ভুলে যাওয়ার মতো এক ফাইনালের মধ্য দিয়ে শেষ হয়েছে বিশ্বকাপ ফুটবল ২০২৬। ফাইনালে আর্জেন্টিনার 'নেগেটিভ ফুটবলের' বিপরীতে স্পেন বল পজেশন ধরে রেখে আক্রমণাত্মক পাসিং ফুটবল খেলে ১-০ গোলের জয় তুলে নেয়। আর এর মধ্যে দিয়ে দ্বিতীয়বারের মতো বিশ্বকাপ শিরোপার স্বাদ পায় স্প্যানিশরা। ফাইনালে অতিরিক্ত সময়ে স্প্যানিশ ফরোয়ার্ড ফেরান তোরেসের পা থেকে আসা ম্যাচের একমাত্র গোলটি এই টুর্নামেন্টের ৩০৮তম গোল।
প্রশ্ন হচ্ছে, মাঠের খেলায় এই বিশ্বকাপকে ফুটবলপ্রেমীরা কীভাবে মনে রাখবে? এক্ষেত্রে তিনটি রেফারেন্স পয়েন্ট হতে পারে গোল, পেনাল্টি মিস, আর গোলকিপারদের দুর্দান্ত সব সেভ। চলুন তাহলে পরিসংখ্যানের পাতা থেকে ঘুরে আসা যাক।
রেকর্ড সংখ্যক গোল
৩৯ দিনের এই মেগা ইভেন্টে এবার ৩২ দলের পরিবর্তে প্রথমবারের মতো অংশ নেয় ৪৮টি দল। স্বাভাবিকভাবেই ম্যাচ ও গোলসংখ্যা দুটোই বেড়েছে। ৩ দেশের ১৬টি ভেন্যুতে আয়োজিত এই বিশ্বকাপে ম্যাচ হয়েছে রেকর্ড ১০৪টি, আর গোল হয়েছে রেকর্ড ৩০৮টি। অর্থাৎ, ম্যাচ প্রতি গোলের গড় ২ দশমিক ৯৬, যেটা ১৯৭০ বিশ্বকাপের পর সর্বোচ্চ।
টুর্নামেন্টে সবচেয়ে বেশি ১০টি গোল এসেছে তৃতীয় স্থান নির্ধারণী ম্যাচে, যেখানে ইংল্যান্ড ৬-৪ গোলে ফ্রান্সকে পরাজিত করে সান্ত্বনাসূচক তৃতীয় স্থান নিশ্চিত করে। আর সর্বোচ্চ ব্যবধানে জয়-পরাজয়ের দেখা মিলেছে গ্রুপ পর্বের দুটি ম্যাচে। একটিতে নবাগত কুরাসাওকে ৭-১ গোলে বিধ্বস্ত করে জার্মানি, আর অন্যটিতে কাতারকে ৬-০ গোলে হারায় স্বাগতিক কানাডা। নকআউট পর্বে রাউন্ড অব ১৬-এর ৮ ম্যাচের ৩টিতেই হয়েছে ৫টি করে গোল। আর কোয়ার্টার ফাইনালে চার ম্যাচে গোল হয়েছে ১২টি।
এবারের বিশ্বকাপে ম্যাচ প্রতি গড় গোলসংখ্যা বৃদ্ধির পেছনে সবচেয়ে বড় কারণ হচ্ছে দুর্দান্ত ফিনিশিং। আত্মঘাতী গোল বাদ দিলে এবারের টুর্নামেন্টে গোল হয়েছে ২৯৪টি, যেখানে অপটার তথ্য অনুযায়ী প্রত্যাশিত গোল বা এক্সপেকটেড গোল (এক্সজি) ছিল ২৭১ (২৭১ দশমিক ৩)। অর্থাৎ, প্রত্যাশিত গোলের তুলনায় ২৩টি গোল বেশি হয়েছে এবারের আসরে। এর আগের বিশ্বকাপগুলোতে টুর্নামেন্টের মোট গোলসংখ্যা প্রত্যাশিত গোলের চেয়ে কম ছিল।
সবচেয়ে বেশি গোল আর অ্যাসিস্ট কাদের?
এবারের আসরে সবচেয়ে বেশি ২০টি করে গোল করেছে ইংল্যান্ড ও ফ্রান্স। তবে তাঁদের গোলসংখ্যা বৃদ্ধিতে বড় ভূমিকা রেখেছে তৃতীয় স্থান নির্ধারণী ম্যাচ, যেখানে ইংল্যান্ড করেছে ৬টি গোল আর ফ্রান্স ৪টি।
টুর্নামেন্টে রানার্স-আপ আর্জেন্টিনার গোলসংখ্যা ১৯। অন্যদিকে, ৮ ম্যাচে ১৪টি গোল করেই শিরোপা জয় করেছে স্পেন। এতে বোঝা যায়, স্পেন সঠিক সময়ে ঠিকই গোল তুলে নিতে পেরেছে। এই যেমন রাউন্ড অব ১৬ ও কোয়ার্টার ফাইনালে ম্যাচের শেষ মুহূর্তে ‘সুপার-সাব’ মিকেল মেরিনোর গোলে জয় তুলে নিয়েছে। এছাড়া কোয়ার্টার ফাইনালিস্ট বেলজিয়ামও করেছে ১৪টি গোল।
টুর্নামেন্টে সবচেয়ে বেশি ১৪০টি গোলে শট নিয়েছে চ্যাম্পিয়ন স্পেন, তবে অন-টার্গেট বা গোল লক্ষ্য করে সবচেয়ে বেশি শট নিয়েছে ফ্রান্স। অন্যদিকে, তুরস্ক গ্রুপ পর্বের প্রথম ২ ম্যাচে ৬২টি গোলে শট নিয়েও কোনো গোল পায়নি। বিশ্বকাপে এটাও একটি রেকর্ড।
অ্যাসিস্টের দিক থেকেও এগিয়ে আছে ফ্রান্স। ২০টি গোল করার পাশাপাশি তাঁদের অ্যাসিস্টের সংখ্যা ১৮। ইংল্যান্ডের অ্যাসিস্ট ১৪টি, আর আর্জেন্টিনার ১২টি। এছাড়া ১০টি করে অ্যাসিস্ট এসেছে চ্যাম্পিয়ন স্পেন ও বেলজিয়ামের কাছ থেকে।
সবচেয়ে বেশি গোল হজম করেছে কারা?
টুর্নামেন্টে সবচেয়ে বেশি ১২টি করে গোল হজম করেছে তিনটি দল: ইরাক, তিউনিসিয়া ও ইংল্যান্ড। ১১টি করে গোল হয়েছে উজবেকিস্তান ও নরওয়ের বিপক্ষে। এছাড়া নিউজিল্যান্ড, সুইডেন, কাতার ও ফ্রান্স ১০টি করে গোল হজম করেছে।
গোল্ডেন বুটের সবচেয়ে তীব্র লড়াই?
বিশ্বের সেরা স্ট্রাইকাররাই যে সব সময় বিশ্বকাপের আসরে সবচেয়ে বেশি গোল করে, বিষয়টি এমন নয়। ১৯৯৮ বিশ্বকাপে ডেভর সুকার, ২০০৬ সালে মিরোস্লাভ কোজা, কিংবা ২০১৪-তে হামেস রদ্রিগেজ- এদের কেউই গোল্ডেন বুট জয়ের সময় বিশ্বের সেরা গোল স্কোরার ছিলেন না। কিন্তু এবারের আসরে দেখা গেল পুরোপুরি ভিন্ন এক চিত্র।
গোল্ডেন বুটের জন্য বিশ্বের সেরা গোলদাতাদের এতটা তীব্র প্রতিযোগিতা এর আগে কোনো বিশ্বকাপে দেখা যায়নি। ২০২২ কাতার বিশ্বকাপের গোল্ডেন বুট বিজয়ী ফ্রান্সের কিলিয়ান এমবাপ্পে এবারও গোল্ডেন বুট জয় করেছেন। গতবার ৮ গোল করা এমবাপ্পে এবার করেছেন ১০টি গোল।
বিশ্বকাপের ইতিহাসে কোনো এক আসরে ১০ বা তার চেয়ে বেশি গোল করার দৃষ্টান্ত আছে আর মাত্র তিনটি। ১৯৫৮ বিশ্বকাপে ফরাসি স্ট্রাইকার জাঁ ফন্টেইন মাত্র ৬ ম্যাচে করেছিলেন ১৩টি গোল। তার চার বছর আগে ১৯৫৪ বিশ্বকাপে হাঙ্গেরির স্যান্ডর ককসিস ১১টি গোল করেছিলেন। এরপর ১৯৭০ বিশ্বকাপে পশ্চিম জার্মানির জার্ড মুলারও করেন ১০টি গোল।
এবারের আসরে নিজের দশম গোলটি করে বিশ্বকাপের ইতিহাসে সেরা গোলদাতাদের তালিকায় মেসিকে ছাড়িয়ে শীর্ষে উঠে এসেছেন এমবাপ্পে। বিশ্বকাপে তাঁর গোলসংখ্যা এখন ২২, আর মেসির ২১।
টুর্নামেন্টে ৮টি গোল করে সিলভার বুট নিয়েই সন্তুষ্ট থাকতে হয়েছে আর্জেন্টাইন সুপারস্টার লিওনেল মেসিকে। ইংল্যান্ডের জুড বেলিংহাম ও নরওয়ের আরলিং হালান্ড দুজনেই করেছেন ৭টি করে গোল। তবে বেলিংহাসের একটি অ্যাসিস্ট থাকায় ব্রোঞ্জ বুটটা গেছে তাঁর ঝুলিতেই। এছাড়া ফ্রান্সের উসমান দেম্বেলে ও ইংলিশ অধিনায়ক হ্যারি কেইন টুর্নামেন্ট শেষ করেছেন নামের পাশে ৬টি করে গোল নিয়ে।
গোলদাতাদের সেরা দশে চ্যাম্পিয়ন স্পেনের একমাত্র সদস্য হলেন মিকেল ওইয়ারসাবাল। ৫ গোল করে তালিকায় তাঁর অবস্থান সপ্তম। অথচ ২০০৬ ও ২০১০ বিশ্বকাপে ৫টি গোল করেই গোল্ডেন বুট জিতে নিয়েছিলেন যথাক্রমে মিরোস্লাভ ক্লোজা ও থমাস মুলার। ফলে বোঝাই যাচ্ছে, এবারে গোল্ডেন বুটের লড়াইটা কতটা তীব্র ছিল।
অ্যাসিস্টের তালিকায় শীর্ষে আছেন ফ্রান্সের মাইকেল অলিসে। টুর্নামেন্টে তাঁর ৭টি অ্যাসিস্ট বিশ্বকাপের এক আসরে নতুন রেকর্ড। এছাড়া ৪টি করে অ্যাসিস্ট দিয়েছেন ৫ জন ফুটবলার: ফ্রান্সের কিলিয়ান এমবাপ্পে, আর্জেন্টিনার লিওনেল মেসি, ব্রাজিলের ব্রুনো গিমারায়েস, মরক্কোর ব্রাহিম দিয়াজ, ও নরওয়ের অধিনায়ক মার্টিন ওডেগার্ড। ইংল্যান্ডের বুকায়ো সাকা ৩ গোলের পাশাপাশি ৩টি অ্যাসিস্টও দিয়েছেন মাত্র ৪টি ম্যাচ খেলে।
পেনাল্টি মিসের বিশ্বকাপ
এবারে দিচ্ছি একটি অবাক করা তথ্য। যে বিশ্বকাপে রেকর্ড সংখ্যাক গোল হয়েছে, এমনকি প্রত্যাশিত গোলের চেয়েও বেশি গোল করেছেন ফুটবলাররা, সেই টুর্নামেন্টেই সবচেয়ে বেশি মাত্রায় পেনাল্টি মিসের নজির দেখা গেল। এবারের আসরে নির্ধারিত সময় ও টাইব্রেকার মিলিয়ে ৬২টি পেলান্টি থেকে গোল এসেছে মাত্র ৪১টি। অর্থাৎ, পেনাল্টি কনভার্শন রেট ৬৬ দশমিক ১ শতাংশ। ১৯৬৬ বিশ্বকাপ থেকে প্রাপ্ত তথ্য অনুযায়ী, এটাই কোনো আসরে সর্বনিম্ন পেনাল্টি কনভার্শন রেট।
পেনাল্টির মিসের ক্ষেত্রে সবচেয়ে বেশি দায় সেন্টারব্যাকদের। তাঁদের নেওয়া ১১টি পেনাল্টি থেকে গোল এসেছে মাত্র ৫টি। তবে আক্রমণভাগের তারকা খেলোয়াড়রাও পেনাল্টি মিস করেছেন। এই যেমন মেসি একাই মিস করেছেন ২টি। এছাড়া, এমবাপ্পে, কাই হ্যাভার্টজ, আশরাফ হাকিমি, জাস্টিন ক্লুইভার্ট ও ব্রুনো গিমায়ারেসরাও ছিলেন পেনাল্টি মিসের মিছিলে। বিশ্বকাপের মতো বড় আসরে অতিরিক্ত চাপই পেনাল্টি মিসের সবচেয়ে বড় কারণ বলে ধারণা করা হচ্ছে।
গোলকিপারদের বিশ্বকাপ
এবারে আরও একটি অবাক করা তথ্যের দিকে চোখ রাখা যাক। যে বিশ্বকাপে রেকর্ডসংখ্যক গোল হয়েছে, সেই আসরেই আবার বেশ কয়েকটি গোলকিপিং রেকর্ডেরও দেখা মিলেছে। গোল্ডেন গ্লাভস বিজয়ী স্পেনের উনাই সিমন পুরো টুর্নামেন্টে গোল হজম করেছেন মাত্র ১টি। ৮ ম্যাচের ৭টিতেই তিনি ক্লিন শিট রাখতে পেরেছেন, যেটা বিশ্বকাপের এক আসরে নতুন রেকর্ড।
রানার্স-আপ আর্জেন্টিনার গোলরক্ষক এমিলিয়ানো মার্তিনেজ ফাইনালে স্পেনের ১২টি শট সেভ করেছেন, এটাও বিশ্বকাপের ফাইনালে নতুন রেকর্ড।
তবে এবারের বিশ্বকাপে সবচেয়ে বেশি ২৮টি সেভ দিয়েছেন প্যারাগুয়ের গোলকিপার অরল্যান্ডো গিল। বিশেষ করে রাউন্ড অব ৩২-তে তাঁর দুর্দান্ত পারফরম্যান্সের কারণেই পেনাল্টি শুটআউটে জার্মানিকে বিদায় নিতে হয়েছে।
এছাড়া নবাগত কুরাসাও'র গোলকিপার ইলয় রুম গ্রুপ পর্বে ইকুয়েডরের বিপক্ষে ৯০ মিনিটে ১৫টি সেভ দিয়েছেন। এর আগে ২০১৪ বিশ্বকাপে বেলজিয়ামের বিপক্ষে রাউন্ড অব ১৬-এ আমেরিকার টিম হাওয়ার্ড ১২০ মিনিটে ১৬টি সেভ দিয়েছিলেন, যার ১৫টি এসেছিল নির্ধারিত ৯০ মিনিটে। বিশ্বকাপের এক ম্যাচে নির্ধারিত ৯০ মিনিটে রেকর্ড ১৫টি সেভ এখন তাই দু'জনেরই।
গোলকিপিং রেকর্ডের ছড়াছড়িতে আরও কয়েকজন গোলকিপার নজর কেড়েছেন এবারের আসরে। এর মধ্যে আছেন সুইজারল্যান্ডের গ্রেগর কোবেল, যার ২০টি সেভ তাঁর দলকে কোয়ার্টার ফাইনালে পৌঁছাতে সহায়তা করেছে।
তবে গোলকিপারদের মধ্যে সবচেয়ে বেশি লাইমলাইটে এসেছেন নবাগত কেপ ভার্দের ভোজিনিয়া। প্রথম ম্যাচে তাঁর সাত সাতটি সেভের কল্যাণেই শক্তিশালী স্পেনের সাথে গোলশূন্য ড্র করতে সক্ষম হয় ৫ লাখ জনসংখ্যার দেশ কেপ ভার্দে। এরপর রাউন্ড অব ৩২-তে আর্জেন্টিনার বিপক্ষে ৩-২ গোলে দল হারলেও ভোজিনিয়া ম্যাচে ৮টি সেভ দেন। অর্থাৎ, এবারের আসরে ভোজিনিয়ার ১৮টি সেভের ১৫টিই এসেছে চ্যাম্পিয়ন ও রানার্স-আপ দলের বিপক্ষে।
সার্বিকভাবে, বিশ্বকাপের এবারের আসরে রেকর্ডসংখ্যক গোল যেমন হয়েছে, তেমনি দেখা গেছে গোলকিপারদের দাপটও। এছাড়া টুর্নামেন্টে চমক দেখিয়েছে নবাগত দল কেপ ভার্দে এবং আফ্রিকার দেশ মিশর।
বড় অঘটনের মধ্যে ছিল রাউন্ড অব ৩২-তে প্যারাগুয়ের কাছে হেরে জার্মানির বিদায়। এছাড়া গ্রুপ পর্বে স্পেনের বিপক্ষে কেপ ভার্দের গোলশূন্য ড্র এবং ডিআর কঙ্গোর সাথে পর্তুগালের ১-১ গোলের ড্রতেও অনেকেই হতবাক হয়েছেন।
মাঠের খেলায় এই ছিল এবারের বিশ্বকাপের হাইলাইটস। এর বাইরে রেফারি ও ভারের সিদ্ধান্ত, হাইড্রেশন ব্রেক, মার্কিন ফুটবলার ফোলারিন বালোগানের নিষেধাজ্ঞা বাতিলসহ নানা ইস্যুতে বিতর্ক আর সমালোচনাও হয়েছে এবারের টুর্নামেন্টে।
এখন ২০২৬ ফুটবল বিশ্বকাপকে আপনি কীভাবে মনে রাখতে চান, সে সিদ্ধান্ত একান্তই আপনার।



