বাজারে গেলে, বিশেষ করে ঢাকায় সাধারণ মানুষের বুকের ধুকপুকুনি বাড়তে থাকে। গত দিন যে দামে তিনি জিনিসপত্র কিনে নিয়ে গেছেন, আজও অন্তত সেই দামে কিনতে পারবেন কিনা–এ নিয়ে দুশ্চিন্তার শেষ নেই। মাছ-মাংস-ডিমের মতো আমিষের কথা বাদই দিলাম। ওটা এক সময় ধনী লোকের খাবার ছিল। এখন আবার সেসব খাবার ধনীদের হয়ে গেছে। বাদ আছে শুধু গরিবের সবজি ও ডাল।
এখানে দুটো ঘটনা বলব। কয়েকদিন আগে রিকশায় তেজগাঁও থেকে সোনারগাঁ হোটেলের মোড়ে যাচ্ছি। রাত সাড়ে ৮টা হবে। এফডিসির সামনে কারওয়ানবাজার রেলগেট সিগন্যালে পৌঁছাতেই গেট পড়ে গেল। কারণ ট্রেন যাবে। পাশেই এক্সপ্রেস ওয়ের কাজ চলছে দ্রুতলয়ে। সেদিকে তাকিয়ে তরুণ রিকশাওয়ালা বললেন, ‘ছার, নেত্রী আসলে অনেক কাজ করতাছে। শুধু যদি জিনিসপত্রের দামটা একটু কমাইতে পারত–তাইলে আমরা গরিবরা একটু বাঁচতাম।’ কথায় কথায় জানালেন, তেজগাঁওয়ে এক মেসে থাকেন। চেষ্টা করেন যতটা পারা যায় টাকা ‘সেভ’ করার। কারণ ‘দেশে পরিবার’ আছে। জীবন ধীরে ধীরে কত কঠিন হয়ে যাচ্ছে তার একটা ধারা বর্ণনা দিচ্ছিলেন তিনি। আমি নিবিষ্ট শ্রোতা হিসেবে রিকশায় গদিনশিন হয়ে শুনছিলাম। থাক সে প্রসঙ্গ।
গতকাল শুক্রবার (২৩ ফেব্রুয়ারি) ব্যক্তিগত কাজে যেতে হয়েছিল নরসিংদীর পলাশ উপজেলার চরসিন্দুর গ্রামে। ঢাকা থেকে ৫০ কিলোমিটারের মতো হবে। ব্যক্তিগত গাড়িতে গেলে দেড় ঘণ্টার মধ্যে যাওয়া বা আসা যায়। সড়কে সড়কে যে উন্নয়নের ছোঁয়া, এ হয়তো তারই প্রতিফলন। সেখানে শুনলাম শুক্র আর মঙ্গলবার হাট বসে। শিকড়বিহীন লোকজনের গ্রামের হাট বা বাজারের কথা শুনলে মনটা কেমন আনচান করে ওঠে। আমিও তাঁর ব্যতিক্রম নেই। প্রথম একবার গেলাম হাটের তত্ত্বতালাশে। শুনলাম, জুম্মার নামাজের পরে বিকেল তিনটে থেকে হাট জমতে শুরু করে। হাতে সময় কম। অতএব তিনটে বাজতেই আবার রওনা দিলাম। গিয়ে দেখি, সত্যি সত্যি বিপুল পসরা নিয়ে বসে আছেন বিক্রেতারা। সেখানে সবজির দাপটই বেশি। সবই স্থানীয়।
শুরু হলো অভিযান। হাটে জিনিসপত্রের দাম জানাটা আমার কৌতূহল। জিজ্ঞেস করতে যে দাম জানলাম তাতে দরাদরি করার কোনো ইচ্ছেই আর অবশিষ্ট রইলো না। ঢাকায় নিয়মিত যে হারে গচ্চা দিচ্ছি তার কাছে এটা কিছুই না। দুটো বিশাল আকারের ফুলকপি কিনলাম ৫০ টাকায়। দরাদরি করলে হয়তো আরও কমতো। একেকটার ওজন দুই কেজির বেশি। বিক্রেতা ভাইটি জানালেন, সকালে ঢাকার পাইকারদের কাছে ১৮ টাকা পিস হিসেবে বিক্রি করেছেন। আজ শনিবার সকালে ধানমন্ডির এক খুচরা বিক্রেতা ফুলকপির দাম চাইলেন প্রতিটি ৫০ টাকা। ওজন ৮০০-৯০০ গ্রামের বেশি হবে না। মাত্র ৫০ কিলোমিটারের ব্যবধানে দামের এই পার্থক্যের অংক যাদববাবুও মেলাতে পারতেন কিনা জানি না, আমি তো কোন ‘ছার’। কেউ যদি জানেন দয়া করে জানাবেন।
চরসিন্দুর হাটের (সব হিসাব কেজিতে) বেগুন (স্থানীয়) ৫০ টাকা, সিম ৩০ টাকা, রসালো দেশি টমেটো ৩০ টাকা, আলু ৩০ টাকা, পেঁয়াজ ১১০ টাকা, কাঁচা মরিচ ৮০ টাকা, উচ্ছে (ছোট) ১২০ টাকা। স্থানীয়রা দর-দস্তুর করে আরও কমে কিনছেন। লক্ষ্য করলেও বলার চেষ্টা করিনি। কারণ ধানমন্ডির এই খুচরা বিক্রেতার কাছে বেগুন ৮০ টাকা, সিম ৬০ টাকা, রসালো দেশি টমেটো ৮০ টাকা, আলু ৪০ টাকা, পেঁয়াজ ১৩০ টাকা, কাঁচা মরিচ ১২০ টাকা, উচ্ছে (ছোট) ২০০ টাকা। পার্থক্যটা কি চোখে লাগে? এই পার্থক্য বেমালুম নিজের ভেতরে গায়েব করে সংসারের দাবি মেটাতে নিয়মিত আমাকে ওই বিক্রেতার কাছেই যেতে হয়।
চরসিন্দুরের ওই হাটেই তিন আঁটি বা মুঠা লালশাক ২০ টাকা, দুই আঁটি শাকের ডাঁটা ৪০ টাকা, ভালো মানের সদ্য কেটে আনা লাউ ৫০ টাকা, মাঝারি সাইজের মিষ্টি কুমড়া ৫০ টাকা। ঢাকায় একই পরিমাণ ও আকারের লালশাক ৪৫ টাকা, শাকের ডাঁটা ৬০ টাকা, লাউ ৮০ টাকা ও মিষ্টি কুমড়া ৮০ টাকা। আর হিসাব দিলে হয়তো লেখাটাকে পাটিগণিতের কোনো অংক মনে হতে পারে। তাই এখানে খ্যামা দেওয়াই দস্তুর।
বুদ্ধিমান ও যুক্তিবাদী পাঠক বলতেই পারেন, ঢাকার তো আর শুধু এক চরসিন্দুর বা নরসিংদী থেকে সবজি আসে না। দেশের আরও প্রত্যন্ত ও দূরবর্তী এলাকা থেকে আসে। মাথা পেতে নিই এই যুক্তিকে। তবে দৃঢ়ভাবে এ-ও বিশ্বাস করি, ওইরকম প্রত্যন্ত এলাকার হাটে বা বাজারে সবজির দাম আরও কম। যে কারণে কৃষকের মাথা থেকে হাত কখনো নামে না। কেউ বলতেই পারেন, আমাদের সবারই ক্রয়ক্ষমতা বেড়েছে। সুতরাং একটু বেশি দাম দিলে সমস্যা কোথায়? ঢাকা শহরে আপনারা ফাস্টফুড, সেকেন্ড ফুড ইত্যাদি নাম করে কত কিছুই খাচ্ছেন। কই কখনো দাম বাড়া-কমার কথা তো শুনি না? আসলে এটা মূল বিষয়টাকে এড়িয়ে যাওয়ার কৌশল। আমরা নিম্ন-মধ্য আয়ের দেশ হতে চলেছি, মাথাপিছু আয় বেড়েছে, ক্রয়ক্ষমতাও হয়তো বেড়েছে–এই সত্য অস্বীকার তো কেউ করছে না।
কিন্তু পণ্যের দাম এত বাড়ার বিস্ফোরণে হঠাৎ কেন জানি রবীন্দ্রনাথের কটা লাইন মাথায় ঘুরপাক খাচ্ছে: “সফলতা লভি যবে/ মাথা করি নত/ জাগে মনে আপনার/ অক্ষমতা যত।” আসলেই, সাফল্য কী আমাদের আরও বিনয়ী করছে, অক্ষমতাকে তুলে ধরতে সাহায্য করছে; না আমরা দম্ভের রঙিন চশমায় বিষয়গুলো দেখছি। এই প্রশ্নের উত্তর আমাদের নিজেদের কাছে পরিষ্কার হতে হবে। কারণ যার পকেটে পর্যাপ্ত পয়সা আছে তাকে নিয়ে তো চিন্তার কিছু নেই। চিন্তা তো ঢাকা শহরের ওই রিকশাওয়ালাকে নিয়ে, যার দিন কেটে যায় প্যাডেল ঘোরাতে ঘোরাতে, ‘দেশে’ মা-বাবা-স্ত্রী-সন্তান, হয়তো ছোট ছোট স্কুলপড়ুয়া ভাই-বোন অপেক্ষায় থাকে সামান্য কটা বেশি টাকার জন্য। কারণ তাদের খরচও বাড়ছে। আর কৃষক বারবার জমিতে ছুটে যান লাভের বিভ্রমে। একটু লাভ হলে পরিবারটা ভালো চলতো, সন্তানের জন্য একজন শিক্ষক দিতে পারতেন, মেয়ের বিয়েতে দশ জনকে দাওয়াত দিতে পারতেন। এদের কথা ভেবে, আমাদের মাথাটা একটু নত হওয়া উচিত না? আমাদের অক্ষমতা দুর করতে প্রয়াসী হওয়ার কথা ভাবব না? ভাবব। কারণ দেশটা কিন্তু আমার-আপনার মতো ওদেরও।
গতকাল শুক্রবার প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা জার্মানি থেকে ফিরে আসার পর সংবাদ সম্মেলন করেছেন। সেখানে ঘুরেফিরে বারবার জিনিসপত্রের দামের বিষয়টি উঠে এসেছে। সামনে রোজা। এজন্য বিষয়টির গুরুত্ব আরও বেড়েছে। সেখানে চ্যানেল আই-এর শাইখ সিরাজ কতগুলো খুবই গুরুত্বপূর্ণ কথা বলেছেন। শাইখ সিরাজ দীর্ঘদিন ধরে এ দেশের কৃষি, কৃষক নিয়ে কাজ করছেন। অনেক কিছুই তাঁর নখদর্পণে। তিনি যখন বলেন, ‘আমাদের এত ফসল উৎপাদন হয়, আমি তো কোনো ঘাটতি দেখি না। অর্থনীতির সাথে অংক তো মেলে না।’ তখন তাকে গুরুত্ব দিতেই হয়। অর্থাৎ বাজারে হঠাৎ হঠাৎ করে কিছু জিনিসের উধাও হয়ে যাওয়ার সাথে কী বাস্তবতা মেলে। এই কিছু দিন আগে ডিম উধাও, এরপর আলু, পেঁয়াজ। কোথায় যায় এগুলো। প্রধানমন্ত্রীই বলেছেন, দাম বাড়াতে পেঁয়াজ পচিয়ে ফেলে দেওয়া হয়েছে। ডিম যখন আক্রা ঢাকার অদূরে এক গোপন গুদাম তখন লক্ষাধিক ডিম পেড়ে বসলো! কি আশ্চর্য, এ যেন একেবারে ম্যাজিক। কিন্তু শেষমেশ এর কারিগরদের কিছুই হয় না। বিপুল পরিমাণ আলু জমা থাকার পরেও অভিযান চালাতে গিয়ে ব্যর্থ হয়ে ফিরে আসতে হয় বিরাট মাপের সরকারি কর্মকর্তাকেও। তাহলে কি সর্ষের মধ্যেই ভূত আছে?
শাইখ সিরাজ তাঁর বক্তব্যে দেশে উৎপাদিত শস্য সংরক্ষণ ও বণ্টন ব্যবস্থার ঝামেলা নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন। এই ঝামেলা কি পোড়খাওয়া-বিদেশে প্রশিক্ষিত সরকারি কর্মকর্তাদের অজানা? না তাঁরা পুড়তে পুড়তে খাঁটি সোনা হওয়ার পরিবর্তে অঙ্গারে পরিণত হয়েছেন। নাহলে রাজধানী থেকে ৫০ কিলোমিটারের ব্যবধানে সবজির দাম দ্বিগুণ হয় কী করে?
জিনিসপত্রে দাম বাড়া নিয়ে সংবাদ সম্মেলনে প্রধানমন্ত্রী বেশ দীর্ঘ একটি ব্যাখ্যা দিয়েছেন। যার ভেতরে রাজনৈতিক কার্যকারণও স্থান পেয়েছে। এরপরেও বাস্তবতা এড়ানো যাচ্ছে না। দেশের প্রত্যন্ত এলাকা থেকে ঢাকায় ভাগ্যান্বেষণে আসা গরিব রিকশাচালক বা চরসিন্দুর হাটের সবজি বিক্রেতা একটু সুদিনের আশায় কিন্তু প্রধানমন্ত্রীর দিকেই তাকিয়ে আছেন।
লেখক: নির্বাহী সম্পাদক, ডিজিটাল বিভাগ, ইনডিপেনডেন্ট টেলিভিশন



