ছেলেদের সাবালক হওয়া উদ্যাপনে ঐতিহ্যবাহী একটি অনুষ্ঠান পালন করা হয় সাউথ আফ্রিকাসহ আফ্রিকার অনেক দেশে, যেখানে একসঙ্গে অনেক তরুণকে গণখতনা করানোর পাশাপাশি ধর্মে দীক্ষা দেওয়া হয়। সাংস্কৃতিক শিক্ষা আর দায়িত্ববোধও শেখানো হয়। কিন্তু এই অনুষ্ঠানে খতনার ক্ষেত্রে স্বাস্থ্যসম্মত বিধি না মানা ও অনিয়ম-অশিক্ষার কারণে প্রতি বছর অনেক তরুণের প্রাণ হারানোর খবর আসে। এ বছরও তার ব্যতিক্রম হলো না।
বছরে দুবার, জুন-জুলাই ও নভেম্বর-ডিসেম্বরে এই অনুষ্ঠানটি পালিত হয়। গত জুন-জুলাইয়ে এমন অনুষ্ঠানের কারণে ৩৯ তরুণ মারা যাওয়ার খবর জানিয়েছিল ব্রিটিশ সংবাদমাধ্যম ডেইলি মেইল। এবার সাউথ আফ্রিকার সরকারি হিসাবই বলছে, গত দুই মাসে গণখতনার পর পানিশূন্যতা ও সংক্রমণের কারণে ৪১ তরুণ মারা গেছেন।
গতকাল মঙ্গলবার এ তথ্য জানাতে গিয়ে সাউথ আফ্রিকার ঐতিহ্যবিষয়ক মন্ত্রী ভেলেঙ্কোসিনি হ্লাবিসা দোষারোপ করেছেন গণখতনা কার্যক্রম পরিচালনা করা দীক্ষা প্রদানকারী বিদ্যালয়গুলোর (ইনিসিয়েশন স্কুল) এবং তরুণদের অনেকের মা-বাবার ওপর। তিনি বলেছেন, এঁরা নিরাপত্তাসংক্রান্ত বিধিমালা ও চিকিৎসাসংক্রান্ত পরামর্শ না মানার কারণে এত মৃত্যু।
এ ঘটনার প্রেক্ষিতে ৪১ জনকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে বলেও জানিয়েছেন হ্লাবিসা। এর মধ্যে অনিবন্ধিত দীক্ষা প্রদানকারী বিদ্যালয়ের সংশ্লিষ্ট ব্যক্তি যেমন আছেন, তেমনি বয়স লুকিয়ে সন্তানকে গণখতনা কার্যক্রমে পাঠানো মা-বাবাও আছেন।
সাউথ আফ্রিকায় ১৬ বছর বয়স হওয়ার আগে সাবালকত্ব উদযাপনের এই অনুষ্ঠানে যাওয়া যায় না। শুধু ১৬ বছর ও তার বেশি বয়সীরা মা-বাবার অনুমতিসাপেক্ষে এই অনুষ্ঠানে যেতে পারে।
কিন্তু এসব অনুষ্ঠানে খতনা করানো তরুণদের অনেক অপ্রমাণিত পরামর্শ মেনে চলতে বলা হয়ে জানিয়ে অভিযোগ করেছেন হ্লাবিসা। অপ্রমাণিত পরামর্শের উদাহরণ হিসেবে বলেছেন, খতনা করানোর পর দ্রুত শুকানোর কথা বলে তরুণদের পানি পান করতে দেওয়া হয় না।
‘কিছু কিছু দীক্ষাদানকারী বিদ্যালয়ে স্বাস্থ্যগত মানদণ্ড মেনে চলার ব্যাপারে অবহেলা দেখা গেছে। (মা-বাবাদের উদ্দেশে) আপনি যদি আপনার সন্তানকে দীক্ষাদানকারী বিদ্যালয়ে পাঠান, কিন্তু কী হচ্ছে না হচ্ছে সে খোঁজখবর কখনো না করেন, পর্যবেক্ষণে না থাকেন, আপনার সন্তান পানি পান করছে কি না সেটা গিয়ে না দেখে আসেন, তাহলে আপনি আপনার সন্তানকেই বিপদে ফেলছেন’ – বলেছেন হ্লাবিসা।
এবার ৪১ মৃত্যুর মধ্যে সবচেয়ে বেশি হয়েছে ইস্টার্ন কেইপ রাজ্যে – ২১ জন।
সাউথ আফ্রিকাসহ আফ্রিকার অনেক দেশেই খোসা, এনদেবেলে, সোথো, ভেন্ডাসহ বিভিন্ন জনগোষ্ঠীতে ছেলেদের সাবালক হওয়া উদযাপন করতে এই অনুষ্ঠান আয়োজন করা হয়। অনুষ্ঠানের সময়ে ছেলেদের দীক্ষাদানকারী স্কুলগুলোতে পরিবার থেকে আলাদা রাখা হয় এবং সংস্কৃতি, ধর্ম ও দায়িত্ব সম্পর্কে শেখানো হয়। পাশাপাশি খতনাও করানো হয়। কার্যক্রম শেষে বাড়ি ফিরে আসা ছেলেদের আনন্দঘন অনুষ্ঠানের মাধ্যমে বরণ করে নেওয়া হয়। তবে খতনা কার্যক্রমের পর প্রতিবছরই অনেক মৃত্যুর খবর আসে, যা নিয়ে দেশটির সরকারও আইনগত ব্যবস্থা নিতে বাধ্য হচ্ছে।
আইন অনুযায়ী দীক্ষাদানকারী স্কুলগুলো অবশ্যই সরকারি দপ্তরে নিবন্ধিত হতে হবে। কিন্তু এই আইনের পরও অবৈধ বিদ্যালয় বন্ধ হচ্ছে না। বেশিরভাগ মৃত্যুর ঘটনা এসব অনিবন্ধিত বিদ্যালয়েই হচ্ছে বলে জানাচ্ছে লস অ্যাঞ্জেলস টাইমস-এর প্রতিবেদন।
সাবালকত্ব প্রাপ্তি উদ্যাপনের এই অনুষ্ঠানের জন্য ছেলেকে নিবন্ধিত করাতে মা-বাবাকে একটা নির্দিষ্ট পরিমাণ ফি দিতে হয়। এই ফি-র লোভেই অনেকে অনিবন্ধিত স্কুল খুলে কার্যক্রম চালাতে থাকেন বলে জানাচ্ছে এলএ টাইমস।



