গোয়াংজু যাওয়ার আগে সবাই একটা ভুল করে। ভুলটা হলো, তারা ভাবে চীনে যাচ্ছে। আসলে তারা যাচ্ছে একটা বিশাল বাজারের ভেতরে। এই পার্থক্যটা বুঝতে আমার তিন দিন লেগেছিল।
ঢাকার বিমানবন্দরে দাঁড়িয়ে তখন অবশ্য এসব কিছুই মনে হয়নি। মনে হচ্ছিল, ব্যাগের মধ্যে পাসপোর্ট আছে, ভিসা আছে, কিছু ডলার আছে। কাজেই পৃথিবীর আর কোনো চিন্তা নেই।
আমার সঙ্গে যিনি যাচ্ছিলেন, তিনি ব্যবসায়ী মানুষ। নাম রাসেল। বিমানবন্দরে বসেই তিনি আমাকে বললেন, ‘ভাই, চীনে গিয়ে প্রথম কাজ কী?’ আমি বললাম, ‘হোটেলে যাব।’ তিনি বললেন, ‘না। প্রথম কাজ হলো ভুল না করা।’ কথাটা খুব জ্ঞানের! পরে বুঝেছি, রাসেল ঠিকই বলেছিলেন।
চীনে যাওয়ার আগে কাগজপত্র ঠিক করা সবচেয়ে জরুরি। দুই ভাগ করুন। একটা হলো খুবই ইজি টু সার্ভ জাতীয়। ভাত-তরকারি জাতীয়। মূল খাবার, তবে প্লেটে নিলেন আর খেয়ে ফেললেন এমন। মানে পাসপোর্ট, ভিসা ও টিকিট কপি। আরেকটাতে পাসপোর্ট কপি, ভিসা কপি, হোটেল বুকিং, প্রয়োজনীয় ব্যবসায়িক কাগজপত্র এবং চীনে যাদের সঙ্গে দেখা করবেন তাদের যোগাযোগের তথ্য আলাদা করে রাখাই ভালো।
বিমানে বসে জানালা দিয়ে নিচে তাকিয়ে মনে হলো, বাংলাদেশ আর চীনের মাঝখানে আকাশটা আশ্চর্য রকম একই। পৃথিবী বদলে যায়। আকাশ বদলায় না।
বাইয়ুন বিমানবন্দরে নামার পর প্রথম যে জিনিসটি বুঝলাম, সেটা হলো গোয়াংজু ছোট শহর নয়। বিমানবন্দর থেকে শহরে যাওয়ার ব্যবস্থা আছে মেট্রো, ট্যাক্সি এবং অন্যান্য পরিবহনে। মেট্রো লাইন তিন বিমানবন্দরকে শহরের সঙ্গে যুক্ত করে। ক্যান্টন ফেয়ারের সময় বিমানবন্দর থেকে মেলার এলাকাতেও বিশেষ পরিবহন ব্যবস্থা বাড়ানো হয়।
খুব ভোরে নেমেছি। সম্ভবত চারটা। আমাদের মাথায় প্ল্যান আলাদা। ইমিগ্রেশন শেষ করে লম্বা সোফায় গা এলিয়ে দিলাম। পাশেই লাগেজ। এভাবে চোখ বন্ধ করাটা বোকামি হবে কিনা ভাবছি। তবে দেখলাম অনেকেই লাগেজ পাশে ফেলে শুধু চোখ না, নাক মুখ ঢেকে ঘুমাচ্ছে। চীন দেশ, চোরের বালাই নাই, এমন একটা বিষয় মনে হলো। পাঁচ মিনিটের জন্য চোখটা বুজে দেখি সকাল ৮টা।
সেখান থেকে বের হয়ে মেট্রো ধরে গোয়াংজু সাউথ স্টেশনে ছুটলাম। সেখানেই আছে বুলেট ট্রেন বা হাইস্পিড ট্রেন। তাই আমাদের প্রথম গন্তব্য গোয়াংজুর হোটেল নয়, শেনজেন! ইলেকট্রনিক্স মার্কেটের স্বর্গরাজ্য। শেনজেন নিয়ে পরে আবার লিখব। আমার লেখার উদ্দেশ্য ব্যবসায়ীদের জন্য। গুয়াংজুতেই আপনি যেভাবে এ টু জেড কাজ সারতে পারবেন, তা বলা।
হোটেলে পৌঁছে আবার নতুন সমস্যা। ওয়াইফাই আছে, কিন্তু গুগল নেই। কিছু অ্যাপ আছে, কিছু নেই। তখন বুঝলাম, চীনে যাওয়ার আগে ফোনটাকেও প্রস্তুত করতে হয়। আলিপে, উইচ্যাট, প্রয়োজনীয় যোগাযোগের ব্যবস্থা এবং ইন্টারনেট ব্যবহারের পরিকল্পনা আগে করে রাখা বুদ্ধিমানের কাজ।
আপাতত শেনজেন স্কিপ করে গুয়াংজুর হোটেল থেকে শুরু করা যাক।
পরদিন সকালেই আসল গোয়াংজু দেখতে বের হলাম। এই শহরের সবচেয়ে মজার ব্যাপার হলো, এখানে ব্যবসা আর জীবন আলাদা নয়। আপনি রাস্তায় হাঁটছেন, এক পাশে রেস্তোরাঁ, আরেক পাশে গুদাম, তার পাশেই পাইকারি বাজার, তার ওপরের তলায় অফিস, নিচে মাল ওঠানামা করছে।
কেউ কোটি টাকার পণ্য কিনছে, কেউ আবার পাঁচশো টাকার জিনিস নিয়ে দরদাম করছে। গোয়াংজু বহুদিনের বাণিজ্যিক শহর। আজকের ক্যান্টন ফেয়ার, বিশাল পাইকারি বাজার আর পার্ল রিভার ডেল্টার শিল্পাঞ্চলগুলো শহরটাকে আন্তর্জাতিক ব্যবসার অন্যতম কেন্দ্র বানিয়েছে।
ব্যবসায়ী হিসেবে কোথায় থাকবেন, সেটাও খুব গুরুত্বপূর্ণ। ক্যান্টন ফেয়ারে কাজ থাকলে পাঝৌ সুবিধাজনক। মিটিং বেশি হলে তিয়ানহ্য বা ঝুঝিয়াং নিউ টাউন ভালো। পাইকারি বাজার ঘুরতে হলে ইউয়েশিউ এলাকার সুবিধা বেশি। অর্থাৎ হোটেল আগে বুক করলেই হলো না, আপনি কী ব্যবসা করবেন, সেটাও জানতে হবে।
আমাদের প্রথম বাজার ছিল ইদে লু, তারপর হুয়াংশা, দাশাতৌ, নিউ এশিয়া। একদিনে যত বাজার দেখা যায়, তার চেয়ে বেশি পণ্য সেখানে দেখা যায়।
রাসেল একটা ব্যাগ হাতে নিয়ে দাম জিজ্ঞেস করল। দোকানি একটা সংখ্যা বলল। রাসেল আমার দিকে তাকাল, আমি রাসেলের দিকে তাকালাম। দুজনের চোখেই একই প্রশ্ন, এটা কি আসল দাম?
চীনে ব্যবসার সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ পাঠগুলোর একটি এখানেই। প্রথম দামকে শেষ দাম ভাববেন না। একটা পণ্য দেখে ছবি তুলুন, নমুনা নিন, একই পণ্য কয়েক জায়গায় দেখুন, পরিমাণ বলুন, তারপর দাম জিজ্ঞেস করুন। বড় অর্ডার হলে ন্যূনতম অর্ডারের পরিমাণ, প্যাকেজিং, উৎপাদনের সময়, পেমেন্ট পদ্ধতি এবং শিপিং আলাদা করে জেনে নিন।
আর শুধু বাজার দেখে ব্যবসা করবেন না। সম্ভব হলে সরবরাহকারীর অফিস বা কারখানায় যান। কারণ দোকানে যে মানুষটি আপনার সঙ্গে হাসিমুখে কথা বলছেন, তিনিই হয়তো প্রকৃত প্রস্তুতকারক নন।
গোয়াংজু থেকে ফোশান, দংগুয়ান কিংবা শেনঝেনের শিল্পাঞ্চলে যাওয়া যায়। তাই শহরটাকে শুধু কেনাকাটার জায়গা ভাবলে ভুল হবে। এটা আসলে দক্ষিণ চীনের বিশাল সরবরাহব্যবস্থার একটি দরজা।
ক্যান্টন ফেয়ারের সময় এই ব্যাপারটা আরও পরিষ্কার হয়। বিশ্বের নানা দেশ থেকে ক্রেতারা আসে। মেলার বিশাল হলের মধ্যে দাঁড়িয়ে মনে হয়, পৃথিবীর সব ব্যবসায়ী একই প্রশ্ন করছে, ‘দাম কত?’, ‘কত দিনে দিতে পারবেন?’, ‘নমুনা আছে?’, ‘বাংলাদেশে পাঠাবেন?’
কিন্তু গোয়াংজু শুধু ব্যবসা নয়। এক সন্ধ্যায় কাজ শেষ করে আমরা পার্ল নদীর পাশে গেলাম। সারাদিন পণ্যের দাম, কারখানা, শিপিং, নমুনা নিয়ে কথা বলার পর নদীর পাশে দাঁড়িয়ে রাসেল হঠাৎ বলল, ‘ভাই, চীন আসলে সুন্দর।’ আমি বললাম, ‘এতদিন পরে বুঝলেন?’ সে বলল, ‘না। এতদিন পণ্যের দিকে তাকিয়ে ছিলাম। আজ শহরের দিকে তাকালাম।’
গোয়াংজুর আসল সৌন্দর্য সম্ভবত এখানেই। এখানে আপনি একই দিনে কোটি টাকার ব্যবসার কথা বলতে পারেন, আবার রাতে চুপচাপ নদীর পাশে দাঁড়িয়ে থাকতে পারেন।
আর ফেরার আগে একটা কাজ অবশ্যই করতে হয়। সব নমুনার হিসাব, কার সঙ্গে কথা হয়েছে তার তালিকা, কাকে আবার ফোন করতে হবে, কোন পণ্যের দাম ভালো, কোন সরবরাহকারীকে বিশ্বাস করা যায়, কোন পণ্য দেশে পাঠাবেন, কোনটা শুধু দেখে রেখে দেবেন।
কারণ গোয়াংজুতে আসা সহজ, গোয়াংজু থেকে ব্যবসা নিয়ে দেশে ফেরা কঠিন। আর এই শহরের সবচেয়ে বড় শিক্ষা হলো, এখানে কেউ আপনার হয়ে ব্যবসা করে দেবে না। আপনাকেই শিখতে হবে, দাম বুঝতে হবে, মানুষ বুঝতে হবে, সময় বুঝতে হবে।
তারপর একদিন দেখবেন, যে শহরে প্রথম দিন বিমানবন্দর থেকে বের হতে ভয় লাগছিল, সেই শহরের একটা রাস্তার মোড় আপনার কাছে পরিচিত হয়ে গেছে। দোকানদার আপনাকে দেখে হাসছে, আর আপনি বাংলা ভাষায় ফোনে বলছেন, ‘হ্যাঁ, মালটা ভালো। দেশে পাঠান।’
তখন বুঝবেন, আপনি আর পর্যটক নেই। আপনি গোয়াংজুর ব্যবসার গল্পের একজন চরিত্র হয়ে গেছেন।
চলবে...


