পবিত্র হজ শুধু আকাঙ্ক্ষাই থেকে যাবে

আপডেট : ২৪ নভেম্বর ২০২৪, ০৯:২৭ পিএম

পবিত্র হজ পালনের জন্য নিবন্ধনের সময়সীমা চতুর্থবারের মতো বাড়িয়েছে ধর্ম মন্ত্রণালয়। এ বছর বাংলাদেশ থেকে হজ পালনে ইচ্ছুক মুসলমানদের জন্য ১ লাখ ২৭ হাজারের সামান্য বেশি কোটা বেঁধে দিয়েছে সৌদি আরব। যদিও এ পর্যন্ত নিবন্ধন ৬০ শতাংশের বেশি হয়নি। তাই ৬ ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত সময় বাড়ানো। এই সময়ের মধ্যে ২ লাখ ৫ হাজার টাকা জমা দিয়ে প্রাথমিক নিবন্ধন করা যাবে। এবং বাকি অর্থ পরিশোধ করতে হবে ২৯ ফেব্রুয়ারির মধ্যে। তবেই নিবন্ধন চূড়ান্ত হবে।

এখন প্রাথমিক প্রশ্ন হলো, ১৭ কোটি জনসংখ্যার দেশে, যেখানে প্রায় ৯০ শতাংশ মানুষ মুসলমান সেখানে কেন কোটা পূরণ হচ্ছে না? তাহলে কি খরচটা সাধারণের সাধ্যের সীমা অতিক্রম করে যাচ্ছে? পরপর চার বার নিবন্ধনের জন্য সময় বাড়ানো, নানা প্রশ্নের জন্ম দেয়। যেসব প্রশ্নের উত্তর হয়তো সবটা সরকারের কাছেও নেই।

ইসলাম ধর্মের পাঁচটি স্তম্ভের অন্যতম পবিত্র হজ। আর সেটা সামর্থ্যবানদের জন্য করা হয়েছে। আমাদের দেশের অধিকাংশ ধর্মপ্রাণ মানুষ সাধারণত হজে যান একটু বেশি বয়সে। সংসারের দায়িত্ব থেকে কিছুটা অব্যাহতি পাওয়ার পর। এজন্য তাঁরা সারা জীবন ধরে একটু একটু করে পয়সা জমান। কারও  কারও সন্তানেরা সাহায্য করেন। এভাবেই গড়ে উঠেছে পবিত্র হজ বা ওমরাহ পালনের সংস্কৃতি। বর্তমান সময়ে এসে সেই সামর্থ্য কি আসলেই কমছে? না হলে গত ১৫ নভেম্বর থেকে শুরু হওয়া নিবন্ধন কেন ১ ফেব্রুয়ারি এসেও ৬০ শতাংশের বেশি হয় না?

এই বাংলা থেকে প্রথম আনুষ্ঠানিক হজ কাফেলা রওনা হয় ১৮২২ সালে। সৈয়দ আহমেদ বেরলভির নেতৃত্বে। অবিভক্ত ভারতবর্ষের রাজধানী কলকাতা থেকে এই কাফেলা শুরু হয়। সেখানে অবিভক্ত বাংলার বিভিন্ন প্রান্ত থেকে ধর্মপ্রাণ মুসলমানেরা অংশ নেন। এর মধ্যে উল্লেখযোগ্য নাম সৈয়দ মীর নিসার আলী ওরফে তিতুমীর, হাজি শরিয়তউল্লাহ ও তাঁর ছেলে মহসীন আলাদিন আহমেদ ওরফে দুদু মিয়া। ইতিহাস বলছে, হজ পালন শেষে কাফেলা কলকাতায় ফেরে ১৮২৭ সালে, অর্থাৎ ৫ বছর লেগে গিয়েছিল হজ পালন শেষে ফিরতে। এই কাফেলায় অংশগ্রহণকারীদের কেউ কেউ আর সৌদি আরব থেকে ফিরে আসেননি। এরপর সময় পাল্টেছে, বিজ্ঞানের অগ্রগতিতে যাতায়াত সুগম হয়েছে। ব্রিটিশ ভারতে এক সময় বাংলা থেকে ট্রেনে চেপে বোম্বে, অধুনা মুম্বাই যেতে হতো। সেখান থেকে জাহাজে করে পবিত্র হজের উদ্দেশ্যে হাজিরা সৌদি আরব যেতেন। অনেকে এই ট্রেনের কারণে জাহাজ মিসও করতেন। তাঁরা বিফল মনোরথ হয়ে বোম্বে থেকে আবার বাড়ি ফিরতেন। এই ছিল ব্যবস্থা।

এখন তো অনেক সহজ হয়ে গেছে সব কিছু। ঢাকা থেকে প্লেনে চেপে বসলে ছয় ঘণ্টায় জেদ্দা। তারপর আনুষ্ঠানিকতা সেরে আল্লার ঘরের কাছে পৌঁছাতে সময় লাগে না তেমন একটা। কিন্তু আসল কথা হলো সময়ের সাথে সাথে সামর্থ্যও কি কমলো বা কমছে আমাদের? হজে যাওয়ার জন্য সরকারের নিয়ন্ত্রাধীন প্রতিষ্ঠানের সাথে গেলে খরচ কিছুটা কমে, এমনটাই দস্তুর। বেসরকারি ব্যবস্থাপনায় এ জন্য নানা ধরনের প্যাকেজ আছে। সামর্থ্যবানদের নিয়ে কথা নেই। কিন্তু নিম্ন আয়ের মানুষ, যারা শেষ ইচ্ছা হিসেবে বৃদ্ধ বয়সে হজ পালনে যান তাঁদের কী হবে? ২০১৫ সালে সরকারি ব্যবস্থাপনায় দুটি প্যাকেজ ছিল। একটির খরচ ৩ লাখ ৫৪ হাজার ৭৪৫ টাকা; অন্যটি ২ লাখ ৯৬ হাজার ২০৬ টাকা। আট বছরের ব্যবধানে এসে ২০২৩ সালে সর্বনিম্ন খরচ দাঁড়ায় ৬ লাখ ৮৩ হাজার ১৫ টাকা। অর্থাৎ প্রায় আড়াই গুণ বেশি। এ বছর অবশ্য সরকার এক লাখ টাকার কিছু বেশি খরচ কমিয়েছে। কিন্তু সেটা কি খুব কমানো হলো?

সারা বিশ্বের মুসলমানদের কাছে অত্যন্ত পবিত্র মক্কা ও মদিনা শহর। আর এই দুটি শহরই হচ্ছে সৌদি আরবে। খেলাটা আসলে সেখানে। তামাম মুসলমানদের কাছে পবিত্র হলেও এর নিয়মকানুন ঠিক করে সৌদি রাজ পরিবার। পবিত্র হজ ও ওমরাহ থেকে সৌদি আরবের বছরে আয় ২০ বিলিয়ন ডলার। আপনি কি জানেন, এই আয় তেলের পর তাদের দ্বিতীয় সর্বোচ্চ আয়। মক্কা চেম্বার অব কমার্স অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রির হিসাব মতে বেসরকারি খাতের মোট আয়ের ২৫–৩০ শতাংশ আসে মক্কা ও মদিনা– এই দুই শহরের পূণ্যার্থীদের কাছ থেকে।

মনে রাখতে হবে, যেদিন থেকে মোহাম্মদ বিন সালমান (যিনি এমবিএস নামে বেশি পরিচিত)  ক্ষমতায় অধিষ্ঠিত হন, সে দিন থেকে তিনি সৌদি আরবকে আমূল পাল্টে দেওয়ার কাজ শুরু করেন। জ্বালানি তেলনির্ভর অর্থনীতি থেকে বেরিয়ে এসে দেশের অর্থনীতির গতিমুখ অন্য দিকে ঘোরানোর চেষ্টা করছেন তিনি। আর এর প্রধান হাতিয়ার হলো পর্যটন। দুবাইসহ আরব বিশ্বের বিভিন্ন দেশ/ শহর এ শিক্ষা দিয়েছে যে, পর্যটন থেকে মরুভূমিতেও মরুদ্যান তৈরি সম্ভব। এর প্রথম কাজ হিসেবে সৌদি এয়ারলাইন্স ও বিমানবন্দরগুলোকে ঢেলে সাজানোর কাজ চলছে। সেখানে বিপুল অর্থ বিনিয়োগ করছে সৌদি সরকার ভবিষ্যতের আশায়। কারণ পশ্চিম ও দূর প্রাচ্যের মধ্যে সংযোগ সাধনে মধ্যপ্রাচ্য কতটা গুরুত্বপূর্ণ তা প্রমাণ করে দিয়েছে দুবাই, শারজাহ, দোহা, কুয়েত সিটির মতো শহরগুলো। এখন এ কাজে তাদের প্রতিদ্বন্দ্বী হয়ে উঠতে চলেছে সৌদি শহরগুলো।

সৌদি আরবে পর্যটনের মূল আকর্ষণ হচ্ছে মক্কা ও মদিনা, অর্থাৎ পবিত্র হজ ও ওমরাহ, এটা এমবিএসের চেয়ে ভালো কেউ জানেন না। এ কারণে হজের সময় যাতে বেশি পূণ্যার্থী নিরাপদে ও কম কষ্টে পবিত্র কাবা শরিফ তাওয়াফ ও আরাফাতের ময়দানে অবস্থান করতে পারেন সেই ব্যবস্থা করছে সৌদি সরকার। পাশাপাশি মক্কা ও মদিনার মধ্যে অতি দ্রুতগামী ট্রেন চালু করা হয়েছে। ২৭৬ মাইল এই রেললাইন তৈরিতে ব্যয় হয়েছে ছয় শ কোটি ডলার। জেদ্দার কিং আব্দুল আজিজ ইন্টারন্যাশনাল এয়ারপোর্টের পরিসর বাড়ানো হচ্ছে। এটা শেষ হলে বছরে ৮ কোটি লোক এই বিমানবন্দর দিয়ে যাতায়াত করতে পারবে। এসবেরই লক্ষ্যই হলো পূণ্যার্থীরা যেন তাঁদের সব ধর্মীয় আচার পালন করে দ্রুততম সময়ে দেশে ফিরতে পারেন। আর ফিরতে পারলে আরও লোক যেতে পারবে।

ধর্মীয় পর্যটনের ব্যাপারে এমবিএসের মূল লক্ষ্যই হলো পবিত্র ওমরাহ। হজের সময়টা বাদ দিয়ে সারা বছর ওমরাহ পালন করতে পারেন মুসলমানেরা। এমবিএসের লক্ষ্য ২০৩০ সালের মধ্যে ওমরাহ পালনকারীর সংখ্যা তিন কোটিতে নিয়ে যাওয়া। এই সংখ্যা যত বাড়বে সৌদি এয়ারলাইন্স থেকে শুরু করে সব ব্যবসার পরিমাণ ততই ফুলে ফেঁপে উঠবে। সারা বিশ্বে প্রায় দু শ কোটি মানুষ মুসলমান ধর্মাবলম্বী। এটা দিন দিন বাড়বে। ফলে ওমরাহ পালনকারীর সংখ্যাও বাড়বে। এজন্য নুসুক নামে একটি অ্যাপও চালু করা হয়েছে। যেখানে নিবন্ধন করে যেকোনো মুসলমান ওমরাহ পালনে যেতে পারবেন।

মক্কা ও মদিনা–এই দুই শহরে ইতিমধ্যে যে পরিমাণ পাঁচ তারকা হোটেল হয়েছে তাতে বোঝাই যায়, আস্তে আস্তে বিষয়গুলো অতি সম্পন্নদের জন্যই সীমিত হতে চলেছে। আর সে কারণে আমাদের মতো দেশগুলোতে নিবন্ধনের সংখ্যা হয়তো দিন দিন আরও কমবে। সময় বাড়িয়েও তখন লাভ হবে না। নজরুলের মতো হয়তো অনেককে বলতে হবে, ‘আমি হজে যেতে পাইনি বলে কেঁদেছিলাম রাতে।/ তাই হজরত এসে স্বপ্নে মাগো ধরেছিলেন হাতে।’
 
লেখক: নির্বাহী সম্পাদক, ডিজিটাল বিভাগ, ইনডিপেনডেন্ট টেলিভিশন

একদিক থেকে দেখলে একে যুদ্ধ বলা যায় কি না, তা-ই প্রশ্নসাপেক্ষ। আক্রমণ যেখানে বলতে গেলে একপাক্ষিক, সে তো যুদ্ধের চেয়ে বরং নিপীড়িতের ওপর নিপীড়কের আগ্রাসনের সংজ্ঞায় পড়ে। ২০২৩ সালের অক্টোবরে হামাসের...
আমার নাম রহিম খান। তারা আমার নামাজ পড়ার অধিকার নিয়ে কথা বলতে এসেছিল। আমাকে বলা হয়েছিল, আমি ছাদে, আমার নিজের ছাদেও নামাজ পড়তে পারি না। আমার হিন্দু ভাইবোনেরা, যাদের আমি খুব ভালোবাসি, তারা রাস্তায়...
আজ আমাদের প্রিয় নবী ও রাসুল হজরত মুহাম্মদ (সা.)‑এর জন্মদিন। তিনি আমার খুব প্রিয় একজন। এর অনেক কারণের মধ্যে একটি হলো সব ধর্মের মানুষের কথা মাথায় রেখে মদিনায় দেওয়া তাঁর একটি ভাষণ, যেখানে মদিনা...
মধ্যপ্রাচ্যে ফিলিস্তিনের সমর্থকেরা দীর্ঘদিন ধরে ইসরায়েলি দখলদারত্বের বিরুদ্ধে আরব নেতাদের কঠোর অবস্থান নিতে ব্যর্থতার জন্য গভীর দুঃখবোধের মধ্যে আছেন। কিন্তু এটা কেন হচ্ছে, তা বোঝা সহজ।
হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরের তৃতীয় টার্মিনালের নির্মাণকাজ প্রায় শেষ হলেও ১৬ ডিসেম্বর অপারেশন শুরুর পরিকল্পনা নিয়ে অনিশ্চয়তা তৈরি হয়েছে। জাপানি কনসোর্টিয়ামের সঙ্গে পরিচালনা ও গ্রাউন্ড...
প্রান্তিক মানুষের স্বাস্থ্যসেবা আরও উন্নত এবং তা সহজে প্রাপ্তি নিশ্চিত করতে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণের নির্দেশ দিয়েছেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। একই সঙ্গে চিকিৎসকেরা যেন রোগীদের চিকিৎসাসেবা দেওয়ার...
বিশ্বকাপ ফুটবলের ফাইনালে পছন্দের দল হেরে যাওয়ায় সাতক্ষীরাযর রসুলপুরে হৃদরোগে আক্রান্ত হয়ে হাফিজুর রহমান ওরফে লালটু নামে এক আর্জেন্টিনার সমর্থকের মৃত্যু হয়েছে। সোমবার সকালে এ ঘটনা ঘটে।
ইরান-যুক্তরাষ্ট্র সংঘাতের নতুন উত্তেজনায় বিশ্ববাজারে আবারও বাড়ছে অপরিশোধিত জ্বালানি তেলের দাম। এতে জ্বালানি আমদানি ব্যয় ও বিদ্যুৎ উৎপাদন খরচ বেড়ে বাংলাদেশের বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভের ওপর চাপ তৈরি...
লোডিং...

এলাকার খবর