তিপ্পান্ন বছরের ব্যবধান। কিন্তু কী অদ্ভুত মিল! ১৯৭১ সালে ছিল সোভিয়েত ইউনিয়ন-আমেরিকা-চীন। এবার রাশিয়া-আমেরিকা-চীন। অর্থাৎ, ৫৩ বছর আগে সোভিয়েতকে জব্দ করতে বন্ধু হিসেবে চীনকে পাশে পেতে চেয়েছিল আমেরিকা। আর এবার রাশিয়াকে পদানত করতে চীনকে সহযোগী হিসেবে চায় তারা। তবে দুটোর মধ্যে সময়ের সাথে সাথে রয়েছে পরিস্থিতির আসমান-জমিন পার্থক্য।
আমেরিকাকে ১৯৭১-এ এই কাজে সাহায্য করেছিলেন হেনরি কিসিঞ্জার। তুখোড় কূটনৈতিক বুদ্ধি। মেধা ও প্রজ্ঞায় তাঁকে এখনো মার্কিন প্রশাসনের কর্মকর্তারা সমীহ করেন। এক শ বছর বয়সে শেষ নিশ্বাস ত্যাগের আগেও কিসিঞ্জার চীন ঘুরে এসেছেন। চীনের সাথে পায়ে পা বাধিয়ে ঝগড়া করাটা যে আমেরিকার জন্য ভালো কিছু বয়ে আনবে না, তা ঠারে ঠারে বুঝিয়ে দিয়ে গেছেন।
মার্কিন পররাষ্ট্রমন্ত্রী অ্যান্টনি ব্লিঙ্কেনের সর্বশেষ তিন দিন সফর আবার সেই বিতর্ক সামনে এনেছে। আসলে আমেরিকা কী চায়? ঝগড়া না বন্ধুত্ব? চীনের সাথে তাদের অনেক বিষয়ে মতপার্থক্য আছে। আসলে দুটি দেশ পুরোপুরি বিপরীত রাজনৈতিক কাঠামোর মধ্য দিয়ে চলে। ফলে পার্থক্য হবে, সেটাই স্বাভাবিক। এই পার্থক্য মেনে নিয়েই গত চার দশক শুধু বাণিজ্যিক সম্পর্কের ওপর ভিত্তি করে দুই দেশের সম্পর্ক এগিয়েছে। হঠাৎ কী এমন হলো যে, বন্ধুর কর্মকাণ্ডে আমেরিকার কপালে ভাঁজ।
ব্লিঙ্কেন ২৪-২৬ এপ্রিল পর্যন্ত তিন দিন চীনে ছিলেন। চীনের পররাষ্ট্রমন্ত্রী ওয়াং উই-এর আমন্ত্রণে এই সফরে গেছেন। নয় মাসের মধ্যে এটা ছিল তাঁর দ্বিতীয় সফর। ব্লিঙ্কেনের আগে মার্কিন অর্থমন্ত্রীসহ হোয়াইট হাউসের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারাও চীনে গেছেন। কিন্তু কোনো আমন্ত্রণে নয়। ফলে ব্লিঙ্কেনের সফরকে ঘিরে একটা উচ্ছ্বাস চীনের রাজনৈতিক ও কূটনৈতিক মহলে তৈরি হয়েছিল। তাইওয়ানের আশপাশের এলাকাও ছিল একেবারে শান্ত। কিন্তু ২৪ এপ্রিল সকালে সাংহাইয়ে পা রেখেই তিনি বুঝিয়ে দিলেন, এই সফরে তাঁর মূল অ্যাজেন্ডা রাশিয়ার কাছে থেকে চীনকে দূরে রাখার জন্য চাপ দেওয়া। বিশেষ করে কোনো সামরিক সরঞ্জাম যেন বেইজিং এখনই মস্কোকে দেওয়া বন্ধ করে। এই বলে গোড়াতেই সফরের উদ্দেশ্যে পানি ঢেলে দিলেন তিনি।
বেইজিংয়ে ওয়াং উই-এর সাথে টানা সাড়ে পাঁচ ঘণ্টা আলাপ করেছেন ব্লিঙ্কেন। তাঁদের মধ্যে একান্তেও কথা হয়েছে। এতে দুই দেশের সম্পর্কে জটিলতা কাটার চেয়ে বরং বেড়েছে। কারণ চীনের ধারণা ছিল, বাণিজ্য, উচ্চ প্রযুক্তি, তাইওয়ান—এসব নিয়ে কথা হবে। তবে ব্লিঙ্কেনের অ্যাজেন্ডায় ছিল রুশ-ইউক্রেন সংঘাত, রাষ্ট্রীয় ভর্তুকিতে সস্তায় চীনা পণ্য রপ্তানি, দক্ষিণ চীন সাগরে উত্তেজনা, মানবাধিকার, মধ্যপ্রাচ্যে উত্তেজনা, তাইওয়ান, টিকটক বিক্রি ইত্যাদি।
এই আলোচনায় যাওয়ার আগে একটি কথা বলে রাখা ভালো, ব্লিঙ্কেনের সফরের আগে আগেই প্রেসিডেন্ট বাইডেন ৯৫ বিলিয়ন ডলারের বৈদেশিক সামরিক সহায়তা বিলে সই করেছেন। এখান থেকে ইউক্রেন ও ইসরায়েল যেমন অর্থ পাবে, তেমনি ৮ বিলিয়ন ডলারের সামরিক সহায়তা পাবে তাইওয়ান। চীন এটা কীভাবে নেবে, তা জানতেন ব্লিঙ্কেনসহ মার্কিন কর্মকর্তারা। এসব কারণে চীনের এক বিশেষজ্ঞ মন্তব্য করে বসলেন, ব্লিঙ্কেন অযথা চীনের সময় নষ্ট করতে আসছেন। তাঁকে পত্রপাঠ বিদায় করাই ভালো।
এই সফরে ব্লিঙ্কেন দেখা করেছেন চীনের প্রেসিডেন্ট শি জিনপিং-এর সাথে। আমেরিকার সব অভিযোগই তিনি প্রেসিডেন্ট শি-কে শুনিয়েছেন। চীনের গণমাধ্যমের ভাষ্য অনুযায়ী, শি শুধু শুনেছেন। কোনো বিষয়ে মতামত জানাননি। ব্লিঙ্কেনকে চীনের প্রেসিডেন্ট বলেছেন, ‘আমেরিকা মুখে বলে একটা, করে আরেকটা। এটা বন্ধ করা উচিত।’ আর বেইজিংকে শত্রু হিসেবে বিবেচনা না করার জন্য তিনি ওয়াশিংটনকে আহ্বান জানিয়েছেন। শি এটাও মনে করিয়ে দিয়েছেন, ‘আমাদের একে অপরকে উন্নতি করতে সাহায্য করা উচিত, একে অপরের ক্ষতি করা নয়।’
চীনের সর্বোচ্চ পর্যায় থেকে যে বার্তা পাওয়ার, তা ব্লিঙ্কেন পেয়ে গেছেন। রাশিয়ার কাছে চীনের সামরিক সরঞ্জাম বিক্রি বন্ধ করাটা আমেরিকার জন্য অত্যন্ত জরুরি হয়ে গেছে। এবারে ইউক্রেন, ইসরায়েল ও তাইয়ানের জন্য ৯৫ বিলিয়ন ডলারের সামরিক সহায়তা বিল পাস করাতে গিয়ে যথেষ্ট বেগ পেতে হয়েছে বাইডেনকে। এরপর আর সাহায্য দেওয়া যাবে কিনা সন্দেহ। কারণ, তাঁর হোয়াইট হাউসে ফেরা অনিশ্চিত। আর ট্রাম্প তো বলেই দিয়েছেন, ক্ষমতায় বসার প্রথম দিনই তিনি ইউক্রেন যুদ্ধ বন্ধ করে দেবেন। এর বাইরে আছে আমেরিকার ন্যাটোর সহযাত্রী বন্ধুদের চাপ। তারা যত দ্রুত সম্ভব এই সংঘাতের শেষ চায়। এ কাজ করতে হলে চীনের দ্বারস্থ হওয়া ছাড়া কোনো উপায় ছিল না ব্লিঙ্কেন বা তাঁর বস বাইডেনের।
কিন্তু চীনের জবাব পরিষ্কার—‘তোমরা শত শত কোটি ডলারের সামরিক সরঞ্জাম দিয়ে উইক্রেন যুদ্ধ জিইয়ে রেখেছ। এখন হারার ভয়ে আমাদের কাছে এসেছ। আর বলছ, তোমাদের সমস্যা শুধু চীন-রাশিয়া বাণিজ্য নিয়ে।’ ফলে ব্লিঙ্কেনের কথা তারা কানে তোলেনি। উইঘুর মুসলমানদের মানবাধিকারের প্রসঙ্গ ব্লিঙ্কেন তোলায় তারও জবাব দিয়েছেন চীনা বিশেষজ্ঞরা। তাঁরা বলছেন, ‘তোমরা বসে বসে গাজায় ইসরায়েলি গণহত্যা দেখছ, অস্ত্র সাহায্য দিচ্ছ, আর জ্ঞান দিতে এসেছ আমাদের।’
মার্কিন পররাষ্ট্রমন্ত্রীর চীন সফর নিয়ে দুই দেশের পুরো বিপরীত প্রত্যাশা থাকায় সবটাই বিফলে গেছে। বরং দেশে ফিরে চীনের দিকে তোপ দাগতে শুরু করেছেন ব্লিঙ্কেন। বলছেন, আমেরিকার নির্বাচনে হস্তক্ষেপ করার চেষ্টা করছে চীন।
এবার দেখা যাক কিসিঞ্জার আসলে কী করেছিলেন। সেই ১৯৪৯-৭১ পর্যন্ত কোরিয়া যুদ্ধ, ভিয়েতনাম যুদ্ধসহ নানা কারণে চীনের সাথে আমেরিকার সম্পর্ক ছিল সাপে-নেউলে। ১৯৬৮ সালে সোভিয়েত ইউনিয়নকে চাপে ফেলতে মার্কিন প্রেসিডেন্ট রিচার্ড নিক্সন চীনের সাথে সম্পর্ক ভালো করার সিদ্ধান্ত নেন। এই কাজের মুখ্য কারিগর হিসেবে নিয়োগ দেন তাঁর জাতীয় নিরাপত্তা উপদেষ্টা হেনরি কিসিঞ্জারকে। সহযোগী হিসেবে পান পাকিস্তানকে। সম্পর্ক উন্নয়নের গোপন এই অভিসারের নাম দেওয়া হয় ‘মার্কো পোলো’। ইতালীয় মার্কো পোলো প্রথম পশ্চিমা পর্যটক ও ব্যবসায়ী, যিনি সিল্ক রুট ধরে চীনে পৌঁছান। নিক্সন-কিসিঞ্জার জুটির ‘মার্কো পোলো’ অভিযান সফল হয়েছিল।
তাহলে ব্লিঙ্কেন বা তাঁর বস বাইডেনের ব্যর্থতা কোথায়? এর জবাব দিয়েছেন মার্কিন পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের সাবেক কর্মকর্তা রোনান ফ্যারো। তিনি বলছেন, গত কয়েক যুগ ধরে মার্কিন পররাষ্ট্রনীতি ঠিক করছে পেন্টাগন ও সিআইএ (মার্কিন গোয়েন্দা সংস্থা)। এখানে মার্কিন বেসামরিক কর্মকর্তারা একেবারেই অচ্ছ্যুৎ। ঠিক একই কথা বলছেন সাবেক মার্কিন কূটনীতিক ও ওবামার আফগানিস্তান বিষয়ক দূত রিচার্ড হলব্রুক। মার্কিন পররাষ্ট্রনীতির সামরিকীকরণ প্রসঙ্গে তাঁর বিশেষণ হলো ‘মিল-থিংক’ বা ‘সামরিক-ভাবনা’। কেউ কেউ একে ‘মিল-ইন্ট-থিংক’ অর্থাৎ সামরিক-গোয়েন্দা-ভাবনা বলে বিশেষায়িত করছেন।
ফ্যারো লিখেছেন, (পররাষ্ট্রনীতির ক্ষেত্রে) আধুনিক কৃৎ-কৌশল প্রতিস্থাপন করতে গিয়ে সামান্য চিন্তাভাবনা করেই আমরা সেই সব প্রতিষ্ঠানের ধ্বংস দেখেছিলাম। এখানেই কিসিঞ্জার অন্যদের চেয়ে আলাদা। তিনি সাধারণ ও দার্শনিকের দিকগুলো বিবেচনায় নিতেন। তিনি অনুভব করেছিলেন, ঐতিহাসিক সিদ্ধান্ত নেওয়ার ক্ষেত্রে প্রথম প্রতিক্রিয়ার চেয়ে কৌশলেই জয়লাভ সম্ভব। চীনের সাথে আমেরিকার গত ৪০ বছরের সম্পর্ক কিসিঞ্জারের সেই কৌশলেরই ফসল।
আর ব্লিঙ্কেনের ব্যর্থতার কারণে বেইজিংভিত্তিক চায়না ফরেন অ্যাফেয়ার্স ইউনিভার্সিটির অধ্যাপক লি হাইডংয়ের মন্তব্য, ‘মনে হচ্ছে ব্লিঙ্কেন চীনকে আল্টিমেটাম দিতে এসেছেন।’ সেটা মার্কিন পররাষ্ট্রমন্ত্রী দিতেই পারেন। কিন্তু সমস্যা হলো, রাজায়-রাজায় যুদ্ধ হলে আমাদের মতো উলুখাগড়াদের প্রাণ নিয়ে তো সর্বপ্রথম টানাটানি পড়ে।
লেখক: নির্বাহী সম্পাদক, ডিজিটাল বিভাগ, ইনডিপেনডেন্ট টেলিভিশন


ব্লিঙ্কেন কেন চীন যাচ্ছেন?
সম্পর্ক এগিয়ে নেওয়ার পথ খুঁজছে ওয়াশিংটন-বেইজিং
