১৯৯০ সালের ৬ ডিসেম্বর সামরিক শাসক হুসেইন মুহাম্মদ এরশাদের পতনের মধ্য দিয়ে বাংলাদেশের রাজনীতিতে একটি বড় মোড় আসে। দীর্ঘ স্বৈরশাসনের পর জনগণের প্রত্যাশা ছিল গণতান্ত্রিক ব্যবস্থায় ফেরার।
সেই প্রেক্ষাপটে ১৯৯১ সালের ২৭ ফেব্রুয়ারি অনুষ্ঠিত হয় পঞ্চম জাতীয় সংসদ নির্বাচন। অন্তর্বর্তী সরকারের অধীনে হওয়া এ নির্বাচনে প্রায় সব বড় রাজনৈতিক দল অংশ নেয়। বিএনপি জয়ী হয়ে সরকার গঠন করে এবং পরে সংবিধান সংশোধনের মাধ্যমে দেশে সংসদীয় শাসনব্যবস্থা পুনঃপ্রবর্তন করা হয়।
এরপরের নির্বাচন আসে ১৯৯৬ সালে, যা ছিল রাজনৈতিক টানাপোড়েনে ভরা। ১৫ ফেব্রুয়ারি অনুষ্ঠিত নির্বাচনটি প্রধান বিরোধী দলগুলোর বর্জনের কারণে বিতর্কিত হয়ে পড়ে। আন্দোলনের মুখে সংসদে তত্ত্বাবধায়ক সরকারের বিল পাস করে সংসদ ভেঙে দেওয়া হয়।
পরে ১২ জুন তত্ত্বাবধায়ক সরকারের অধীনে আবার নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়। সে নির্বাচনে আওয়ামী লীগ জয়ী হয়ে সরকার গঠন করে। তত্ত্বাবধায়ক সরকার ব্যবস্থার অধীনে এটিই ছিল প্রথম জাতীয় নির্বাচন।
২০০১ সালে একই ব্যবস্থার অধীনে দ্বিতীয়বারের মতো নির্বাচন হয়। বিএনপির নেতৃত্বে চারদলীয় জোট জয়লাভ করে। খালেদা জিয়া দ্বিতীয়বারের মতো প্রধানমন্ত্রী হন। এ সময় দেশে জোটভিত্তিক রাজনীতির প্রভাব আরও স্পষ্ট হয়ে ওঠে।
২০০৭ সালের রাজনৈতিক অস্থিরতার প্রেক্ষাপটে দেশে জরুরি অবস্থা জারি হয় এবং সেনা-সমর্থিত তত্ত্বাবধায়ক সরকার প্রায় দুই বছর দায়িত্বে থাকে। এ সময় দুর্নীতিবিরোধী অভিযানে গ্রেপ্তার হন দুই প্রধান নেত্রী, খালেদা জিয়া ও শেখ হাসিনা। ২০০৮ সালের নির্বাচনে আওয়ামী লীগ নিরঙ্কুশ বিজয় পেয়ে সরকার গঠন করে।
২০১৪ সালের নির্বাচন হয় তত্ত্বাবধায়ক সরকার ব্যবস্থা বাতিলের পর। নির্বাচনকালীন সরকার নিয়ে বিরোধী দলগুলোর আন্দোলনের মধ্যে বিএনপিসহ বেশির ভাগ বিরোধী দল নির্বাচন বর্জন করে। দেড় শতাধিক আসনে প্রার্থীরা বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতায় নির্বাচিত হন। আওয়ামী লীগ টানা দ্বিতীয় মেয়াদে সরকার গঠন করে।
২০১৮ সালের নির্বাচনে বিএনপিসহ বিরোধী দলগুলো অংশ নেয়। তবে ভোটগ্রহণ ও ফলাফল নিয়ে নানা অভিযোগ ওঠে। আওয়ামী লীগ আবারও জয়ী হয়ে সরকার গঠন করে। নির্বাচনটি নিয়ে রাজনৈতিক অঙ্গনে বিতর্ক দীর্ঘদিন ধরে আলোচিত হয়।
২০২৪ সালে অনুষ্ঠিত হয় দ্বাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন। বিএনপি এ নির্বাচন বর্জন করে। আওয়ামী লীগ জয়ী হয়ে টানা মেয়াদে সরকার গঠন করে। তবে একই বছরের ৫ আগস্ট এক গণআন্দোলনের পর দেশের রাজনৈতিক পরিস্থিতিতে বড় পরিবর্তন আসে এবং ক্ষমতার পালাবদল ঘটে।
গত ৩৫ বছরের জাতীয় নির্বাচনগুলো শুধু সরকার গঠনের প্রক্রিয়া নয়। বরং দেশের রাজনৈতিক সংস্কৃতি, অংশগ্রহণের প্রশ্ন ও আস্থার সংকটের প্রতিচ্ছবি। প্রতিটি নির্বাচনই সময়ের বাস্তবতা ও রাজনৈতিক সমীকরণকে সামনে এনেছে।
গণতান্ত্রিক ধারাবাহিকতা রক্ষা এবং অংশগ্রহণমূলক নির্বাচন নিশ্চিত করা। এই দুই প্রশ্ন এখনো বাংলাদেশের রাজনীতিতে গুরুত্বপূর্ণ হয়ে আছে।



