আরেকটি বৈশ্বিক টুর্নামেন্টে ব্যর্থতার পর অধিনায়ক নাজমুল হোসেন শান্ত জবাবেও ধারাবাহিকতা ধরে রেখেছেন। আবারও জানিয়েছেন, তারা উন্নতির কথা ভাবছেন। বরাবরই তা ভাবেন, যদিও সে ভাবনার প্রতিচ্ছবি কখনো দেখা যাচ্ছে না।
চ্যাম্পিয়নস ট্রফি জিততে যাচ্ছেন- দেশ ছাড়ার আগে বেশ আত্মবিশ্বাসী শোনাচ্ছিল অধিনায়ক শান্তকে। কিন্তু টানা দুই ম্যাচে ব্যর্থতা ও টুর্নামেন্ট থেকে বাদ পড়ার পর সেই শান্তই কাল হতাশার সুরে বলেছেন, ‘ব্যাটিংয়ে উন্নতি করা দরকার আমি এটা অনেকবার বলেছি। আমাদের ব্যাটিংয়ে উন্নতি করতেই হবে।’
গতকাল নিউজিল্যান্ডের বিপক্ষে ৫০ ওভারে ২৩৬ রান করেছে। পাকিস্তানের মাটিতে এবার ৩০০ রানও অনিরাপদ মনে হচ্ছে। অস্ট্রেলিয়া তো ইংল্যান্ডের দেওয়া ৩৫২ রানও ১৫ বল হাতে রেখে পেরিয়ে গেছে। সেখানে ২৩৬ তাড়া করতে নিউজিল্যান্ডের ৪৭ ওভার পর্যন্ত যেতে হয়েছে, একে বাংলাদেশে বোলারদের সাফল্য বলা যেতে পারে।
বাংলাদেশের বোলারদের নিয়ে অবশ্য এমনিতেও প্রশ্ন নেই। ছোট পুঁজি পেয়েও ১৫ রানের মধ্যে ২ উইকেট ফেলে দিয়েছিলেন পেসাররা। সেঞ্চুরিয়ান রাচিন রবীন্দ্রের সহজ দুটি ক্যাচ ফিল্ডাররা ফেলে না দিলে ম্যাচটা আরেকটু প্রতিদ্বন্দ্বিতামূলক হতে পারত।
কিন্তু ব্যাটসম্যানদের মানসিকতায় যে ঘাটতি সেটা তো পূরণ করার সাধ্য নেই বাংলাদেশের। গতকাল পাওয়ার প্লেতে ৫৮ রান তুলে ফেলেছিল বাংলাদেশ। পাওয়ার প্লে শেষে দ্বিতীয় ব্যাটসম্যান হিসেবে ফিরে যান মিরাজ। এতেই খোলসে ঢুকে পরের ১০ ওভারে মাত্র ৯৩ রান তোলে বাংলাদেশ।
৫০ ওভার শেষে দেখা গেছে, এই খোলসে ঢুকে ম্যাচের ৩০০ বলের ১৭৮টি বলেই কোনো রান নেয়নি বাংলাদেশ। এর যুক্তি হিসেবে শান্ত বলেছেন, ‘আজকে ডট বলের কথা বললে ৫-১০ ওভার পরপর একটা করে উইকেট ফেলেছি। তখন ব্যাটারদের জন্য কঠিন স্ট্রাইক রোটেট করবে কীভাবে। বড় দুইটা জুটি হলে হয়ত এমন হতো না।’
এ যুক্তি নতুন ব্যাটসম্যানের জন্য সত্যি হতে পারে। কিন্তু ওপেনিংয়ে নেমে পাওয়ার প্লেতে ২৮ বল খেলে ফেলা একজন ব্যাটসম্যানের কেন স্ট্রাইক পরিবর্তন করতে সমস্যা হবে? কেন পরের ৩৩ বলের ২০ বলেই ডট দেবেন সেট হয়ে যাওয়া এক ব্যাটসম্যান? যেখানে জানা কথা, পাকিস্তানের ব্যাটিং সহায়ক উইকেটে তিন শ ছাড়া কোনো গতি নেই।
ইনিংসের প্রথম ৬১ বলেই ৪০ বলে স্ট্রাইক পরিবর্তন করতে ব্যর্থ শান্ত পরে সে দোষ কিছুটা কাটিয়ে উঠেছেন। ১১০ বলের ইনিংসে শেষ পর্যন্ত ৫৯ বলে কোনো রান করতে পারেননি শান্ত। অর্থাৎ ইনিংসের ৫৩.৬৪% ক্ষেত্রেই ডট বল খেলেছেন শান্ত। ইনিংস শেষে এর প্রভাবও টের পাওয়া গেছে। ৭৭ রানের ইনিংসটি ৭০ স্ট্রাইকরেটের।
ওয়ানডেতে দলের একমাত্র পঞ্চাশোর্ধ্ব ইনিংস যখন ৭০ স্ট্রাইকরেটের হয়, তখন তিন শ দূরে থাকা আড়াই শ করার চিন্তাও কঠিন।
ওদিকে রাচিন রবীন্দ্র যখন নেমেছিলেন, তখন নিউজিল্যান্ডের স্কোর ১৫, ২ উইকেট পড়ে গেছে। এমন অবস্থায় নেমে সেট হওয়ার চেষ্টা করে সময় কাটালেও কেউ দায় দিতেন না, আপত্তিও করতেন না। কিন্তু পাওয়ার প্লে শেষে দেখা গেল, রবীন্দ্রের নামের পাশে ২৩ রান, সেটা এসেছে ২১ বলে। পাওয়ার প্লে শেষেও গতি কমেনি তাঁর। ৪৮ বলে তাঁর রান ৪৭।
৩০ ওভার শেষে রবীন্দ্রের নামের পাশে ৮২ বলে ৮৫ রান। ইনিংসের ৩৫তম ওভারেই ৯৫ বলে সেঞ্চুরি পেয়ে গেছেন রবীন্দ্র। শান্তর চেয়ে ৫ বল কম খেলে রবীন্দ্র যখন আউট হচ্ছেন, ততক্ষণে তাঁর নামের পাশে ১১২ রান। আর সে ইনিংসে দলকে যে অবস্থানে নিয়ে গেছেন, বাকি ১২ ওভারে অন্য যেকোনো দিন নিউজিল্যান্ডের মিডল ও লেট অর্ডার দলকে তিন শ এনে দিতেন।
অনেকেই বলতে চাইবেন, যেদিন দলের সবাই ব্যর্থ, সেদিন তুলনামূলক সফল শান্তকে নিয়ে এত কাটা-ছেঁড়া কেন? কারণ, কোচিং ম্যানুয়ালেই বলা আছে, বাংলাদেশের কোচ এবং অধিনায়ক নিজেও বেশ কয়েকবার জানিয়েছেন, সব ব্যাটসম্যান প্রতিদিন সফল হবেন না। যে দুই একজন ছন্দে থাকবেন, তাদেরই দায়িত্ব ইনিংস বড় করার।
উইল ইয়াং ও কেইন উইলিয়ামসন ব্যর্থ হওয়ায় যে দায়িত্ব নিয়েছেন রবীন্দ্র, বাংলাদেশে সে দায়িত্ব ছিল শান্তর। কিন্তু রবীন্দ্র যা পেরেছেন, তা পারেননি তাঁর চার বছর আগে আন্তর্জাতিক ক্রিকেটে পা রাখা শান্ত। হ্যাঁ, রবীন্দ্রের ইনিংসেও ডট ছিল। ৪২টি বলে কোনো রান নিতে পারেননি তিনিও। তবু ইনিংস শেষ করেছেন ১০৫ স্ট্রাইকরেটে। যদিও ক্যারিয়ার বিবেচনায় কাল পিছিয়ে ছিলেন কিউই বাঁহাতি অলরাউন্ডার। গতকালের আগে যে ৪০.৪২ গড়ে রান করা রবীন্দ্রের স্ট্রাইকরেট ছিল ১১০!
ওদিকে গত কয়েক বছরে সীমিত ওভারে বাংলাদেশের সেরা ব্যাটসম্যান শান্ত গত দুই বছরে ৪৫ গড়ে রান করলে সেটা এসেছে ৮৩.২৩ স্ট্রাইকরেটে। স্ট্রাইকরেটের এই ২৭ ব্যবধানই কিন্তু মানসিকতার পার্থক্য।
শান্ত শুধু উদাহরণ। আধুনিক ওয়ানডের সঙ্গে বাংলাদেশের ব্যাটিং যে কোনোভাবেই যায় না, সেটা আরেকটু বিস্তারিতভাবে দেখা যাক।
২০১৫ থেকে ২০২৫-এই ১০ বছরে অন্তত ২০০০ রান করেছেন এমন ব্যাটসম্যানদের পঞ্চাশোর্ধ্ব ইনিংস ঘাঁটলে দেখা যায়, অধিকাংশ ব্যাটসম্যানের স্ট্রাইকরেটই এক শর কাছাকাছি।
পঞ্চাশোর্ধ্ব ইনিংসে রানের দিক থেকে শীর্ষ দশে মাত্র দুজনের স্ট্রাইকরেট এক শর নিচে। একজন তামিম ইকবাল (৮৬.৫৪), অন্যজন ওয়েস্ট ইন্ডিজের শাই হোপ (৮৫.৫০)। এরপরই আছেন, রক্ষণাত্মক খেলার কারণে পাকিস্তানের বিশ্লেষকদের ক্রোধ জন্মানো বাবর আজম (৯১.৭৫)। আবার মনে করিয়ে দেওয়া যাক, এই হিসেব কিন্তু শুধু পঞ্চাশোর্ধ্ব ইনিংসের ক্ষেত্রে, অর্থাৎ সেট হয়ে যাওয়ার পর কোন ব্যাটসম্যান আসলেই সেট হওয়ার জন্য ব্যবহৃত বলের ক্ষতি পুষিয়ে দিচ্ছেন না কি না, সে হিসেব।
তাতে দেখা যাচ্ছে, বিরাট কোহলি, রোহিত শর্মা, ডেভিড ওয়ার্নার, কুইন্টন ডি ককরা এক শর উপরে রান করছেন। শিখর ধাওয়ান ০.০৭ এর জন্য এক শ হাতছাড়া করেছেন।
১০ বছর অনেক বড় সময় মনে হতে পারে, কারণ ওয়ানডে ক্রিকেট সম্প্রতি বদলের মধ্য দিয়ে গেছে। সর্বশেষ পাঁচ বছরে অন্তত ১০০০ রান করেছেন এমন ব্যাটসম্যানদের চিত্র দেখলে দেখা যাচ্ছে, এক্ষেত্রেও রানের গতি বাড়ানোয় ব্যর্থ বাবর আজম। তাঁর ২৮টি পঞ্চাশোর্ধ্ব ইনিংসের স্ট্রাইকরেট ৯০.৯৭। এবং শীর্ষ দশে সবচেয়ে পিছিয়ে তিনি। তাঁর পরেই আছেন বিশ্বকাপ বা চ্যাম্পিয়নস ট্রফি খেলতে না পারা শাই হোপ (৯১.৫৮)। তিনে আয়ারল্যান্ডের হ্যারি টেক্টর (৯২.৮৭)।
কোহলির যে সময়টা ভালো যাচ্ছে না, তা স্পষ্ট। কারণ সর্বশেষ পাঁচ বছরে পঞ্চাশোর্ধ্ব ইনিংসে তাঁর স্ট্রাইকরেট এক শ নিচে নেমে গেছে (৯৮.১০)। কিন্তু রোহিত শর্মা (১২৪.৮৩), শুবমান গিল (১০৯.৬৭), পাথুম নিশাঙ্কা, আসালাঙ্কা, ওয়ার্নাররা এক শর উপরেই রান করেছেন।
আর যদি গত দুই বছরের হিসাব টানা হয়? গত দুই বছরে ওয়ানডেতে সর্বোচ্চ রানের তালিকায় পাঁচে আছেন শান্ত (১০৪৫)। কিন্তু অন্তত ৫০০ রান করেছেন এমন ৪৬ ব্যাটসম্যানের মধ্যে শান্তর পর আছেন মাত্র ৪ জন। ৮৫.৭৯ স্ট্রাইকরেটে ব্যাট করা শান্তর ঠিক ওপরই আছেন বাবর (৮৬.৫৩)। ৩৮ ও ৩৯তম আছেন মুশফিকুর রহিম (৮৯.৬৪) ও তাওহিদ হৃদয় (৮৯.৫৫)। কোহলি যে আসলেই ধুঁকছেন, সেটা আবার স্পষ্ট এই তালিকায়। এই সময়ে পঞ্চাশোর্ধ্ব ইনিংসে কোহলির স্ট্রাইকরেট মাত্র ৯৩.৪০।
তো কারা এগিয়ে আছেন? দু-একজন বাদে নামগুলো অনুমেয়। হেনরিখ ক্লাসেন (১৫৯), শন উইলিয়ামস (১৩৪), ট্রাভিস হেড (১৩৪), রোহিত (১২৫), আইডান মার্করাম (১২৪)।
আর বাংলাদেশের চিত্র যদি দেখা হয়? গত পাঁচ বছরে ১৬জন ব্যাটসম্যান মোট ১০৫টি পঞ্চাশোর্ধ্ব ইনিংস উপহার দিয়েছেন। সে ইনিংসগুলোর মধ্যে ৪৩টি ১০০ বা এর বেশি স্ট্রাইকরেটের। অর্থাৎ ৬০ ভাগ ক্ষেত্রেই বাংলাদেশের ব্যাটসম্যান ইনিংস বড় করলেও রানের গতি বাড়াতে পারেন না।
গত পাঁচ বছরে পঞ্চাশোর্ধ্ব ইনিংসে ১০০-এর বেশি স্ট্রাইকরেটে ব্যাট করা তিনজন দলের ধারেকাছে নেই। বাকি দুজন সৌম্য সরকার (১০৬.৮৯) ও তানজিদ হাসান তামিম (১০৫.৯৭) আসা –যাওয়ার মধ্যে থাকেন। এরপরই থাকা লিটন (৯৮.৫০) চ্যাম্পিয়নস ট্রফির দলে সুযোগ পাননি, নেই সাকিবও (৯৬.৩৭)।
মাহমুদউল্লাহ কাছাকাছি আছেন (৯৪.৭৪), মুশফিকও গা-লাগোয়া (৯৪.৫৩)। হৃদয়ের কথা তো আগেই বলা হয়েছে, মিরাজ (৮২.৪১) ও জাকের আলীর স্ট্রাইকরেট (৭৬.০২) হতাশা আরও বাড়ায়।
গত পাঁচ বছরে এক শর বেশি স্ট্রাইকরেটে পঞ্চাশোর্ধ্ব ইনিংস সবচেয়ে বেশি খেলেছেন মাহমুদউল্লাহ রিয়াদ, ৬টি। যার চারটিই ওয়েস্ট ইন্ডিজ ও আফগানিস্তানের বিপক্ষে। এর পরই আছেন লিটন দাস ও তামিম ইকবাল (৫টি)। তবে ইংল্যান্ড ছাড়া লিটন দাসের বাকি সব ইনিংস জিম্বাবুয়ে, আফগানিস্তান ও আয়ারল্যান্ডের বিপক্ষে। তামিম ইকবালের চারটিই জিম্বাবুয়ের বিপক্ষে, একটি দক্ষিণ আফ্রিকার বিপক্ষে।
একশর বেশি স্ট্রাইকরেটের চারটি ইনিংস আছে সাকিব আল হাসান ও মুশফিকুর রহিমের। সাকিবের একটি ইনিংস আয়ারল্যান্ডের বিপক্ষে। আর মুশফিকের চারটি ইনিংসই জিম্বাবুয়ে, আয়ারল্যান্ড ও ওয়েস্ট ইন্ডিজের বিপক্ষে। শক্তিতে পিছিয়ে নেই, এমন দলের বিপক্ষে মুশফিকের ১০০ স্ট্রাইকরেটের পঞ্চাশোর্ধ্ব ইনিংস খুঁজে পেতে ২০১৯ বিশ্বকাপে ফিরে যেতে হচ্ছে (১০২*, প্রতিপক্ষ অস্ট্রেলিয়া)। অথচ, তাঁকে ছয়ে পাঠানোই হয়েছে স্ট্রাইকরেট বাড়ানোর লক্ষ্য নিয়ে।
গত দুই বছরের হিসেবটাও দেওয়া যেত, কিন্তু এতক্ষণে নিশ্চয় বার্তাটা স্পষ্ট হয়ে গেছে। সারা বিশ্ব ওয়ানডেতে যেভাবে ব্যাটিং করছে, বাংলাদেশের ব্যাটিং তার সঙ্গে যায় না।



