রশ্ন তোলেন অনেক নেটিজেন।
এক অভিভাবক বলেন, ‘ওরা কেন্দ্রে ঢুকেছে পুরো শরীর ভেজা। পোশাক ভিজেছে, এমন পোশাক পরে কোনো শিক্ষার্থী তিন ঘণ্টা পরীক্ষা দিতে পারে? এগুলো কি সরকার, মন্ত্রীদের চোখে পড়ে না?’ আরেক অভিভাবক বলেন, ‘গত দুটি পরীক্ষায় বৃষ্টিতে ভিজে, পানিতে অনেকটা সাঁতরে কেন্দ্রে যাচ্ছে। অথচ কারও কোনো কথা নেই। মনে হচ্ছে দেশে কোনো সরকার নেই। পরীক্ষার্থীদের প্রতি তাদের কোনো দায়বদ্ধতা নেই।’
আন্তঃশিক্ষা বোর্ড সমন্বয় কমিটির সভাপতি ও ঢাকা শিক্ষা বোর্ডের চেয়ারম্যান অধ্যাপক সৈয়দ আক্তারুজ্জামান জানান, পরীক্ষা স্থগিতের সিদ্ধান্ত স্থানীয় জেলা প্রশাসনের প্রতিবেদনের ভিত্তিতে নেওয়া হয়। চট্টগ্রাম ছাড়া অন্য জেলার প্রশাসনের পক্ষ থেকে পরিস্থিতি স্বাভাবিক থাকার তথ্য দেওয়া হয়েছিল। তবে রাতের বৃষ্টিতে কয়েকটি এলাকায় নতুন করে জলাবদ্ধতা সৃষ্টি হয়েছে এবং বিষয়টি গুরুত্বের সঙ্গে পর্যবেক্ষণ করা হচ্ছে। প্রয়োজন হলে পরবর্তী সিদ্ধান্ত নেওয়া হবে বলেও জানান তিনি।
এদিকে শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে, ৬৪ জেলার জেলা প্রশাসক ও সংশ্লিষ্ট শিক্ষা বোর্ডের চেয়ারম্যানদের সঙ্গে আলোচনা করে এলাকার পরিস্থিতি বিবেচনায় পরীক্ষা নেওয়া বা স্থগিতের সিদ্ধান্ত হচ্ছে। যেসব পরীক্ষা পিছিয়ে যাবে, সেগুলো পরে নেওয়ার পরিকল্পনাও রয়েছে। তবে দুর্যোগের মধ্যে পরীক্ষার্থীদের ভোগান্তির কারণে পরীক্ষা স্থগিত না করার সিদ্ধান্ত নিয়ে জনমনে যে ক্ষোভ ও বিতর্ক তৈরি হয়েছে, তা সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমসহ বিভিন্ন মহলে আলোচনার কেন্দ্রবিন্দুতে পরিণত হয়েছে।



