এমপি এলাকার, মন্ত্রী তো দেশের!

আপডেট : ২৪ নভেম্বর ২০২৪, ০৯:২৮ পিএম

দশ-বারো বছর আগে সাংবাদিকদের এক আন্তর্জাতিক সম্মিলনে অংশ নেওয়ার সৌভাগ্য হয়েছিল। সেখানে ক্রিকইনফোর প্রধান সম্পাদক সম্বিত বল নিজেদের সাফল্য ব্যাখ্যা করতে গিয়ে বলছিলেন, কীভাবে তাঁরা ম্যাচের রিপোর্ট করেন। সম্বিতের ভাষায়, যেকোনো গণমাধ্যম খেলাটাকে দেখে এক পাশ থেকে নিজের মতো করে। আর তাঁরা দেখেন ওপর থেকে, যাতে খেলাটা চারপাশ থেকে দেখা যায়। অর্থাৎ, ৩৬০ ডিগ্রি অ্যাঙ্গেলে। পরে ক্রিকইনফোর রিপোর্ট পড়তে গিয়ে খেয়াল করলাম, সম্বিতের কথা কতটা সত্য। তিনি ধরিয়ে না দিলে বোধ হয় বুঝতেই পারতাম না কখনো। এ জন্যই হয়তো ক্রিকেট নিয়ে অনেক ওয়েবসাইট আসার পরও ক্রিকইনফো তাদের জনপ্রিয়তা ধরে রাখতে পেরেছে।

আসলে সম্বিতের ভাষ্যের মধ্যে একটা ইঙ্গিত আছে। আর সেটা হলো, ক্ষুদ্রতাকে অতিক্রম করে বৃহত্তর পরিসরে কোনো কিছুকে দেখা বা দেখার চেষ্টা করা। বিষয়টি আদপে বলা যত সহজ, করা ততটাই কঠিন– সন্দেহ নেই। তবে এই ক্ষুদ্রতা ব্যক্তিগত পরিসরে থাকলে তেমন কোনো সমস্যা হয় না। কিন্তু তা যদি প্রাতিষ্ঠানিক হয় বা রাষ্ট্রীয় পর্যায়ে চলে যায়, তাহলে বৃহত্তর জনগোষ্ঠীর স্বার্থ ক্ষুণ্ন হওয়ার যথেষ্ট আশঙ্কা থাকে।

আমাদের দেশে কেউ বড় কোনো পদের অধিকারী হলে কেন জানি তিনি নিজ এলাকার বাইরে বেরোতেই পারেন না। নিজেকে এলাকার ভূমিপুত্র প্রমাণের আপ্রাণ চেষ্টা অনেক সময় বৃহত্তর স্বার্থকে ক্ষুদ্র গণ্ডির মধ্যে সীমিত করে ফেলে, এটা নিশ্চয় তাঁরা বোঝেন। তারপরও করেন। এ ক্ষেত্রে ছোট-মাঝারি-বড় আমলা থেকে শুরু করে মন্ত্রী-এমপি– কেউই বাদ যান না। তাঁরা ৩৬০ ডিগ্রি থেকে দেশটাকে না দেখে জিরো ডিগ্রিতে শুধু নিজের এলাকাকে দেখেন।

এই যেমন আমাদের রেলপথমন্ত্রী মো. জিল্লুল হাকিমকে দেখুন। এবারই প্রথম মন্ত্রী হয়েছেন। বয়সে প্রবীণ। এলাকার উন্নয়ন চাইবেন– এটাই স্বাভাবিক। গত ২০ জানুয়ারি এক মতবিনিময় সভার পরে মন্ত্রী সাংবাদিকদের বলেন, ‘দেশের সবচেয়ে বড় রেলের মেরামত কারখানা হবে রাজবাড়ীতে এবং রাজবাড়ীকে পুনরায় রেলের শহর হিসেবে পরিণত করা হবে। সেই সঙ্গে রাজবাড়ী জেলাকে একটি উন্নত, শান্তিপূর্ণ এবং সমৃদ্ধ জেলা হিসেবে গড়ে তোলা হবে।’ তিনি বলেন, রাজবাড়ী আবারও রেলের শহর হিসেবে সারা দেশে পরিচিতি পাবে। কোনো ট্রেন উঠিয়ে নেওয়ার আগে নতুন ট্রেনের ব্যবস্থা করা হবে।

এই যে রাজবাড়ীতে দেশের সবচেয়ে বড় রেল মেরামত কারখানা হবে– কোন যুক্তিতে? কেন এটা ফরিদপুর বা যশোরে হবে না? মন্ত্রী রাজবাড়ীর মানুষ বলে? বর্তমানে নীলফামারী জেলার সৈয়দপুরে এবং চট্টগ্রামের পাহাড়তলীতে রেলের গাড়ি ও যন্ত্রাংশ মেরামতের বড় কারখানা আছে। পার্বতীপুরে আছে ছোট আকারে। হঠাৎ করে এমন কী প্রয়োজন পড়ল যে, দেশের সবচেয়ে বড় এবং আরও একটা নতুন রেল মেরামত কারখানা লাগবে? সৈয়দপুর বা পাহাড়তলী কি তাহলে কাজের চাপে ন্যুব্জ হয়ে পড়েছে? আর প্রধানমন্ত্রীও খুব প্রয়োজন না হলে নতুন প্রকল্প গ্রহণের ব্যাপারে সবাইকে সাবধান করে দিয়েছেন। তাহলে কি শুধু জনমনোরঞ্জনের জন্য মন্ত্রী এমন প্রতিশ্রুতি দিতে থাকবেন?

জেলা হিসেবে রাজবাড়ীর প্রতি নির্দিষ্ট হয়ে এ কথা বলা হচ্ছে, বিষয়টা এমন না। আসলে রেলপথ এমন এক মন্ত্রণালয় যে, এই দপ্তরের মন্ত্রী হলেই তিনি নিজ এলাকার বাইরে তেমন কিছু ভাবতে পারেন না। জিল্লুল হাকিমের আগে এই দায়িত্বে ছিলেন নূরুল ইসলাম সুজন। প্রান্তিক জেলা পঞ্চগড়ের মানুষ। তিনি দায়িত্ব পাওয়ার পরই বোঝা গেল, রেলের জন্য পঞ্চগড় আসলে কতটা গুরুত্বপূর্ণ! ২০২২ সালের ২ নভেম্বর ডেইলি স্টারের বাংলা অনলাইনে এক প্রতিবেদনে তুহিন শুভ্র অধিকারী লিখেছেন, ‘দেশের জনসংখ্যার ০.৭১ শতাংশের বাস পঞ্চগড়ে। তবে রেল পরিষেবার ক্ষেত্রে দেশের সবচেয়ে উত্তর অংশের এই জেলা সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার পাচ্ছে বলে মনে হচ্ছে। এ মুহূর্তে ঢাকা থেকে ৩টিসহ মোট ৫টি আন্তনগর ট্রেন পঞ্চগড় পর্যন্ত চলাচল করে, যা বিভাগীয় সদর দপ্তর ছাড়া সব জেলার মধ্যে সর্বোচ্চ।’ ওই প্রতিবেদনে আরও বলা হয়েছে, ‘পঞ্চগড়ের বাসিন্দা নূরুল ইসলাম সুজন ২০১৯ সালের জানুয়ারিতে রেলপথমন্ত্রী হওয়ার পর জেলার রেল পরিষেবার কলেবর ব্যাপকভাবে বৃদ্ধি পায়। গত সাড়ে ৩ বছরে রেলের বহরে যুক্ত হয়েছে ৬টি আন্তনগর ট্রেন ও ১টি আন্তর্দেশীয় ট্রেন। পঞ্চগড় ৬টি আন্তনগর ট্রেনের মধ্যে ২টি পেয়েছে এবং আরও ১টি আন্তনগর ট্রেন সেবা এ জেলা পর্যন্ত সম্প্রসারিত হয়েছে বলে রেলওয়ে সূত্রে জানা গেছে। নাম প্রকাশ না করার শর্তে এসব সূত্র জানায়, মন্ত্রী তাঁর নিজ জেলায় বাড়তি রেল সুবিধা চালু করতে গিয়ে অন্যান্য জেলাকে বঞ্চিত করেছেন।’

রেলওয়ের এক কর্মকর্তা প্রতিবেদক তুহিন শুভ্র অধিকারীকে বলেন, ‘পঞ্চগড়কে দেশের রেলের রাজধানী বলে মনে হচ্ছে; কারণ, মন্ত্রী এটিকে সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার দেন।’ আমাদের সমস্যাটা এখানেই। গোটা দেশটাকে ভুলে নিজের এলাকার জন্য সর্বস্ব পণ করেন এই মন্ত্রীরা। এবার নূরুল ইসলাম সুজন মন্ত্রিসভায় নেই। নিজ জেলার জন্য তাঁর নেওয়া প্রকল্পগুলোর কী হবে? ট্রেন না হয় ঘুরিয়ে এক পথ ছেড়ে অন্য পথে চলবে; কিন্তু কোনো প্রকল্প যদি যোগ্যতার অভাবে মাঝপথে বন্ধ হয়ে যায়, তাহলে এত দিনের ব্যয় কি সব গচ্চা যাবে? এখানেই আসে মন্ত্রীদের জন্য দেশটাকে ওপর থেকে সামগ্রিকভাবে দেখার বিষয়টি।

নূরুল ইসলামের পূর্বসূরি ছিলেন মুজিবুল হক। তাঁর নিজ নির্বাচনী এলাকায় রয়েছে গুণবতী রেলস্টেশন। এটি হাসানপুর ও ফেনী স্টেশনের মাঝে অবস্থিত। মন্ত্রী থাকা অবস্থায় গুণবতী রেলস্টেশনে চট্টগ্রামগামী দুটি আন্তনগর ট্রেন থামানোর ব্যবস্থা করেন। এ নিয়ে সমালোচনা আছে। এই ব্যবস্থার কারণে গুণবতী আসলে কতটা ফলবতী হয়েছে বলা কঠিন।

আর প্রথম রেলমন্ত্রী প্রয়াত সুরঞ্জিত সেনগুপ্তর কথা নাই-বা বলি। তাঁর খুবই অল্প মেয়াদে ‘কালো বিড়ালের কাহিনি’ ছিল ব্যাপক আলোচিত।

রেলপথ মন্ত্রণালয় নিয়ে এতক্ষণ ঘ্যানর ঘ্যানর করা হলো বটে, তবে এ দেশে কম-বেশি সব মন্ত্রণালয় (যেখানে সুযোগ আছে) এই দোষে দুষ্ট। কথিত আছে, বিএনপির নেতা প্রয়াত সাইফুর রহমান অর্থমন্ত্রী হিসেবে সিলেটকে এত ভালোবাসতেন যে, তাঁর আমলে সেখানকার পথঘাট আর কাঁচা ছিল না। শুধু জমির আইলগুলো রক্ষা পেয়েছিল উন্নয়নের হাত থেকে।

সক্রেটিস বলেছিলেন, পৃথিবীতে শুধু একটিই ভালো আছে, জ্ঞান। আর একটিই খারাপ আছে, অজ্ঞতা। এখন আমাদের মন্ত্রীদের ‘জ্ঞান’ যদি শুধু নিজের এলাকার জন্য থাকে, আর পুরো দেশটাই ‘অজ্ঞতা’র চাদরে মোড়া হয়, তাহলে আমজনতা যাবে কোথায়? তাদের না আবার রবীন্দ্রনাথের কাছ থেকে ধার করে বলতে হয়, ‘চারি দিকে চাই, নাহি হেরি গতি। নাহি যে আশ্রয়, অসহায় অতি’।

লেখক: নির্বাহী সম্পাদক, ডিজিটাল বিভাগ, ইনডিপেনডেন্ট টেলিভিশন 

যে কমিশনের উদ্দেশ্যই ছিল ‘সমাজের সব পক্ষের অংশগ্রহণ নিশ্চিত করা’, সেখানে শুরু থেকেই নারীর অনুপস্থিতি বিষয়টিকে কেবল উপেক্ষা নয়, বরং কাঠামোগত অবহেলার স্পষ্ট প্রমাণ হিসেবে দাঁড় করিয়েছে। প্রস্তাবটি...
জাতীয় পার্টি যে আসন ভিক্ষা করছে, এটা কিন্তু বাইরের কেউ বলেনি। দলের চেয়ারম্যান জি এম কাদের নিজেই বলেছেন। এতোদিন জাতীয় পার্টির এই আসন সমঝোতাকে ‘বানরের পিঠা ভাগাভাগির’ সঙ্গে তুলনা করে এসেছে বিএনপি।...
জাতীয় সংসদ নির্বাচনই এখন সবচেয়ে আলোচিত বিষয়। যে ভোটে এল, আর যে এল না—উভয়েরই আলোচনার কেন্দ্রে ওই ভোটই। এমনকি নিজেকে ভোটবিমুখ দাবি করা ব্যক্তিটিও দিনশেষে ভোটের মাঠের খবর নিচ্ছে। এরই মধ্যে মনোনয়নপত্র...
হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরের তৃতীয় টার্মিনালের নির্মাণকাজ প্রায় শেষ হলেও ১৬ ডিসেম্বর অপারেশন শুরুর পরিকল্পনা নিয়ে অনিশ্চয়তা তৈরি হয়েছে। জাপানি কনসোর্টিয়ামের সঙ্গে পরিচালনা ও গ্রাউন্ড...
প্রান্তিক মানুষের স্বাস্থ্যসেবা আরও উন্নত এবং তা সহজে প্রাপ্তি নিশ্চিত করতে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণের নির্দেশ দিয়েছেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। একই সঙ্গে চিকিৎসকেরা যেন রোগীদের চিকিৎসাসেবা দেওয়ার...
বিশ্বকাপ ফুটবলের ফাইনালে পছন্দের দল হেরে যাওয়ায় সাতক্ষীরাযর রসুলপুরে হৃদরোগে আক্রান্ত হয়ে হাফিজুর রহমান ওরফে লালটু নামে এক আর্জেন্টিনার সমর্থকের মৃত্যু হয়েছে। সোমবার সকালে এ ঘটনা ঘটে।
ইরান-যুক্তরাষ্ট্র সংঘাতের নতুন উত্তেজনায় বিশ্ববাজারে আবারও বাড়ছে অপরিশোধিত জ্বালানি তেলের দাম। এতে জ্বালানি আমদানি ব্যয় ও বিদ্যুৎ উৎপাদন খরচ বেড়ে বাংলাদেশের বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভের ওপর চাপ তৈরি...
লোডিং...

এলাকার খবর