সহনীয় প্রশাসন ও ব্যবসা সময়ের দাবি

আপডেট : ১৪ অক্টোবর ২০২৪, ১০:৩৪ পিএম

স্বাধীনতার ৫৩ বছরের মাথায় জাতি এখন এক অবিস্মরণীয় বিজয় অর্জন করেছে। আমাদের ছাত্র সমাজ আজ আমাদের অবাক করা এক দেশ উপহার দেওয়ার অপেক্ষায়। সত্যিই আমাদের এই প্রজন্ম সম্ভাবনাময় এক নতুন প্রজন্ম। জুলাই মাসের শুরু থেকে শেষ পর্যন্ত একের পর এক একেবারে অহিংস আন্দোলন কর্মসূচি দিয়ে তারা দেশকে চূড়ান্ত বিজয়ের দিকে নিয়ে গেছে। শুধু একদল কোটাধারী ছাড়া দেশের আপামর জনসাধারণের ছাত্রদের এই আন্দোলনের প্রতি পূর্ণ সমর্থন ছিল। তাইতো তারা ছাত্রদের প্রতিটি কর্মসূচিতে সক্রিয় অথবা মানসিক সমর্থন দিয়েছে। ফলশ্রুতিতে বাংলাদেশ এখন অন্যরকম সম্ভাবনাময় ভবিষ্যতের দ্বারপ্রান্তে। এটাকে এখন এগিয়ে নিয়ে যাওয়ার দায়িত্ব সবার। এর জন্য দরকার একটা জনসাধারণ বান্ধব প্রশাসন ও ব্যবসায়ী সম্প্রদায়।

বিগত দিনগুলিতে ১৯৭১ সালের রক্তক্ষয়ী যুদ্ধের মাধ্যমে অর্জিত আমাদের বাংলাদেশ এমন একটা প্রশাসন ও ব্যবসায়ী সম্প্রদায় প্রত্যক্ষ করেছে, যা কখনো নাগরিকবান্ধব ছিল না। তারা সহনীয় প্রশাসন ও বাজার ব্যবস্থা প্রবর্তনের বিপরীতে নিজেদের ভোগ-দখল আর এক একটা কোটারিকে খুশি করার উন্মত্ত নেশায় বুঁদ হয়ে ছিল। ফলে নাগরিকদের আশা-আকাঙ্ক্ষা উপেক্ষিত ছিল। আমি নিশ্চিত যে এরকম প্রশাসন ও ব্যবসায়ী সম্প্রদায় বিজয়ী এই বীরের জাতি কখনো আশা করেনি এবং ভবিষ্যতেও করবে না। তাই এখনই সময় এগুলোকে ঢেলে সাজানোর।

আমাদের দেশের প্রশাসন ও ব্যবসা চালানোর জন্য যে নিয়মকানুন আছে তার অধিকাংশ জনবান্ধব হলেও হতে পারে। কিন্তু দুঃখের বিষয় হলেও সত্য যে, আইনের সঠিক প্রয়োগ আমাদের দেশে হয়নি বা করা যায়নি। ফলে এ দেশের আপামর জনসাধারণ কখনো আইনের সঠিক প্রয়োগ হতে দেখেনি। ফলে প্রশাসন ও ব্যবসাতে করা হয়েছে দুরবৃত্তায়ণ। এতে করে জিনিসপত্রের দাম দফায় দফায় বেড়েছে। আর প্রশাসন তাদের নির্লিপ্ততার মাধ্যমে প্রতিনিয়ত এদের সমর্থন দিয়ে চলেছে, যা একটি সুস্থ শাসন ব্যবস্থায় কখনো কাম্য হতে পারে না।

সবজির বাজারে চলছে কেনাকাটা। ফাইল ছবিএখানে লক্ষণীয় যে, আমাদের দেশে নিত্য প্রয়োজনীয় অনেক পণ্য উৎপাদিত হয়, আবার এর একটা অংশ বিদেশ থেকে আমদানি করে নিয়ে আসতে হয়। কিন্তু সাধারণ মানুষ এগুলো সহনীয় মূল্যে কিনতে পারে না। বিদেশে পণ্যের দাম বাড়লে এ দেশে পণ্যের দাম বাড়ে, আবার কমলেও বাড়ে। আর আমাদের দেশে একবার কোনো পণ্যের দাম বাড়লে তা আর কখনো কমে না। দুঃখজনক এ অবস্থা দেখার কেউ নেই। তাইতো এ দেশে জীবনধারণের খরচ পৃথিবীর যেকোনো উন্নত দেশের কাছাকাছি। অথচ আমাদের আয় ও জীবন ব্যবস্থা তাদের ধারে কাছেও না। ফলশ্রুতিতে একটা শ্রেণি অবলম্বন করেছে অসদুপায়, জড়িয়েছে ঘুষ আর দুর্নীতিতে। এটা এখন ক্যানসারে পরিণত হয়েছে।

বর্তমানে আমরা এমন একটা সমাজে বাস করছি যেখানে একটা মানুষের সামাজিক মর্যাদা নির্ধারিত হয় তার কত সম্পদ আছে তার ভিত্তিতে। যার যত বেশি সম্পদ, তার সম্মান/ মানমর্যাদা তত বেশি। অথচ কীভাবে সেই সম্পদ অর্জিত হলো তা আর কেউ খুঁজে দেখেন না। তারই ধারাবাহিকতায় আমাদের শ্রেণি বৈষম্য আন্দোলনের যখন চূড়ান্ত বিজয় অর্জিত হলো তখন এক শ্রেণির মানুষ লুটপাটে নেমে গেল। এ যেন ১৯৭১ সালে আমরা যখন মহান স্বাধীনতা যুদ্ধের মাধ্যমে বিজয় লাভ করলাম তারই প্রতিচ্ছবি। তাদের কেউ কেউ পরবর্তীতে আরও অনেক কিছু করে নিজেকে প্রতিষ্ঠিত করছেন। অথচ কোনো জিনিস তার প্রকৃত মালিককে না বলে নেওয়া যে চুরি এটা যেন এরা জানে না, আর জানলেও মানতে নারাজ। কি-এক অবক্ষয়ের দেশে আমরা বাস করছি। তাইতো মানুষের মধ্যে দেখা যাচ্ছে অবৈধ সম্পদ অর্জনের এক অশুভ প্রতিযোগিতা। সৃষ্টি হচ্ছে শ্রেণি বৈষম্য, আর এই বৈষম্য দূরীকরণের জন্য এ রকম একটা আন্দোলন ছিল একেবারে প্রত্যাশিত।

যদিও এই ধরনের একটা আন্দোলনের দরকার ছিল অনেক আগে। আমরা অনেক দেরি করে ফেলেছি। তাহলে আমাদের দেশে এত দুর্বৃত্ত তৈরি হতো না। সুখবর হল অনেক দেরি হলেও কোটা বৈষম্য দূরীকরণের আন্দোলন হয়েছে। এর মাধ্যমে সকল প্রকার শ্রেণি বৈষম্য দূর হোক এটাই হোক আমাদের সকলের চাওয়া পাওয়া। এখন যারা ক্ষমতায় তাদেরকে সমাজের সকল প্রকার বৈষম্য দূর করতে হবে। পুঞ্জীভূত সকল জঞ্জালের অপসারণের অবসান ঘটতে হবে। যত তাড়াতাড়ি এটা করা যাবে, ততই মঙ্গল।

শিক্ষার্থীদের কোটাবিরোধী আন্দোলন। ফাইল ছবিপ্রকৃতপক্ষে আমাদের দেশে সরকার কীভাবে চলবে, প্রশাসন কীভাবে চলবে, কীভাবে দেশের স্বার্থ সংরক্ষণ হবে বা সংরক্ষণ করা হবে, তার জন্য যথেষ্ট নিয়মকানুন রয়েছে। কীভাবে ব্যবসা-বাণিজ্য চলবে, কীভাবে ব্যবসাবান্ধব পরিবেশ সৃষ্টি হবে, তারও নিয়মকানুন রয়েছে যথেষ্ট। কিন্তু এগুলোর সঠিক প্রয়োগ হচ্ছে বলে তেমন কিছু দেখতে পাচ্ছি না। হলে এরকম অসহনীয় অবস্থার অবতারণা হতো না।

উদাহরণস্বরূপ এ দেশে জ্বালানি, বিদ্যুৎ, পানি ইত্যাদির দাম দফায় দফায় বাড়ানো হয়। পাশাপাশি ডিম, মাছ, মাংস সহ সকল প্রকার খাদ্যদ্রব্যের দাম লাফিয়ে লাফিয়ে বাড়তে থাকে। অথচ দেশের বিভিন্ন ক্রান্তিলগ্নে ব্যবসায়ীরা ব্যাংক/ বীমা প্রতিষ্ঠান থেকে বিভিন্ন সুদ ও ঋণ মওকুফ সুবিধা নিয়েছেন। বিশেষ করে করোনাকালে আমরা এগুলো প্রত্যক্ষ করেছি। উদ্দেশ্য ছিল জনসাধারণকে সুবিধা দেওয়া। কিন্তু সামান্য কিছু টিকা সুবিধা পাওয়া ছাড়া জনগণ তেমন কিছু পায়নি, বরং ক্রমান্বয়ে জিনিসপত্রের দাম বাড়িয়ে আপামর জনসাধারণের নাভিশ্বাস ওঠানো হয়েছে। এগুলো দেখার জন্য প্রশাসনকে আশানুরূপ কোনো ব্যবস্থা নিতে দেখা যায়নি, সরকারকেও দেখা যায়নি। আমরা দেখেছি প্রশাসন ও ব্যবসায়ীরা এইসব দাম বাড়ানোর পক্ষে বিভিন্ন সাফাই গেয়েছেন। তাইতো ব্যবসায়ীরা হয়েছেন আরও বেপরোয়া। এটাকে অতি দ্রুত এখানেই রুখে দিতে হবে।

সরকার ও প্রশাসন যখন ব্যবসায়ীদের সকল অপকর্মের পক্ষে অবস্থান নেন, তখন কেউ যদি এটা বিশ্বাস করেন যে, ওনারা অবৈধ সুবিধা (মানে ঘুষ) নিচ্ছেন বা নেন, তাতে কি ভুল হবে? নাহলে খাদ্যদ্রব্যসহ সকল নিত্য প্রয়োজনীয় জিনিসপত্রের দাম বাড়লে ওনাদেরও তো অসুবিধা হওয়ার কথা। একেবারে নির্দিষ্ট পরিমাণ আয়ের মাধ্যমে ওনারা কীভাবে জীবনযাত্রার বাড়তি খরচ মেটান তা অবশ্যই প্রশ্নের সম্মুখীন। কি এমন যাদুর কাঠির কারণে ওনাদের কোনো অসুবিধা হয় না তা বুঝতে কারও একটুও কষ্ট হওয়ার কথা না। বছরের বছর ওনারা এই জাতিকে ভুলভাল বুঝিয়ে গেছেন, এটা কি মেনে নেওয়া যায়?

অচিরেই নতুন সরকার গঠিত হবে, অথবা ইতিমধ্যে গঠিত হয়ে গেছে। সেটা হতে পারে অন্তর্বর্তীকালীন সরকার অথবা জনগণের প্রত্যক্ষ ভোটে নির্ধারিত সরকার। এই সরকারের কাছে আপামর জনগণের অনেক প্রত্যাশা। প্রকৃতপক্ষে সাধারণ জনগণ একটা সহনীয় অবস্থা আশা করে। এর জন্য দরকার আইনের সঠিক প্রয়োগ। কোনোপ্রকার বৈষম্যমূলক আইনের প্রয়োগ কেউ আর দেখতে চায় না। প্রশাসনের দক্ষ জনবলের এই কাজটা করতে পারার কথা। যারা পারবেন তারাই মেধাবী, তারাই দেশপ্রেমিক। বললে অত্যুক্তি হবে না যে, বাকিদের অধিকাংশ মেধাহীন অথবা কোটায় নিয়োগপ্রাপ্ত। এসব কোটায় নিয়োগপ্রাপ্তরা যদি সহসা দক্ষতা অর্জন করতে পারেন, তবে তাদেরকে চাকরিতে রাখা যেতে পারে, অন্যথায় বিদায় নিতে হবে, অবশ্যই সেটা আইন অনুসরণ করে। বিদায়প্রাপ্তরা হয়তোবা অন্য কোথাও অনেক ভালো করবেন।

এখন আসি নিত্য-প্রয়োজনীয়সহ সকল জিনিসপত্রের দাম কেমন হওয়া উচিত? যেকোনো জিনিসের দাম তার উৎপাদন/ আমদানি খরচের সাথে পরিবহণ খরচ, শুল্ক এবং সর্বাধিক ১০% মুনাফা যোগ করে নির্ধারিত হওয়া প্রয়োজন। এখন এইসব উৎপাদন/ আমদানি খরচ ও শুল্ক কম রেখে পণ্যের দাম কীভাবে স্বল্প আয়ের মানুষের কাছে সহজলভ্য করা যায়, সেখানে ব্যবসায়ীদের ও প্রশাসনে কর্মরত ব্যক্তিবর্গকে দ্বায়িত্ব পালন করতে হবে। বিগত দিনগুলোতে কীভাবে যেন একটা মধ্যস্বত্ত্বভোগী সম্প্রদায় গড়ে উঠেছে যারা মানুষের স্বল্প দামে পণ্য ক্রয়ের ক্ষেত্রে বিরাট এক প্রতিবন্ধকতা সৃষ্টি করে রেখেছে। পাশাপাশি ঘাটে ঘাটে চাঁদাবাজি এই অবস্থাকে অসহনীয় করে তুলেছে। এই বিষয়গুলি সবার জানা, মানে প্রশাসন ও ব্যবসায়ীদের নাকের ডগায় অন্যায় এই কাজগুলো চলেছে। অথচ কেউ তাদের টিকিটাও স্পর্শ করতে পারেনি। আসলে কি পারেনি, নাকি চায়নি? প্রশ্ন কিন্তু থেকেই যায় যে, তাহলে কি প্রশাসন ও ব্যবসায়ীরা এর মাধ্যমে বাড়তি সুবিধা নিচ্ছেন? এগুলোও বৈষম্য, কেননা আপনি একটা কোটারিকে সুবিধা দিচ্ছেন।

সারা বিশ্বের অন্যতম এবং শীর্ষস্থানীয় এক বিপ্লবের মাধ্যমে বাংলাদেশের আপামর জনসাধারণের এখন একটা চূড়ান্ত বিজয় অর্জিত হয়েছে। এই বিজয়কে কাজে লাগাতে হবে। সময় এখন সকল অপকর্মের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়ার। কেবল দক্ষ প্রশাসন আইনের সঠিক প্রয়োগের মাধ্যমে বেপরোয়া ব্যবসায়ীদের লাগাম টেনে ধরতে পারেন। এতে করে নিত্য প্রয়োজনীয় জিনিসপত্রের দাম দেশের সাধারণ মানুষের ক্রয়ক্ষমতার মধ্যে চলে আসবে। এরকম একটা সহনীয় পরিবেশই নতুন সরকারের কাছে দেশের সকল মানুষের মানুষের প্রথম প্রত্যাশা।

লেখক: কমডোর (অব.), বাংলাদেশ নৌবাহিনী

[এই মতামত লেখকের নিজস্ব। এর সঙ্গে ইনডিপেনডেন্ট টেলিভিশনের প্রাতিষ্ঠানিক সম্পাদকীয় নীতিমালার কোনো সম্পর্ক নেই।]

বাঙালি নারীর অসীম সাহসিকতা, দেশপ্রেম, আদর্শ আর বিপ্লবের কথা যখন লেখা হয় সবার আগে আসে প্রীতিলতার নাম। শিল্পী, শিক্ষিকা, দার্শনিক, এবং নারীর আত্মমর্যাদার প্রতীক প্রীতিলকার জীবন গল্প আমাদের শেখায়,...
নেপালসহ দেশে দেশে সরকার পতন ও এরপরের ‘খিচুড়ি’ হয়ে যাওয়া পরিস্থিতিতে সেসব অভ্যন্তরীণ সমস্যাগুলো না হয় ‘ডাল’ আর ‘চাল’-এর ভূমিকা নিয়েছে। আগুন হিসেবে কাজ করেছে জেন জি-র ক্ষোভ। কিন্তু খিচুড়ি রান্নার...
‘বিপ্লব, নাকি করপোরেট শক্তির খেল’–প্রশ্নটা আজ দক্ষিণ এশিয়ার রাজনীতির সামনে এক বিরাট ধাঁধা হয়ে দাঁড়িয়েছে। চার বছরের মধ্যে ভারতের তিন প্রতিবেশী দেশ–শ্রীলঙ্কা, বাংলাদেশ এবং নেপাল–গণআন্দোলনের জেরে...
কাঠমান্ডু পোস্টের সম্পাদকীয়
এই তরুণদের হালকাভাবে নেওয়াটা সরকারের জন্য হবে বোকামি। এমন স্বতঃস্ফূর্ত তরুণ-নেতৃত্বাধীন আন্দোলন এমনকি সুপ্রতিষ্ঠিত শাসনকেও উৎখাত করেছে। আমাদের এই অঞ্চলেও এমন উদাহরণ আছে। সবচেয়ে সাম্প্রতিক সময়ের...
কুমিল্লা ভিক্টোরিয়া সরকারি কলেজের ছাত্রী ও নাট্যকর্মী সোহাগী জাহান তনু হত্যা মামলায় আরও দুই সন্দেহভাজন জাহিদুল ইসলাম ও ফয়সাল আহমেদ রাব্বীর ডিএনএ নমুনা সংগ্রহের নির্দেশ দিয়েছেন আদালত।
হবিগঞ্জে পৃথক অভিযানে আন্তঃজেলা ডাকাত দলের মূল হোতাসহ মোট ৮ সদস্যকে গ্রেপ্তার করেছে র‍্যাব-৯। সোমবার দুপুরে হবিগঞ্জে র‍্যাব-৯-এর কার্যালয়ে আয়োজিত এক সংবাদ সম্মেলনে এ তথ্য জানান র‍্যাব কর্মকর্তারা।
বেলুচিস্তানের খোজদার জেলার জিদিতে চালানো এক অভিযানে ১৯ পাকিস্তানি সেনাকে হত্যার দাবি করেছে বিচ্ছিন্নতাবাদী গোষ্ঠী বেলুচ লিবারেশন আর্মি (বিএলএ)। বেলুচিস্তান পোস্টের এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, গত ১০...
লোডিং...
পঠিতনির্বাচিত

এলাকার খবর