মানবজীবনে সংসার, প্রতিষ্ঠান, ক্লাব, দাতব্য সংস্থা—যাই চালাতে যান না কেন, এর জন্য অর্থ প্রয়োজন। রাজনৈতিক দলগুলোই–বা এর বাইরে থাকে কী করে! দিন যা পড়েছে, তাতে খরচের বহর দিনে দিনে বাড়ছে। বিশেষ করে ‘গণতান্ত্রিক ব্যবস্থায়’ যদি দল চালাতে হয়। সংগঠন, অফিস, অফিসের কর্মকর্ত-কর্মচারী, মিটিং, মিছিল, সর্বোপরি ভোট। এসব ভুলে গেলে চলবে? আগে যারা রাজনীতি করতেন, তাঁদের অধিকাংশই ঘরের খেয়ে বোনের মোষ তাড়াতেন। এখন কি আর সেই দিন আছে। রাজনীতি করলে ছেঁড়া পাঞ্জাবি, নোংরা পাজামা, তালিমারা জুতা পরতে হবে—এ দিব্যি কে দিয়েছে! দেখেন না, আমেরিকার প্রেসিডেন্ট থেকে পাতি নেতা পর্যন্ত কেমন সুন্দর সুটেড-বুটেড থাকে। আসলে চড়া মেজাজের সাথে কড়া ইস্তিরি করা জামা-কাপড় না হলে আর এখন চলে? এই সহজ সত্যটা আমাদের কেউ কেউ বুঝতে চায় না।
চায় না বলেই, কী এক ফ্যাসাদে পড়েছে ভারতের রাজনৈতিক দলগুলো। বিশেষ করে শাসক দল বিজেপি। ভারতে রাজনৈতিক দলগুলোর বউন্ডুলেপনা থেকে করপোরেট কালচারে আনার একটা দাবি বিজেপি করতেই পারে। এ জন্য খরচ আছে। আর এই খরচ তো জোগাবেন এ যুগের ‘গৌরি সেন’রা; অর্থাৎ, ব্যবসায়ীরা। সেটাকেই হালাল করতে ২০১৭ সালে পার্লামেন্টে নতুন আইন এনেছিল বিজেপি। আইনে বলা হয়েছিল, যেকোনো ব্যবসায়ী রাষ্ট্রীয় স্টেট ব্যাংক অব ইন্ডিয়া (এসবিআই) থেকে ইলেকটোরাল বন্ড বা নির্বাচনী বন্ড কিনতে পারবেন এবং সেই বন্ড যেকোনো রাজনৈতিক দলকে দিতে পারবেন। দলগুলো যদি নির্দিষ্ট সময়ের মধ্যে সেই বন্ড ভাঙিয়ে নিজেদের অ্যাকাউন্টে জমা না করে, তবে ওই অর্থ প্রধানমন্ত্রীর পিএম কেয়ার ফান্ডে জমা হবে। আর এই অর্থের ওপর ১০০ ভাগ শুল্ক ছাড় পাবে প্রতিষ্ঠানগুলো। ওই সময়ে ভারতের অর্থমন্ত্রী প্রয়াত অরুণ জেটলি সংসদে বলেছিলেন, ‘এমন ব্যবস্থা আমরা করে যাচ্ছি যে, বিরোধী দলেরাও এর সমান সুবিধা পাবে।’ এই মহান উদ্যোগের মধ্যে এক ফোঁটা গো-চোনার মতো পড়েছিল—‘এর তথ্য কখনই প্রকাশ করা হবে না’।
কী মুশকিল, এই ফাঁক গলে কিনা সোজা সুপ্রিম কোর্টে মামলা করে বসলেন ভারতীয় নৌ-বাহিনীর সাবেক কর্মকর্তা কমোডর (অবসরপ্রাপ্ত) লোকেশ বাত্রা। এই মামলায় পরে আরও অনেকে যুক্ত হয়। তবে ভারতের সুপ্রিম কোর্ট এই আইনকে অসাংবিধানিক ঘোষণা করেন, এর সব তথ্য অনলাইনে প্রকাশের জন্য ব্যাংক ও নির্বাচন কমিশনকে নির্দেশ দেন। আর এতেই থলের বিড়াল বেরিয়ে পড়ার আশঙ্কা দেখা দেয়। এতে কেউ কেউ ভীষণ চিন্তিত হয়ে পড়েন। এমনই একজন হলেন ভারতীয় সুপ্রিম কোর্টের বার অ্যাসেসিয়েশনের সভাপতি অধীশ আগারওয়াল। তিনি যেনতেন আইনজীবী নন। নির্বাচনী বন্ড সম্পর্কে দেওয়া সুপ্রিম কোর্টের রায় রদ বা বন্ধ করার জন্য তিনি ভারতের রাষ্ট্রপতির কাছে চিঠি দেন। অথচ সুপ্রিম কোর্টের রায় পাল্টানোর কোনো ক্ষমতা রাষ্ট্রপতির নেই—এ কথা অধীশ ভালোমতোই জানতেন। তড়িঘড়ি করে বারের সদস্যরা জানিয়ে দেন সভাপতির এই চিঠির সাথে বারের কোনো সম্পর্ক নেই।
আসলে কেঁচো খোঁড়ার বিপদ সম্পর্কে অধীশ যে অত্যন্ত সচেতন ছিলেন, এটা আমরা পরে বুঝতে পারব। প্রথম দেখা যাক ১২ হাজার কোটি রুপির এই বন্ডের ভাগ কে কেমন পেয়েছে। স্বাভাবিকভাবে বিজেপি পেয়েছে অর্ধেকেরও বেশি; অর্থাৎ, ৬ হাজার কোটা রুপির বেশি। দ্বিতীয় স্থানে কে থাকতে পারে? অনুমান করুন তো। আপনার অনুমান ঠিক হয়নি বলেই ধরে নিচ্ছি। দ্বিতীয় স্থান অধিকারী দলটির নাম মমতা ব্যানার্জির তৃণমূল কংগ্রেস। অঙ্কের হিসাবে ১ হাজার ৬০০ কোটি রুপির বেশি। এরপর ভারতের জাতীয় কংগ্রেস (১৪২১ কোটি)। কেন্দ্রে ও এতগুলো রাজ্যে বিজেপি ক্ষমতায়, নরেন্দ্র মোদির মতো একজন ক্যারিশমেটিক নেতা তাদের আছে। দুবার ভারত জয়ের পর তৃতীয় দফায়ও তারা আসবে এমনটাই সবাই ধরে নিয়েছে। ফলে ব্যবসায়ীরা এমন দলকেই তো ঢালাওভাবে অর্থ দেবেন—এমনটাই দস্তুর।
কিন্তু বিষয়টা কেঁচে গণ্ডূষ হয়ে গেছে অন্য জায়গায়। ইনডিপেনডেন্টের পাঠকেরা জানেন, আবাগারি নীতিতে ব্যবসায়ীদের অবৈধ সুযোগ দেওয়ার অভিযোগে দিল্লির মুখ্যমন্ত্রী অরবিন্দ কেজরিওয়াল এখন কারাগারে। একই মামলায় দিল্লি সরকারের দুজন মন্ত্রী ও আম আদমি পার্টির একজন এমপি দীর্ঘ দিন ধরে কারাগারে আছেন। এমন আইনে তাঁদের ধরা হয়েছে যে, বেকসুর না হওয়া পর্যন্ত জামিন মিলবে না। এর পেছনে একটা গল্প আছে। সেটাতেই আসছি।
ভারতের এনফোর্সমেন্ট ডিরেক্টরেট (ইডি) ২০২২ সালের ১০ নভেম্বর দিল্লির আবগারি কেলেঙ্কারিতে জড়িত থাকার অভিযোগে হায়দরাবাদের ব্যবসায়ী শরৎ চন্দ্র রেড্ডিকে গ্রেপ্তার করে। এর পাঁচ দিন পর অরবিন্দ ফার্মা নামে একটি কোম্পানি ৫০ কোটি রুপির নির্বাচনী বন্ড কেনে। এই প্রতিষ্ঠানের একজন পরিচালক শরৎ রেড্ডি। অরবিন্দ ফার্মার কেনা সেই বন্ডের সব টাকা পেয়েছে ক্ষমতাসীন বিজেপি। ছয় মাস জেলে থাকার পর রেড্ডি জামিনে মুক্তি পান এবং ইডির মামলায় রাজসাক্ষী হয়ে যান। তাঁর সাক্ষ্যে এই মামলায় জেলে আছেন কেজরিওয়াল এবং বাইরে বহাল তবিয়তে ঘুরছেন রেড্ডি। কারণ, এরপর নির্বাচনী বন্ডের মাধ্যমে আরও ২৫ কোটি রুপি অনুদান দিয়েছেন বিজেপিকে।
পরের গল্পটা আরেকটু অন্যরকম। আল–জাজিরা জানাচ্ছে, ‘লটারি কিং’ নামে খ্যাত ৬৩ বছরের সান্তিয়াগো মার্টিনের জন্ম আন্দামান ও নিকোবর দ্বীপপুঞ্জে। তামিলনাড়ুর কোয়েম্বাটোরে আসার আগে তিনি মিয়ানমারে শ্রমিক হিসেবে কাজ করেছিলেন। কিন্তু ফিউচার গেমিং অ্যান্ড হোটেল সার্ভিসেস প্রাইভেট লিমিটেড নাম দিয়ে সেখানে তিনি গড়ে তুলেছেন লটারি সাম্রাজ্য। মার্টিনের প্রতিষ্ঠান ২০২০-২৪ সালের মধ্যে ১৩৬৮ কোটি রুপির নির্বাচনী বন্ড কিনেছে। এর মধ্যে তৃণমূল কংগ্রেস পেয়েছে ৫৪০ কোটি রুপি। এরপর আছে তামিলনাড়ুর শাসকদল ডিএমকে (৫০০ কোটি)। তবে বিজেপিও বাদ পড়েনি। মার্টিনের প্রতিষ্ঠানের কাছ থেকে তারা পেয়েছে ৫০ কোটি রুপি।
নির্বাচনী বন্ডের যে তথ্য প্রকাশ করা হয়েছে, তা থেকে এর ভেতরকার যোগসাজশ; অর্থাৎ, সরকারের কাছ থেকে এর বিনিময়ে তারা কী সুবিধা পেয়েছে, তা উদ্ধার করা খুবই কঠিন। সেই কঠিন কাজটি করছেন ভারতের কিছু ব্যক্তি ও সংবাদমাধ্যম (অবশ্যই মূলধারার সংবাদমাধ্যম নয়)। নিউজলন্ড্রি ও দ্য নিউজ মিনিট নামে দুটি প্রতিষ্ঠান প্রকাশিত তথ্য বিচার বিশ্লেষণ করে দেখেছে, অন্তত ৩০টি কোম্পানি আছে, যারা আগের পাঁচ বছরে (আর্থিক বছর) বিজেপিকে বন্ডের মাধ্যমে মোট প্রায় ৩৩৫ কোটি টাকা দিয়েছে। এসব প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে এই সময়কালে ইডিসহ কেন্দ্রীয় বিভিন্ন সংস্থা তদন্ত শুরু করেছিল।
এই দুটি প্রতিষ্ঠান আরও গভীরে গিয়ে দেখেছে:
- এই সংস্থাগুলোর মধ্যে ২৩টি সংস্থা, যারা তাদের বিরুদ্ধে অভিযানের সময় বিজেপিকে ১৮৭.৫৮ কোটি রুপি দিয়েছে, তারা ২০১৪ সাল থেকে কখনো বিজেপিকে একটি পয়সাও দেয়নি। ২০১৪ সালে নরেন্দ্র মোদি সরকার ক্ষমতায় আসে।
- এই সংস্থাগুলোর মধ্যে অন্তত চারটি আছে, যারা কেন্দ্রীয় সংস্থাগুলো পরিদর্শনের চার মাসের মধ্যে বিজেপিকে মোট ৯.০৫ কোটি টাকা অনুদান দিয়েছে।
- এই সংস্থাগুলোর মধ্যে অন্তত ছয়টি আছে, যারা আগেই বিজেপিকে অর্থ দিত এবং কেন্দ্রীয় সংস্থাগুলো অভিযান শুরুর পর মোটা অঙ্কের অর্থ দিয়েছে।
- অন্য ছয়টি সংস্থা, যারা আগে প্রতি বছর বিজেপিকে অনুদান দিয়েছিল, তারা এক আর্থিক বছরে অনুদান না দেওয়ায় কেন্দ্রীয় সংস্থার অভিযানের মুখে পড়ে।
- কমপক্ষে তিনজন দাতা (বিজেপিকে), যারা এই ৩০ প্রতিষ্ঠানের তালিকার অংশ নন, তাঁদের বিরুদ্ধে কেন্দ্রীয় সরকারের কাছ থেকে সুবিধা পাওয়ার অভিযোগ রয়েছে।
- এই কোম্পানিগুলোর মধ্যে মাত্র তিনটি একই সময়ে কংগ্রেসকে অনুদান দিয়েছে।
এ ব্যাপারে ভারতের অর্থমন্ত্রী ও বিজেপি নেত্রী নির্মলা সীতারামণ কী বলছেন শুনুন। বলছেন, ‘আপনি জানেন যে, আগে যারা অর্থ দিয়েছিল, আমরা তাদের দরজায় কড়া নাড়তে গিয়েছিলাম। আমি কি বোঝাতে পারছি? না? যদি কোম্পানিগুলো টাকা দেয় এবং তারপরও আমরা ইডি-র মাধ্যমে তাদের দরজায় কড়া নাড়ি–এটা কি সম্ভব, না সম্ভব না?’ অর্থাৎ, ধরি মাছ না ছুঁই পানি গোছের উত্তর দিয়ে তিনি পার পেতে চেয়েছেন।
তবে নির্মলার স্বামী অবশ্য স্ত্রীর সাথে একেবারেই একমত নন। নির্মলার স্বামী; অর্থাৎ, প্রখ্যাত অর্থনীতিবিদ পরকালা প্রভাকর মনে করেন, নির্বাচনী বন্ড ইস্যুতে বিজেপিকে চড়া মূল্য দিতে হবে। এই অভিযোগ আরও বেগবান হবে। সবাই এখন বুঝতে পারছে যে, এটি শুধু ভারতের সবচেয়ে বড় কেলেঙ্কারি নয়, বিশ্বের সবচেয়ে বড় কেলেঙ্কারি। এ কারণেই ভোটাররা এই সরকারকে কঠোর শাস্তি দেবে।
অনলাইন পোর্টাল দ্য ওয়্যারে এম কে ভেনু লিখেছেন, একটি প্রাতিষ্ঠানিক চাঁদাবাজির র্যাকেটের মতো দেখাচ্ছে ইডি, আয়কর বিভাগ এবং সিবিআই-এর ভূমিকা। দ্য নিউজ মিনিট ও নিউজলন্ড্রি-এর তদন্তে বেরিয়ে এসেছে, কীভাবে কিছু লোক প্রকাশ্যে তিন শ কোটি রুপির বেশি নির্বাচনী বন্ডের টাকা তুলেছেন। ইডি ও আয়কর বিভাগ তাদের বিরুদ্ধে তদন্ত শুরুর পর তারা এ অর্থ দিয়েছে। এই ধারাটি সংস্থাগুলোকে নির্বাচনী বন্ডের মাধ্যমে বিপুল পরিমাণে অর্থ দিতে অবদান রেখেছে।
ইডি, সিবিআই বা ইনকাম ট্যাক্স ডিপার্টমেন্ট যাদের পেছনে লেগেছে, তাদের মধ্যে কতগুলো নির্বাচনী বন্ড কিনেছে—এটা একটা গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন। অনেক ছোট কোম্পানি হয়তো সামনের কোম্পানি হিসেবে কাজ করেছে, যেমনটি রিলায়েন্স রিটেলের একটি বেসরকারি, তালিকাবিহীন প্রতিষ্ঠান সাবসিডিয়ারি হয়ে উঠেছে। ফলে কেলেঙ্কারি আর ১২ হাজার কোটি রুপির মধ্যে সীমাবদ্ধ নেই।
কংগ্রেস নেতা রাহুল গান্ধী প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির বিরুদ্ধে নির্বাচনী বন্ডের নামে সবচেয়ে বড় চাঁদাবাজির র্যাকেট চালানোর অভিযোগ তুলেছেন। কিন্তু বিজেপি-বিরোধীদের এ ব্যাপারে সুর যতটা চড়ানোর কথা ছিল, তা হয়নি। কারণ, রাজ্যে ক্ষমতায় থেকে অনেকেই নির্বাচনী বন্ডের নামে বিপুল অর্থ ব্যবসায়ীদের কাছ থেকে নিয়েছেন। ব্যতিক্রম শুধু বামপন্থীরা। সে কারণে নির্বাচনী বন্ড নিয়ে বিরোধীরা কতটা সোচ্চার হবে বলা কঠিন। আর ২০১৯-এ রাফায়েল কেলেঙ্কারি সামাল দেওয়া মোদির কাছে নির্বাচনী বন্ড তো হয়তো একেবারেই নস্যি।
লেখক: নির্বাহী সম্পাদক, ডিজিটাল বিভাগ, ইনডিপেনডেন্ট টেলিভিশন


ভারতের নির্বাচনে বিদেশিরা নাক গলাচ্ছে কেন?
বিশ্বজুড়ে মোদির বন্ধু এখন এরাই?
রামের কাছে বামরা কি টিকবে?
