অবিশ্বাস্য এক মৌসুম কাটিয়েছে বায়ার লেভারকুসেন। বুন্দেসলিগার অপরাজেয় চ্যাম্পিয়ন হয়েছে। এই মৌসুমে টানা ৫১ ম্যাচ অপরাজিত তারা। সে ধারা ৫২ হবে, আর মৌসুমের দ্বিতীয় শিরোপা ঘরে তুলবে তারা-এমনটাই ছিল প্রত্যাশিত। ইউরোপা লিগের ফাইনালের প্রতিপক্ষ আতালান্তা, যারা সিরি ‘আ’তে কোনোমতে পঞ্চম হয়েছে।
কিন্তু শাবি আলোনসোর ছন্দময় ফুটবলকে তছনছ করে দিল জিয়ান পিয়েরো গাসপেরিনির ব্যাকরণ-বিরোধী আগ্রাসন। প্রেসিংয়ের তীব্রতায় ম্যাচের শুরুতেই খেই হারাল জার্মান চ্যাম্পিয়নরা। আর সে সুযোগে আদেমোলা লুকমান গড়লেন ইতিহাস।
ইউরোপা লিগের ফাইনালে প্রথম হ্যাটট্রিকের রেকর্ড গড়েছেন নাইজেরিয়ান ফরোয়ার্ড। তাঁর তিন গোলেই ৩-০ ব্যবধানে ইউরোপা লিগ জিতেছে আতালান্তা।
গাসপেরিনির অধীনে গত কয়েক মৌসুম-জুড়েই দুর্দান্ত ফুটবল খেলছে আতালান্তা। আক্রমণাত্মক ফুটবল খেলার জন্য বিখ্যাত হয়ে উঠলেও ক্লাব ইতিহাস আর বদলানো যাচ্ছিল। ১১৭ বছরের ইতিহাসে শুধু একটি ট্রফিই ক্যাবিনেটে নিতে পেরেছে তারা। ১৯৬৩ সালে কোপা ইতালিয়া জেতার পর থেকে দলটির আক্ষেপ শুধু বাড়ছিল। গতকাল সে দুঃখ ভুলেছে তারা।
এবং কী দুর্দান্ত এক গল্পই না লিখল তারা। লুকমান যে কিনা ইংলিশ প্রিমিয়ার লিগে একের পর এক ক্লাবে ব্যর্থ হয়েছেন। এভারটন, ফুলহাম, লেস্টার সিটির মতো লিগে তলানিতে থাকা দলেও টিকতে না পারা এক ফরোয়ার্ডের ক্যারিয়ার ইতালিতে পুনর্জীবিত করেছেন গাসপেরিনি। তবু গতকাল যা করেছেন, সেটা অকল্পনীয় ছিল।
গাসপেরিনির দলের একটাই দুর্বলতা, তারা অ-ধারাবাহিক। এ কারণেই লিগে পাঁচে থেকে শেষ করেছে তারা। না হলে যতই লেভারকুসেন অপরাজিত মৌসুম কাটাক না কেন, কাগজে-কলমে আতালান্তাকেই এগিয়ে রাখার কথা ছিল। এই দলটি অলিম্পিক মার্শেইকে কোনো সুযোগ দেয়নি। লিভারপুলের মতো ক্লাবকে তাদের মাঠেই নাস্তানাবুদ করেছে।
গতকাল লিভারপুল ম্যাচের ফর্মটাই যেন টেনে আনল গাসপেরিনির শীষ্যরা।
ম্যাচের শুরু থেকেই আতালান্তার শরীরী ভাষা ও প্রেসিং ফুটবলের সামনে অসহায় মনে হয়েছে লেভারকুসেনকে। ম্যাচের শুরুতেই রক্ষণের ভুল, ক্রস থেকে জিয়ানলুকা সামাচা ঠিকমতো হেড করতে না পারায় সেবার রক্ষা পায় জার্মানরা।
১২ মিনিটে আর পারেনি তারা। দাভিদে জাপাকস্তা ডান প্রান্ত দিয়ে একটি ক্রস পাঠিয়েছিলেন, বাঁ প্রান্ত দিয়ে লুকমান এগিয়ে আসছেন, তা বুঝতেই পারেননি এজাকুয়েল পালাসিওস। মাত্র তৃতীয় আফ্রিকান খেলোয়াড় হিসেবে ইউরোপিয়ান ফাইনালে গোল করেন লুকমান।
শুরু থেকেই এমন আক্রমণাত্মক ফুটবল খেলার যুক্তি দিয়েছেন গাসপেরিনি, ‘আমাদের আক্রমণ করতেই হতো, শুধু রক্ষণ যথেষ্ট না। আমরা জানি এই দলগুলো আক্রমণে দারুণ। ওরা (লেভারকুসেন, লিভারপুল, মার্শেই) সবাই দুর্দান্ত। যেভাবে আমরা সেটা করেছি, সেটাই বেশি গুরুত্বপূর্ণ। সন্দেহ নেই, এত শক্তিশালী এক দলের বিপক্ষে এ জয় আমাদের প্রাপ্য। ইউরোপা লিগ জয় অসাধারণ এক অর্জন।’
১৪ মিনিট পর আবার ফাইনালের মতো বড় ম্যাচের চাপ বোঝা গেল লেভারকুসেনের খেলায়। গোলকিপারের কাছ থেকে বল পেয়ে আবার নিজেদের অর্ধে পাঠিয়েছিলেন লেভারকুসেনের ফরোয়ার্ড, কিন্তু সে পাস সতীর্থের কাছে না গিয়ে যায় লুকমানের সামনে। বক্সের বেশ বাইরে থেকে পাওয়া বল টেনে নিয়ে যান ইংল্যান্ডে জন্ম নেওয়া ফরোয়ার্ড। বক্সে ঢোকার আগেই ডান পায়ের বাঁকানো শটে ব্যবধান বাড়িয়ে দেন। প্রথম কোনো নাইজেরিয়ান হিসেবে ফাইনালে জোড়া গোল করার রেকর্ড এটি।
লেভারকুসেন বেশ কয়েকবার দ্রুত আক্রমণে উঠেছিল বটে, কিন্তু তাদের কোনো আক্রমণই ভয় জাগায়নি। অথচ চোটের কারণে দলটির অধিনায়ক মার্তেন দে রুন ছিলেন না মাঠে। বাধ্য হয়ে ভিক্টর বনিফাসেকে মাঠে নামার আলোনসো। দলের সর্বোচ্চ স্কোরারকে মূল একাদশে কেন রাখেননি সে প্রশ্ন অবশ্য আর জোরালো হয়নি, কারণ আতালান্তা কোনো সুযোগই দেয়নি।
পুরো মৌসুমে মাত্র এক ম্যাচে গোল করতে ব্যর্থ হয়েছিল লেভারকুসেন। সে ম্যাচেও তারা গোলের সম্ভাবনা সৃষ্টি করেছিল। কিন্তু গতকাল জার্মান ক্লাবের সৃষ্টিশীলতা ও কৌশল সব আটকা পড়ে যাচ্ছিল গাসপেরিনির সামনে।
এ মৌসুমে এর আগে ৯০ মিনিটের পর ১৭টি গোল করেছে লেভারকুসেন। অতিরিক্ত সময়ে জোড়া গোলও করতে দেখা গেছে তাদের। কিন্তু গতকাল এমন কিছুই দেখা যায়নি। এ নিয়ে খুব বেশি আফসোস নেই আলোনসোর, ‘৫২তম ম্যাচে গিয়ে হারা কোনো স্বাভাবিক ব্যাপার না। সাধারণত মৌসুমে অনেক আগেই এটা ঘটার কথা। আমরা যা অর্জন করেছি তা ব্যতিক্রমী কিছু এবং আমরা গর্বিত। আজ আমাদের দিন ছিল না। ওরা ভালো ছিল।’
অবশ্য ৭৫ মিনিটেই লুকমান নিশ্চিত করেছেন লেভারকুসেনের পক্ষে আর কোনো প্রত্যাবর্তনের লেখা হচ্ছে না। প্রতি আক্রমণে ওঠা সামাচা আশপাশে তিনজন ডিফেন্ডার দেখে বল বাড়িয়ে দেন লুকমানের কাছে। লুকমান বল নিয়ে একটু পাশে চলে যান। তারপর বাঁ পায়ের গোলায় হ্যাটট্রিকের ইতিহাস গড়েন।
ইউরোপের সব ধরনের কাপ প্রতিযোগিতার ফাইনালে হ্যাটট্রিক করা ষষ্ঠ খেলোয়াড় তিনি। তবে শুধু ইউরোপা লিগ বিবেচনা করলে তিনিই প্রথম।
১৯৭৫ সালের পর সব ধরনের প্রতিযোগিতার ফাইনালেই প্রথম হ্যাটট্রিকের জন্ম দেওয়া ২৬ বছর বয়সী ম্যাচ শেষে যেন ভাষা হারিয়ে ফেলেছিলেন, ‘আমার জীবনের অন্যতম সেরা রাত। দল দুর্দান্ত পারফরম্যান্স দেখিয়েছে। আমরা পেরেছি… আমরা আজ রাতে ইতিহাসের জন্ম দিয়েছি।’



