প্রসবকালীন একজন নারীর অন্যান্য অনেক জটিলতা ও সমস্যার মধ্যে সবচেয়ে বেদনাবহ ভয়াবহ একটি হচ্ছে ‘প্রসবজনিত ফিস্টুলা’। জেনিটাল ফিস্টুলা হলো নারীর জননপথের (মাসিকের রাস্তা) সঙ্গে মূত্রথলি/মূত্রনালী বা মলদ্বার অথবা উভয়ের একটি অস্বাভাবিক সংযোগ স্থাপিত হওয়া। জেনিটাল ফিস্টুলার প্রধান কারণ হচ্ছে বাধাগ্রস্ত প্রসব। তবে অপারেশন অথবা আঘাতজনিত কারণেও এটা হতে পারে। যখন এটা প্রসবজনিত কারণে হয়, তখন তাকে বলে ‘প্রসবজনিত ফিস্টুলা’।
প্রসবজনিত ফিস্টুলার চিকিৎসার ধরণ কি?
প্রসবজনিত ফিস্টুলার দুই ধরনের চিকিৎসা আছে—নিরাময়যোগ্য ও প্রতিরোধযোগ্য।
নিরাময়যোগ্য
ফিস্টুলা রোগের একমাত্র চিকিৎসা হচ্ছে - অপারেশন। বাংলাদেশে এগারোটি সরকারি মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে (ইউএনএফপি-র সহযোগিতায়) এবং সাতটি বেসরকারি হাসপাতালে বিভিন্ন আন্তর্জাতিক এনজিওর সহযোগিতায় (যেমন: ফিস্টুলা ফাউন্ডেশন, ডিরেক্ট রিলিফ ইত্যাদি) সম্পূর্ণ বিনা খরচে এই রোগীদের অপারেশন করা হয়।
প্রতিরোধযোগ্য
১. কোনো কন্যার ১৮ বছরের আগে বিয়ে নয় এবং ২০ বছরের আগে গর্ভধারণ নয়। সুতরাং কারো যদি কোনো কারণে পরিণত বয়সের আগে বিয়ে হয়, তাকে অবশ্যই জন্মনিরোধক পদ্ধতি নিতে হবে।
২. গর্ভাবস্থায় প্রশিক্ষণপ্রাপ্ত স্বাস্থ্যকর্মী দিয়ে কমপক্ষে নিয়মিত চারবার মায়ের স্বাস্থ্য পরীক্ষা করাতে হবে। ফলে ঝুঁকিপূর্ণ মায়েদের চিহ্নিত করে উপযুক্ত স্বাস্থ্যকেন্দ্রে পাঠালে উপযুক্ত সময়ে সঠিক সিদ্ধান্ত নেওয়া সম্ভব হবে।
৩. প্রাতিষ্ঠানিক প্রসবের সংখ্যা বাড়াতে হবে।
৪. বাড়িতে প্রসবের সময় অবশ্যই প্রশিক্ষিত স্বাস্থ্য কর্মী থাকতে হবে। ফলে কোনো ধরনের জটিলতা দেখা দিলে, সেটা দ্রুত নির্ণয় করে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া সহজ হবে।
৫. বিলম্বিত ও বাধাগ্রস্ত প্রসবের ক্ষেত্রে রোগীকে প্রস্রাবের থলিতে নল বা ক্যাথেটার পরিয়ে ৪ সপ্তাহ নল-সমেত রাখতে হবে। এর ফলে মূত্রথলির রক্ত চলাচল প্রক্রিয়া ধীরে ধীরে স্বাভাবিক হয়ে আসবে। এতে করে ছোট ফিস্টুলা থাকলে সেটা ভালো হয়ে যেতে পারে। আর বড় ফিস্টুলা থাকলে আকারে ছোট হয়ে যেতে পারে। ফলে অপারেশন সফল হওয়ার সমূহ সম্ভাবনা তৈরি হবে। এসময়ে মা পর্যাপ্ত পরিমাণ পানি ও তরল খাবার খাবেন।
মানসম্পন্ন প্রসূতি সেবার কারণে উন্নত বিশ্বে এখন প্রসবজনিত ফিস্টুলা নেই। বাংলাদেশে মাতৃমৃত্যুর হার কমে এসেছে। একই সাথে প্রসবজনিত ফিস্টুলার সংখ্যাও কমে এসেছে। বাংলাদেশে ২০০৩ সালের এক জরিপ অনুযায়ী, আনুমানিক ৭১ হাজার নারী প্রসবজনিত ফিস্টুলার শিকার ছিল। ২০১৬ সালে জাতীয় পর্যায়ের এক সমীক্ষা অনুযায়ী ২০ হাজারের মতো নারী (১৫ থেকে ৬৪ বছর বয়সী) প্রসবজনিত ফিস্টুলায় ভুগছেন। বর্তমানে সেই সংখ্যা সম্ভবত আরো কমে এসেছে।
আমাদের আছে ১৩ হাজারেরও অধিক কমিউনিটি ক্লিনিক। প্রতিটি ক্লিনিকে ছয় হাজার মানুষকে প্রাথমিক স্বাস্থ্যসেবা দেওয়া সম্ভব। আরো আছে দক্ষ প্রশিক্ষণপ্রাপ্ত মাঠকর্মী, যারা বাড়িতে বাড়িতে প্রাথমিক পর্যায়ের স্বাস্থ্যসেবা পৌঁছে দিতে পারেন। আমাদেরকে একটি চমৎকার সংযোগ স্থাপন করতে হবে এই সমস্ত প্রশিক্ষণপ্রাপ্ত স্বাস্থ্যকর্মী, গর্ভবতী নারী ও তার পারিবারিক সদস্যদের মধ্যে। উদ্দেশ্য হবে-
১. প্রতিটি গর্ভবতী নারী অন্ততপক্ষে নিয়মিত চার বার গর্ভাবস্থায় চেক-আপ করানো।
২. এখনো ৫০ শতাংশ প্রসব বাড়িতে হচ্ছে। প্রাতিষ্ঠানিক ডেলিভারির সংখ্যা বাড়ানোর জন্য ব্যাপক প্রয়াস চালাতে হবে।
লেখক: অধ্যাপক, প্রসূতিবিদ্যা ও স্ত্রীরোগ বিশেষজ্ঞ এবং ফিস্টুলা সার্জন, কুমুদিনী উইমেন্স মেডিকেল কলেজ
আরও পড়ুন:



