ঘুষ একটি উপাদেয় খাবার। এই দেশের পাশাপাশি বিশ্বের বিভিন্ন দেশেই ঘুষ খাওয়া ও দেওয়ার চল আছে। কোথাও মাত্রাছাড়া, কোথাও চুপেচাপে। ফলে কারওটা সামনে আসে, কারওটা আসে না। তবে ব্যাকরণ অনুযায়ী ঘুষ আসলে টেবিলের নিচ দিয়ে খেতে হয়। তা হাত দিয়েই বা মুখ দিয়ে খাওয়া হোক। কিন্তু যখন তা খুল্লামখুল্লা হয়, তখন বুঝতে হবে– ডাল মে বহুত কুছ কালা হ্যায়!
অতিসম্প্রতি দুই সরকারি কর্মচারীর বিরুদ্ধে ঘুষ চাওয়া, এমনকি তার অঙ্ক নির্ধারণ করে দেওয়া-সংক্রান্ত অভিযোগ উঠেছে। জমির নামজারিতে কত টাকা ঘুষ দিতে হবে, তা নির্ধারণের অভিযোগ উঠেছে পিরোজপুরের নাজিরপুর উপজেলার এসি (ল্যান্ড)-এর বিরুদ্ধে। এ-সংক্রান্ত কথোপকথনের একটি অডিও সামাজিক যোগাযোগের মাধ্যমে এখন ভাইরাল। এসিল্যান্ড অভিযোগটি অস্বীকার করলেও বিষয়টি খতিয়ে দেখেছেন জেলা প্রশাসক। গঠিত তিন সদস্যের তদন্ত কমিটি প্রতিবেদনও দাখিল করেছে এবং সেখানে অভিযোগের প্রাথমিক সত্যতাও পাওয়া গেছে।
অন্যদিকে রাজশাহীর চারঘাট থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মাহবুবুল আলমের বিরুদ্ধে আব্দুল আলিম কালু নামে এক আসামির স্ত্রী সাহারা বেগমকে ডেকে ৭ লাখ টাকা চাওয়ার একটি অডিও ফাঁস হয়েছে। এ সময় ওসি সাহেব সাহারা বেগমকে মাদক ব্যবসার পরামর্শ দেন এবং নির্বিঘ্নে ব্যবসার জন্য জেলা ডিবির এক ওসিকে বদলি করে দেওয়ারও আশ্বাস দেন। এরই মধ্যে সাহারা বেগমের করা লিখিত অভিযোগ আমলে নিয়ে অভিযুক্ত ওসি মাহবুবুলকে প্রত্যাহার করে পুলিশ লাইনে সংযুক্ত করা হয়েছে।
অর্থাৎ, অভিযোগ উঠেছে জোরেশোরেই। দুটি ঘটনাতেই অডিও ক্লিপ পাওয়া গেছে। যদিও এ ধরনের অডিও ক্লিপের সত্যতা যাচাইয়ের একটি বিষয় থাকেই। তবে অভিযুক্তকে চলতি দায়িত্ব থেকে সরিয়ে দেওয়ার অর্থই হলো– প্রাথমিক সত্যতা মেনে নেওয়া। এসব অডিও ক্লিপ শুনলে মনে হবে, ঘুষ খাওয়া এবং এটি খাওয়াতে শ্রেণি-ধর্ম নির্বিশেষে সবাইকে মোটামুটি বাধ্য করার একটি বন্দোবস্ত করার মিশনে ছিলেন অভিযুক্ত দুজন। একজন তো বিভাগের সবাইকে নিয়ে বসে নির্ধারণ করে দিচ্ছিলেন ঘুষের রেট। আর অন্যজন পায়ে বেড়ি বাঁধছিলেন ছলে-বলে-কৌশলে। সেখানে ঘুষের বিপরীতে ফ্রিতে ছিল অবৈধ ব্যবসা চালানোর পরামর্শ। একেবারে বিজনেস কনসালটেন্সি যাকে বলে! বুঝুন তবে, ঘুষের কত গুণ!
ঘুষ হলো মূলত উপরি আয়। ওই ল্যান্ডের এসি বা পুলিশের ওসি– দুজনেই সরকারি কর্মচারী। তাঁরা অবশ্যই সরকারের নির্ধারিত বেতন-ভাতা পান। তবে তাতেও সন্তুষ্টি না থাকাতেই মূলত উপরি আয়ের দিকে ঝুঁকে পড়া। এর পেছনে সমাজে উৎকৃষ্ট আর্থিক মর্যাদা লাভের লোভ একটি বড় প্রভাবক হিসেবে কাজ করে। এ সমাজে অর্থই যেহেতু অধিকাংশ ক্ষেত্রে সামাজিক মর্যাদা বৃদ্ধির ভিত গড়ার কাজটি করে, ফলে এই লোভ পাশ কাটিয়ে এগোনোর মতো চারিত্রিক দৃঢ়তা ‘ক্ষমতাবান’দের পক্ষে দেখানো কঠিন হয়ে পড়ছে।
ক্ষমতার বিষয়টি এখানে খুবই গুরুত্বপূর্ণ। কারণ সরকারি কর্মচারীদের হাতেই রাষ্ট্র পরিচালনার প্রয়োজনীয় প্রাতিষ্ঠানিক ক্ষমতা দেওয়া থাকে। এটি স্পষ্ট যে, ওই ল্যান্ডের এসি বা পুলিশের ওসি সেই ক্ষমতাকেই তাদের ঘুষের থালা ভরানোর হাতিয়ার করে তুলেছিলেন। ওই যেমনটা কেয়ারটেকারকে বাড়ি সামলানোর দায়িত্ব দিলে কখনো কখনো সে রাতে গেট খুলে দেওয়ার নাম করে ভাড়াটেদের কাছ থেকে টাকা তোলে, তেমনি আর কি!
একটি গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রের সরকারি কাজকর্ম করার জন্য কিছু কর্মচারী থাকেন। তাদের মূল কাজ হলো রাষ্ট্রের যাবতীয় কর্মকাণ্ড যেন ঠিকঠাক চলে, সেটি নিশ্চিত করা। সেই সঙ্গে রাষ্ট্রের নাগরিকদের রাষ্ট্রের কাছ থেকে যেসব সুযোগ-সুবিধা ও সেবা পাওয়ার কথা, তা মূলত এ ধরনের কর্মচারীদের মাধ্যমেই নিশ্চিত করা হয়। অর্থাৎ, নাগরিকদের সুখে-শান্তিতে রাখার জন্যই রাষ্ট্র মূলত কর্মী নিয়োগ করে। গণতান্ত্রিক পদ্ধতিতে এটাই আসলে সরকারি কর্মচারী নিয়োগের মূল কারণ। তবে ওপরের দুটি ঘটনায় এটি নিশ্চিত যে, সেখানে সরকারি কর্মচারীরা নিজেদের সুখ-শান্তি স্থায়ী করার ব্যাপারেই কেবল তৎপর ছিলেন। জনগণ তাদের কাছে শুধু টাকার মেশিন।
এ দেশের সরকারি কর্মচারীদের মধ্যে অনেকের মূল সমস্যা আসলে কী তাহলে?
প্রধানতম সমস্যা হলো, এখানকার সরকারি কর্মচারীরা নিজেদের কখনো কর্মচারী ভাবতেই পারেন না। তাঁরা সর্বদাই নিজেদের রাজা-উজির ভাবতেই ভালোবাসেন। ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতাই বলা যাক। এই তো কিছুদিন আগেই এক শীর্ষস্থানীয় সরকারি হাসপাতালে সেবা নেওয়ার প্রয়োজন হয়েছিল। সেখানে যেভাবে সাধারণদের সেবা দেওয়া হচ্ছিল, তাতে একটি বিষয় স্পষ্ট ছিল। তা হলো, সেবাগ্রহীতাদের ইনফিরিয়র ভাবা। ধরুন, একজন বড় ডাক্তার অন ডিউটিতে আছেন। কিন্তু যখন রোগী একটু কথা বলতে চাইল তাঁর সরকারপ্রদত্ত এসি রুমের দরজাটি ফাঁক করে, সেই কথার অ-আ শুনলেন তো না-ই, রুমেও ঢুকতে দিলেন না। সেই রূঢ়তায় অনিচ্ছার চেয়েও অবহেলা বেশি ছিল। ওই সময় তিনি রোগী দেখছিলেন না। মেডিকেল কলেজের শিক্ষার্থীদের খাতাও দেখছিলেন না। লিখছিলেন একটা চেক বইয়ে। এর কারণে ডিউটি টাইমে কোনো রোগীকে ফিরিয়ে দেওয়া কোন ধরনের পেশাদারির মধ্যে পড়ে, তা নির্ধারণ করা সত্যিই কঠিন। এটি আপনি তখনই অবলীলায় করতে পারবেন, যখন আপনি বোধ করবেন যে সরকারপ্রদত্ত কাজটি আপনি যাদের জন্য করছেন, সেই সাধারণ জনগণ আসলে আপনার তুলনায় অনেক নিচু তলার বাসিন্দা!
এই দেশে সরকারি চাকরি ও সরকারি কর্মচারীদের কাজকে একটি স্বপ্নের চাকরি হিসেবে দেখানোর প্রক্রিয়া অনেকদিন ধরেই চালু আছে। এর পেছনে সমাজ, গণমাধ্যম ও গণমানুষ– সবাই দায়ী। এর মূল কারণ অবশ্যই আর্থিক ও সামাজিক। কারণ এ দেশে এটি এতদিনে প্রচলিত হয়ে গেছে যে, বেসরকারি চাকরিতে ঘুষ খাওয়া কষ্টসাধ্য। তবে সরকারিতে তা আয়াসসাধ্য। আবার স্থায়ীভাবে চাকরি চলে যাওয়াও বেশ কঠিন। এখন এর সামাজিক মান্যতাও জুটছে। ফলে সরকারি চাকরিতে যোগ দিয়েই এখন সবাই ‘স্যার’ বা ‘ম্যাডাম’ ডাক শুনতে উদগ্রীব হয়ে ওঠে। এর প্রধান লক্ষ্য নিজেকে সুপিরিয়র করে তোলা। তখনই ক্ষমতা প্রয়োগের উপায় হয়ে উঠতে পারা যায়। এতে করে ক্ষমতার অপব্যবহারও করা যায়। ঘুষ খাওয়া তখন আর নৈতিকতায় বাধে না। কারণ দেশীয় রাজা-জমিদার ও বিদেশি রানির জমানায় ‘জি হুজুর, জি হুজুর’ করে দিন পার করা এ দেশের সাধারণ মানুষের শত শত বছরের অভ্যাসে আছে। শুধু একবার পোষ মানাতে পারলেই হলো। আর পায় কে? খাজনার বদলে ঘুষ তোলা আর কোনো ব্যাপার?
কারণ দিন শেষে গণতান্ত্রিক ব্যবস্থায় একটি সরকারি সিস্টেমের ভেতরেই সাধারণদের বাস করতে হয়। বিভিন্ন প্রয়োজনীয় সেবা সেই ব্যবস্থার মধ্যেই পেতে হয়। আর সেটিকে পাওয়া বজ্রের মতো কঠিন কিংবা পানির মতো তরল করে দেওয়ার ম্যাজিক পাওয়ার নিয়েই চলে ঘুষের কারবার।
তাই বলে কি সরকারি কর্মচারীরা সবাই দুর্নীতি করেন? অবশ্যই নয়। কারণ সেটি হলে পুরো ব্যবস্থাটিই হুড়মুড়িয়ে ভেঙে পড়ত। সেটি যখন হয়নি, তার অর্থ হলো– সরকারি কর্মচারীদের অনেকেই এখনো নিজেদের চাকরিটা জনগণের উদ্দেশে নিবেদিত বলেই মনে করেন। কিন্তু সমস্যা হলো, এক গামলা দুধে এক ফোঁটা গোবর পড়লেও তা যেমন আর পানযোগ্য থাকে না, তেমনি কতিপয়ের খারাপ কাজে একটি বিশাল সিস্টেমই একসময় প্রশ্নবিদ্ধ হয়ে পড়ে। গণতান্ত্রিক শাসনই তখন হুমকিতে পড়ে যায়। আর এতেই বাধে গণ্ডগোল, ঘুষের দুষ্টচক্রের চক্রায়ন তখন চলতেই থাকে। দুষ্টের দৃষ্টান্তমূলক দমন আর শিষ্টের উৎকৃষ্ট পালন ছাড়া সেই চক্র ভাঙার আর উপায় থাকে না।
লেখক: উপবার্তা সম্পাদক, ইনডিপেনডেন্ট টেলিভিশন



